ইয়াবার মরণ নেশা থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষার জন্য ভাবতে হবে

সোমবার , ১৩ মে, ২০১৯ at ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ
65

বাংলাদেশে অনেকটা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষতিকর ইয়াবা। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে ইয়াবা প্রবেশের পর কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে তা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দেশে। লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মিয়ানমার সীমান্তে একের পর এক গড়ে উঠছে ইয়াবা কারখানা। আর তাতে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। বিজিপি’র সদস্যরা চোরাকারবারিদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সহযোগিতার কারণে নানা ব্যবস্থা নিয়েও বাংলাদেশে ইয়াবা’র পাচার রোধ করা যাচ্ছে না। এমনকি মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে ওঠা ইয়াবার কারখানাগুলোর ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়ার পরও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের আগের পতাকা বৈঠকগুলোতে ইয়াবা পাচারে মিয়ানমার বাহিনীর জড়িত থাকার বিষয়টি বিজিবি তুলে ধরে। কিন্তু ইয়াবা পাচার বন্ধে মিয়ানমার বারবার আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবা চোরাচালান মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় কঙবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার চিহ্নিত কয়েক গডফাদারের নিয়ন্ত্রণে। মোটা অঙ্কের অর্থের লোভে ফেলে এরা হাতে নিয়েছে পুলিশের দুর্নীতিবাজ কিছু সদস্যকে। এদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম হয়ে ইয়াবার বড় বড় চালান চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কোটি কোটি টাকার ইয়াবার চালানের এ ব্যবসা থেকে অবৈধ আয়ের অর্থ পুলিশ ছাড়াও সমাজের বিত্তশালী ও প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে, মিয়ানমারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী এলাকায় দায়িত্বে থাকা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য সরাসরি ইয়াবা পাচারে জড়িত-এরকম অভিযোগ চালু আছে। মূলত মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সততার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন না করলে এ ধরনের ইয়াবাসহ চোরাচালানের বিভিন্ন পণ্য সহজে পার পেয়ে যাওয়ার অবকাশ থেকে যায়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে অসৎ ব্যক্তিদের অবস্থান যেমন রয়েছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও এ ধরনের লোকজন যে নেই তা বলা যাবে না। তবে ঘটনা প্রমাণিত হলে এদের শুধু বরখাস্ত নয়, আদালতে সোপর্দ করে বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে শ্রেয়। চট্টগ্রাম-কঙবাজার সড়ক দিয়ে এবং সাগর পথে কঙবাজার অঞ্চল থেকে ইয়াবার চালান যে এসে থাকে তা তাদের জানা রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সোর্সের মাধ্যমে খবর পাওয়া না গেলে সহজেই এ জাতীয় চালান পার পেয়ে যায়। আর এ জাতীয় চালান পাচারে পুলিশের কোন কোন সদস্য যদি জড়িয়ে যায় তাতে এ বাহিনীর ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়।
শুধু ইয়াবা পাচারে নয়, তারা ইয়াবায়ও আসক্ত। এমন তথ্য পুলিশের হাইকমান্ডের কাছে এসেছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা নিজেরা খাই, নিজেরা পাচারে জড়িত, তাহলে ইয়াবা পাচার রোধ কিভাবে সম্ভব? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঠিক থাকলে ইয়াবাসহ ৮০ ভাগ মাদক পাচার রোধ সম্ভব বলেও পুলিশের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা অভিমত ব্যক্ত করেন।
গত ১১ মে দৈনিক আজাদীতে ‘সন্তান যখন অচেনা / ইয়াবা আসক্তিতে বাড়ছে অপরাধ, ৫ বছরে নেশাগ্রস্ত ছেলের হাতে খুন ৩৮৭ মা-বাবা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দশ মাস দশ দিন ধরে যাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, কষ্টের তীব্রতা সয়েও তিল তিল করে বড় করে তুলছিলেন প্রিয় সন্তানকে, সেই সন্তানই কখনো ছুরি হাতে, কখনো ক্ষুর হাতে তেড়ে আসছে পিতা-মাতার দিকে। কোনো না কোনো বাড়িতে নিত্যদিন চলছে এমন ঘটনা। চিরচেনা নাড়িছেঁড়া ধন সন্তান হয়ে পড়ছে অচেনা। চাওয়া একটাই-টাকা; ইয়াবা কেনার টাকা। দিতেই হবে। না দিলে সেই ছুরি পিতার গলায় বসে যাচ্ছে।’
সন্তানের এমন অচেনা রূপের কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবায় আসক্তরা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নিষ্ঠুর নির্মম হয়ে যায়। আসলে ইয়াবায় আসক্তি এমন, যার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়, তা দমন করা কষ্টসাধ্য। বলা যায়, ইয়াবার আগ্রাসনের শিকার পুরো বাংলাদেশ। ইয়াবা নামক মরণ নেশার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে যত বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, ততই মঙ্গল। নইলে আগামী প্রজন্ম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা কঠিন।

x