ইতিহাস ঐতিহ্যের রাউজান এখন আরো আকর্ষণীয়

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ১৩ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ
484

শত বছর আগের বাংলা সহিত্যের খ্যাতিমান কবি দৌলত কাজী। তিনি ছিলেন রাউজানের গর্বিত সন্তানদের একজন। নিজের জন্মভূমি রাউজানের আলো বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিমুগ্ধ কবি তার লেখা একটি কাব্যে লিখেছেন

রাজার কুমারী এক নামে ময়নামতী

ভুবন বিজয়ী কন্যা জগতে পারুতী

কি কহিব কুমারীর রূপের প্রসঙ্গ

অঙ্গে লীলায় যে বান্ধিছে অনঙ্গ।”

কবি এই লেখায় গোটা রাউজানকে তুলনা করেছেন রাজার কুমারীর সাথে। শত বছর আগে কবির চোখে দেখা এই রাউজান ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমি। গত প্রায় দুই দশকে রাউজানের চিরাচরিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের সাথে যোগ হয়েছে আধুনিক সাজে সজ্জিত অনুপম রূপ। গোটা রাউজানকে সকল শ্রেণির পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে মনের মত করে সাজিয়ে রেখেছেন বর্তমান সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী নিজের মনের রঙে।

রূপের রাণী রাউজান এখন উন্মুখ হয়ে আছে দেশ বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে। এখানে উলেৱখ্য যে, গতবছর ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি রাউজানে এসে সৌন্দর্য্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাউজানের উপর দিয়ে রাঙ্গামাটি যাওয়ার পথে রাউজানের সৌন্দর্য দেখে অনির্ধারিত যাত্রা বিরতি করেছিলেন গিরীছায়ায়। এখানে দাঁড়িয়ে তিনি রাউজানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এই রাউজানে বিভিন্ন সময় আসা যাওয়া করেন জাপান, কোরিয়া, থাইল্যা-, আরব আমিরাত, ওমান, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক। তারা কেউ আসেন রাউজানের সৌন্দর্য্য উপভোগে, আবার কেউ আসেন রাউজানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমূহে প্রার্থনা ও শ্রদ্ধা নিবেদনে। রূপের রাণী এই রাউজানে রয়েছে মোগল আমলের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা, উপমহাদেশ খ্যাত মাস্টার দা সূর্য সেনসহ অনেক বিপৱবীর জন্ম এই উপজেলায়। ভারত থেকে বিভিন্ন সময় এখানে আসেন বিপৱবীদের বহু অনুসারী। তারা রাউজানকে জানেন পুণ্যভূমি হিসাবে। প্রয়াত বিপৱবীদের শ্মশানে তারা শ্রদ্ধা নিবেদন করে যান। উপভোগ করেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য

সচেতন মহল মনে করেন রাউজানকে যারা ঘুরে দেখেছেন তাদের কাছে রাউজান একটি আধুনিক পর্যটন স্পট। যেখানে রয়েছে নদীপাহাড় এর বৈচিত্রময় রূপ। ইতিহাস ঐতিহ্যের সাৰী হয়ে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা। অনেকেই ৰোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন রূপের রাণী রাউজানকে দেশের ট্যুুরিজম বোর্ড আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়েছে। সচেতন মহল মনে করেন সরকারের পর্যটন বিভাগ রাউজানকে ট্যুরিজম স্পট হিসাবে তালিকাভূক্ত করা উচিত। তারা মনে করেন পর্যটন বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ সমগ্র রাউজান ভ্রমণ করা উচিত। এই উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পাহাড় নদীর সৌন্দর্য্যের বিবেচনায় রাউজান হতে পারে দেশের অনন্য একটি পর্যটন ৰেত্র।

