ঈদুল আযহার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে আর কতদিন লাগবে আমাদের?

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ
46

অথচ চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে বলা যায় কোরবানির পশুর হাটে আসা অজস্রঅসংখ্য পশুর মধ্যে (আনুমানিক ৮৫ লক্ষ) এমন একটি পশুও নেই যার যত্নে কোনো নারীর হাত কাজ করেনি। বরং আমরা বলতে পারি বিষাক্ত মোটাতাজাকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে নারীই পারতো রুখে দাঁড়াতে। নারীর ক্ষমতায়ন বা সমতায়ন আসতে হবে সকল কাজে সমান অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। মানুষের মর্যাদায় তার অভিষিক্ত হওয়ার পথ শুধু মৌখিক স্বীকৃতি বা দানের পথ নয়। সেপথে আদৌ যে কিছু হবার নয় তা আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।

ঈদের পরে প্রথম দেখায় আট/দশ দিনের ব্যবধানে হলেও ঈদ নিয়ে দুচারকথা হতেই পারে। আশা করি এতে আঁতকে ওঠার কোনো কারণ নেই। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কথারাও বদলে যায় তো! একবার ভাবুন তো, একটা সময় ছিল, এই সেদিন অব্দিও ছিল সে সময়, যখন ঈদুল আযহার কথা ভাবতে গেলেই কর্তাগিন্নী দুপক্ষেরই মাথা ঘুরত। গিন্নীর মাথায় দাবটি, ধামারিকাটারির ঝনঝনা, শিলনোড়ার ঘষঘষানি, রোদের উঠোনে কি বাড়ির ছাদে হলুদমরিচ জিরে ধনের রোদোৎসব কত কত দিন ধরে চলত! অন্যপক্ষের মাথায় ততদিনে পশুর হাটবাজার বসে যেত। মনের মতো কোরবানির পশুটি কিনে ফেলার আগ পর্যন্ত স্বস্তি নেই। তারপর অন্য ধরনের আয়োজন চলে এপক্ষেওপক্ষে। শুধু চিন্তাভাবনা নয়, সঙ্গে থাকে দুশ্চিন্তাদুর্ভাবনা। নির্ভার, নিশ্চিন্ত আনন্দ থাকে শিশুকিশোরদের। ঈদের নামায শেষে শুরু হয় ছোটাছুটি, হল্লাচিৎকার। কোরবানিকাটাকুটিভাগাভাগির বিশাল কর্মযজ্ঞটা বাইরে শেষ হলে শুরু হয় অন্দরের আয়োজন। মাংস সামলানোবিলোনো এবং একই সঙ্গে রান্নাবান্নার আয়োজন। উৎসবের এমন আয়োজনে দুপক্ষের কর্মতৎপরতায় উনিশবিশ বিশেষ ছিল না বা এখনও নেই বললেও চলে। তবে ইদানিংকালে হাতপা ঝাড়া বয়স্ক দম্পতিরা অনেকেই আর্থিক এবং পারিবারিক আনুকূল্য পেলে সব ছেড়ে ছুড়ে দুচারদিনের জন্য এদিকওদিক ঘুরে আসছেন। সপরিবারে দেশের বাইরে ঈদের ছুটি কাটানো পরিবারও এখন অনেক। এরা কোরবানির ভারটা আত্মীয়স্বজন বা কর্মক্ষেত্রে অধস্তন কারও দায়িত্বে দিয়েই যান। এদের নিজেদের আনন্দ বাড়ে, অন্যরাও উপকৃত হন হয়তো বা। উন্নতি তো লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়! আমরা নিশ্চয়ই উন্নতির পথে ধাবিত হচ্ছি।

ঈদের ছুটি বা যেকোনো ধরণের ছুটি ঘরকন্নার কাজে নিয়োজিত নারীর জন্য নয়। বছরে ১০ লক্ষ কোটি টাকার সবটাই তাই তার অদৃশ্য শ্রমের দান। তার কোনো ছুটি নেই। ছুটি শব্দটাই তার অভিধানে নেই। তবে হ্যাঁ, ঈদের দুচারদিন পরে কোনো এক সুন্দর সকালে দরোজার বাইরে থেকে হামা দিয়ে যখন খবরের কাগজ ঢোকে তখন আমরা বুঝি যে ছুটির দিন ফুরিয়েছে। দেশটা আবার কর্মতৎপর হয়ে উঠেছে। সেদিন (২৭ আগস্ট ২০১৮) দৈনিকের পাতায় (দৈনিক সমকাল) যে খবরটি দেখে চমকে উঠেছি তার শিরোনাম ছিল, ঈদে ৪৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন। ‘উৎসবের অর্থনীতি’ পর্যায়ের এ খবরটিতে বলা হয়েছে এ টাকার বেশির ভাগই কোরবানির পশুর (মানুষের ভেতরের পশুটিকে কোরবানির পশুর সঙ্গে কোরবান দিতে হয় এমন কথা শুনে শুনে কেন যেন মনে হয় ‘পশু’ শব্দটার গায়েও কলঙ্ক লেপন করেছে মানুষ; আহা মানুষ!) মূল্য এবং তার চামড়ার টাকার। নির্বাচনের বছর বলে এবারে অপেক্ষাকৃত বেশি পশু কোরবানি হয়েছে।

