ইউজিসির ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে খর্ব হলে উচ্চ শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন অসম্ভব

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
41

উচ্চ শিক্ষা কমিশন আইনের খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিবর্তে খর্ব করা হচ্ছে। পত্রিকান্তরে গত ৫ সেপ্টেম্বর এখবর প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, সক্ষমতা ও কর্মপরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইউজিসিকে উচ্চ শিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিনের। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘উচ্চ শিক্ষা কমিশন আইন২০১৮’ প্রণয়ন করছে সরকার। সম্প্রতি প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় আইনটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত উচ্চ শিক্ষা কমিশনে ইউজিসির ক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে সংকুচিত করা হয়েছে। এ আইন বাস্তবায়ন করা হলে ইউজিসি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। খবরে বলা হয়, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উচ্চ শিক্ষা কমিশন আইনে কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদনের শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদ সৃষ্টি ও বিলোপ, অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউট খোলা ও অর্থ বরাদ্দের কাজ করে ইউজিসি। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুমোদন, বিভাগ বা কোর্স চালু, স্থগিত কিংবা বাতিলের কাজও করে থাকে ইউজিসি। তবে প্রস্তাবিত আইনে এসব ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদনের শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। ইউজিসির নিজস্ব পদ সৃষ্টি যোগ্যতা নির্ধারণ ও নিয়োগের বিষয়েও পূর্বানুমোদন নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। এমন কি কোন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক, চুক্তি সম্পাদন এবং যে কোন ধরনের সহায়তা কিংবা বিনিময় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতেও পূর্বানুমোদন লাগবে। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের আইনি সক্ষমতাও বাড়ানো হয়নি। এতে বলা হয়েছে, ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে, কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারবে না।এটা নেবে মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয় মন্ত্রণালয় কমিশনের সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়। পরিদর্শন ও তদন্ত বিষয়ে সরকার যেমন মনে করবে, তেমন ব্যবস্থা নিতে পারবে। প্রস্তাবিত আইনে বর্তমান বিধি মোতাবেক কমিশনের একজন চেয়ারম্যান এবং পাঁচজন পূর্ণকালীন সদস্য রাখা হয়েছে। এতে প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনজন খণ্ডকালীন সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনজন সচিব খণ্ডকালীন সদস্য থাকবেন। এছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনজন উপাচার্য এবং তিনজন ডিন সদস্য নিয়োগ পাবেন। বর্তমানে শুধু শিক্ষাবিদেরাই কমিশনের চেয়ারম্যান হতে পারেন। প্রস্তাবিত আইনে প্রশাসকদেরও চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক বা প্রশাসক হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা চেয়ারম্যান হতে পারবেন। শুধু ইউজিসি নয়, প্রস্তাবিত আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনও ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শর্তাবলী কমিশন নির্ধারণ করবে। অথচ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেরাই এটা নির্ধারণ করে। প্রস্তাবিত আইনের এসব বিধি বিধান থেকে এটা স্পষ্টই বোঝা যায় যে, ইউজিসি তথা উচ্চ শিক্ষা কমিশনে আমলাদের প্রাধান্য বিস্তার ও বজায় রাখার জন্যই এভাবে খসড়া প্রণীত হচ্ছে।

উচ্চ শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে দীর্ঘ আট বছর অপেক্ষার পর ইউজিসি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির কাঠামো ও নাম বদলিয়ে করা হচ্ছে উচ্চ শিক্ষা কমিশন। তবে দেয়া হচ্ছে না স্বায়ত্তশাসন, বাড়ানো হচ্ছে না ক্ষমতা। চেয়ারম্যান পদে বর্তমান আইনে শিক্ষাবিদদের নিয়োগ বাধ্যতামূলক হলেও প্রস্তাবিত আইনে তা বাদ দিয়ে, সর্বোচ্চ পদে আমলাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার যে এখতিয়ার ছিল প্রতিষ্ঠানটির হাতে, সেটি আর থাকছে না। ৫ সেপ্টেম্বরের পত্রিকায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, উচ্চ শিক্ষা কমিশন আইনে কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পূর্বানুমোদনের শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের আইনি সক্ষমতাও বাড়ানো হয়নি। এতে বলা হয়েছে, ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এটি নেবে মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, মন্ত্রণালয় কমিশনের সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়। কমিশন স্বাধীনভাবে যেকোনো প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে তার কার্যক্রম যে মুখ থুবড়ে পড়বে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অরাজকতাও বন্ধ করা যাবে না। আমরা চাই, ইউজিসি থেকে প্রেরিত উচ্চ শিক্ষা কমিশনের জন্য যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তা আমলে নেয়া হোক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত কমিশন গঠন করা হোক যার প্রভাবে উচ্চ শিক্ষার মান বাড়বে। প্রস্তাবিত আইনে আমলাতন্ত্রের প্রাধান্য সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এটি উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইউজিসির প্রণীত খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, কমিশন হবে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের অধীনে।

স্বাধীনভাবে এ কমিশন যে কোন প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এটি পুরোপুরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতামুক্ত হলে স্বাধীনভাবে উচ্চ শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ পাবে। কারণ মন্ত্রণালয়ের একটি উইং হয়ে দেশের উচ্চ শিক্ষার কাজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই সম্ভব নয়। আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন উচ্চ শিক্ষা কমিশন সত্তাই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটাতে পারবে। তবে উচ্চ শিক্ষা কমিশন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অবশ্যই যোগসূত্র ও সমন্বয় থাকার প্রয়োজন রয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত উচ্চ শিক্ষা কমিশন তার সব কাজের অনুলিপি মন্ত্রণালয়কে অবগত করতে পারে।

আপত্তি থাকলে, আইনের কোন ব্যতিক্রম ঘটলে বা মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হলে মন্ত্রণালয় অবশ্যই উচ্চ শিক্ষা কমিশনকে জানাবে এবং উচ্চ শিক্ষা কমিশনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে যার যার অবস্থানে থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও উচ্চ শিক্ষা কমিশন দেশের উচ্চ শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করবে। এটা নিয়ে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়। দেশের উচ্চ শিক্ষার স্বার্থে বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে উচ্চ শিক্ষা কমিশন যাতে আলোর মুখ দেখতে পায়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই বিধেয়।

আরেকটি বিষয় হলো, স্বায়ত্তশাসিত উচ্চ শিক্ষা কমিশন গঠনের পর সেই কমিশন যেন আবার স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনে কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করে, সেদিকটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ভারতও তাদের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে উচ্চ শিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের অংশ হিসেবে আইনের খসড়া তৈরি করেছে। দেশটির খসড়া আইনের ইতিবাচক বিষয়গুলো বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

x