ইরানের সিনেমা এবং মজিদ মাজিদি

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ৩ জুলাই, ২০১৮ at ৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ
78

ফলে মজিদ মাজিদির ভারত আগমনের হেতু কেবল আয়াস অনুসন্ধানই নয়, যুক্তিগ্রাহ্যও বটে। ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউড’ নামে যে ছবিটি তিনি মুম্বাইতে এসে করেছেন, সেটি তিনি অনায়াসে তেহরানে করতে পারতেন। ছবির কাহিনীরেখা যে কোনো দেশের হতে পারে। তবে ভারতে কেন ছবি করতে এলেন এ বিষয়ে স্পষ্ট করে মজিদ কিছু না বললেও বোঝা যায়, ছবির যে বিষয়বস্তু তা নিয়ে ছবি করলে ইরানে কিছু ঝামেলা হয়তো হতেও পারতো। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ভারত সুবিধাজনক এবং বিস্তর সহযোগিতাও পেয়েছেন মজিদ এদেশে। এগিয়ে এসেছেন এদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও কলাকুশলীরা। সারা ভারত জুড়ে ছবিটি প্রদর্শিত হয়ে চলেছে।

পারস্য সভ্যতা পৃথিবীর আদি সভ্যতাগুলোর অন্যতম। ভাষা ধর্ম সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের কারণে এ সভ্যতা বরাবর একটা স্বতন্ত্র মর্যাদা পেয়ে গেছে। সাম্রাজ্যগত কারণে পারস্য সভ্যতার প্রভাব বিশ্বের মধ্যাঞ্চলের বিশাল এক ভূখজুড়ে বিসতৃত ছিল। পরবর্তীকালে ধর্মগত পরিবর্তন হলেও এ সভ্যতার সাংস্কৃতিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এ সভ্যতার ভাষা ফারসি এখনো ইরান ছাড়াও আরো কয়েকটি দেশে প্রচলিত। এই ভাষা এক সময় আমাদের উপমহাদেশেও কেবল প্রচলিত নয়, রীতিমত আদরনীয় ছিল। পারস্য সংস্কৃতির খাদ্যরীতি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিশেষ করে এই উপমহাদেশে।

গত শতকের সত্তরের দশকের শেষার্ধ্বে ইরানে যখন ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয় আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে, তখন ইরানের নতুন সরকার সে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এমনিতেই ইরানের মূলধারার চলচ্চিত্র সাধারণভাবে রুচিসম্মত ছিল। কিন্তু নতুন সরকার চাইছিলেন শক্তিশালী এই মাধ্যমটিকে সুসংহত করতে। অবশ্য এর নেপথ্যে সূক্ষ্ম ও স্থূল একটি উদ্দেশ্য ছিল। সরকারি মতাদর্শের প্রচার প্রচারণা। কেবল প্রপাগাামূলক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নয় সাধারণভাবে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও যাতে এটা হয় সেজন্য তারা দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ওপর বিশেষ নজর দেন। গঠন করেন ফারাবি ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা। কলাকুশলী বিশেষ করে পরিচালকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে ফ্রান্সে। আয়াতুল্লাহ খোমেনি তাঁর নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছিলেন ফ্রান্সে। হয়তো সে কারণে দেশটির প্রতি তাঁর দুর্বলতা থেকে থাকতে পারে। এছাড়া তেহরানে একটা জৌলুষপূর্ণ চলচ্চিত্রোৎসব শাহের আমল থেকে চালু ছিল। নতুন সরকার ফযর শহরে সরকারিভাবে একটি চলচ্চিত্রোৎসব চালু করে। এর পাশাপাশি অন্যান্য প্রাদেশিক রাজধানীতেও উৎসব অনুষ্ঠিত হতে থাকে। সব মিলে চলচ্চিত্র শিল্প যথেষ্ট প্রণোদনা পেতে থাকে সরকারি পর্যায়ে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও ছিল এবং আছে। সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর সেন্সরশিপ চালু রয়েছে ইরানি সিনেমায়। শাহের আমল থেকেই ইরানের ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের প্রচকড়াকড়ি ছিল। ইসলামি বিপ্লবী সরকার এসে তা আরো কড়া করে। ছবি তৈরির পরিকল্পনা নিলে সেন্সর বোর্ডে প্রথমেই চিত্রনাট্য জমা দিতে হতো। বলাবাহুল্য সে চিত্রনাট্য খুব কম ক্ষেত্রেই অক্ষত থাকতো। কর্তৃত্ব জাহির করার জন্যে হলেও সেন্সর কর্র্তৃপক্ষ চিত্রনাট্যে হাত লাগাতো। আর ছবি তৈরি হয়ে যাবার পর সে ছবি স্বভাবতই জমা দিতে হয় সেন্সর বোর্ডে। সেখানে মর্জি মাফিক না হলে তো নানান তালবাহানা আছেই। ফলে মূলধারার বেশির ভাগ ছবিই হতো ইসলামি ভাবধারা, উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা ধর্মভিত্তিক কাহিনী নিয়ে। সেন্সর এসব ছবিতে কাঁচি চালাতো না। কিন্তু এ ধরনের মোটা দাগের ছবিতেও চলচ্চিত্রের ভাষার প্রয়োগ ও পরিচালকের মেধা লক্ষ্য করা যেত।

