ঈদযাত্রায় ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার শঙ্কা কমাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে

বন্যা ও বর্ষণে সড়ক ও রেলের ক্ষতি

বুধবার , ৩১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
43

বন্যা ও অতিবর্ষণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর মধ্যে ঈদুল আজহা পড়েছে শ্রাবণের শেষ ভাগে। ফলে আসন্ন ঈদযাত্রায় বৃষ্টিপাতের মধ্যে ব্যাপক দুর্ভোগ ও ভোগান্তির মধ্যে পড়তে পারেন ঘরমুখো যাত্রীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়কের কারণে এবারের ঈদযাত্রায় বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। অন্যদিকে রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঈদযাত্রায় একাধিক ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন খোদ রেলওয়ে কর্মকর্তারাই। পত্রিকান্তরে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
এমনিতেই যেকোন উৎসবের সময় সড়ক, রেল নৌ-যাতায়াত চরম ভোগান্তির হয়ে পড়ে। তার ওপর এ বছর বন্যা ও বর্ষণ যোগ হয়েছে। প্রবল বর্ষণ ও বন্যায় সাংঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সারাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এজন্য এ বছরের ঈদযাত্রায় বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছর সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কের এক-তৃতীয়াংশ ছিল বেহাল। গতবারের বর্ষায় যেসব সড়ক-মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলো কোনমতে জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হয়। এ বছর বর্ষা আগাম এসে পড়ায় সেগুলো পুরোপুরি মেরামতের আগেই বন্যার কারণে নতুন করে ভেঙে গেছে। সড়কপথে যানজট হয় বলে মানুষ রেল যাতায়াতের দিকে ঝুঁকে। কিন্তু সেই রেলও পুরনো অবকাঠামোর ওপর ভর করে চলছে। সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্যার কারণে। বন্যায় নদ-নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, দেখা দিচ্ছে যানজট। বিভিন্ন বন্যা দুর্গত এলাকায় রেললাইন তলিয়ে গেছে পানির নিচে। ইদানীংকালে রেললাইনের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা থাকায় সংশ্লিষ্টরা আসন্ন ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ পোহানোর আশঙ্কা করছেন। রেলওয়ে ও সড়ক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন রেললাইনের সংস্কার হয়নি বলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে, ঘটছে দুর্ঘটনা। দেশের অনেকগুলো জেলা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বাড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণত ঈদুল আজহাতে গাড়ির চাপ বেশি থাকে। তাই যানজট বেশি হয়, মানুষের ভোগান্তিও বাড়ে। এর কারণ হলো, মহানগর ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়া মানুষের চাপ যেমন থাকে, তেমনি মহানগর দুটোর অভিমুখী পশুবাহী ট্রাকের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এবছর অনেক জেলায় বন্যা হয়েছে। যেসব এলাকায় বন্যার পানি উঠে সড়ক নষ্ট হয়েছে, ঈদের আগে দ্রুত মেরামত করা না হলে ওইসব রুটের যাত্রীদের ভোগান্তির সীমা থাকবে না। ঈদের আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি সহনশীল অবস্থায় না থাকে এবং এ দুর্যোগের ফলে ফেরিঘাটসহ যেসব রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো মেরামত করা না হলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি চরমে পৌঁছবে। প্রতিবছরই ঈদযাত্রা নিয়ে এক রকম আতঙ্ক তৈরি হয়। মহাসড়কে ছোটখাটো সংস্কার করে যান চলাচলের উপযোগী করার প্রক্রিয়া চলে। ঈদযাত্রা নিরাপদ হবে, যানজট হবে না- এমন ঘোষণা করা হলেও ঈদের দু-তিন দিন আগে থেকেই মহাসড়ক স্থবির হয়ে পড়ে। সেই ভোগান্তি পোহাতে হয় ঈদের ঘরমুখো মানুষদের।
এবছরও নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও যানজট ও জনভোগান্তির আশঙ্কা থাকছে। নদী ভরাট থাকায় লঞ্চ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ নৌ সংকেতগুলো ভেঙে গেছে। খুব দক্ষ চালক না হলে পথ চেনা মুশকিল। তাছাড়া জোয়ারের টানে কোথাও কোথাও চরের সৃষ্টি হয়েছে। সব কিছু মিলে এবার নদীপথে চলাচলও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে লঞ্চের টিকিট নিয়েও কাড়াকাড়ি হয়েছে। অনেকেই টিকিট না পেয়ে ভেঙে ভেঙে যাওয়ার চিন্তা করছেন।
সরকারি স্টিমারের অনেকগুলো বিকল থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগের পরও রেলের গতিবেগ পাশের অনেক দেশের তুলনায় কম। আর বিভিন্ন রেল সেতুর আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গেলেও নতুন সেতু নির্মিত না হওয়ায় রেল দুর্ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এছাড়া সড়ক-মহাসড়ক গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা, আকাশপথে টিকিট সংকট, নৌপথে যাতায়াতের ঝুঁকি প্রভৃতি কারণে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের অব্যবস্থাপনা, রেল প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতা ১০০ বছরের পুরনো সেতু, দীর্ঘ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, পাথর ছাড়া রেলপথ, সংস্কারবিহীন পুরনো রেললাইনের কারণে রেলপথে ঝুঁকি ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বন্যার কারণে এ পথগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেন দেখার কেউ নেই। যোগাযোগ খাতে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েও অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা এজন্যে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও নিম্নমান এবং ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ছে।
ঈদযাত্রা আনন্দযাত্রা। কিন্তু অনেকেরই শেষ পর্যন্ত তা থাকে না। তখন আনন্দ বেদনায় পরিণত হয়। দীর্ঘমেয়াদী ও সুচিন্তিত পরিকল্পনা নেই বলে, ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু নয় বলে, পরিবহন মালিকদের সেবা দেওয়ার বদলে আয়ের ভাবনা বেশি থাকে বলে ঈদযাত্রা সীমাহীন ভোগান্তির যাত্রা হয়ে ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের টিকিট কালোবাজারি ও দুষ্কৃতকারীদের নিয়ন্ত্রণ করার বদলে পকেট ভারী করার দিকে নজর বেশি থাকে। বেড়ে যায় দালালদের উৎপাতও। অথচ যথাযথ পরিকল্পনা, সমন্বয় ও চেষ্টা থাকলে সত্যিই ঈদযাত্রা আনন্দময় হতে পারে। জনগণ সেটাই আশা করে। তারা চায়, ঈদের সময় প্রকৃত অর্থেই আনন্দময় পরিবেশ তৈরি হোক। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগেভাগে এ বিষয়ে সচেতন ও তৎপর হলে ঈদযাত্রা ও ঈদের পরিবেশ আনন্দময় হয়ে উঠবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

x