উচ্চাঙ্গ সংগীতের আলোকবর্তিকা উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া

সুমন বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ২২ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
21

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনে সংগীতের মধ্য দিয়ে হাসি-কান্না, আনন্দ-দুঃখ, বিরহ-বেদনা সবকিছুকে মিলিয়ে পরিপূর্ণ জীবন কামনা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন একটি সুখী সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের পাশাপাশি সংগীতকে মানুষের হৃদয়রাজ্যে পৌঁছে দিতে। তিনি সংগীত জীবনের সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে শুধু জন্মস্থান চট্টগ্রামের সুনাম রক্ষা করেননি, পুরো দেশের সংগীতের ধারাকে একটি পরিকল্পিত রূপ দিয়ে দেশকে গৌরবোজ্জ্বল করেছেন।
উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার আবদুল্লাপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নিকুঞ্জ বিহারী বড়ুয়া ও মাতা বিরলা বালা বড়ুয়ার একমাত্র পুত্র সন্তান তিনি। আজীবন সত্যিকার অর্থে সংগীতপ্রাণ এ মানুষটি ১৪ বছর বয়সে পিতৃহারা হন এবং ১৫ বছর বয়সে সংগীত শিক্ষার উদ্দেশ্যে কলকাতা গমন করেন।
কলকাতা যাওয়ার কিছুদিন পর পরিচিত বন্ধুদের কাছ থেকে সন্ধান পেলেন প্রথম সংগীতগুরু নাটু ঘোষের। শুরু হল ব্যাকরণিক সংগীত শিক্ষা। তাঁর কাছে ৩ বছর যাবৎ সংগীত শিক্ষা লাভের পর ধ্রুপদ শেখার জন্য গেলেন বিখ্যাত ধ্রুপদিয়া অনিল কুমার ঘোষের কাছে। তাঁর কাছে একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে তালিম চললো আরো ৭ বছর। এবার মাথায় ঢুকলো সনদপত্র নিতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তো আর দেয়া যায় না। ভর্তি হলেন অল-ইন্ডিয়া মিউজিক কলেজে। সেখানে তালিম শুরু হলো কলেজের অধ্যক্ষ সংগীতাচার্য প্রফুল্ল কুমার সেনের তত্ত্বাবধানে। জন্মসূত্রে সেন আদি বাসস্থানও চট্টগ্রামে।
কালক্রমে গুরুর একান্ত স্নেহধন্য হয়ে উঠলেন উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া। ছাত্রের একাগ্রতা ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিবিড়ভাবে তালিম দেয়া শুরু করলেন উস্তাদ । এভাবে চললো আরো দীর্ঘ ৭ বছর। অবশেষে অল ইন্ডিয়া মিউজিক কলেজ থেকে স্নাতক প্রাপ্ত হন এবং ‘সংগীত বিশারদ’ ডিগ্রি অর্জন করেন উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া। গুরু শিষ্যকে বললেন, কলকাতায় থেকে যেতে এবং অল ইন্ডিয়া মিউজিক কলেজে শিক্ষকতা শুরু করতে। কিন্তু মা এবং জন্মভূমির প্রতি কর্তব্যবোধে নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। তিনি স্থায়ীভাবে স্বদেশে ফিরে আসেন। তাঁর সংগীত প্রতিভায় আকৃষ্ট হন চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টের তৎকালীন সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. কামাল এ. খান। তিনি নীরদ বরণ বড়ুয়াকে গভীর আগ্রহ সহকারে নিজ বাসভবনে রাখেন এবং চট্টগ্রামের সুধী সমাজে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। ক্রমে তিনি চট্টগ্রাম বেতার কর্তৃপক্ষের সাথে পরিচিত হন এবং অনুরোধক্রমে চট্টগ্রাম বেতারে যোগদান করেন। তিনি মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত ডা. কামাল এ. খানের কথা স্মরণ করেছেন।
