আ থাউজেন্ড স্প্লেনডিড সানস খালেদ হোসেইনি

ফারজানা শারমীন সুরভি

মঙ্গলবার , ২০ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
46


খুব কম লেখক তাঁর প্রথম জনপ্রিয় উপন্যাস প্রকাশের পরের আকাশচুম্বী প্রত্যাশাকে অতিক্রম করতে পারেন। খালেদ হোসেইনি ব্যতিক্রম। ‘আ থাউজেন্ড স্প্লেনডিড সানস’ অতিক্রম করেছে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য কাইট রানার’কে।
‘দ্য কাইট রানার’ ছিল পিতা-পুত্রের গল্প। আর ‘আ থাউজেন্ড স্প্লেনডিড সানস’ ১৯৯৬ সালের তালেবান শাসন পরবর্তী আফগানিস্তানে নারীর পৃথিবী ভেঙ্গে পড়ার গল্প।
সত্তরের দশকের প্রেক্ষাপট থেকে উপন্যাসের শুরু। গল্পের প্রধান চরিত্র- মরিয়ম এবং লায়লা। আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চলে সত্তরের দশকে বড় হওয়া ‘অবৈধ’ সন্তান মরিয়ম পিতার জন্য কাঁদে। পিতার বৈধ সন্তানদের মতো স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর ভাগ্য নির্ধারণ করে। ডানা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে মরিয়ম একটা জীবন কাটিয়ে দেয়। কখনো তার পিতার ফেলে দেয়া অবহেলার পুতুল হয়ে। কখনো স্বামী রশিদের হাতে মার খেতে খেতে মরে যেতে যেতে। মরিয়ম সন্ধান পায় না ভালোবাসার। না পিতা। না মাতা। না স্বামী। না সন্তান। মরিয়ম শুধু বেঁচে থাকে। মাথা নিচু করে।
লায়লা উপন্যাসের আরেকটি প্রধান চরিত্র। আফগানিস্তানে স্বৈরশাসককে উৎখাত করে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসে ১৯৭৮ সালে। সেসময় কাবুলে শিক্ষক পিতার আধুনিক শিক্ষায় বড় হয় লায়লা। কমিউনিস্ট শাসনামলের সব গুম-হত্যা-অন্যায়ের পরেও কাবুলে নারীরা স্বাধীন ছিল। আফগান গ্রামাঞ্চলের নারীরা হয়তো তালেবান শাসনের পূর্ববর্তী কিংবা পরবর্তী কোন সময়েই নিজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পায়নি। কিন্তু কাবুলে তবু নারীরা মাথা উঁচু করে রাষ্ট্র ও সমাজে বেঁচে ছিল। সেই মুক্ত সময় ভেঙ্গে টুকরা হয়ে যায় ১৯৯৬ সালে তালিবানদের ক্ষমতা দখলের পরে। ক্ষমতার পালা বদলে শেষ পর্যন্ত সমাজের দুই স্তরের দুইজন নারী লায়লা আর মরিয়মের জীবন এক হয়ে যায়। তারা যাপন করে দাসের বন্দী জীবন।
নারীরা তালিবান রাষ্ট্রে বেঁচে থাকে দম বন্ধ করে। ‘মাহরাম’ ছাড়া তারা বাইরে যেতে পারে না। স্বামী-পিতা-পুত্র যদি চার দেয়ালের মধ্যে নারীকে খুন করে, রাষ্ট্র খুনীর পিঠ চাপড়ে দেয়। কালো বোরখায় তাদের মুখ ঢেকে রাখতে হয়। বন্ধ হয়ে যায় কন্যা শিশুদের স্কুল। সন্তান জন্মের সময় নারীরা পায় না চিকিৎসার অধিকার। ফতোয়ার পাথর কিংবা শিরচ্ছেদ একমাত্র নিয়তি। সেই অবরুদ্ধ সময় মরিয়ম আর লায়লাকে রূপান্তর করে মাতা ও কন্যায়। তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। মরিয়ম শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার সন্ধান পায়। লায়লার স্বাধীনতার জন্য মরিয়ম তালিবানদের খড়গে মাথা পেতে দেয়।
এই বই সম্পর্কে একটি স্মৃতি আমার সবসময় মনে থাকবে। মিনেসোটার এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছি। আলাস্কার ফ্লাইটের জন্য। এই হট্টগোলের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি ‘আ থাউজেন্ড স্প্লেনডিড সানস’ উপন্যাসের শেষ একশ পৃষ্ঠা। প্লেন টেক অফ করে। এয়ারহোস্টেস মুভি দেখার জন্য হেডফোন নিয়ে আসে। আমি উপন্যাসে চোখ রেখে উত্তর দেই, ‘নো! থ্যাঙ্কস’। বইয়ে এমনি বুঁদ! বই পড়া শেষ হয়ে যায় কিছুক্ষণ পরে। আমি তখনো প্লেনে। পাশে দুইজন সহযাত্রী। আমি স্থান-কাল ভুলে কাঁদতে শুরু করি। অনেক কষ্টে ফোঁপানি আটকে রাখি। চোখ বন্ধ করে অনুভব করি মরিয়মকে। ‘এঙকিউজ মি’ বলে ল্যাভেটরিতে যেতে হয়। চোখের পানিতে ভেজা কাজল মুছতে।
‘আ থাউজেন্ড স্প্লেনডিড সানস’ আমার আত্মাকে স্পর্শ করেছে।

x