ইঁদুর

ফারজানা রহমান শিমু

মঙ্গলবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ
17

ঢক ঢক করে গ্লাসের পানি শেষ করে তৃষ্ণা মেটায় আলতাফ। আহ্‌! বুকটা জুড়িয়ে যায়। প্রতিদিন এই সময়টায় বুক আর পেট কেমন খাঁ খাঁ করে। সেই ভোরবেলা রিকশা নিয়ে যখন বের হয়, পাণ্ডার নেশায় বড্ড ক্লান্ত লাগে। কেবলি হাই উঠে আর ঘুম আসতে চায়। বেলা পর্যন্ত ঘুমানো কি আর দিন মজুরদের পোষায়? হাজারো ক্লান্তি নিয়েও কয়েকটি স্কুলে বাচ্চা পৌঁছে দেয় সে। বড়ই মায়া লাগে তার। ফুটফুটে বাচ্চাগুলো আধো ঘুমে চোখ ডলে ডলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কেউ কান্নাও করে। বিরক্ত বাবা-মা দু’চারটা থাপ্পড়ও বসিয়ে দেয়। ওদের দেখে দেখে মেয়ের মুখটা মনে পড়ে তার।
পলাশপুর গ্রামে এক গৃহস্থ পরিবারে আলতাফের জন্ম। কয়েক পুরুষ আগে ওখানকার মির্জাবাড়িতে আলতাফ মির্জা নামে দশাসই এক জোয়ান ছিল। তার হুংকারে নাকি বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেত। তাই আলতাফের দাদা বড়ই সাধ করে নাতির নাম রেখেছে আলতাফ হোসেন। বিত্তবান না হলেও দিনকাল ভালই চলে যেত। আলতাফের শৈশবে অভাবের কোন ছাপ পড়ে নি কোনদিন। খেলার সাথীদের সাথে মিলে কত না দুষ্টুমি আর মজা করেছে সে। হায়রে সোনালী দিন! সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছে সে। তারপর পদ্মার ভাঙন কেড়ে নিয়ে যায় তার সবকিছু। দাদাতো আগেই গিয়েছিল। বাপের বুকে বাসা বেঁধেছিল রোগ। ঘুমের মধ্যেই চলে গেল বাপ। এরপর পদ্মা যখন থাবা মেরে ভিটেও কেড়ে নিল, লায়লা বেগম ছেলের হাত ধরে শহরে এলো।
রঙিন চাটগাঁ শহরে কত কষ্টই না করেছে আলতাফ! পেটের দায়ে স্টেশনে পড়ে থাকত, পচাবাসি খাবার খেত। রাত বিরেতে নানা কিসিমের মানুষ তার মাকে টানাটানি করত। ভয়ে কলজে শুকিয়ে যেত আলতাফের। মাঝে মাঝে আঁচল টেনে ধরে বলত, ‘মা, চল ফিরে যাই’।
মা তাকে সাহস দিয়ে বলত, ‘না বাবা। ফিরে গিয়ে কি খাব? তুই একটু কষ্ট কর, দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে’। কোন কোন রাতে হাত বাড়িয়ে মা’কে পেত না পাশে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকত। এই শহরে টিকে থাকার জন্য কত মা যে নিজেকে হারিয়েছে! এসব ভাবলে আলতাফের মনটা বিষিয়ে উঠে।
মাত্র চার বছরের মাথায় প্রবল জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে মাও চলে গেল অন্য পাড়ে। এত বড় পৃথিবীতে পড়ে রইল আলতাফ। পড়াশোনা কিছুটা ছিল বলে আর মাথাটা সাফ ছিল বলে দু’চার জায়গায় ঠোক্কর খেয়েও শেষ পর্যন্ত টিকে গিয়েছিল আলতাফ। কখনো কুলির কাজ, কখনো হোটেলে বাসনপত্র মাজা, আবার কখনও বা ধনী মহিলাদের বাজারের ব্যাগ বয়ে আনা. . . কত জাতের কাজই না করেছে! আর আপন মনে শুধু ভেবেছে ‘একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে’।
সেদিন ছিল রবিবার। কাজীর দেউড়ি বাজারের মুখেই দাঁড়িয়েছিল আলতাফ। হঠাৎ ঘটে গেল অঘটন। প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসা কারটি এক রিকশাকে ধাক্কা মেরে চলে গেল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল রিকশাওয়ালা। বাপের বয়সি মানুষটাকে তুলে বসিয়ে দিল আলতাফ। সেবা শুশ্রূষা পেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটি আলতাফকে আপন করে নিল। জীবনের মোড় ঘুরে গেল আলতাফের। ফরিদ মিয়াকে চাচা বলে ডাকতে লাগল সে। চাটগাঁ শহরে চাচা-ভাইপো গড়ে তুলল এক নতুন সংসার। এরপর বউ এলো, ফুটফুটে একটি মেয়েও হল। আদর করে মেয়ের নাম দিল শিউলি। চারজনের এই সংসারে বিত্ত না থাকলেও শান্তির অভাব নেই।
