ঈদযাত্রায় দূরপাল্লার বাসে সংকটের শঙ্কা

নগর ও জেলায় এখনো ২০ শতাংশ গাড়ির ফিটনেস নেই

সোহেল মারমা

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:৪৪ পূর্বাহ্ণ
92

চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় এখনো ২০ শতাংশ গাড়ির ফিটনেস নেই। অভিযান অব্যাহত থাকায় আন্তঃজেলা রুটেও ফিটসেনবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের তেমন দেখা মেলছে না। এখন থেকে দূরপাল্লার বাসে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাতে আসন্ন ঈদযাত্রায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ার আশংকা করা হচ্ছে।

তবে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন আজাদীকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে বাস মালিকেরা যদি সংকট সৃষ্টি করতে চান, তাহলে সংকট দেখা দেবে। সাধারণত তারা সংকট সৃষ্টি করে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ে তৎপর হন। তা না করে যদি যাত্রীদের প্রতি আন্তরিক হন, তাহলে ঈদে দূরপাল্লার বাসের সংকট হবে না।

বিআরটিএর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দূরপাল্লার রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসে লাইসেন্স ও ফিটনেস আছে। ওগুলোর বেশিরভাগই নতুন গাড়ি। সেদিক দিয়ে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তিনি জানান, শহর থেকে কম দূরত্বে কিংবা নিকটবর্তী বিভিন্ন জেলায় চলাচলকারী বাসগুলোর বেশিরভাগেরই ফিটনেস নেই। আইন যারা প্রয়োগ করেন তাদের দুর্বলতার কারণে এ ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ আজাদীকে বলেন, এ পর্যন্ত ৮০ ভাগ গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ গাড়ির এখনো ফিটনেস নেই। সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিকদের বলা হয়েছে ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য। তারাও আসছেন। যত দ্রুত সম্ভব আমরা গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করে ছেড়ে দিচ্ছি।

সংশ্লিষ্ট মালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের মতো আসন্ন ঈদুল আজহা ঘিরে প্রতিদিন ১ হাজার এসিননএসি বাসে ৫০ হাজার যাত্রী চলাচল করে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গত বছরের হিসাবে, ঈদুল আজহায় সড়কপথে চট্টগ্রাম ছেড়েছে ১১ লাখ যাত্রী।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ করেছে বিআরটিএ, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গত ৫ তারিখ থেকে ঈদুল আজহার অগ্রিম টিকেট দেওয়ার কথা থাকলেও সেই সময় ধর্মঘটের অজুহাতে টিকেট বিক্রি বন্ধ রাখে পরিবহন মালিক কর্তৃপক্ষ।

ওই দিন আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতি চট্টগ্রামের মহাসচিব বলেছিলেন, ধর্মঘট উঠে যাওয়ার পর কিংবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অগ্রিম টিকেট বিক্রি কার্যক্রম শুরু হবে।

কিন্তু পর দিন থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও এখনো ঈদুল আজহার অগ্রিম টিকেট বিক্রি শুরু করতে পারছেন না বাস মালিকেরা। মালিকদের একটি অংশ টিকেট বিক্রিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। কোনো কোনো পরিবহন কোম্পানি অন্য বছরের তুলনায় এবার ঈদে তাদের বাস ও ট্রিপের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে।

চট্টগ্রামে ইউনিক পরিবহনের একটি কাউন্টারের ব্যবস্থাপক আজাদীকে বলেন, বিআরটিসি কাউন্টার থেকে আমাদের বাসের অগ্রিম টিকেট বিক্রি করা হচ্ছে। অন্য জায়গায় হচ্ছে না। এছাড়া এবার ঈদে ১০ থেকে ১২টি গাড়ি কমানো হয়েছে। সাধারণত ঈদ উপলক্ষে দিনে ২০ থেকে ২৫টি গাড়ি ঢাকাচট্টগ্রাম রুটে চলাচল করে।