এতসব প্রতিকূলতার মধ্য থেকে অনেক মেধাবী চলচ্চিত্রকার উঠে আসতে থাকেন ইরানের চলচ্চিত্র শিল্পে। তবে যে চলচ্চিত্রকারের হাত ধরে ইরানের চলচ্চিত্র প্রকৃত ঠিকানা খুঁজে পায় এবং যিনি ইরানের চলচ্চিত্রকে বিশ্বে পরিচিত করে তোলেন তিনি দারিয়ুস মেহরজুই। তাঁর প্রথম ছবি ‘দি কাউ’ কে ইরানি চলচ্চিত্রের প্রথম নিউ রিয়ালিস্ট ফিল্ম বলা হয় যার মাধ্যমে ইরানি সমাজ ব্যবস্থায় শোষণ, নিপীড়ন ও অবক্ষয়ের চিত্র সর্বপ্রথম দর্শকেরা পান। তাঁর পরবর্তী ছবি দ্য জান্‌ক হাউস, দ্য পোস্টম্যান, দ্য সাইকেল; এসব ছবির প্রতিটি ফ্রেমে ইরানের সামগ্রিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। ফলে তিনি শাহ সরকারের রোষানলে পড়েন। তাঁর ছবিগুলোর প্রদর্শনী হয় নিষিদ্ধ করা হয় নয়তো বাধা দেয়া হয়। শাহ সরকারের পতনের পর যখন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় তখন তিনি কিছুদিন নীরব থাকেন। এরপর তিনি যেসব ছবি করেন তাতে মৌলবাদ বিরোধী বক্তব্য প্রাধান্য পায়। ফলে মেহরজুই ইসলামি সরকারেরও রক্তচক্ষুর শিকার হন। এ অবস্থা এখনো বিরাজমান।

তবে দারিয়ুস মেহরজুইএর দেখানো পথ ধরে এগিয়ে আসেন আব্বাস কিয়ারোস্তমি, মোহসেন মাখমালবাফ, মজিদ মাজিদি, জাফর পানাছি, বাহরাম বেজাই, আতিক রাহিমি, বাবাক পায়ামি, তাহমিনে মিলানি, বাহমান ঘোবাদি, আসগর ফরহাদি, সামিরা মাখমালবাফের মতো মেধা আর সাহসের দিক থেকে দুর্ধর্ষ চলচ্চিত্র নির্মাতা যারা সবাই ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রে নিজগুণে সমাদৃত। তবে এদের প্রায় সকলের ওপরই সরকারি বিধিনিষেধ ধরপাকড় নিত্য ঘটমান। কাউকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে অজানা ঠিকানা থেকে। কেউ বা কারান্তরীণ। যেমন জাফর পানাহি।

