ইংরেজি নববর্ষের ইতিকথা ও প্রত্যাশা

অনিক শুভ

বুধবার , ২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৭ পূর্বাহ্ণ
46

শীতের সকালে শিশিরভেজা দূর্বাঘাস লকলকিয়ে স্বাগত জানাল নতুন বছরকে। নতুন বছর মানেই নতুন আনন্দ আর নতুন পরিকল্পনা। দিনপঞ্জির পাতা অনুযায়ী, আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিয়ে গেল ২০১৮ সাল। শুভ আগমন ২০১৯ ।
নতুন বছর মানেই পুরনোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা। আশা আর স্বপ্নপূরণে প্রত্যয়ী হওয়া। সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আয়না। সংস্কৃতির বহুবিধ উপাদানের মধ্যে নববর্ষও অন্যতম। আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে শুরু হয় নতুন বছর। তবে রোমে নতুন বছর পালনের প্রচলন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৩ সালে। পরে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকার প্রচলন করেন। যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। রোমে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের অন্তর্গত বছরের প্রথম দিনটি জানুস দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। জানুস হলেন প্রবেশপথ বা সূচনার দেবতা। তার নাম অনুসারেই বছরের প্রথম মাসের নাম জানুয়ারি নামকরণ করা হয়। এরপরে যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পর তার জন্মের বছর গণনা করে ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি এই ক্যালেন্ডারের নতুন সংস্কার করেন। যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই কার্যত দিনপঞ্জি হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়।
সম্রাট নুমা পম্পিলিয়াস ফেব্রুয়ারী মাসকে দ্বাদশতম হিসেবে প্রচলন করেন। এ মাসটি ছিল ৩০ দিনের। জুলিয়াস সিজার তার রাজত্বকাল এ মাসটিকে দ্বিতীয় মাস হিসেবে প্রচলন করেন। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারী থেকে দু’দিন কেঁটে নিয়ে ১ দিন জুলাই মাসে ও ১ দিন আগস্ট মাসের সাথে যোগ করেন। ল্যাটিন “ফেব্রুয়া” শব্দের মানে ‘পাপের দণ্ড’। সে সময়কার অপরাধীদের এ মাসে জরিমানা ও বিভিন্ন শাস্তি দিয়ে শুদ্ধ করা হতো। ফলশ্রুতিতে আজকের ফেব্রুয়ারী। রোমানদের যুদ্ধের দেবতার নাম মার্স। প্রাচীন রোমের ক্যালেন্ডারে এই মাস শুরুতে থাকলেও জুলিয়াস সিজার একে তৃতীয় মাস হিসেবে ক্যালেন্ডারে স্থান যোগ করেন। কনস্টাইনটাইনের আমলে এর নামকরন করা হয় মিয়ার্স। আধুনিক ইংরেজী করণে নাম হয় মার্চ। রোমানরা ডাকতো ‘এপ্রেলিস’ নামে। তাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যা ছিল দ্বিতীয় মাস। সম্রাট সিজার একে চতুর্থ মাস হিসেবে প্রচলন করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, গ্রীকদের ভালবাসার দেবী থেকে রোমানদের ‘এপ্রিলিস’ আর তার ইংরেজী করণে এখনকার ‘এপ্রিল’। রোমানদের বসন্ত ও সতেজতার দেবীর নাম ছিল মায়া । যার নাম অনুসারে মে মাসের নামকরণ করা হয়। প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে এ মাসটি তৃতীয় মাস হলেও সম্রাট সিজার মে মাসকে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের পঞ্চম মাস হিসেবে প্রচলন করেন। রোমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী বিবাহের পৃষ্টপোষকতার দেবীর নাম জুনো। তার নামানুসারেই জুন মাসের নামকরণ করা হয়। শুরুর দিকে জুন মাস ২৯ দিনে থাকলেও সম্রাট সিজার এর সাথে একদিন যোগ করে ৩০ দিনে করেন। সাথে ষষ্ঠ মাস হিসেবে চালু করেন। সম্রাট জুলিয়াস সিজার জুলাইতে জন্ম গ্রহণ করেন। তার সম্মানার্থে রোমানরা এ মাসের নাম রাখে জুলাই। তার রাজত্বকালেই ৩১ দিন ধরে এ মাসটি সপ্তম মাসে