আসলাম ও বি আই সিদ্দিকীর সাথে মনোনয়ন প্রত্যাশী আরো তিনজন

নির্বাচনী ট্রেনে ।। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড)

মোরশেদ তালুকদার ও লিটন কুমার চৌধুরী

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
461

চট্টগ্রাম-৪ আসনে (সীতাকুণ্ড, পাহাড়তলী-আকবর শাহ আংশিক) বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব লায়ন আসলাম চৌধুরীই দলের একক প্রার্থী হবেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে-এমনটাই বিশ্বাস করেন দলটির তৃণমূলের কর্মীরা। কেন্দ্রের পরিকল্পনাও তেমন। তবে তার বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ ও ‘ঋণ খেলাপি’র অভিযোগে মামলা আছে। ফলে দল চাইলেও শেষ পর্যন্ত আইনি জটিলতা তার প্রার্থী হওয়ায় বাধা হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ.ওয়াই.বি আই সিদ্দিকীর কথাই ভাবছে বিএনপি।
সীতাকুণ্ডের পরিচিত আছে চট্টগ্রাম শহরের প্রবেশদ্বার হিসেবে। নগরীর সীমানার সঙ্গে যুক্ত এ উপজেলা। তবে নির্বাচনী আসন বিন্যাসে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড আসনটির অর্ন্তভুক্ত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৩৮ কিলোমিটার অংশ এই আসনের অর্ন্তভুক্ত। বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষায়, ‘তাদের দল ঘোষিত আন্দোলন-কর্মসূচিকে সফল করতে সীতাকুণ্ডের অংশটি অধিক গুরুত্বের।’ অবশ্য গত ১০ বছর ধরে আসনটির প্রতিনিধিত্ব করছে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ সর্বশেষ দু’টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই এখানে বিজয়ী হয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপি’র সাংগঠনিক অবস্থান কিছুটা দুর্বল সেখানে। ওই জায়গা থেকে দলটির নেতাকর্মীরা, এ আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চান। তাই তাদের দাবি, তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয়া হোক সেখানে। এদিকে আসলাম চৌধুরী ও এ.ওয়াই.বি আই সিদ্দিকীর যে কোন একজনকে দলের প্রার্থী করার কথা ভাবলেও বিএনপি’র আরো কয়েকজন নেতা দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। এরা হচ্ছেন, সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নাজমুন নাহার নেলী, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র যুগ্ম সম্পাদক আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেল। এছাড়া বিএনপি থেকে ‘বহিষ্কৃত’ সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা এ.কে.এম আবু তাহের বিএসসিও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান।
লায়ন আসলাম চৌধুরী : ২০১৬ সালের ১৫ মে গ্রেপ্তার হয়ে এখনো কারাগারে আছেন লায়ন আসলাম চৌধুরী। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার উৎখাতে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। অবশ্য এ অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে আসছেন তার অনুসারীরা। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম-৪ আসনে তাকেই বিএনপি’র একক প্রার্থী বলছেন তারা।
উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আসলাম চৌধুরীর বিকল্প কেউ নেই। তিনিই বিএনপি’র একক প্রার্থী। আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। সীতাকুণ্ড বিএনপিতে কোন বিভক্তি নেই। এবং সবাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, আসলাম চৌধুরীই নির্বাচন করবেন ও বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।’ আসলাম চৌধুরীর বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মামলা আছে। এগুলো নির্বাচনের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। জামিন না পেলে কারাগার থেকেই নির্বাচন করবেন ।’
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক তোফাজ্জল আহমেদ বলেন, ‘২০১৩ ও ২০১৪ সালে আন্দোলন-কর্মসূচিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন আসলাম চৌধুরী। সীতাকুণ্ড আসনে তিনিই একমাত্র বিএনপির প্রার্থী। তার কোনো বিকল্প নেই।’ একই বক্তব্য উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জহুরেরও। তিনি বলেন, আসলাম চৌধুরীর পক্ষে কাজ করার জন্য উপজেলা বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আন্দোলন-সংগ্রামে পুরো দেশে আসলাম চৌধুরী এক নম্বর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। সীতাকুণ্ডে এখনো তার বিকল্প নেই।’
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন আসলাম চৌধুরী। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে জিয়া পরিষদ চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সভাপতি এবং উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য হন। মূলত এরপর থেকেই সীতাকুণ্ডে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি। ২০০৮ সালে মনোনয়ন পান দলের। এরপর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মনোনীত হন এবং দলের হাইকমান্ড জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পদ পান। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়কও হন তিনি।
এ.ওয়াই.বি আই সিদ্দিকী :
এ.ওয়াই.বি আই সিদ্দিকী সাবেক মন্ত্রী ও সাংসদ প্রয়াত এল কে সিদ্দিকীর ছোট ভাই। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশের মহাপরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন এ.ওয়াই.বি আই সিদ্দিকী। আগামী সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন চাইবেন তিনি। ঢাকায় অবস্থান করলেও গ্রামের বাড়িতে এসে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন তিনি।
দৈনিক আজাদীকে তিনি বলেন, ‘যতদূর জানি এ আসনে এখনো আসলাম চৌধুরীকেই বিএনপির প্রার্থী করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি যদি নির্বাচন না করেন, তখন দলের কাছে মনোনয়ন চাইব।’
অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র এক নেতা বলেন, ‘বিভিন্ন সংসদীয় আসনে সাবেক কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে দলীয় মনোনয়ন দিবে বিএনপি। ফলে এ.ওয়াই.বি আই সিদ্দিকীর মনোননয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছেই।’
নাজমুন নাহার নেলী :
দলে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নাজমুন নাহার নেলী। তিনি বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের পরে দলের দুঃসময়ে আমি উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদ বিপুল ভোটে নেত্রীকে উপহার দিয়েছিলাম। ফলে এলাকার জনগণ এবং দলের কাছে আমার অবস্থান সুদৃঢ়।’
নাজমুন নাহার নেলীর ঘনিষ্টরা জানান, ‘মামলাজনিত কারণে আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে না পারলে তিনি এ আসনের শক্তিশালী প্রার্থী। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।’
আহমেদুল আলম রাসেল :
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেলও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে আসছি। তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। দল যদি মনোনয়ন দেয় নির্বাচন করবো। যদি আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয় তখন তার জন্য কাজ করবো।’
প্রসঙ্গত, ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেল। ১৯৮৯ সালে মহসিন কলেজে ছাত্রদলের যুগ্ম-আহবায়ক, ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম আইন কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি, ২০০২ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও ২০০৬ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
একেএম আবু তাহের বিএসসি :
দল থেকে ‘বহিষ্কৃত’ হলেও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি একেএম আবু তাহের বিএসসি। ‘বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘দলের মনোনয়ন চাইবো। নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে আমিও নির্বাচন করতে প্রস্তুত আছি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে আমার।’ তিনি বলেন, ‘সীতাকুণ্ড বিএনপি একক ব্যক্তির আধিপত্যের মধ্যে চলে গেছে। সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে।’
প্রসঙ্গত, উপজেলা বিএনপিতে একসময় একেএম আবু তাহের বিএসসি’র প্রভাব ছিল। কিন্তু সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মরহুম এল. কে সিদ্দিকী সংসদ সদস্য হলে দলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে দল থেকে বহিস্কার হন তিনি। এরপর থেকে সাংগঠনিক কর্মসূচিতে দেখা যেত না তাকে।

x