ইমারত নির্মাণ আইনে কড়াকড়ি

৪ ভবন মালিক কারাগারে আরও ৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

হাসান আকবর

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
372

ভবন নির্মাণে নগরজুড়ে সৃষ্ট অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে ‘ইমারত নির্মাণ আইন’ কার্যকরে কঠোর অবস্থান নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। আইন অমান্য করায় ইতোমধ্যে ৪ ভবন মালিককে কারাগারে প্রেরণ এবং ৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে সংস্থাটি। তাদের কড়াকড়ির ফলে বিভিন্ন আবাসিক এলাকার ভবন মালিকরা নিজেরাই অননুমোদিত অংশ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা সিডিএতে এসে অঙ্গিকার করে সময় চেয়ে নিচ্ছেন। এর মধ্যে কল্পলোক আবাসিক এলাকার ভবন মালিকরা অননুমোদিত অংশ ভেঙে ফেলতে আজ মাইকিং করবেন বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা জানান, ৬০ বর্গমাইলের চট্টগ্রাম মহানগরে বর্তমানে লোকসংখ্যা ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এই সংখ্যা ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। ইউএনডিপি, গৃহায়ন অধিদফতর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদফতরের বিভিন্ন জরিপ মতে, নগরে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক এই জনসংখ্যার জন্য বছরে গড়ে ১০ হাজার ইউনিট বসতঘর কিংবা ফ্ল্যাট লাগছে। একই সাথে বাড়ছে দোকানপাট ও অফিসসহ নানা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য গড়ে ২৯৬ একর ভূমি ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এসব ঘরবাড়ি তৈরিতে প্রচলিত নিয়ম কানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
সিডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম মহানগরে যেকোনো ধরনের ভবন নির্মাণের জন্য সিডিএ থেকে পূর্বানুমতি এবং প্ল্যান অনুমোদন করানো বাধ্যতামূলক। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্ল্যান অনুমোদন করানো হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয় না। যেমন- ছয় তলা ভবনের প্ল্যান নিয়ে সাত তলা নির্মাণ কিংবা আট তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে দশ তলা নির্মাণের অসংখ্য রেকর্ড রয়েছে নগরজুড়ে। একইভাবে বাধ্য হয়ে প্রয়োজনীয় জায়গা ছাড়লেও তা আবার দখল করে নেন ভবন মালিকরা। এছাড়া পার্কিং দেখিয়ে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিলেও সেখানে পার্কিং না রেখে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালুসহ নানা অনিয়ম দেখা যায়। এতে দিন দিন প্রাচ্যের রাণী খ্যাত চট্টগ্রাম মহানগর ইট পাথরের জঞ্জালে পরিণত হচ্ছে। এছাড়া নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ না করায় অপরিকল্পিত ও বিশৃংখল নগরায়নের ফলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে এ শহর। পাশাপাশি আরবান, ট্রান্সপোর্ট ও ড্রেনেজ- এই তিনটি নাগরিক চাহিদার সমন্বয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে প্রণীত মাস্টার প্ল্যান এবং ২০০৮ সালের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে অপরিকল্পিত নগরায়ন থেকে চট্টগ্রামকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আদালত। এর মধ্যে চউকের ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী গতকাল দুই ভবন মালিককে কারাগারে পাঠিয়েছেন। দণ্ডিতরা হলেন- কল্পলোক আবাসিক এলাকার বি-১১৩ নম্বর প্লটের বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ নুর হোসেন ও বি-২৯ নম্বর প্লটের ওবায়দুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ- তারা ছয় তলা ভবনের নকশা অনুমোদন নিলেও তা অনুসরণ না করে নিজেদের মর্জিমাফিক ভবন নির্মাণ করেছেন। ফলে সিডিএর অথরাইজড বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় গত ২৯ মে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তারা গতকাল আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন। তবে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এর আগে আবছার উদ্দিন ও মোহাম্মদ হারুন নামে আরও দুই ভবন মালিককে একইভাবে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন সিডিএর ম্যাজিস্ট্রেট।
সিডিএ অথরাইজড কর্মকর্তা-১ প্রকৌশলী মনজুর হাসান গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা বারবার চেষ্টা করেও ভবন মালিকদের আইন মানাতে পারিনি। তবে এখন আমাদের বিশেষ আদালত হয়েছে। আইন প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন কেউ ভবন নির্মাণে অনিয়ম করলে আমরা মামলা করছি। আদালত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ভবন মালিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে ভবন মালিকরা আমাদের কাছে আসছেন। কয়েকদিন সময় চেয়ে নিচ্ছেন। আমরা তাদের সময় দিচ্ছি। আমরা চাই, তারা নিজেরা নিজেদের অবৈধ অংশ ভেঙে সবকিছু ঠিক করে নিক। অন্যথায় আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশেষ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরীর বলেন, ইমারত নির্মাণ আইনে ৩২টি এবং রিয়েল স্টেট আইনে একটি মামলার বিচার চলছে। যে চারজন ভবন মালিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে তা একেবারে প্রাথমিক প্রক্রিয়া। আদালতে তারা জামিন চেয়েছেন, কিন্তু আদালত জামিন নামঞ্জুর করে জেলে পাঠিয়েছে। তবে এদের যখন শাস্তি হবে তখন সেটা আরো কঠোর হবে। ইমারত নির্মাণ আইন লংঘন করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। একই সাথে তাকে ভবনও ভাঙতে হবে।

x