আব্বাস কিয়ারোস্তমির মতো চলচ্চিত্র গুরুকে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সে গিয়ে সিনেমা বানাতে হয়েছে। আসগর ফরহাদি, আতিক রাহিমিও একই পথ অবলম্বন করেছেন। বাবাক পায়ামি কানাডার নাগরিকত্ব নিয়ে সে দেশে স্থিত হয়েছেন মৃত্যুর হুমকির কারণে। এ রকম উদাহরণ আরো রয়েছে। তবে এরা সকলেই বিদেশে থেকেও ইরানের সিনেমাই বানিয়ে চলেছেন। এবং সারাবিশ্বের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। এ বছরের (২০১৮) কান চলচ্চিত্র উৎসবেও দেখা গেছে এই দৃষ্টান্ত।

তবে এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন মজিদ মাজিদি। তিনি পশ্চিমে না গিয়ে গেছেন পূর্বে। রীতিমত ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তিনি এসেছেন ভারতে। এক সময় ভারত আর ইরান ছিল প্রতিবেশী। দেশভাগজনিত কারণে এখন মাঝখানে পাকিস্তান। ফলে নিকট প্রতিবেশী। পারস্য আর ভারতীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীন দুটি সভ্যতা। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দুই সভ্যতার মধ্যে প্রচুর সামঞ্জস্য লক্ষ্যণীয়। ইরানে ইসলাম আগমনের পর ধর্মান্তরে অনীহ প্রচুর পারসিক আশ্রয় নেন ভারতে। ইরানে এখন আর কোন পারসিক নেই। তাদের বসবাস এখন পাকিস্তানের সিন্ধু ও ভারতের গুজরাট মহারাষ্ট্র আর দিল্লিতে। ফারসি ভাষা এই সেদিন পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সরকারি ভাষা ছিল। মোগল আমলে এই ভাষা ভারতে সরকারিভাবে আদৃত ছিল এবং ব্রিটিশ আমলেও ইংরেজির পাশাপাশি ফারসি ভাষার চল ছিল। উপমহাদেশের উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের ভাষাগুলোতে ফারসি ভাষার অনেক প্রভাব এখনো বিদ্যমান। দুই দেশের খাদ্য ও সঙ্গীতে প্রচুর মিল। বিশেষ করে সঙ্গীতে। ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের অনেক রাগ পারস্য প্রভাবিত এবং এই সঙ্গীতের অপরিহার্য অনেক যন্ত্রও পারস্য থেকে আগত ও প্রভাবিত কিংবা বিবর্তিত।

ফলে মজিদ মাজিদির ভারত আগমনের হেতু কেবল আয়াস অনুসন্ধানই নয়, যুক্তিগ্রাহ্যও বটে। ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউড’ নামে যে ছবিটি তিনি মুম্বাইতে এসে করেছেন, সেটি তিনি অনায়াসে তেহরানে করতে পারতেন। ছবির কাহিনী রেখা যে কোন দেশের হতে পারে। তবে ভারতে কেন ছবি করতে এলেন এ বিষয়ে স্পষ্ট করে মজিদ কিছু না বললেও বোঝা যায়, ছবির যে বিষয়বস্তু তা নিয়ে ছবি করলে ইরানে কিছু ঝামেলা হয়তো হতেও পারতো। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ভারত সুবিধাজনক এবং বিস্তর সহযোগিতাও পেয়েছেন মজিদ এদেশে। এগিয়ে এসেছেন এদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও কলাকুশলীরা। সারা ভারত জুড়ে ছবিটি প্রদর্শিত হয়ে চলেছে। প্রদর্শিত হয়েছে ২০১৭ সালের গোয়ার ভারতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। সবচেয়ে বড় কথা মজিদ মাজিদির ‘প্রথম’ ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’।

প্রথম’ বলার কারণ পরবর্তী ছবিটিও তিনি মুম্বাইতে নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন ইতোমধ্যে।

(চলবে)

x