উপজেলার ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক দিক থেকে অনুপম সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমি এই উপজেলার দৰিণপশ্চিমে কর্ণফুলীহালদা নদীর বহমান পানির কুল কুল ধ্বনি, উত্তরের সর্তা খালে পাহাড়ী পানির ঝর্ণধারা বিমোহিত করে পর্যটকদের। পূর্বের পাহাড় টিলার সারি সারি বৃর্বরাজি আর ঝোপ ঝাড়ে আশ্রিত পশু পাখির কুঞ্জন পর্যটকদের দেয় এক স্বর্গীয় অনুভূতি।

ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক থেকে বিশ্বব্যাপী এই উপজেলার মর্যাদা সবার উপরে। এই উপজেলায় রয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সিপাহীসালার মাস্টার দা খ্যাত সূর্যসেন সহ তার সাহসী সহচরদের বাস্তুভিটা। তাদের স্মৃতি সৌধ রয়েছে নোয়াপাড়া, উরকিরচর, বাগোয়ানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে। যাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে এখনো ছুটে আসেন ভারত উপমহাদেশের অনেক জ্ঞানী গুনি। হিন্দু সমপ্রদায়ের অন্যতম গুরু তারাচরণ সাধুর জন্মস্থান এই রাউজানে। এই সাধকের নামে পশ্চিম বঙ্গে রয়েছে বিশাল আশ্রম ও কমপেৱক্স। এই সাধুর জন্মস্থান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের পশ্চিম গুজরা গ্রামে। অনেকেই আসে তার পৈতিৃক ভিটায় শ্রদ্ধা নিবেদনে। এই রাউজানে জন্ম মহাকবি নবীন সেনের। পশ্চিম গুজরায় বিশাল এলাকা জুড়ে পড়ে রয়েছে জমিদারপুত্র মহাকবি নবীন সেন এর বাস্তুভিটা। তার বাড়ির পাশে পূরুগুজরায় কবির শ্মশানে এখন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বিশাল কমপেৱক্স। যেখানে ছুটে আসেন কবি ভক্তরা প্রতিবছর। পূরু গুজরা হোয়ারা পাড়ায় বৌদ্ধ নেতা বিশুদ্ধানন্দ মহাথের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির। এখানে বিভিন্ন সময় ভ্রমণে এসেছেন বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী নেতা ও রাষ্ট্র প্রধান। এখনো বিভিন্ন সময় আসেন দেশ বিদেশের খ্যাতিমান বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দ ও পর্যটকরা। বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির পাহাড়তলীর মহামুনির খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে। এখানে প্রায় আসেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকগণ। এই গ্রামটিকে ঘিরে রয়েছে রাউজানের সাংস্কৃতিক বলয়। এই গ্রামে জন্ম ড.বেণী মাধব বড়ুয়ার। পাহাড়তলীতে অবস্থিতি বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেও আসেন বিভিন্ন দেশের নামী দামি ব্যক্তিবর্গ। এই প্রতিষ্ঠানের অদূরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভ্যন্তরে বিশাল এলাকাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত আছে জগৎপুর আশ্রম। এটি হিন্দু সমপ্রদায়ের জন্য পবিত্রস্থান। রয়েছে অনাথ আশ্রম। দেশ বিদেশের পর্যটকগণ এখানে বিভিন্ন সময় ছুটে আসেন। উপভোগ করেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। প্রাচীন ইতিহাসের জীবন্ত হয়ে আছে কদলপুরের লস্কর উজির দীঘি। বিশাল এই দীঘি নিয়ে এখনো চলে গবেষণা। আলোচিত এসব প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে। সহজ যোগাযোগ মাধ্যম কাপ্তাই সড়ক পথ। রাউজানের উত্তরাংশ রয়েছে চট্টগ্রামরাঙ্গামাটি মহাসড়ক। এই সড়ক পথে রাউজানের প্রবেশ মুখে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন হালদা সেতু। পূরুমূখি