ইরান বিপ্লবের ৪০ বছর

মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্‌

সোমবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
77

বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লব ইরানের ইসলামি বিপ্লব। প্রয়াত আধ্যাত্মিক নেতা, আপসহীন সংগ্রামী, ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে সংঘটিত সফল এ বিপ্লব। বর্তমান পৃথিবীর স্বঘোষিত পরাশক্তিগুলোর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সংঘটিত এ বিপ্লব ঝিমিয়ে পড়া মুসলমানদের জাগ্রত করেছিল সার্বিকভাবে। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আড়াইশত বছরের পুরনো রাজতান্ত্রিক পাহ্‌লভী বংশের রাজত্বকে তছনছ করে দিয়ে রক্ত সাগরের মধ্য হতে ফুটেছিল ইরানে ইসলামী বিপ্লবের গোলাপফুল। পুরো আশি, নব্বই ও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে সারা পৃথিবীকে এর সুঘ্রাণে সুরভিত করেছিল। ইরানের মজলুম জনগণ রেজা শাহ্‌ পাহ্‌লভীর শত অত্যাচারকে মাথা পেতে নিয়ে ইসলামী বিপ্লবের জন্য কাজ করেছিল। যাবতীয় জেল-জুলুম, হত্যা-গণহত্যা তাদেরকে বিপ্লবের পথ হতে বিচ্যুত করতে পারেনি। তারা ইসলামী বিপ্লবের সফলতার জন্য রাজপথে হাসিমুখে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়েছিল। একদিন সে রক্ত কথা বলে উঠেছিল। জনতার মুষ্ঠিবদ্ধ গগন বিধারী আওয়াজ স্বৈরশাসক রেজা শাহ্‌ পাহ্‌লভীকে ইরান ত্যাগে বাধ্য করেছিল। আর নিজ মাতৃভূমি হতে অন্যায়ভাবে বহিস্কৃত ফ্রান্সের প্যারিসে নির্বাসিত ইমাম খোমেইনীকে তারা হৃদয় গোলাপ দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল। সেদিন থেকে দুনিয়ার বুকে ইরানবাসী আল কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আদর্শকে সমুন্নত করার লক্ষ নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।
বিপ্লবের অব্যবহিত পর হতে ইহুদী-খ্রিস্টান, ইঙ্গ-মার্কিন-রুশ শক্তি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে দেবার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অন্যের প্ররোচনায় পরিচালিত ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের যুদ্ধকে ইরানবাসী অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ করেছিল। প্রতিরোধ করেছিল অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লব। প্রতিদিন খুন ঝরেছে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের। কত আয়াতুল্লাহ্‌, কত ওলামা-মাশায়েখ, কত সরকারি কর্মকর্তা এ বিপ্লবের জন্য জীবন দান করেছেন তার কোন সঠিক হিসেব নেই। একইদিন একই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীসহ ৭০ জন পার্লামেন্ট সদস্যকে হত্যা করে ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার অপপ্রয়াসও ব্যর্থ হয়। বার বার ইরানের ইসলামী বিপ্লব রক্ত সাগর থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।
২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামী বিপ্লবের ৪০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ইহুদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিগত ৪০ বছরের প্রতিটি দিন ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার জন্য তাদের কামান আর মিসাইলের ট্রিগারে আঙ্গুল চেপে বসে আছে। কিন্তু হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বীর জাতি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ইহুদী-মার্কিন আক্রমণ ও অবরোধ আগ্রাসনের হুমকিকে বৃদ্ধাঙ্গুুলি দেখিয়ে সফলভাবে টিকে আছে ৪০ বছর। টিকে থাকবে শত সাহস্র বছর।
ইরানী জাতির টিকে থাকার মূলে রয়েছে তাদের সুনেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্য। আছে একটি সুলিখিত সংবিধান। অটুট আছে ইমামের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য। রয়েছে বিপ্লবের পর হতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মজলিশ ও মন্ত্রণাসভা। সবার উপরে মূল রহস্য, টানা ১০ বছর (১৯৭৯-১৯৮৯) বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ্‌ রূহুল্লাহ্‌ খোমেইনীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁরই সুযোগ্য শাগরেদ ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ্‌ খামেনীকে পরবর্তী ইমাম হিসেবে নিয়োগ প্রদান। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মন্ত্রণাসভা বা অভিভাবক পরিষদের সুনেতৃত্বে যাবতীয় ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লব টিকে আছে।