ভোর বেলা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে আলতাফ। স্কুলের বাচ্চাগুলোকে পৌঁছে দেয়ার পর কয়েকজন যাত্রীকে অফিসে দিয়ে বেলা এগারটায় সে সিআরবি’র দিকে চলে যায়। মোড়ের টং দোকানে চা বিস্কুট খেয়ে সে ছায়া ঢাকা একটি জায়গায় রিকশা দাঁড় করায়। এরপর নিজের সিটে পা তুলে দিয়ে খানিকক্ষণ ঝিমিয়ে নেয়।
নিত্যদিনের মত সেদিনও ঢুলছিল আলতাফ। হঠাৎ প্রচণ্ড চেঁচামেচি তাকে সজাগ করে তোলে। চোখ খুলেই সে দেখতে পায় পাঁচটি ছেলে জাপটে ধরেছে তাদেরই সমবয়সী একজনকে আর প্রাণপণে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছে সে। আলতাফের ভেতরটা ছটফট করতে থাকে। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখতে পায় কে যেন ছুরি চালিয়ে দিয়েছে ছেলেটার গলায়। গল গল করে রক্ত বেরুতে শুরু করে। আর তার শরীরটা ধপাস করে পড়ে যায় মাটিতে। কেবল খোলা চোখ জোড়া নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে আলতাফের দিকে। হিম হয়ে যায় আলতাফ। পরক্ষণে নিজেকে স্থির করে নেয়। চোখ দুটো বন্ধ করে ঝিমানোর ভাব করে। ভয় হয়, বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দটা কেউ শুনে না ফেলে। অকথ্য ভাষায় খিস্তি খেউর করে ছেলেগুলো অবলীলায় চলে যায় চোখের আড়ালে। চোখ খুলে আলতাফ দেখতে পায়, রক্তের পুকুরে পড়ে থাকা ছেলেটার সামনে গাড়ির গতি কমিয়ে কে যেন ছবি তুলছে। এরপর দুটো বাইক আসে। আরোহীরা বাইক থামিয়ে ভিডিও করে। অসার আলতাফের মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। এরপর একটা সিএনজি থেকে বয়স্ক একজন মানুষ নেমে আসে। ড্রাইভারকে কি যেন বলে। এইবার এগিয়ে যায় আলতাফ। কিন্তু ততক্ষণে ওরা ছেলেটিকে সিএনজিতে তুলে নেয়। বিশ্রী স্বাদে তেতো হয়ে যায় আলতাফের মুখের ভেতরটা।
সিআরবি থেকে বেরিয়ে সে কাজীর দেউড়ি বাজারের সামনে এসে দাঁড়ায়। ঠিক এখানে একদিন চাচাকে তুলে বসাতে একটুও বুক কাঁপেনি তার। তবে আজ কেন, কিসের ভয়ে সে চোখ বন্ধ করে থাকল? সংসারের জন্য না শিউলির জন্য? যদি শিউলি মেয়ে না হয়ে ছেলে হত আর তাকেই কেউ . . . না, না এসব ভাবতে চায় না আলতাফ। মেয়ে তার হাইস্কুলে পড়ে। একদিন বড় হবে, বিয়ে হবে তার। আলতাফ রিকশাটা সরিয়ে নেয় ওখান থেকে। এক কিশোরী ডাক দিয়ে বলে, ‘এ্যাই রিকশা, চকবাজার যাবে’?
দু’চারটে ভাড়া নিয়ে এদিক ওদিক যায় আলতাফ। এরপর মেয়ের জন্য ফুচকা কিনে ঘরে চলে যায়। স্কুল-কলেজের মেয়েরা কত মজা করে ফুচকা খায়! শিউলিও ভালবাসে, তাই মাঝে মধ্যে নিয়ে যায় আলতাফ। ঘরে ঢুকেই ডাক দেয় সে-‘শিউলিরে, দেখ্‌, তোর জন্য কি এনেছি’। মেয়ে পাল্টা জবাব দেয়, ‘বাবা, তুমি এদিকে এসে দেখ কি হয়েছে’। ফুচকা রেখে ভেতরের রুমে উঁকি দিয়ে আলতাফ দেখে কুটি কুটি করে কাটা এক গাদা কাগজ। মেয়ের চেহারায় চরম বিরক্তি। আলতাফ বলে উঠল, ‘ইঁদুর ঢুকল কেমন করে’? মেয়ে জবাব দিল, ‘জানি না বাবা, কিন্তু আমার পুরনো খাতাগুলো সব কেটে ফেলেছে। এখন অঙ্কগুলো কোথায় পাবো’? আলতাফ শিউলির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘কি করবি, বল্‌। ইঁদুরের কাজ ইঁদুর করেছে’। শিউলি মরিয়া হয়ে বলে, ‘আমাদের কাজ আমরা করব। বিষ দেব, বাবা, নইলে সব কেটে শেষ করে ফেলবে’।
আলতাফের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। কাটা কাগজগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। আজ যদি সে এগিয়ে যেত, বাধা দিত, প্রতিবাদ করত, হয়ত . . . নিষ্প্রাণ এক জোড়া চোখ তার বুকের ভেতরটাকে কূট কূট, কূট কূট করে কাটতে থাকে।

x