১৯৬৪ সালে পাক-ভারত উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুপ্রাচীন সংগীত কেন্দ্র চট্টগ্রাম আর্য সংগীত সমিতি তাঁকে বরণ করে নেয় সমিতি কর্তৃক পরিচালিত সুরেন্দ্র সংগীত বিদ্যাপীঠের একজন সংগীত শিক্ষক হিসেবে। তিনি এ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ২৫ বছর অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত থেকে চট্টগ্রামে শাস্ত্রীয় সংগীতের ক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। আবার বৃদ্ধ বয়সে ছাত্র-ছাত্রীদের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে মোমিন রোডস্থ বাসভবনে আবার শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। যা বর্তমানে সুর-সপ্তক সংগীত বিদ্যাপীঠ নামে পরিচিত।
চট্টগ্রামের বর্তমান সংগীতানুকূল পরিবেশ তৈরির কারিগর উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া। তাঁর গড়া অসংখ্য শিষ্য-শিষ্যারা শুধুমাত্র চট্টগ্রামে নয়, সমগ্র দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে সুনামের সাথে। তারা আজ উচ্চাঙ্গ, রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিক, পল্লীগীতি বলতে গেলে সংগীতের সব শাখায় সুপ্রতিষ্ঠিত।
নীরদ বরণ বড়ুয়া একাধারে শিল্পী, সংগীতগুরু, রচয়িতা, সুরকার ও নাট্যকার হিসেবে দেশের সংগীত রসিকদের হৃদয়ে স্থান করে নেন। বিগত দু’দশকে বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় সংগীতে বন্দেশ রচনার কাজে অনেকেই এসেছেন, কিন্তু এমন রসোত্তীর্ণ বন্দেশ রচনা আর কেউ করতে পারেনি।
তিনি তাঁর অন্যতম সৃষ্টি বন্দেশগুলোকে যথাযথ সংরক্ষণের তাগিদে প্রকাশ করেছেন “আরোহ-অবরোহ” নামের একমাত্র সংগীত গ্রন্থ, যা দেশের শাস্ত্রীয় সংগীত ইতিহাসে এক অমূল্য সংযোজন। এটি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় সংগীতগ্রন্থ। উস্তাদজী রচনা করেছেন চলচ্চিত্র উপযোগী বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত সর্বপ্রথম এবং এখন পর্যন্ত সংগীত বিষয়ক একমাত্র নাটক “সুরের সন্ধানে” যা পরপর দু’বার মঞ্চস্থ হয়ে দর্শককূলের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে।’
সংগীত জগতের অবদানের স্মারক হিসেবে তিনি অর্জন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পদক, মুক্তিযুদ্ধ বিজয় মেলা পরিষদ, বাংলাদেশ বেতার ও টিভি শিল্পী সংস্থা, মাসিক সংগীত পত্রিকা ঢাকা, উস্তাদ মোজাম্মেল হক স্মৃতি পদক, বাংলাদেশ বেতার কর্তৃক গুণীজন সম্মাননা, পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন পরিষদ, শতাব্দী সম্মাননা ১৪০১সহ আরো অসংখ্য সম্মাননা। আজীবন সংগীত সেবাব্রতী উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার জীবনাবসান হয় ৯ আগস্ট, ২০০১ সালে।
আজীবন যিনি দান করে গেলেন, আমাদের জন্য, দেশের জন্য, তাঁকে আমরা কী দিয়েছি, আজকে সে বিষয়টা একটু সবাই যদি তলিয়ে দেখি, তাহলে দেখবো সেরকম কিছুই আমরা দিতে পারিনি। তাঁর বহুমুখী বিরল প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে যদি রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত করা হয় তাহলে সংগীত জগতে সংগীত অনুরাগীদের মাঝে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা এবং সংগীত সাধনার গৌরব রক্ষার্থে যুগে যুগে মননশীল চেতনা দিয়ে দেশ ও জাতির সেবায় ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসবে। সংগীত বিশারদ উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার মৃত্যুবার্ষিকীলগ্নে (৯ আগস্ট) তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি।

x