হিসেবে ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয়। সম্রাট অগাষ্টাস খ্রিষ্টপূর্ব ৩৬ অব্দে রোমের তিনাই শাসন পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। সেসময়কার গৃহযুদ্ধ মিটিয়ে রোমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এরই ফলশ্রুতিতে তার সম্মানার্থে এ মাসের নামকরণ হয় অগাষ্টাস। পরবর্তীতে রোমান সিনেটে অগাস্ট হিসেবে গৃহীত হয়। ইংরেজী করণেও যা অপরিবর্তিত রাখা হয়। ল্যাটিন শব্দ ‘সেপটেম’ অর্থ সপ্তম। শুরুরদিকে রোমান ক্যালেন্ডারে এ মাসটি সপ্তম মাস হিসেবেই ছিল। সম্রাট সিজার সেপ্টেম্বর মাসকে তার ক্যালেন্ডারে নবম মাস হিসেবে প্রচলন করলেও নাম পরিবর্তন করেননি। আর এর ইংরেজী করণে বলা হয় সেপ্টেমবার। ল্যাটিন শব্দ ‘অকটম’ থেকে আজকের অক্টোবর। রোমান ক্যালেন্ডারে মাসটি অষ্টম স্থানে ছিল। জুলিয়াস সিজার দশম মাস হিসেবে প্রবর্তন করেন। ইংরেজী করণে বলা হয় অক্টোবার। ল্যাটিন শব্দ ‘নভেম’ অর্থ নবম। প্রথমদিকের প্রচলিত ক্যালেন্ডারে এ মাসটি নবম স্থানেই ছিল। সে সময় টাইবারিয়াস সিজার রোমের ১১তম সম্রাট ছিলেন। পরবর্তীতে তার সম্মানার্থে এ মাসের নামকরণ না করা হলেও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ১১তম মাস হিসেবে প্রচলিত করা হয়। রোমান ক্যালেন্ডারের দশম মাস হিসেবে প্রচলন ছিল ডিসেম্বরের। তখন এ মাসটি ছিল ২৯ দিনে। ল্যাটিন শব্দ ‘ডিসেম’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ দশ। জুলিয়াস সিজার এ মাসের সাথে ২ দিন যোগ করারর পাশাপাশি ১২তম মাস হিসেবে ক্যালেন্ডারে যোগ করেন।
আনুষ্ঠানিকভাবে নিউ ইয়ার পালন শুরু হয় ১৯ শতক থেকে। নতুন বছরের আগের দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর হচ্ছে নিউ ইয়ার ইভ। এদিন নতুন বছরের আগমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। ইংরেজি নতুন বছরকে ঘিরে বাংলাদেশেও উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করে।
এদিকে ইংরেজি নতুন বর্ষ পালনে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন ইসরায়েল, দেশটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করলেও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। আবার কিছু দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণই করেনি। যেমন সৌদি আরব, নেপাল, ইরান, ইথিওপিয়া ও আফগানিস্তান। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না।
ফ্রান্সের কান্ট্রি সাইডের অধিবাসীরা নতুন বছরের ভবিষ্যত হিসেবে মনে করে সে রাতের আবহাওয়াকে। তাদের মতে আগত বছরের প্রাপ্তি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয় বায়ু। বাতাসেরর গতিবিধির উপর নির্ভর করে সে বছরের শস্য ফলনসহ অধিবাসীদের ভাগ্য। কানাডা, রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড সহ অনেক দেশেই থার্টি ফার্স্ট নাইটে মানুষ ছুটে যায় সমুদ্রসৈকতে। আয়োজন করা হয় ‘পোলার বিয়ার প্লাঞ্জেস’। পশ্চিমের এ উৎসবকে স্বাগত জানিয়েছে আমাদের দেশও। পহেলা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ হিসেবে পালনের পাশাপাশি নানা আয়োজনে পালন করা হয় ইংরেজী নববর্ষও।
অতীত পেছনে ফেলে এসে গেলো নতুন বছর। নতুন বছরে সকলের কাছে প্রত্যাশা, আসুন পুরনো বছরের হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা সব ভুলে গিয়ে নতুন বছরে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলি। পুরনো বছরের পাপগুলো মনে মনে হিসেব করে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাই। আর নতুন বছরটিতে পুরনো পাপগুলো পুণরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করি। মনে রাখবেন সংকল্পই আমার মাঝে পরিবর্তন আনবে।

x