কারো দয়ার ওপর নির্ভর করে নয়, আল্লাহ্‌র উপর তাওয়াক্কুল করে আল কুরআন ও আল সুন্নাহ্‌কে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করে ইমাম হুসাইন (রা.) এর দৃঢ়চিত্ততাকে অবলম্বন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সম্মুখপানে এগিয়ে চলছে। কী কৃষি, কী শিল্প, কী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কী সমর সম্ভারের বিকাশ, কী শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র, কী অভ্যন্তরীণ সার্বিক উন্নয়ন- প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান পৃথিবীর শিল্প উন্নত দেশগুলোকে টেক্কা দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ইরাক কর্তৃক ৮ বছরের চাপিয়ে দেয়া অন্যায় যুদ্ধ, ৪০ বছরব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন-কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধকে ইরান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করছে। ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও সফল কূটনীতি বিশ্বব্যাপী নন্দিত; পক্ষান্তরে পারমাণবিক চুক্তি ভঙ্গ করে বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা নিন্দিত।
ইরানে সবচাইতে সফলতা সামরিক ক্ষেত্রে। ইহুদী-মার্কিন আগ্রাসনের প্রত্যহ হুমকির মুখে আত্মরক্ষার লক্ষে অস্ত্র-শস্ত্র তৈরি ও মওজুদে নিজেদের সক্ষমতা ইরান বিশ্ববাসীকে প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। আর ইরানের সেই অন্তর্নিহিত বিপুল সামরিক শক্তি ও কৌশলকে পদানত করা দুনিয়ার কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব নয় বিধায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর হাত দিতে সাহস করছে না। যদি ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দুর্বল কোন দেশ হতো তাহলে বহু পূর্বেই মার্কিনীরা তুড়ি মেরে ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিত। সম্প্রতি আইএস দমনে ইরাক ও সিরিয়াকে ইরান অত্যন্ত সুকৌশল ও সফলতার সাথে সার্বিক সহায়তা করেছে। ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক সাফল্যে ইসরাঈল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। দুঃখজনক যে, বিশ্ব মুসলিমের ঘোরতর শত্রু ইসরাঈল আজ আল্লাহ্‌র রাসূলের দেশ সৌদি আরবের বিশস্ত বন্ধু!
ইরানে ইসলামী বিপ্লবের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সফলতা বিশ্বনন্দিত। শুধুমাত্র পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় নয়, ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বাণী ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জগতময়।
যেখানেই স্বৈরাচার আছে সেখানেই ইমাম খোমেইনীর প্রদর্শিত গণজাগরণ ও গণজোয়ারে জনতার নিরস্ত্র বিপ্লব সশস্ত্র স্বৈরাচারকে পদানত করেছে। দেশে দেশে মুসলিম ছাত্র জনতা তাদের ঘুমঘোর ভেঙ্গে আল্লাহ্‌র পথে জীবন বিলিয়ে দেয়ার দীক্ষা পেয়েছে বিপ্লব হতে। ফিলিপাইনে মার্কোসের দুঃশাসনের অবসান, বাংলাদেশের স্বৈরশাসক এরশাদের পতন এবং আরব বসন্তে যুবক-তরুণ ছাত্র জনতার বিপ্লবের প্রেরণা অবশ্যই স্বর্ণাক্ষরে লেখা ইরানের ইসলামী বিপ্লব। শাসনে-ত্রাসনে, শোষণ ও নিপীড়নে বিপর্যস্ত জনপদের উদ্বেগাকুল জনতা হৃদয় মথিত আরাধনায় আল্লাহ্‌র দরবারে কামনা করেছে ইমাম খোমেইনী (রাহ.) এর মত একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। কারণ নিকট অতীতে তাঁর মতো কোন শাসকের কীর্তি সাধারণ মানুষের হৃদয়-মনকে এত ব্যাপকভাবে আলোড়িত করতে পারেনি। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী খোলাফায়ে রাশেদীনের স্বর্ণযুগের কাহিনী শুনেছে কিন্তু বাস্তবে দেখেনি। ইমাম খোমেইনী এবং তার পরবর্তী শাসকবৃন্দ দুনিয়ার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নিজেদের ধর্ম, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও নিজেদের জাতিকে স্বয়ম্ভরতার মাধ্যমে যেভাবে রক্ষা করেছে তা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে বিরল।
চেচনিয়া-বসনিয়া, কসোভো, গাজা, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, আরাকান, ইয়েমেন, মধ্যএশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলমানদের জন্য ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মানবিক সাহায্য উদাহরণযোগ্য। বিশেষ করে ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও লেবানানের মজলুম মুসলমানদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একমাত্র অনুপ্রেরণা ইরান। অস্ত্রে নয় মানসিক উজ্জীবনে দক্ষিণ লেবানান ও গাজার মজলুম মুসলমানগণ নিজেদের অধিকার আদায়ে যে সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ্‌কে যুদ্ধবাজ অবৈধ ইসরাঈল আজ সমীহ করে চলতে বাধ্য হয়েছে। গাজার জানবাজ মুজাহিদদের ভয়ে ইহুদীরা ভীত-সন্ত্রস্ত। একথা আজ দিবালোকের মত সুস্পষ্ট যে মুসলমানদের শত-সহস্র ব্যর্থতার মাঝে একমাত্র ইরান মুসলিম বিশ্বের মুখ উজ্জ্বল করেছে। নিজ পায়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবার প্রেরণা জুগিয়েছে। মুসলিম দেশসমূহের জনগণ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের এ থেকে শিক্ষা নেয়া অতি জরুরি।
আমরা ইরানের জনগণ, ইরানের সরকার এবং বিশ্বব্যাপী ইরানের বন্ধু ও সমর্থকদের ৪০তম ইসলামী বিপ্লব বার্ষিকীতে আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ্‌ ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে চিরঞ্জীব করুন। আমীন।
লেখক : প্রাবন্ধিক; সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া

x