সড়কের গহিরা চৌমুহনী থেকে উত্তরমূখি অদুদিয়া সড়কটি চলে গেছে উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক সাধক সম্রাট এর জন্ম সার্থক মাইজভাার দরবারে। এই পথে রাউজানের নোয়াজিশপুর ইউনিয়নের সড়ক পাশে রয়েছে ইতিহাসের সাৰী বিশাল ঈশা খাঁ দিঘী। পূরুমুখি রাঙ্গামাটি সড়কের দুপাশে আধুনিক জনসেবামুখি সব স্থাপনা। এই সড়ক পথে রয়েছে শান্তিরদ্বীপ নামের একটি সমবায় সমিতি। যেখানে এসেছিলেন ফাদার পিচ ফায়ার নামে এক নোবেল বিজয়ী বেলজিয়ামের নাগরিক। তাকে এনেছিলেন এলাকার বিশিষ্ট রাজনীতিক মরহুম একেএম ফজলুল কবির চৌধুরী। এই সড়কের সাথে উপজেলা প্রশাসনের সবকটি প্রতিষ্ঠান। সড়ক পথে রাউজানের শেষাংশের পার্ব্বত্য জেলা সীমান্তের আগে দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সারি সারি বৃর্বরাজির মধ্যে কোকিলের কুহুতান, বৃর্ব ডালে পাখির কিচিমিচির শব্দ। বনের ফাঁকে ফাঁকে বন্য পশুর দৌড়ঝাপ। ঝোপঝাড়ে ঝাড়ের ফাঁকে পশুর দৌড় ও পাখির কুঞ্জনে এই পথের পথিকরা সৌন্দর্য উপভোগে থমকে দাঁড়ায়। সৌন্দর্যে লীলা ভূমি এই এলাকাটি রাউজান রাবার বাগান নামে পরিচিত। গত কয়েক বছর আগে এই এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গীরিছায়া নামের একটি আধুনিক রেস্তোরাঁ। পাশে করা হয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা। সৌন্দর্য পিপাসুরা যাত্রাপথে এখানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন সৃষ্টির অপূরু রূপ সৌন্দর্য। যাত্রা পথের অনেকেই এখানে গাড়ি থামিয়ে নারী শিশুদের নিয়ে বসে পড়েন গীরিছায়ায়। প্রতিষ্ঠানটি দেশ বিদেশের পর্যটকদের জন্য সব ধরনের খাবার রাখেন এখানে মওজুদ। শীতের মৌসুমে রাউজানের বিভিন্ন স্পটে পিকনিক করতে ছুটে আসেন দেশের বিভিন্নস্থানের শত শত সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটক। অনেকেই ঘুরে দেখেন উপজেলার বিভিন্নস্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। রাউজানের মধ্যে আরো একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি দৰিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ৰেত্র হালদা নদী। বছরের একাধিকবার এই নদীতে মা মাছ ডিম দিয়ে থাকে। প্রায় ২৮ কিলোমিটার এই নদীর দুধারে জনবসতি। নদী পথে চলে নৌকা সাম্পান। মাঝি মালৱার কন্ঠে শুনা যায় ভাটিয়ালী গানের সুর।

ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ সৌন্দর্য্যের রাণী এই উপজেলাকে নিয়ে রয়েছে হাজারো রূপকথা। এই উপজেলায় জন্ম চট্টগ্রামের রপকথার মহারাণী মলকাবানু। যার নামে রয়েছে অনেক গান, হয়েছে ছায়াছবি। উপমহাদেশ খ্যাত চলচ্চিত্র শিল্পী শাবানার বাড়িও এই উপজেলায়। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এখনো অর্বত রয়েছে মোগল সাম্রাজ্যের স্মৃতিবহ বহু স্থাপনা। যেগুলো নিয়ে এখনো চলছে বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষণা কর্ম। এই রাউজান আরো সমৃদ্ধ হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব অবকাঠামো সৃষ্টিতে। গত দেড় যুগে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন রাউজানের বর্তমান সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি নিজের মত করে সাজিয়েছেন এই রাউজানকে আধুনিক পর্যটনের সব চাহিদা পূরণে উপযোগী করে। এলাকাবাসী দাবি রাউজানকে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হউক পর্যটন এলাকা হিসাবে।

x