ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের প্রয়াস

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ
34

২১শে আগস্ট নৃশংস গ্রেনেড হামলার মামলার রায় হয়েছে। ১৪ বছর আগে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়া এ মামলার আসামি ১১ সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বুধবার আলোচিত ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় এই রায় ঘোষণা করেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন; আহত হন কয়েকশ নেতাকর্মী। সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়।
এই মামলার রায়ে ইতিহাসের দায় শোধ করার একটা প্রয়াস জাতি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেলো। এটি একটি ঐতিহাসিক রায় হিসেবে বিবেচিত হবে-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই রায়ের মাধ্যমে ২১শে আগস্টের হত্যাকাণ্ডের শিকার ২৪ জন নেতা-কর্মীর স্বজন ও আহত কয়েক শ নেতা-কর্মী-সমর্থকের দীর্ঘ প্রতীক্ষারও অবসান হলো। আদালতের এ রায়কে আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো স্বাগত জানিয়েছে। বলেছে, রায়ে ন্যায়ের প্রতিফলন ঘটেছে। অন্যদিকে, বিএনপি ও সমমনা দলগুলো রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। বলেছে, আইনগত লড়াই চালানোর কথা। উল্লেখ্য যে, গ্রেনেড হামলার পরপর হামলার তথ্য-উপাত্ত লোপাট করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে তৎকালীন সরকার। মামলার তদন্তের নামে তারা যে প্রহসনের আশ্রয় নেয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল জজ মিয়া নাটক। সরকারের ভিতরেই যে হামলাকারীদের শিকড় বিস্তৃত ছিল সে সন্দেহই জোরদার করে তৎকালীন সরকারের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ। এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতে বিচার হয়েছে। আদালত শাস্তি দিয়েছে নানা মেয়াদের। এর প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত আইনানুগ। যদি কেউ রায়ে অসন্তুষ্ট হন, তিনি বা তাঁরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আইনি বিচারের রায়ের কেউ যদি প্রতিবিধান চান, সেটাও চাইতে হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই। ২১ আগস্টের আঘাতে আমাদের হৃদয় এখনো ক্ষতবিক্ষত। এই বিচারপ্রক্রিয়া এবং এই রায় ঐতিহাসিক, কারণ এটা জাতির ওপরে চেপে বসা ইতিহাসের দায় শোধ করার প্রক্রিয়ার একটা অংশ। ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের একটা প্রয়াস। অশ্রু মুছে বেদনাহত চিত্তে আমরা এই রায়কে স্বাগত জানাই।
১৫ আগস্টে পৃথিবীর ইতিহাসে যে নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে নিষ্ঠুরতম নজির স্থাপিত হয়েছে, তার ধারাবাহিক হত্যাযজ্ঞ ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। শেখ হাসিনাকে হত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার অপ তৎপরতা ছিলো আসামীদের।
১৪টা বছর ধরে জাতি বহন করে চলেছে এক ভয়াবহ কলঙ্কের ভার। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বুকে যা ঘটেছিল, তা মনে করলেও শরীর শিউরে ওঠে, আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি, বিবেক হয়ে পড়ে যন্ত্রণাদগ্ধ। শেখ হাসিনাসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে একসঙ্গে খতম করে আওয়ামী লীগ তথা তৎকালীন বিরোধী দল তথা জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়ার কী ভয়াবহ অপকৌশল: নীলনকশা, ষড়যন্ত্র, গ্রেনেড জোগাড়, হামলা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা এবং অবশেষে ঘটনার দায় খোদ আওয়ামী লীগ আর ভারতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা। কী সাংঘাতিক! বিচারহীনতা সংস্কৃতি যেভাবে চলে আসছিলো, তার অবসান হতে চলেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডসহ ২১শে আগস্ট গ্রেডে হামলার বিচারের মাধ্যমে দেশ বিচারহীনতা সেই সংস্কৃতির অপবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলো। দেশে একটি চক্র রাজনৈতিক হত্যা-হামলার যে অপসংস্কৃতি গড়ে তুলেছে তার অবসানেও এই রায় ভূমিকা পালন করবে। আমরা চাই না, দেশে আর কোন ১৫ আগস্ট বা ২১ আগস্টের উদ্ভব হোক।

x