ঈদ মোবারক

রেজাউল করিম

বুধবার , ২৯ মে, ২০১৯ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
97

রমজান মাস রোজা পালনের পর আসে ঈদ-উল-ফিতর। খুশির উৎসব। এ উৎসব নিয়ে আসে খুশির বার্তা নিয়ে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনারে আজ বিলিয়ে দে/ শোন আসমানি তাগিদ…।’ নজরুলের এই বিখ্যাত গানটি শোনা যায় ‘চাঁনরাতে’। ঈদ মানে সীমাহীন আনন্দ। বছরজুড়ে নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ-কষ্ট, বেদনা সব ভুলে ঈদের দিনে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হয়। পেছনের সব গ্লানি মুছে যায়। সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরে পূত-পবিত্রতার সৌকর্যে ঈদগাহের পথে নামে ধর্মপ্রাণ মানুষ। ঈদের দিন সকাল থেকে রাত অবধি অপার আনন্দে ডুবে থাকে সবাই। ঈদ ধনী-গরিবের নির্মল আনন্দ ও পুণ্যের এক দুর্লভ অনুভূতি যা ভাগাভাগি করলে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ঈদের নতুন চাঁদ দেখামাত্র বেতার-টিভি ও পাড়া-মহল্লার মসজিদের মাইকে ঘোষিত হয় খুশির বার্তা ঈদ মোবারক।
ঈদ মানবসমাজের ধনী-গরিব ব্যবধান ভুলিয়ে দেয়ার একটি দিন। ঈদের দিনে সবাই সমান। মসজিদ, ময়দানে ঈদের নামাজে ব্যাপক মুসল্লীর সমাগম হয়ে থাকে। কাতারবদ্ধ হয়ে সকলে ঈদের আদায় করেন। ঈদের দিনে ধনী-গরিব, বাদশা-ফকির, মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় ও একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে সাম্যের জয়ধ্বনি করেন। ‘ঈদ উল ফিতর আনিয়াছে তাই নব বিধান/ ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান/ ক্ষুধার অন্ন থেকে তোমার/ ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে/ তৃষ্ণাতুরের হিস্‌সা আছে ও পেয়ালাতে/ দিয়া ভোগ কর বীর দেদার।’
উৎসব মানেই তো আনন্দদায়ক ব্যাপার, আনন্দজনক অনুষ্ঠান। ঈদে অবশ্য তাই হয়।
ঈদের জন্য একটি বছর সবাই অপেক্ষায় থাকে। ‘ঈদ এসেছে ঈদ এসেছে ঈদ মোবারক/ ঐ আকাশে চাঁদ উঠেছে দেখরে তোরা দেখ/ ধনী গরীব সবার ঘরে আজ, এলো ঈদের খুশি/ ফুটলো আবার দুঃখি জনের মলিন মুখে হাসি/ যাকাত ফিতরা পেয়ে আজ চোখে নাই নিদ/ শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলো এলো খুশির ঈদ/ ফিরনি সেমাই মিষ্টি পোলাও আরও কত খাবার/ বছর ঘুরে ঈদের আনন্দ, ফিরে এলো আবার/ মান অভিমান থাকবে নাকো ভুলে যাবে আজ/ এক কাতারে সামিল হয়ে পড়বে যে নামাজ/ ভাই ভাইকে জড়িয়ে ধরে করবে কোলাকুলি/ মনের দুঃখ, দ্বন্দ্ব ফেছাদ,সবই যাবে আজ ভুলি।’ ঈদ আমাদের আনন্দের সহযাত্রী। যাতে ছোট বড় সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাই। শত্রু-মিত্র, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না। ঈদ মানে হাসি আর আনন্দ, ঈদের খুশি সবার সঙ্গে ভাগ করে নিই।
