ঈদুল আজহা : আল্লাহর আনুগত্যের নিদর্শন

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ
81

মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের অনুপম নিদর্শন হিসেবে প্রতীকী পশু কোরবানির উপলক্ষই হলো ঈদুল আজহা। আল্লাহ পাক তাঁর নৈকট্যধন্য হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাস্তায় কোরবানির নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজের প্রাণাধিক পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দিতে উদ্যত হন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) বেছে নেন প্রাণাধিক পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে। হযরত ইসমাইল (আ.) এর এই কোরবানি আল্লাহ পাক কবুল করেন। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে হযরত ইসমাইলের (আ.) কোরবানির পরিবর্তে জান্নাতি একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিজের প্রাণাধিক বস্তুকে কোরবানি তথা আত্মোৎসর্গ করাই হচ্ছে ঈদুল আজহার মর্মবাণী ও শিক্ষা। হাজার হাজার বছর ধরে মুসলমানরা প্রতীকী পশু কোরবানি দেয়ার মাধ্যমেই ঈদুল আজহা উদযাপন করে আসছেন। নিজেদের ভেতরে গেড়ে বসা পশুত্ব চরিত্র বিসর্জন, সমস্ত পাশবিকতা নির্মূলের মাধ্যমে শুভ শক্তির উন্মেষ ঘটানোই ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও শিক্ষা।
প্রতীকী পশু কুরবানি দিয়ে মানুষের ভেতরের পাশবিক উপসর্গ নির্মূলের ঐশী আবাহনে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে বিলীন করে দেওয়া এবং আত্মত্যাগে সমর্পিত হবার দিনটি মুসলমানদের আজ দোরগোড়ায়। নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু আল্লাহর নির্দেশে কুরবানি তথা বিসর্জন দেওয়াই ঈদুল আজহার দর্শন ও মর্মবাণী। মুসলমানদের ঈমানি চেতনার জাগৃতির স্মারক পবিত্র ঈদুল আজহা। কুরবানির ত্যাগের উৎসবে শামিল হয়ে ও পশু কুরবানির নজরানা পেশ করে সামর্থ্যবান দ্বীনদার মুসলমানরা মূলত নিজেদের ভেতরের পাশবিক প্রবৃত্তিরই নির্মূল করে থাকেন। কুরবানির ত্যাগ ও পরীক্ষার মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর নৈকট্যধন্য বান্দাহ্‌র কাতারে উপনীত হন। এভাবে ঘুচে যায় স্রষ্টার সাথে বান্দাহ্‌র দূরত্ব। আল্লাহ্‌ পাকের সঙ্গে নিবিষ্ট বান্দাহর মেলবন্ধন গড়ে ওঠে পবিত্র কুরবানির মধ্য দিয়ে। মুসলমানদের অন্যতম বড়ো উৎসব ঈদুল আজহা ও কুরবানি। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা ঈদুল আজহার কুরবানি পর্ব এবং অপরিহার্য এ ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রবর্তক হলেন মুসলিম মিল্লাতের আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ)।
মহান প্রভু আল্লাহ্‌র প্রেমে আত্মোৎসর্গীত এ মহান নবী নিজ প্রাণাধিক পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় নিবেদনের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন তা এককথায় বিস্ময়কর। হযরত ইব্রাহিম (আ) কর্তৃক পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্যার্জনে কুরবানি দেওয়ার মর্মস্পর্শী ঘটনা ও স্মৃতিকে জীবন্ত করে রাখার জন্যই কুরবানির এ বিধান। যা বাহ্যিকভাবে প্রতীকী পশু কুরবানির মাধ্যমেই মুসলমানরা সাড়ম্বরে পালন করে আসছে। ঈদুল আজহার এই কুরবানির দিনে হালাল জন্তুর গলায় ছুরি চালিয়ে বস্তুত একজন মুসলমান তার অভ্যন্তরীণ কুপ্রবৃত্তির গলায়ই ছুরি চালিয়ে থাকে। অহমিকা, আত্মম্ভরিতা ও অহংকারের খোরাক খেয়ে বান্দার ভেতর যে পশুত্ব দিনে দিনে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে, কুরবানির ছুরি দিয়ে বস্তুত সেই পশুত্বই নির্মূল করা হয়। নিজের জীবন থেকে পাশবিক উপসর্গগুলো দূরীভূত করতেই কুরবানি ও ঈদুল আজহা এক মোক্ষম অবলম্বন নিঃসন্দেহে।
