ইনফ্লুয়েঞ্জা নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১৭ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ
83

সারাদেশ এখন ডেঙ্গু আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর বাইরে আরেক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সামনে এসেছে। তার নাম ইনফ্লুয়েঞ্জা। ঘরেও হাসপাতালে ছড়িয়ে থাকা জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশ রোগীর শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস পাওয়া গেলেও বাকীদের বেশির ভাগই আক্রান্ত হচ্ছেন অন্য কয়েকটি ভাইরাস ও জীবাণুতে। এর মধ্যে সোয়াইন ফ্লু, ভিক্টোরিয়া ইলনেস, এমনকি ইয়ামাগাতা ইলনেসের মতো ফ্লু রয়েছে। আইইডিসিআর হসপিটাল বেসড হিউম্যান ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইল্যান্সের একাধিক রিপোর্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার জুন থেকেই সারাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে আগের চেয়ে বেশি মাত্রায়। দেশের ৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশই বিভিন্ন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। এমনকি করোনারী কেয়ার ইউনিটে থাকা রোগীদের মধ্যে ৪৮শতাংশ কোনো না কোনো ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে। আলাদা করে ওই হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা শিশু রোগীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশের বিভিন্ন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন সাধারণত এপ্রিল থেকেই আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ শুরু হয় যা চলতে থাকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আর ডেঙ্গু শুরু হয় আরো কিছু সময় পরে। কিন্তু এবার অনেকটা একই সময় দুই ধরনের সমস্যা শুরু হয়েছে। যা সমপ্রতি জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত হয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভয়ংকর প্রকৃতির বহু ব্যাপক সংক্রামক রোগ। খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী হতে এই রোগের অস্তিত্বের ইতিহাস পাওয়া গেলেও ১৯১৮-১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ চলাকালে স্পেনদেশে ইহা বহু ব্যাপক মহামারিরূপে প্রকাশ পেয়ে অচিরাৎ খ্যাত ও সমগ্র পৃথিবীব্যাপ্ত হয়ে পড়ে এবং অসংখ্য লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মহাযুদ্ধ কালে উক্ত মহামারীর প্রাদুর্ভাব হয়েছিল বলে ইহাকে যুদ্ধ জ্বর বলা হত।
ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণ : ভাইরাস-এ এবং ভাইরাস-বি ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণরূপে আবিষ্কৃত হয়েছে। ভাইরাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিমফাইলাম ইনফ্লুয়েঞ্জা, স্ট্রেপ্টোকক্কাস, ষ্ট্যাফাইলো কক্কাস প্রভৃতি জীবাণু একত্রিত হয়ে গুরুতর উপসর্গ সৃষ্টি করে। তাছাড়া নিউমো স্টেপোহিমলিটিকাসও থাকে। মাঝে মাঝে মেনিনগো, মাইক্রোকক্কাই এবং ফ্রিডলান্ডার ব্যাসিলাস প্রভৃতিরও দর্শন হয়। বৃহৎ জনাকীর্ণ নগরে বসবাস, দুর্বলতা, ঠাণ্ডা লাগা আর্দ্রবায়ু সেবন প্রভৃতির ফলেও এই পীড়া হয়ে থাকে। দেহে ভাইরাস প্রবেশের ২৪-৪৮ ঘন্টার মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়।
ইনফ্লুয়েঞ্জার লক্ষণ
