ঈদ উৎসব ও সম্প্রীতির জীবনধারা

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

শুক্রবার , ১৫ জুন, ২০১৮ at ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ
96

আমাদের সকলের জানা যে, পবিত্র রমজান মাসে ধার্মিক মুসলমান মানব সত্তার আত্মিক উৎকর্ষ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিশিষ্ট উপাদান হিসেবে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে উনত্রিশ বা ত্রিশ দিন রোযা আদায় করেন। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী শরিয়তের পঞ্চ বুনিয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে রোযা। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০৫০০০ বছর কালের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সকল নবী রাসুলের শরিয়তেও তাদের উম্মতগণের উপর রোযা আদায় করা বিধিবদ্ধ ছিল। নিজের ও অপরের জীবন সমৃদ্ধিতে নিবেদিত সকল কর্মেরই যোগফল হচ্ছে ধর্ম এই অমিয় সত্যকে ধারণ করে যে কোন ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ ধর্মের গোঁড়ামী বা ধর্মান্ধতাকে পরিহার করে প্রকৃত ধার্মিকতার নির্যাসকে প্রাধান্য দিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য রোযা আদায় করে থাকেন।

রোযা আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা ও সহজসরল জীবন যাপনে অভ্যস্থ হওয়া। মহিমান্বিত রমজান মাসে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও ইন্দ্রিয় সুখভোগ থেকে বিরত থাকাই হচ্ছে ইসলামী পরিভাষায় সিয়াম সাধনা। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাধ্যমে স্বীয় দেহ মনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এর পরিপূর্ণ উপলব্ধিতে অপরের কল্যাণকে নিশ্চিত করার মধ্যেই রমজানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপিত। আমাদের হয়ত এটিও জানা আছে যে, নামায, ইবাদত, সিজদা ইত্যাদি ফিরিশতা, জিন্‌সহ অন্যান্য মাখলুক্বও সম্পন্ন করে থাকে।

কিন্তু রোযা একমাত্র মানব জাতির জন্যই স্বতন্ত্র ইবাদত যা ঈমানের অঙ্গ হিসেবে ফরয বা অবশ্যই পালনীয়। এই মাসে রোযা পালন, ইফতারসেহেরী গ্রহণ, যাকাত প্রদান ইত্যাদি কর্মকান্ড শুধু নিজের উৎকর্ষকতা অর্জনের জন্য নয়, বিভিন্ন মাত্রিকতায় নিজস্ব সম্প্রদায় ছাড়াও অন্য সম্প্রদায়ের বা ভিন্ন মতামতের জনগোষ্ঠীর সাথে সৌহার্দ, সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব তথা বিশ্বজনীন মানবতাবাদকে ধারণ করার এক অবর্ণনীয় সুবর্ণ সৃষ্টির মাস। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই মহা মানব বাণীকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে অন্যের পানাহারসহ নানাবিধ কষ্টের উপলব্ধি এক নতুন মাত্রায় মানবজাতিকে প্রতিষ্ঠিত করে যা সমাজের পারষ্পারিক আপোষ, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনকে পরিপূর্ণভাবে প্রাণিত করে।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পবিত্র রমজান মাসকে তিন ভাগে ভাগ করে প্রথম দশ দিন ‘রহমত’, দ্বিতীয় দশ দিন ‘মাগফিরাত’ ও তৃতীয় দশ দিন ‘নাজাত’ হিসেবে অভিসিক্ত করে স্বমহিমায় এই তিনটি দশককে সমাদৃত করেছেন। রহমত ও মাগফিরাত অর্জন শেষে তৃতীয় দশকে পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তির বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রাপ্তির লক্ষ্যে ইবাদত বন্দেগী অধিকতর কার্যকর হিসেবে বিবেচিত। আমরা জানি দেহ মনের সমন্বয়ে যে মানবসত্তার বিকাশ ও বিস্তার, তার মূলে রয়েছে নাফ্‌স ও রূহের পরস্পর বিরোধী কর্মযজ্ঞ। নাফ্‌স হচ্ছে মানুষের মনস্তাত্তিক কিছু বিরূপ সত্তা যেমন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এবং অপাংক্তেয় পানাহার ইত্যাদি।

পাপের প্রতি আকৃষ্ট, পাপ করে অনুতপ্ত হওয়া এবং পাপের প্রতি অনুরাগী না হয়ে পবিত্র কাজের প্রতি আকর্ষণ এই তিন ধারায় বিভক্ত নাফ্‌স’র উত্তম পর্যায় হচ্ছে নির্মোহ ও নির্লোভ থেকে পাপাচার মুক্ত বা নাজাত প্রাপ্তি। অন্যদিকে বলা যায় পানাহার ইত্যাদি দ্বারা নাফ্‌স যখন শক্তিশালী হয়, রূহ তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। আর রোযা পালনের মধ্যে অর্থাৎ পানাহার ইত্যাদি থেকে নিজেকে বিরত রেখে নাফ্‌সকে শক্তিহীন করে আত্মার পরিশুদ্ধতা উন্নতকল্পে রূহকে শক্তিশালী করার মধ্যেই রোযা পালন হয় মহিমান্বিত। মূলত এই রূহের পরিশুদ্ধি আত্মশুদ্ধি এবং আত্মসংযমের নিরন্তর সাধনা যা সূফি দর্শনের আধ্যাত্মিক অগ্রগতি এবং মানব কল্যাণে স্বীয় সত্তাকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে স্রষ্টার প্রতি অপরিসীম অনুগত্য প্রকাশ এবং মাহে রমজানের অর্থবহ কার্যকারিতার বিধান।

