উদ্ভূত সমস্যার দ্রুত সমাধান দরকার

মঙ্গলবার , ১০ জুলাই, ২০১৮ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
50

আমরা আশান্বিত যে, শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের বোধোদয় ঘটেছে। চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাকা ধর্মঘট স্থগিত করেছে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতি। সোমবার বেলা ১২টার দিকে এ ধর্মঘট স্থগিত করা হয়। সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কাশেম বলেছেন, ‘পরিবেশপরিস্থিতি ও রোগীদের দুর্ভোগের বিষয় চিন্তা করে আমরা চট্টগ্রামের সকল বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাকা ধর্মঘট সাময়িক স্থগিত করেছি।’

রোগীদের জিম্মি করে চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন অমানবিক ও অপ্রত্যাশিত ছিল; তেমনি ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। সমাজের প্রতি এবং সমাজের মানুষের প্রতি তাঁদের যে দায়বোধ, ধর্মঘট আহ্বানের ফলে ঘটেছে তার সুস্পষ্ট লংঘন। বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর ওপর সরকারের যে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এবং বিএমএর সহযোগিতায় এগুলো যে স্বেচ্ছাচারী ভূমিকায় নামে, সেটি এবারের এই কর্মসূচিতে স্পষ্ট হয়েছে। চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণের আগে শপথ নিতে হয়। এমনকি হুমকির মুখেও চিকিৎসকেরা দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসবেন নাএমন শপথ নিয়েই তাঁরা কাজ করতে শুরু করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের হঠাৎ ধর্মঘটের আহ্বান এই শপথকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

নগরীর চারটি বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষায় অনিয়মসহ নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগে দণ্ড দেওয়া হয়। অভিযান পরিচালনা করেন র‌্যাব ৭এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। অভিযানে মেহেদীবাগের ম্যাক্স হাসপাতাল, জিইসি মোড়ের রয়েল ও বেলভিউ হাসপাতাল এবং গোল পাহাড় এলাকর সিএসসিআর হাসপাতালকে জরিমানা করা হয়।

র‌্যাবের এই অভিযানের পর ধর্মঘট ডাকে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতি। ফলে চিকিৎসা সেবায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। কিন্তু বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে সাংবাদিকদের ওপর দায় চাপানোর কথা উল্লেখ করেছে। বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের নগ্ন হামলার প্রতিবাদে এই ধর্মঘট। তবে এই মিথ্যাচরের প্রতিবাদ করেছেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। তাঁরা বলেছেন, উদর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর মত কল্পকাহিনী তৈরী করে রোগীদের জিম্মি করে ডাকা ধর্মঘটের সাথে চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা কোনো ভাবেই সম্পৃক্ত নয়। চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশীদার। সাংবাদিকরা রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের নেয়া পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করছে।’ উল্লেখ্য যে, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে রোববার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএমডিসিকে নির্দেশ দেন।

যাঁরা ধর্মঘট করেছেন, তাঁদের যুক্তি কী ছিল? বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কাশেম বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, ‘আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর প্রতিষ্ঠান চালাবো না’। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষায় অনিয়মসহ নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগে তাঁদের এ জরিমানা দেওয়া হয়েছে। তার মানে এইসব অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না? জরিমানা করলেই কি বন্ধ করে দিতে হবে সেবা? তাঁরা কি বলতে পারবেন, চিকিৎসার অভাবে বা ডাক্তারের অবহেলায় কোনো রোগী মারা যায় না? তারা কি এভাবে রোগীদের জিম্মি রেখে সেবা বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার রাখেন? তাঁরা কি জানেন, তাঁদের ডাক্তার বানানোর পেছনে রাষ্ট্রের কত টাকা ব্যয় হয়েছে? এ টাকা যে জনগণেরতাঁরা কি তা মনে রাখেন? যা ইচ্ছে তা করার অধিকার কোথা থেকে আসছে? তাই বলা যায়, এটা শুধু অমানবিক ছিল না, অন্যায়ও। এটা এক ধরনের সন্ত্রাস।

আমরা মনে করি, শিশু রাইফার মৃত্যুকে নিয়ে চিকিৎসক ও সাংবাদিক সমাজের মধ্যে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তা সমাধানযোগ্য। কেননা, এই দুই পেশার মানুষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক : মানবসেবা ও জাতির কল্যাণ। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। আইন আইনের মতো চলবে। কোথাও আলোচনার সুযোগ তৈরি হলে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির আকস্মিক ধর্মঘট কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সামিল। আমরা মনে করি, সব প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসক এমন আমানবিক সিদ্ধান্তের পক্ষে নন। কিন্তু তাঁরা রোগীদের চেয়ে নিজেদের পেশার সংঘবদ্ধতার প্রতি বেশি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন, যা দুঃখজনক। তবু বলবো, ধর্মঘট স্থগিত করে তাঁরা ভালো করেছেন। তাঁদের এ সিদ্ধান্তের জন্য সাধুবাদ জানাই। আগামীতে যেন তাঁরা এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী কর্মসূচি গ্রহণ না করেন, সেই অনুরোধ রইলো। তবে, সামগ্রিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং উদ্ভূত সমস্যার দ্রুত সমাধান দরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিতঅবিলম্বে একটা উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং সমস্যার সমাধানের পথ বের করা।

x