১. হঠাৎ শীত করে প্রবল জ্বর শুরু হয়। তার সাথে মাথাধরা এবং শরীর ব্যথা-বেদনা হয়।
২. অরুচি, বমি বমি ভাব ও বমন হয়।
৩. বুকের লক্ষণ- সাধারণত সর্দি কাশি থাকে, তবে কাশিতে কফ ওঠে না।
৪. বায়ুনালীর বা কৈশিক নালীর প্রদাহ ভাব দেখা দেয় অথবা পেটের রোগ বা মস্তিষ্কের রক্তাধিক্য এবং প্রলাপভাব দেখা দেয়।
৫. চক্ষুলালবর্ণ, নাসিকা হতে জলপড়া, পুনঃপুনঃ হাঁচি ও কাশি, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠবদ্ধতা, মুখের মধ্যে শুষ্কতা, জ্বর ১০৪/১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত দেখা যায়। নাড়ী এবং শ্বাসের গতি দ্রুত হয়।
৬. প্রবল সর্দি, বেদনা এবং দুর্বলতা ইহার প্রধান লক্ষণ।
৭. রক্তে শ্বেত কণিকার সংখ্যা কম হতে পারে।
ভয়ংকর উপসর্গ ও পরিণতি : সাধারণত এই রোগের জটিল অবস্থা দেখা দেয় না, আপনাতেই সেরে যায়। কিন্তু রোগের সঙ্গে যদি কক্কাসের ইনফেকশন হয় তবে রোগ জটিল হয়ে পড়ে এবং সহজে সারে না। এই অবস্থায় নানাবিধ জটিল উপসর্গ দেখা দেয় যথা-ট্রেকাইটিস, ব্রংকাইটিস, ল্যারিনজাইটিস, নিউমোনিয়া ইত্যাদি। যদি রোগীর আগের থেকে হার্টের রোগ থাকে তবে কার্ডিও মায়োপ্যাথি দেখা দিতে পারে এবং হঠাৎ মৃত্যু হতে পারে। এছাড়া কর্ণমূল প্রদাহ, নাকমুখ, মলদ্বার দিয়ে রক্তপড়া, ঝিল্লিপ্রদাহ, সন্নিপাত বিকার, প্রলাপ, তন্দ্রাচ্ছন্নভাব, শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি জটিল উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
আনুষঙ্গিক চিকিৎসা ব্যবস্থা : অসুস্থ হলে কিছুদিন বেড রেষ্টে থাকুন। এতে আপনি যেমন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন, তেমনই অন্য কারোর মধ্যেও অসুখটা ছড়াবে না।
* ছোট বাচ্চা বা বয়স্ক কেউ থাকলে তাঁদের কাছ থেকে দুরে থাকুন।
* গা-হাত-পা ব্যথা হলে বেশি করে জল খান। বারেবারে জল খেতে ভাল না লাগলে ফলের রসও খেতে পারেন।
* যথেষ্ট পরিমানে ঘুমান। কারণ সর্দিকাশি বা ফ্লু হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম প্রয়োজন হয়।
* গরম জলে গার্গল করুন।
* প্রোটিনযুক্ত সুষম আহার খান
* ঘরে যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ রোদ আসতে পারে তার ব্যবস্থা রাখুন। রোদে অনেক জীবাণু নষ্ট হয়ে যায়।
* নিয়মিত বালিশ, চাদর পরিষ্কার করুন। এতে সহজে জীবাণু ছড়াবে না।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : ইনফ্লুয়েঞ্জা নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অত্যন্ত কার্যকর। লক্ষণভেদে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ সেবনে এই রোগ সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে। এই রোগে ব্যবহৃত ওষুধ নিম্নে প্রদত্ত হল। যথা-
১. ইনফুয়েঞ্জিনাম : এই ওষুধটি এই রোগের একটি উৎকৃষ্ট প্রতিষেধক আবার ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের সকল অবস্থায় ইহা ব্যবহার করা যায় এবং বেশ কার্যকর হয়। শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হলে ইহার ব্যবহার সব অবস্থাতেই উপযোগী। ২. একোনাইট ৩. আর্সেনিক ৪. অ্যান্টিম টার্ট ৫. ব্রায়োনিয়া ৬. ইউপেটোরিয়াম ৭. জেলসিমিয়াম ৮. রাসটঙ ৯. ব্যাপ্টিরিয়া ১০. বেলেডোনা ১১. হিপার ১২. স্যাবাডিলা ১৩. পালসেটিলা ১৪. ফসফরাস ১৫. মার্কুরিয়াস ১৬. ক্যালি কার্ব ১৭. নাঙভমিকা ১৮. কার্বোভেজ ১৯. ক্যামোমিলা ২০. কষ্টিকাম ২১. চায়না উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x