পবিত্র কোরআনে শুধু মাত্র যে মাসটির কথা উল্লেখ আছে সেটি হচ্ছে রমজান মাস। এই রমজান মাসের তাৎপর্য ইসলামের ইতিহাসে বিশাল। এই মাসেই প্রিয় নবীর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় মহান বদর যুদ্ধ। মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীদের নিয়ে প্রায় এক হাজার শত্রু মোকাবেলা করে মহাল আল্লাহর অপার কৃপায় ঈমানী শক্তিবলে জয়লাভ করে মুসলমানগণ। এই যুদ্ধে জয়ী হতে না পারলে আদৌ পবিত্র ইসলাম ধর্ম সুদৃঢ় হয়ে আজকের পর্যায়ে আসতে পারত কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই পবিত্র রমজান মাসেই পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআন নাজেল হয়েছে এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ রজনীও এ মাসেই অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও ইসলামের ইতিহাসে বহু ঘটনা সম্বলিত এই মাস ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের অনেক বেশি গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।

পবিত্র রমজান মাসের শেষে যে ঈদউলফিতর বা ঈদ উৎসব তার পটভূমি উপলব্ধি করতে হলে পবিত্র রমজানের দর্শন তথা সংযম, ত্যাগ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ, আচারআচরণ, নামাজদোয়া, অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়া, গরীবদুখিদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদির আলোকে উপলব্ধি করতে হবে। ইফতারসেহেরী, তারাবির নামাজ, যাকাত প্রদান, ধনীদরিদ্রের ব্যবধান ঘুছিয়ে এক আল্লাহতালার সৃষ্ট মানব হিসেবে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, অন্যের ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা ইত্যাদি পরিহার করে পরিপূর্ণ মানবিক ও অসাম্প্রদায়ীকতায় দিক্ষিত হয়ে একটি মননশীল ও সুন্দর মানসিকতায় ঋদ্ধ হওয়া পবিত্র রমজানের শিক্ষা। এবং এর পরেই সকলে মিলেমিশে শ্রেণীবর্ণধনীদরিদ্র নির্বিশেষে ঈদ উৎসব আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যেই প্রকৃত সুখ ও শান্তি নিহিত রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, এই মাসে যাকাত ও ঈদের দিন ফিতরা দেওয়ার রেওয়াজ একটি বৈষম্যহীনতার অসাধারণ উদাহরণ। যাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি বা পবিত্র করা। ব্যক্তিগত গচ্ছিত সম্পদের উপর গরীবের যে পাওনা রয়েছে তা আদায় করার নামই যাকাত। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে ’তোমরা মানুষকে আল্লাহর হুকুম মতে সম্পদের যে অংশ অন্যদের বন্টন করে দাও তা তোমাদের সম্পদের বৃদ্ধি ঘটায়’। অর্থাৎ যাকাত ফিতরা আদায় করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল আত্নীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী বা সমাজের গরীব দুখি মানুষকে খাদ্যদ্রব্য, নতুন কাপড়চোপড় বা নগদ অর্থ প্রদান করে তার অভাব ঘোচাতে বা স্বাবলম্বী হওয়ার পথে উৎসাহিত করাই যাকাতের মূল লক্ষ্য।

যাকাত দাতা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বৈধ উপাজর্নের পথে নিয়োজিত থাকবেন এবং এই বৈধ উপার্জন থেকেই অন্যকে সাহায্য সহযোগিতা করবেন এটিই কাম্য। আর অপর দিকে যাকাত গ্রহীতা দাতার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রেখেই প্রাপ্ত যাকাত যথাযথভাবে ব্যবহার করে নিজে স্বাবলম্বী হয়ে অন্যকে এ রকম যাকাত প্রদান করে উৎসাহিত করার মনমানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হবেন এটিই প্রত্যাশিত। ভিক্ষাবৃত্তিকে ইসলাম কখনো সমর্থন করেনা বরং আত্মনির্ভরতা ও স্বয়ম্ভরতাকে উজ্জীবিত করে নিজ ও নিজ পরিবারের দায়ভার গ্রহণের মধ্যে আত্মসনু্তুষ্টির সার্থকতা। আমাদের প্রিয় নবী কাঠুরিয়াকে ভিক্ষা না করে নিজের শক্তি বলে বৈধ উপার্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। ঈদ উৎসবের মহাশিক্ষা হচ্ছে মনের সকল কালিমা ও পাপের গ্লানিকে দুর করে, লোভলালসাকে সংহার করে, অন্ধকারঅসূচিবিদ্বেষবিভেদকুপমন্ডুকতা, সাম্প্রদায়িকতাসহ ইত্যাদির অশুভ ও অসুন্দর মানসিকতার নিধন ঘটিয়ে একটি সমৃদ্ধ, সুন্দর ও উজ্জ্বল মনের পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং দেশ ও জাতিকে ভালবেসে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা। নিজের পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করে অন্য কেউ আলোকিত করার পথ প্রসস্থ করে ইহ ও পরকালীন মঙ্গল কামনায় নিজের জীবনকে যথার্থ অর্থে পরিচালনা করার মধ্যেই ঈদ উৎসবের সার্থকতা।

লেখক: শিক্ষাবিদ, উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x