ইঙ্গমার বার্গম্যান শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৪ জুলাই, ২০১৮ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ
38

শৈশব থেকেই সিনেমা ও থিয়েটারের প্রতি তাঁর সমান আকর্ষণ। ছোটবেলার দিনগুলোতে তাঁর হাত খরচার বেশিরভাগ চলে যেত ফিল্ম কিনতে প্রজেক্টরে দেখার জন্যে। সপ্তাহের অনেক সন্ধ্যাই কাটাতেন সিনেমা হলে, অপেরায় আর থিয়েটারে। তিনি বলেছেন, ‘থিয়েটার আমার কাছে কর্তব্যনিষ্ঠ স্ত্রীর মতো, সিনেমা এক বিরাট রহস্য, খুব দামী প্রেমিকার মতো, তার চাহিদাও খুব বেশী, দুজনকেই আমি ভালোবাসি, দুজনের প্রতিই আমি বিশ্বস্ত।’

(১ম পর্ব)

ফ্রাঁসোয়া ক্রফো ইঙ্গমার বার্গম্যান সম্পর্কে বলেছেন, ‘Here is a man who has done all we dreamed of doing. He has written films as a novelist writes a book. Instead of a pen he has used a camera. He is an author of cinema ’.

অথর শব্দটির আক্ষরিক অর্থ লেখক হলেও এর অর্থ আরও ব্যাপকতর। অথরিটি শব্দটিও অথরের ব্যুৎপত্তিজাত, যার অর্থ কর্তৃত্ব। চলচ্চিত্রে অথরশীপ বা অথরতত্ত্ব বলে একটি ধারা আছে। যেধারার নির্মাতাকে অথর চলচ্চিত্রকার বলা হয়। অর্থাৎ চলচ্চিত্র নির্মাণে যার প্রভূত কর্তৃত্ব। ক্রফোর বক্তব্যে আমরা দেখি, তিনি বার্গম্যানকে ‘Author of cinema’ বলছেন।

প্রকৃতার্থেও তাই। ইমার বার্গম্যান চলচ্চিত্রের একজন কর্তা বা অথরিটি যিনি সিনেমাকে শীর্ষমাত্রায় পৌঁছুতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে গেছেন। চলচ্চিত্রের অন্যতম এক স্রষ্টা।

ক্রফোর কথার সূত্র ধরে বলা যায়; আমাদের স্বপ্নগুলো, মনের কন্দরে লুকোনো কথাগুলো যিনি চলচ্চিত্রে মূর্ত করে তোলেন, সেই বার্গম্যান হচ্ছেন চলচ্চিত্রের কবি। ১৯১৮ সালের ১৪ জুলাই সুইডেনের দ্বিতীয় শহর উপসালায় এই কবির জন্ম। যখন তার বয়েস ১০, বাবা তাঁকে একটা প্রজেক্টর উপহার দিয়েছিলেন। সেই থেকে চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর যেভালোবাসার শুরু তা বহমান ছিল আজীবন। মোট ৪৪টি ছবি তিনি নির্মাণ করেছেন ১৯৪৫ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত। ৫৮ বছরের সুদীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে। অবশ্য ১৯৮৫ থেকে ২০০২ এই ১৭ বছর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে বিরত ছিলেন। দীর্ঘ ফিল্ম ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন টু জয় (১৯৪৯), জারনি ইনটু অটাম (১৯৫৫), স্মাইলস অফ এ সামার নাইট (১৯৫৫), দ্য সেভেন্‌্‌থ সীল (১৯৫৬), ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ (১৯৫৭), সো ক্লোজ টু লাইফ (১৯৫৮), দি ভার্জিন স্প্রিং (১৯৬০), সি সাইলেন্স (১৯৬৩), পারসোনা (১৯৬৬), দি শেম (১৯৬৮), ফেস টু ফেস (১৯৭৬), দি সারপেন্টস এগ (১৯৭৭), অটাম সোনাটা (১৯৭৮), ফানি এন্ড আলেকজান্ডার (১৯৮২), আফটার দ্য রিহারসেল (১৯৮৪) এবং সারাব্যান্ড (২০০৩, শেষ কাজ) এর মতো অবিস্মরণীয় সব চলচ্চিত্র, নিঃসন্দেহে যেগুলো ওয়ার্ল্ড ফিল্ম মাস্টারপিস।

মানবমনের অতি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সাবলীলভাবে ধরা দেয় তাঁর ছবিগুলোতে। তাঁর চলচ্চিত্রকৃতির নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রতিভাত হয়, মানুষের মনের অন্ধকার কোনগুলোর ছবি। এবং দমিত ও অতৃপ্ত ইচ্ছেগুলোর কথা তিনি বারেবারে বলতে চেয়েছেন। প্রলয় শরের মতে, ‘বার্গম্যানের ছবি এক বিরূপ বিশ্বে মানুষের নিয়ত জ্ঞানের সন্ধান।’

ইঙ্গমার বার্গম্যান পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ শিল্পী যিনি আজীবন একইরকম পরিশ্রম করে গেছেন সিনেমা ও থিয়েটার এই দুই মাধ্যমে। এই দুই মাধ্যমে নিজের অসাধারণ ক্ষমতাকে স্বচ্ছন্দভাবে প্রকাশ করে গেছেন।