বিশদে এ খবরের পুনরাবৃত্তি আদা ব্যাপারীর কাজ নয়। আসলে তার কোনো প্রয়োজনও নেই। যেপ্রশ্নটা মনে এল তার কথাই বলি। এমন একটি মহাযজ্ঞে নারী কোথায়? নারী উদ্যোক্তা, নারী ব্যবসায়ীর সংখ্যা এবং তাদের কর্মযজ্ঞ দিনে দিনে বাড়ছে। পশু পালন এবং কৃষি কাজে নারীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই। আদি কৃষক হিসেবে নারীর ঐতিহাসিক স্বীকৃতি রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষ করে চামড়া ছাড়ানো থেকে মাংস কাটার কাজে নারীর হাতের কাজের দক্ষতা নিঃসন্দেহে প্রশ্নাতীত হবার কথা। মৌসুমী প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা নারী এক্ষেত্রে এখনও সক্রিয় হচ্ছেন না কেন? ৬০০ কোটি টাকার চামড়ার বাজারেও নারী নেই। অথচ চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে বলা যায় কোরবানির পশুর হাটে আসা অজস্রঅসংখ্য পশুর মধ্যে (আনুমানিক ৮৫ লক্ষ) এমন একটি পশুও নেই যার যত্নে কোনো নারীর হাত কাজ করেনি। বরং আমরা বলতে পারি বিষাক্ত মোটাতাজাকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে নারীই পারতো রুখে দাঁড়াতে। নারীর ক্ষমতায়ন বা সমতায়ন আসতে হবে সকল কাজে সমান অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। মানুষের মর্যাদায় তার অভিষিক্ত হওয়ার পথ শুধু মৌখিক স্বীকৃতি বা দানের পথ নয়। সেপথে আদৌ যে কিছু হবার নয় তা আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।

সৌদি নারীর হাতে গাড়ির স্টিয়ারিংখবরটা মাত্র সেদিনের। কিন্তু তোলপাড় হয়ে গেল ওদের দেশ জুড়ে। দেশের অর্থনীতিতে নারী চালকের হাত কতটা অবদান রাখতে সক্ষম হবে তার হিসাব হয়ে গেল রাতারাতি। অথচ বহু দিন ধরে আমাদের মেয়েরা চালকের আসনে রয়েছে। জনসংখ্যার অর্ধেক তো (এখনও) নারী। কিন্তু চালকের আসনে তাদের সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম। আমাদের সেতুমন্ত্রী একটি ড্রাইভিং স্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একবার বলেছিলেন নারীদের মাথা ঠাণ্ডা। নিয়মকানুনের প্রতি (এক্ষেত্রে ট্রাফিক সিগন্যাল ও অন্যান্য নিয়নমকানুন) তারা শ্রদ্ধাশীল বেশি। নেশাজাতীয় দ্রব্যে তাদের আসক্তি কম। তাদের হাত দিয়ে দুর্ঘটনার নজির নেই। এর একটি কথাও কথার কথা নয়। অথচ ব্র্যাক ভিন্ন আর কোনো প্রতিষ্ঠানকে সেভাবে এগিয়ে আসতে দেখা গেল না। ব্র্যাকে নারী চালক কাজ করছেন ২০১২ থেকে। আমাদের নারীবান্ধব সরকার নারী গাড়িচালক নিয়োগে ১০ শতাংশ কোটার বিষয়টি মাথায় রেখেছেন অনেকদিন ধরে শুনেছি কিন্তু তার বাস্তব রূপ দেখিনি। বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস চালু করেছে ২০০২ থেকে। এখন তা কাগজকলমের বিষয়। কারণ পরিবেশ সৃষ্টিতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ সামান্য কয়েকটা বিষয় যেমন দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে থাকায় বিশেষ করে রাতের বেলায় আনুষঙ্গিক নিরাপত্তা, স্যানিটেশনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের (ঘুমসহ) ব্যবস্থা, শৌচাগার ইত্যাদি বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকার প্রয়োজন ছিল। যথাসময়ে যথাযথ পদক্ষেপ গৃহীত হলে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার এমন মহামারী হতে পারত না। অন্তত ১২ বছরের কিশোরের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং এবং দল বেঁধে কিশোর বালকদের পথের আন্দোলনে নেমে আসা এবং পরবর্তী দুর্ঘটনাগুলোও হয়তো ঘটত না।

