ইঙ্গমার বার্গম্যান শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ৩১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:২৯ পূর্বাহ্ণ
29

মানুষের মনের গহনের না বলা কথাগুলো বলা হতে লাগলো তাঁর ছবিতে। বার্গম্যান বললেন তাঁর ছবিতেমানুষ

কখনো একাকী চলতে পারে না; পারে না মনের শান্তি অর্জন করতে। সে জীবনকে ভালোবাসে, ভালোবাসে নিজেকে। তাই তার প্রয়োজন সঙ্গীর। কারণ সে চায় জীবনের চাপ জীবনের ভার এসবের বিরোধীতা করতে, আর তাই প্রেমিকাকে যেমন সে পেতে চায়; তেমনি মৃত্যুদূত এলে তাকে সে আহ্বান জানায় দাবাখেলার প্রতিযোগিতায়। কারণ সে জীবনের থেমে যাওয়াকে পছন্দ করে না, যদিও তাকে মৃত্যুদূতের কাছে হার মানতেই হয়। তবুও সে লড়তে চায় জীবনকে ভালোবাসে বলেই, জীবনের পরিসমাপ্তি চায় সে শান্ত স্নিগ্ধ প্রশান্তিময়।

(দ্বিতীয় পর্ব)

স্টিনা বার্গম্যানকে ইঙ্গমার বার্গম্যানের চলচ্চিত্র জীবনের সূচনাকার বলা যায়। বলতে গেলে স্টিনার হাত ধরে ইঙ্গমারের ফিল্ম ক্যারিয়ারের শুরু। স্টিনা বার্গম্যানের উৎসাহে তিনি চলচ্চিত্রের জন্যে প্রথম চিত্রনাট্য রচনা করলেন, ঐবঃং, ১৯৪৪ সালে। ছবিটি পরিচালনা করলেন আল্‌্‌ফ মোবার্গ। সেই বার্গম্যানের হাতে খড়ি চলচ্চিত্রে। চিত্রনাট্যকার রূপে।

১৯৪৪ সালেই তাঁর দেখা হলো প্রখ্যাত নাট্য প্রযোজক কার্ল এন্ডার্স ডিমলিংএর সঙ্গে হলসিনবার্গে। বার্গম্যান তখন ওখানকার থিয়েটারে কাজ করছেন। ডিমলিং সেসময় একটা ডেনিশ নাটক কিনেছেন ‘মোডার ডাইরেট’ নামের। ডিমলিং চাইলেন সেটা নিয়ে বার্গম্যান একটা ছবি করুন। বার্গম্যান সঙ্গে সঙ্গে রাজী হলেন। এবং সেই শুভ সূচনা। এক বছর পর বার্গম্যানের প্রথম ছবি ‘ক্রাইসিস’ মুক্তি পেল, ডেনিশ নাট্যকার লেক ফিশারের ‘মোডার ডাইরেট’ নাটক অবলম্বনে বার্গম্যানের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় তৈরি হলো এই ছবি। সেই থেকে থিয়েটারের পাশাপাশি সিনেমাও চলতে লাগলো একসাথে বার্গম্যানের হাত ধরে।