শৈশব থেকেই সিনেমা ও থিয়েটারের প্রতি তাঁর সমান আকর্ষণ। ছোটবেলার দিনগুলোতে তাঁর হাত খরচার বেশিরভাগ চলে যেত ফিল্ম কিনতে প্রজেক্টরে দেখার জন্যে। সপ্তাহের অনেক সন্ধ্যাই কাটাতেন সিনেমা হলে, অপেরায় আর থিয়েটারে। তিনি বলেছেন, ‘থিয়েটার আমার কাছে কর্তব্যনিষ্ঠ স্ত্রীর মতো, সিনেমা এক বিরাট রহস্য, খুব দামী প্রেমিকার মতো, তার চাহিদাও খুব বেশী, দুজনকেই আমি ভালোবাসি, দুজনের প্রতিই আমি বিশ্বস্ত।’

ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি ভর্তি হন স্ট্রকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য ও শিল্পকলা বিভাগে। বিশ্বখ্যাত সুইডিশ নাট্যকার স্ট্রান্ডবার্গের কবুং ঃড় ঐবধাবহ নাটকের ওপর গবেষণা করতে লাগলেন পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে। কিন্তু প্রথাগত লেখাপড়ায় তাঁর আগ্রহ ছিল না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পাবার জন্যে গবেষণা করা তাঁর পক্ষে আর হয়ে উঠলো না। কাজটা তিনি শেষ করলেন না। বরং ১৯৩০ সালে যোগ দিলেন স্টকহোমের বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটারে। আর এখানেই তিনি সুযোগ পেলেন তাঁর মনমতো সৃষ্টিশীল কাজের, নাটক রচনার, নাটক পরিচালনার। এখানেই তাঁর সুযোগ হয় চলচ্চিত্র প্রযোজকদের সঙ্গে যোগাযোগের।

১৯৩৫এ তিনি দেখলেন বিশিষ্ট সুইডিশ নাট্য পরিচালক ওল্‌্‌ফ মোলানডারের পরিচালনায় স্ট্রীন্ডবার্গের লেখা নাটক ‘এ ড্রিম প্লে’র মঞ্চায়ন। তখনই তিনি স্ট্রীড বার্গের রীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন যার প্রভাব তাঁর মধ্যে রয়ে গেছে চিরদিন। স্ট্রীন্ডবার্গই পরিণত হন তাঁর আদর্শে।

১৯৩৮এ ইঙ্গমার বার্গম্যান প্রথম নাটক পরিচালনার সুযোগ পান স্টকহোমের মাস্টার ওল্‌্‌ফগার্ডেন থিয়েটারে। আর সেই শুরু। সেই থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত একটানা ৭৫টি নাটক পরিচালনা করেছেন তিনি। টেলিভিশন ও রেডিওতেও করেছেন অনেকগুলো নাটক। যেসব নাটক তিনি করেছেন সেসবের রচয়িতারা সকলেই বিখ্যাত। যেমন : গ্যায়টে, মলিয়ের, ইবসেন, চেখভ, পিরানদেল্লো, ব্রেখট কাম্যু, টেনেসি ইউলিয়ামস, এডওয়ার্ড এলবি এবং অবশ্যই স্ট্রীন্ডবার্গ। এক কথায় নাটকের মধ্যে দিয়ে বার্গম্যানের বিশ্বভ্রমণ।

একটা সময়ে বিশেষ করে ১৯৪০এর দশকের মাঝামাঝি অর্থাৎ ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর সুইডেনের থিয়েটার চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি পড়েছিল। ইঙ্গমার বার্গম্যানই বলতে গেলে একা হাতে এই থিয়েটারকে আবার দাঁড় করান।

১৯৫২ সালে মালমো সিটি থিয়েটারে তিনি শুরু করেন ছয় বছরের জন্যে নাটক পরিচালনার কাজ। মালমো সিটি থিয়েটার ইউরোপের সবচেয়ে আধুনিক থিয়েটারগুলির অন্যতম। এই থিয়েটারের ‘বার্গম্যান যুগ’ এখনো বিখ্যাত হয়ে রয়েছে, মূলত: এর অসামান্য দলগত অভিনয়ের জন্যে। মালমো সিটি থিয়েটারের অনেক অভিনয় শিল্পী পরবর্তীকালে বার্গম্যানের সিনেমায় অভিনয় করেছেন। যেমন: হ্যারিয়েট এন্ডারসন, বিবি এন্ডারসন, ইনগ্রিড থুলিন, লিভ উলম্যান, ম্যাক্স ভন সিডো প্রমুখ। বার্গম্যানের চলচ্চিত্রে এঁদের অভিনয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

১৯৪৪ সালের দিকে বার্গম্যান থিয়েটারে একটু একঘেয়ে বোধ করতে লাগলেন। তাঁর মনে পড়লো তাঁর দামী প্রেমিকা অর্থাৎ চলচ্চিত্রের কথা।

তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি আগ্রহবোধ করতে লাগলেন। এসময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটলো বিখ্যাত নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক হেজালমার বার্গম্যানের স্ত্রী স্টিনা বার্গম্যানের সঙ্গে। শুরু হলো ইঙ্গমার বার্গম্যানের জীবনের দ্বিতীয় ও নতুন অধ্যায়ের। বলা যায় বার্গম্যানের জীবনের প্রকৃত অধ্যায়টির সূচনা হলো ১৯৪৪ সালে।

(পরবর্তী সংখ্যায় শেষ হবে)

x