ঈদ আনন্দ

আব্দুস সালাম

বুধবার , ১৩ জুন, ২০১৮ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ
46

হাবিব ও হাবিবা দুই ভাইবোন। মেহেরপুর জেলার শহরতলীতে ওদের বাসা। বাবা ঢাকাতে রিকশা চালায়। দুই তিন মাস পর পর ওদের সঙ্গে দেখা করতে আসে। আর মা বাড়িতে বসে কুটির শিল্পের কাজ করে। কখনও কাঁথা সেলাই করে, কখনও পুঁতি দিয়ে মালা, ব্যাগ ও বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ধরণের খেলনা তৈরি করে। বাবামায়ের দু’জনার রোজগারে তাদের সংসারটা কোনরকমে চলে যায়। বাবামায়ের কষ্ট দুই ভাইবোন উপলব্ধি করতে পারে ঠিকই। তারা এও বুঝতে পারে যে, মাবাবা তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে যে, তারা যেন ভালোভাবে লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। তাই দুই ভাইবোন মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করে। তাদের কোন বইপুস্তকের প্রয়োজন হলে বাবা ঢাকার নীলক্ষেত থেকে পুরাতন সেসব বইপুস্তক কিনে আনে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য তারা উৎফুল্ল চিত্তে সেসব বইয়ের পড়া শিখে নেয়। পড়াশুনায় মনোযোগী দেখে মাবাবাও তাদের প্রতি খুশি হয়।

হাবিব ও হাবিবা একই স্কুলে পড়ে। পড়াশুনাতে ওরা যথেষ্ট ভালো। দুই ভাইবোন পায়ে হেঁটে নিয়মিত স্কুলে যায়। স্কুলে যাওয়ার সময় মা টিফিনের জন্য মাঝে মাঝে তাদের হাতে টাকা দেয় আবার কখনও কখনও ওদের জন্য খাবার তৈরি করে দেয়। হাবিব একদিন হাবিবাকে বলল, আমরা তো গরিব মানুষ। আব্বামা খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। যখন তখন নতুন জামাকাপড় কিনতে পারে না। তাই সবসময় পুরাতন জামাকাপড় পরে থাকে। গতবছর আব্বা আমাদের জন্য ঢাকা থেকে সকলের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনে এনেছিল ঠিকই কিন্তু আব্বা নিজের জন্য কোন নতুন পোশাক কেনেনি। মাস তিনেক পর আবার রোজা শুরু হবে। চল আমরা এক কাজ করি। মা টিফিনের জন্য আমাদেরকে যে টাকা দেয় তা সব খরচ না করে কিছু টাকা জমা করে রাখি। সেই জমানো টাকা দিয়ে আমরা আব্বার জন্য ঈদের সময় একটা জামা কিনে দেব। তাহলে দেখবি আব্বা খুব খুশি হবে। তবে সাবধান মা যেন আমাদের পরিকল্পনার কথা কোনভাবেই জানতে না পারে। হাবিবা ভাইয়ের সাবধান বাণীতে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। এরপর থেকে শুরু হয় তাদের টাকা জমানোর পালা।

দুই ভাইবোনের মধ্যে একজনের টাকা দিয়ে টিফিন কিনে তারা ভাগ করে খায়। মাঝে মাঝে হাবিব না খেয়ে ছোট বোন হাবিবার জন্য পুরো টিফিনটাই দিয়ে দেয়। এভাবেই তারা টাকা জমাতে থাকে। দেখতে দেখতে রোজা শুরু হয়ে যায়। রোজার সপ্তাহ খানিক পর তাদের স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। হাবিব তাদের জমানো গুনে দেখে প্রায় ৩৫০ টাকা হয়েছে। ঈদের দুই দিন আগে ঢাকা থেকে আব্বা বাড়িতে আসবে শুনে তারা খুব খুশি হয়। যথাসময়ে আব্বা বাড়িতে ফিরে আসে। বাবা সকলের জন্য নতুন পোশাক কিনেছে। হাবিব ও হাবিবা নতুন পোশাক পেয়ে খুব খুশি হয়। দুই ভাইবোন এবারও লক্ষ্য করে যে, বাবা সকলের জন্য কেনাকাটা করলেও নিজের জন্য কিছু কেনেনি।

বাবা পরেরদিন দুইভাই বোনকে নিয়ে বারান্দায় বসে গল্প করছে। এমনসময় হাবিবা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে তোমাকে আমরা ঈদের জন্য একটা উপহার দিতে চাই। যদি রাগ না কর তাহলে বলতে পারি। ‘ঠিক আছে বল্‌ রাগ করবো না। তুই যা দিবি তাই নেব।’ বাবা উত্তর দিল। বাবার উত্তর শুনে হাবিব পাশে বসে মুখ টিপে হাসতে থাকে। ‘তোমাকে একটা জামা কিনে দিতে চাই।’ ভাইয়া আর আমি টাকা জোগাড় করেছি। ‘তো কত টাকা জোগাড় করেছিস?’ ‘৩৫০ টাকা।’ হাবিব উত্তর দেয়। এত টাকা তোরা কোথায় পেলি? বাবার এ প্রশ্নের উত্তরে টাকা জমানোর সব কথা হাবিব বাবাকে খুলে বলে। বাবা বুঝতে পারে ঈদে সে নতুন জামা পরে না বলে তার দুই সন্তান এমনটি করেছে। বাবা দুই সন্তানকে পরমাদরে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। হাবিবা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে বাবার দু’চোখ অশ্রুতে পূর্ণ। সে আবার প্রশ্ন করে, বাবা তুমি রাগ করেছ? ‘না মা, না। আমি রাগ করিনি। আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমি অবশ্যই তোদের টাকা দিয়ে জামা কিনব। তবে আমার অনুরোধ তোরা আর কখনও এভাবে কষ্ট করে টাকা জোগাড় করব না। তাহলে কিন্তু আমি খুব রাগ করবো’

জামা কেনার জন্য বিকালবেলায় বাবা হাটে গেল। ৩৫০ টাকার সঙ্গে আরও কিছু টাকা যোগ করে নতুন একটি জামা কিনল। ঈদের দিন বাবা সেই নতুন জামা পরে হাবিবকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে গেল। বাবার গায়ে নতুন জামা দেখে হাবিব ও হাবিবা দু’জনায় খুব খুশি হলো।

x