ঈদ উৎসব পালনের ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। তা হলো- আরবের অন্যান্য সমপ্রদায়ের মধ্যে নানারকম উৎসবের প্রচলিন ছিল। উকাজের মেলা ছিল এ ধরনের একটি বর্ণাঢ্য আয়োজন। এসব উৎসব প্রায়শই নানা অশ্লীল ও রুচিহীন আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ণ থাকত। অপরদিকে মুসলমানদের জন্য তখন পর্যন্ত কোনো উৎসবের প্রচলন হয়নি। তাদের নিষ্কলুষ বিনোদনের বিষয়টি রসুলুল্লাহ (সা.) গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেন। হিজরির ২য় সাল থেকেই রমজান মাসের শেষে ঈদ উল ফিতর উৎসব উদযাপনের সূচনা হয়। বাংলাদেশে ঈদ উৎসবে গ্রামবাংলায় এমন কী শহরেও মেলা বসে। মেলায় লোকশিল্পজাত নানা পণ্যদ্রব্য বিক্রি হয়। বিক্রি হয় খাবার জিনিসপত্র। কোনো কোনো মেলায় নাগরদোলা, ছবির খেলা, পুতুল নাচ ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়। নানা ধরনের খেলাধুলা হয়। মুর্শিদি, মারফতি গানের আসর বসে। এসব কিছুই ঈদ উৎসবকে আরো আনন্দময় এবং প্রাণবন্ত করে তোলে।
বাহ্যিক দিক থেকে ঈদ আনন্দময় হয়ে ওঠে নতুন এবং সুন্দর পোশাকে, খাওয়া-দাওয়ায়। বিশেষ করে ছোটদের কাছে। ঈদের নামাজ আদায় শেষে তারা বড়দের সালাম করে। পায় সেলামি, তাতে খুশিতে আটখানা। ফিতরা-দান সে আয়োজনের পূর্ণতা রক্ষায় বিশেষ সহায়তা করে। এই উৎসবে মুসলমানদের অংশগ্রহণ হয় সর্বাত্মক এবং সর্বজনীন। কারণ সব মানুষ মিলেমিশে গড়ে তুলেছে মানব সমাজ। সেই মানব সমাজের কল্যাণের কথাই বলে ইসলাম। ঈদ এজন্য সকলের জন্য কল্যাণকর একটি উৎসব। ঈদ উৎসব এই শিক্ষা দেয় যে, নিজের সম্পদ নিজে ভোগ করলেই হবে না, সে সম্পদে অন্যেরও অধিকার আছে। কারণ ঈদ উৎসবের মূল বাণী হচ্ছে মানুষে মানুষে ভালোবাসা, সমপ্রীতি। সকলের মাঝে একতা ও শান্তি। ‘ঈদ এসেছে দুনিয়াতে শিরণী বেহেশতী/ দুষমনে আজ গলায় গলায় পাতালো ভাই দোস্তী/ জাকাত দেবো ভোগ-বিলাস, আজ গোস্বা/ বদমস্তি/ প্রাণের তশতরীতে ভরে বিলাব তৌহিদ/ চলো ঈদগাহে।’
ঈদ-উৎসবের আরেকটি অনুষঙ্গ হলো খাওয়া-দাওয়া। পোলাও- কোরমা, সেমাই, ফিরনি, পায়েশ, বিরিয়ানি আরো কতো কি।
আমাদের দেশের কিছু ‘কথিত’ ধনী যাকাত, ইফতার-সেহরি সামগ্রী, ঈদবস্ত্র বিতরণের নামে গরিবদের প্রতারণা করে। আবার ইফতার, সেহরি সামগ্রী ও ঈদবস্ত্র বিতরণের নামে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, প্রচারণার প্রতিযোগিতা। আর যাকাত নিতে গিয়ে প্রায় প্রতিবছর পদদলিত হয়ে মারা পড়ে গরিব। এটা রমযানের শিক্ষা নয়। যাকাত সারা বছর দেয়া যায়, কিন্তু ‘কথিত’ ধনীরা রমজানকে বেছে নেয় অধিক পূণ্যের আশায়। সাথে প্রচারের ব্যাপার তো আছেই। এমনটি কাম্য নয়।
জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট ও বৈষম্য-বঞ্চনা ঘোচাতে পারে না একটি ঈদ, কিন্তু সবকিছুর ভেতর দিয়েও একটুখানি আনন্দ, একটুখানি সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সমপ্রীতির নজির সৃষ্টি করতে পারে। লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানিমুক্ত হোক বিশ্ব। বাংলাদেশ আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাবে-এই প্রত্যাশা হোক সকলের।

x