দেশের মানুষ’ শিরোনামে গত ৪ আগস্ট ২০১৮ য় দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে রিকশামিস্ত্রী নাজমা খাতুনকে দেখেছি আমরা। বাবা রিকশামিস্ত্রী ছিলেন বলে রিকশা সারাই এর যন্ত্রপাতির সঙ্গে ছিল তার আবাল্য পরিচয়। এ পেশায় আসতে হবে স্বপ্নেও এমনটা ভাবেনি নাজমা। বাবা যথাসময়ে বিয়ে দিয়েছিল কিন্তু চোখের উপর স্বামীকে বদলে যেতে দেখে নাজমা সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে আর কালক্ষেপণ করেনি। তবে অত্যাচার আর অপমানের জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে নিজেই যে আত্মনির্ভরশীলতার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে সক্ষম হবে তাও সে ভাবে নি। পঁয়তাল্লিশে পৌঁছে পাঁচ সন্তানের জননী নাজমা আজ শুধু রিকশামিস্ত্রী নয়, রিকশামিস্ত্রীদের প্রশিক্ষকও বটে। অনেক শিষ্যের সে ওস্তাদ। এমন এক শিষ্যের সঙ্গেই বিশ বছর ধরে ঘর করছে নাজমা। এ স্বামী কখনও স্বামীত্ব ফলায়নি বরং ‘ওস্তাদ’ বলে সমীহ করতেও ভোলে না। নিজের ক্ষুদ্র কারিগরি জ্ঞান পুত্র কন্যাদেরও দিচ্ছে নাজমা। তার বিশ্বাস, কাজে আবার নারীপুরুষ কি? সব কাজ সবাই পারে।

আমাদের খোলা চোখ নারীপুরুষের সমান মজুরিতে একই কাজের ক্ষেত্রে নিখাঁদ আনন্দের বাতাবরণটি দেখতে পায়। সেখানে নির্মল আনন্দ কখনোই কোনো বিভৎস ছন্দপতনের পথে যায় না। কারওরান বাজারে রাতভর পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সবজির ট্রাক এলে নারীরাও ছোটে। সবজি ওঠানোনামানোর কাজ করে। সেখানে কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে শুনি নি। যেমন আমাদের রিকশামিস্ত্রী নাজমা জানে ওস্তাদশিষ্যে নারীপুরুষের প্রশ্ন নেই, সম্মানের কমবেশির প্রশ্ন নেই।

পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্রে, প্রতিটি পরিবার থেকে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে নারী সমমর্যাদা পেলে, তার শ্রম যথার্থ স্বীকৃতি পেলে, মজুরিবৈষম্য ঘুচলে সমতায়নের দরোজা আপনিই খুলে যাবে। সমতাসুন্দর জীবনে নারীর প্রতি অন্যায়, অসুন্দর বা অশ্রদ্ধেয় কোনো আগাছার চাষ হতেই পারে না। আমাদের পোশাক খাত দেশকে যা দিচ্ছে, রপ্তানির ৮৪ ভাগ যে খাত থেকে আসছে সেখানে নারীই যে প্রধান চালিকা শক্তি এতে দ্বিমত নেই। অথচ মজুরি নির্ধারণের বেলায় তার জীবনযাপনের ব্যয়ের নিরিখাটই দেখা হচ্ছে এখনও। এবং আমরা জানি মজুরি যৎসামান্য কিছু বাড়লে অতিরিক্ত কাজের চাপে প্রকারান্তরে তা কেড়ে নেওয়া হয়। অর্থনীতিবিদ রেহমানসোবহান মজুরি নির্ধারণের এ পদ্ধতিটিকে বলেছেন, ‘পশু অ্যাপ্রোচ’। মনের পশুপ্রবৃত্তি দূর করার জন্য আমাদের আরও কত ঈদুল আযহার প্রয়োজন হবে জানি না।

x