আরবী ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ হলো আনন্দ। ‘আজহা’ শব্দের অর্থ ত্যাগ। কিন্তু ঈদুল আজহা নিছক কোনো আনন্দোৎসব নয়; ত্যাগ ও মিলনের উৎসব ঈদুল আজহা প্রতিবছর নিয়ে আসে এক বৈচিত্র্যময়, স্বাতন্ত্র্যধর্মী উৎসবের আমেজ। ঈদুল আজহা হযরত ইব্রাহিম (আ), হযরত মা হাজেরা (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ)-এর পরম ত্যাগের স্মৃতিই বহন করে। হযরত ইব্রাহিম (আ) কে পবিত্র কুরআনে মুসলিম জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নবী পরিবারটি বিশ্ব মুসলিমের জন্য ত্যাগের উজ্জ্বলতর আদর্শ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হুকুম পালনে হযরত ইব্রাহিম (আ) ছিলেন বড়োই নিবেদিতপ্রাণ। জাগতিক কোনো মোহ, কোনো লোভ লালসা কোনো ধরনের স্বার্থচিন্তা কিংবা কোনো সংকীর্ণতা তাকে আল্লাহর হুকুম পালনে বিন্দুমাত্রও বিচলিত করতে সক্ষম হতো না। তার আত্মপ্রত্যয়ী ঘোষণাই ছিল ‘আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ- সব কিছুই জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তার কোনো শরীক নেই, আমি এভাবেই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।’ [আল কুরআন-৬: ১৬২-১৬৩] হযরত ইব্রাহিম (আ)-এর মহান ত্যাগের ফলই হচ্ছে ঈদুল আজহা। আর এর প্রধান উপলক্ষই হলো কুরবানি।
ঈদুল আজহার কুরবানিতে পশু কুরবানির দ্বারা আল্লাহর হক যেমন আদায় হয় তেমনি গরিব দুঃখী মানুষের ভাগ্যও সুপ্রসন্ন হয়। যে দরিদ্র লোক সারা বছর গোশত খেতে পারেন না এই কুরবানিতে তার স্বাচ্ছন্দ্যে রসনা তৃপ্তির সুযোগ মেলে। কুরবানির মাধ্যমে একই সঙ্গে আল্লাহ হুকুম এবং গরিবের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যে সুন্দর সহজ বিধান মুসলিম সমাজে চর্চিত ও পালিত হয় তাতে ইসলামের সামাজিক দায়িত্ব পালনের নির্দেশনাই ফুটে ওঠে। কুরবানিদাতাদের উচিত গরিব-দুখী অভাবী মানুষের মাঝে কুরবানির গোশত বণ্টন করে তাদের হাসিখুশিতে রাখা। দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারলে নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি আশা করা যায়। ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে মানুষ ও সমাজকে তুলে আনার এই যে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি তা অবশ্যই গুরুত্ববহ এবং ইসলামী বিধানের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যই উন্মোচিত করে। ইচ্ছা করলেও কুরবানির গোশত একা ভক্ষণের সুযোগ নেই। এতে নিকটাত্মীয় ও গরিব মানুষের অধিকার জুড়ে দিয়ে মানবতার পতাকাকে উড্ডীন করা হয়েছে। ঈদুল আজহার আত্মোৎসর্গ ও আত্মনিবেদনের চেতনায় আল্লাহ পাক আমাদের পরিশীলিত করুন, উজ্জীবিত করুন। ঈদুল আজহার ত্যাগের শিক্ষায় সবাই অনুপ্রাণিত হোক এবং মানবিক চেতনা জাগ্রত হোক সবার মাঝে।
আসুন! যথাযথ পন্থায় পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য ও কৃপা লাভে আমরা ধন্য হই। পশুর মাংস শুধু নিজে ভক্ষণ না করে চারপাশের দরিদ্র-অভাবী মানুষদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই। পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, কে কতো দামি পশু কোরবানি করলো, তাও আল্লাহ পাক দেখেন না। আল্লাহ পাক দেখেন কী উদ্দেশে কোরবানি দেওয়া হলো সেটাই। আত্মশুদ্ধি এবং নিয়তের বিশুদ্ধতা ছাড়া কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না- তা যেন আমরা মনে রাখি। সবাইকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা।
লেখক : সাংবাদিক

x