এরপর বছরের পর বছর ছবি করে গেছেন। কোনো বছর দুটোকোনো বছর তিনটে। অনেকের জন্যে চিত্রনাট্যও লিখেছেন। মানুষের মনের গহনের না বলা কথাগুলো বলা হতে লাগলো তাঁর ছবিতে। বার্গম্যান বললেন তাঁর ছবিতেমানুষ কখনো একাকী চলতে পারে না। পারে না মনের শান্তি অর্জন করতে। সে জীবনকে ভালোবাসে, ভালোবাসে নিজেকে। তাই তার প্রয়োজন সঙ্গীর। কারণ সে চায় জীবনের চাপ জীবনের ভার এসবের বিরোধীতা করতে, আর তাই প্রেমিকাকে যেমন সে পেতে চায়; তেমনি মৃত্যুদূত এলে তাকে সে আহ্বান জানায় দাবাখেলার প্রতিযোগিতায়। কারণ সে জীবনের থেমে যাওয়াকে পছন্দ করে না, যদিও তাকে মৃত্যুদূতের কাছে হার মানতেই হয়। তবুও সে লড়তে চায় জীবনকে ভালোবাসে বলেই, জীবনের পরিসমাপ্তি চায় সে শান্ত স্নিগ্ধ প্রশান্তিময়। এসব উপলব্ধির কথা বার্গম্যান বলে গেছেন ছবির পর ছবিতে। এমনকি তাঁর ব্যক্তি জীবনে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অন্ত্যেষ্টির চিত্রনাট্যটিও তিনি লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর সেই প্রত্যাশিত অন্তেষ্টিও ছিল তাঁর চলচ্চিত্রের মতো শান্ত স্নিগ্ধ নিরুচ্চার যা অক্ষরেঅক্ষরে মানা হয়েছে তাঁর লিখে রাখা চিত্রনাট্য অনুযায়ী।

নিজের জন্যে তিনটি নিয়ম তৈরি করেছিলেন বার্গম্যান ১. ছবি করে সবসময় আনন্দ দাও ২. সবসময় শৈল্পিক চেতনা মেনে চলো ৩. ছবি করার সময় সবসময় মনে রেখো এটাই তোমার শেষ ছবি।

বিশাল তাঁর কর্মযজ্ঞ। থিয়েটার ও সিনেমায় যুগপৎ কাজ করে গেছেন। কিন্তু কোনোটায় কোনোটার প্রভাব নেই। দুই মাধ্যমের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তাঁর সহজাত কুশলতায় দুর্দান্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ৭৩ বছরের (১৯৩০২০০৩) দীর্ঘ শিল্প জীবনে।

মানব জীবনের পঞ্চেন্দ্রিয় ও ষড়রিপুর নিরন্তর বিশ্লেষণ তাঁর চলচ্চিত্রের পরতেপরতে ছড়ানো। হিংসা, রিরাংসা, অবদমিত ও অতৃপ্ত যৌনতা, ঐশ্বরিক বিশ্বাস অবিশ্বাসের দ্বান্দ্বিকতা, প্রেম, কামনা, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, হতাশা, সংকট, দ্বিধা, পরশ্রীকাতরতা, জীবনের প্রতিনিয়ত অবলম্বনের এসব অনুসন্ধান তাঁর সবকটি চলচ্চিত্র জুড়ে বিস্তৃত। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রের নামকরণেও এই বৈশিষ্ট্য প্রতিভাসিত।

বার্গম্যান বৃত্তাবদ্ধ হয়ে থাকেননি কখনো। প্রতিটি ছবিতে নিজেকে ভেঙেছেন এবং অতিক্রম করে গেছেন। মানুষের মনের অন্তর্দহন এবং দৈহিক ও মানসিক দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে নির্মিত তাঁর ট্রিলজি ‘থ্রো আ গ্লাস ডার্কলি’ (১৯৬১), ‘উইন্টার লাইট’ (১৯৬৩) ও ‘দ্য সাইলেন্স’ (১৯৬৩) এ তিনি দেখান এসব দ্বন্দ্বে মানুষ ক্রমশ: দীর্ণ হয়ে অসহায় হয় বটে তবে নতুন এক উপলব্ধিতে নতুন কোনো অবলম্বনকে আশ্রয় করে সে আবার ঋজু হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বাসের নয় জ্ঞানের জয় হয়।

যদিও বৃত্তাবদ্ধ হয়ে থাকেননি বার্গম্যান তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় শৈলীতে, কিন্তু নির্মিতি ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তিনি পেরেছিলেন নিজের একটি পরিমণ্ডল নির্মাণ করতে, যা শিল্পের মহত্ত্বের লক্ষণ। তাঁর চলচ্চিত্র, এমন কি কোনো একটি চলচ্চিত্রের কোনো একটি দৃশ্য তাঁকে নিমিষেই যেমন চিনিয়ে দেয়, তেমনি তাঁকে আগাগোড়া অননুকরণীয় এবং অনুকরণে বিপজ্জনক করে রেখেছে বরাবর।