ঈগল পরিবহনের অলংকার কাউন্টারের ব্যবস্থাপক অনিক ঘোষ বলেন, সাধারণত ঢাকাচট্টগ্রাম রুটে ১৬ থেকে ১৮টি গাড়ি চলাচল করে। তবে এবার শিডিউলের বাইরে অতিরিক্ত গাড়ি দিচ্ছে না। গাড়ি না পাওয়ার সাথে সাথে পেশাদার চালকও পাওয়া যাচ্ছে না। গত ৭ আগস্ট থেকে ঈদের অগ্রিম টিকেট এই পরিবহনে বিক্রি শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে নগরীর জিইসি মোড়, অলংকার, এ কে খান, বিআরটিসিতে অবস্থিত অন্য পরিবহনগুলোর কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে বেশিরভাগ পরিবহন কোম্পানি ট্রিপের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব গাড়ির ফিটনেস আছে, শুধু সেগুলো ছাড়া হচ্ছে। আর যেগুলোর ফিটনেস নেই সেগুলোর কাগজপত্র ঠিক করতে দিয়েছেন মালিকেরা। সব কোম্পানির একই অবস্থা। এছাড়া এবার গাড়িতে নতুন রং করার প্রবণতা কম। নতুন রং করলেও গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকতে হবে। সেটা নিশ্চিত হয়েই গাড়ি ছাড়ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাসের অগ্রিম টিকেটও যাত্রীদের সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলে জানা যায়।

এদিকে বিআরটিএতে গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট ও প্রফেশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে সংশ্লিষ্টদের ভিড় এখনো কমেনি বলে জানা গেছে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা প্রায় ৪৪ হাজার। এর মধ্যে ২২ হাজারের কোনো ফিটনেস সনদ নেই। নগরীতে ১০১২ বছর ধরে ফিটনেস নবায়ন করছে না, এ ধরনের বিভিন্ন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। আর জেলায় রয়েছে এ ধরনের প্রায় ১৩ হাজার যানবাহন। এসব যানবাহনের মধ্যে রয়েছে ট্রাক, বাস, মিনিবাস, টেম্পো, সিএনজি অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস। এতে করে ঈদের আগে এতগুলো গাড়ির ফিটনেস সনদ তৈরির কাজ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার কাজ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিআরটিএর কর্মকর্তারা।

বিআরটিএ চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, বিআরটিএর পক্ষ থেকে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ সময় যেগুলো চলাচলের উপযোগী নয় বা ইঞ্জিন খারাপ, সেসব যানবাহন ফিরিয়ে দিচ্ছি। ওগুলোর কোনো ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে না। তবে ঠিকঠাক করে পরবর্তীতে ওইসব যানবাহনকে পুনরায় বিআরটিএতে নিয়ে আসার জন্য বলা হয়েছে।

বিআরটিএর কর্মকর্তারা জানান, কাজের চাপ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অফিস খোলা রাখা হয়েছে।

এ ব্যাপারে আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির মহাসচিবের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আজাদীকে বলেন, যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই, যেসব চালকের লাইসেন্স নেই, অভিযান চলার কারণে তারা রাস্তায় বের হতে পারছেন না। এতে চালক ও পরিবহন সংকট দেখা দেবে। তাতে করে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার ঈদে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়ে যাবে। এ দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সূত্র জানায়, প্রতি বছর ঈদে ফিটনেসবিহীন, লক্কড়ঝক্কড় বাস, ট্রাক, লেগুনা, টেম্পো, মাইক্রোবাস, কার, নছিমনকরিমন ও সিটি সার্ভিসের বাসমিনিবাস দূরপাল্লার বহরে যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এসব যানবাহন রাস্তায় নামানোর ফলে পথে নষ্ট হয়ে যানজট ও ভোগান্তি হয়, পাশাপাশি দুর্ঘটনাও ঘটে। প্রাণহানি ও জানমালেরও ক্ষতি হয়। গত বছর ঈদুল ফিতরে ২০৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত এবং ৮৪৮ জন আহত হয়েছিলেন।

x