নিজের সেই পরিমণ্ডলের কারণে তিনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার (সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড) বাইরে কখনো যাননি নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের নির্মাণে। অত্যন্ত সীমিত বাজেটে নির্মাণ করেছেন অর্ধশতাধিক নাটক এবং প্রায় অর্ধশত চলচ্চিত্র। পশ্চিম দক্ষিণ ও পূর্বের অনেক রঙিন হাতছানি অবলীলায় উপেক্ষা করেছেন।

আপাতদৃষ্টে নিভৃতচারী মনে হলেও বার্গম্যান প্রকৃতার্থে তা নন। সিনেমার পাশাপাশি কাজ করেছেন টেলিভিশনেও। অন্য পরিচালকদের জন্যে দশটি চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। লেখালেখি করেছেন নাটক ও চলচ্চিত্র নিয়ে সহজাত ওজস্বিতায়। জীবনের শেষ বছরগুলোতে ডায়েরি লিখে গেছেন, যা পরে আত্মজীবনীরূপে প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৯৪ এর জানুয়ারি থেকে ১৯৯৮ এর মে মাস পর্যন্ত ইঙ্গমার বার্গম্যান অন্তর্ধান ছিলেন। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও প্রতীক্ষায় তাঁর সন্ধান মেলেনি। ফিরে আসার পর পরিবারের কেউ যেমন এবিষয়ে তেমন কিছু জিজ্ঞেস করেননি, তিনিও স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। এটা হয়তো তাঁর নিভৃতচারিতার আকাঙ্ক্ষার বহি:প্রকাশ। হয়তো তাঁর এসময়ের হদিস জানতেন তাঁর সবচেয়ে কাছের কেউ। অনেকের ধারণা তিনি তখন মিউনিখে ছিলেন।

ইঙ্গমার বার্গম্যান হচ্ছেন চলচ্চিত্রের প্রতিভাধর কয়েকজন শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন যিনি অর্জন করেছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবকটি শ্রেষ্ঠ সম্মাননা।

২০০৭ সালের ৩০ জুলাই এর এক তুষার শীতল রাতে তাঁর ৮৯ বছরের দীর্ঘ যাত্রার অবসান ঘটে। পাশে ছিলেন দুই কন্যা লিন ও ইভা, পুত্র দানিয়েল। আর ছিলেন স্ত্রী প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্রকার লিভ উলম্যান, তাঁর অনেক ছবির অভিনেত্রী, যাঁর কাছে বারেবারে জীবনের ও শিল্পের আশ্রয় খুঁজেছেন ইঙ্গমার।

সেভেন্‌্‌থ সীল’ ছবিতে মৃত্যুদূতকে দাবা খেলার নানান ছলাকলায় দীর্ঘ সময় আটকে রাখতে পারলেও এবার আর পারলেন না। তবে রেখে গেলেন ৪৪টি অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র এবং ৩টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

মৃত্যুর অনেক আগে ইঙ্গমার তাঁর ইচ্ছাপত্রে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর অন্ত্যেষ্টির বিষয়ে চিত্রনাট্যের মতো করে। এমনকি তাঁর শেষ যাত্রায় ও অন্ত্যেষ্টিতে কোন্‌্‌ কোন্‌্‌ ধর্মীয় ও শোক সঙ্গীত গাওয়া হবে তারও একটি তালিকা দিয়ে গিয়েছিলেন। মনোনীত করে গিয়েছিলেন পাদ্রীকে।

২০০৭ সালের ১৮ আগস্ট, প্রয়াণের ১৯ দিন পর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় তাঁর অতিপ্রিয় ফারো দ্বীপের গীর্জার সমাধিক্ষেত্রে। যে দ্বীপটি নিয়ে তিনি একটি ছবি নির্মাণ করেছিলেন।

x