আষাঢ়ী পূর্ণিমা

শতদল বড়ুয়া

মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
141

আজ শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্যে এক স্মরণীয় দিন। বৌদ্ধরা আজ দিন ব্যাপী ধর্মীয় কাজে ব্যস্ত সময় কাটাবে। কাল থেকে শুরু হবে তিনমাসব্যাপী বর্ষাব্রত পালন পর্ব। যাকে আমরা বর্ষাবাসও বলি। মহামানব গৌতম বুদ্ধ দেখলেন ভিক্ষুসংঘরা যেখানে সেখানে অবস্থান করে অযথা সময় নষ্ট করছে। ভিক্ষুরা বর্ষাকালে চলাফেরা করতে গিয়ে বিভিন্নস্থানে কৃষকদের জমির ফসল ক্ষতি করায় কৃষকরা ভিক্ষুসংঘদের নিন্দা করতে লাগলো। সে-সময়ে ভিক্ষুরা ভগবানের কাছে গিয়ে বর্ষাকালের সুবিধা-অসুবিধার কথা উত্থাপন করলে ভগবান সেদিন থেকে ভিক্ষুসংঘদের বর্ষাব্রতের অনুমোদন সমর্থন করেছিলেন।
আজকের আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধের যে ঘটনাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সেগুলো হলো- সিদ্ধার্থের মাতৃজঠরে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ, পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের নিকট ধর্মচক্র প্রবর্তন, ঋদ্ধি প্রদর্শন, মাতৃদেবীকে ধর্মোপদেশ প্রদানে তাবতিংস স্বর্গে গমন এবং ভিক্ষুদের বর্ষাব্রত আরম্ভ।
আজকের দিনের কার্যসূচি শুরু হয়েছে ভোররাতে বিহার হতে বিশ্বশান্তি কামনায় বিশেষ সূত্রপাঠের মধ্য দিয়ে। সকাল নয়টা থেকে পঞ্চশীল ও অষ্টশীল প্রার্থনা, বুদ্ধ পূজা এবং সম্মিলিতভাবে বুদ্ধ পূজা উৎসর্গ। শহরকেন্দ্রিক বিহারগুলোতে দায়ক-দায়িকা বেশী হওয়ায় বেশ কয়েকবার প্রার্থনা সভা ও বুদ্ধ পূজা উৎসর্গ করা হয়। গ্রামে একবারই পঞ্চশীল ও অষ্টশীল এবং বুদ্ধ পূজা উৎসর্গ করা হয় বেলা বারোটার পূর্বাহ্নে।
সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা উল্লিখিত ঘটনাগুলো অধিকতর ব্যাপক। আমি সারসংক্ষেপ হিসেবে অতি সামান্যতম অংশ তুলে এনেছি আষাঢ়ী পূর্ণিমার বর্ণনা দীর্ঘায়িত না করে বুদ্ধেরই শিষ্য তথা ভিক্ষুসংঘের বিষয়ে কিছুটা ধারণা দেয়ার প্রয়াসে। যে ব্যক্তি এ ধর্ম বিনয় অপ্রমত্ত সহকারে আচরণ করবে সে জন্ম-জরা-ব্যাধি মরণের পরপারে উত্তীর্ণ হয়ে দুঃখের অন্তসাধন করবে। ভিক্ষুসংঘরা আমাদের ধর্মদেশনার ধর্মদেশনার মাধ্যমে বুদ্ধের অমিয় বাণী শোনান। নিম্ন ভিক্ষুসংঘদের কোন পর্যায়ে কী নামে অভিহিত করা হয়েছে তারই কিঞ্চিত ধারণা পেশ করলাম পাঠক সমীপে।
বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রায় একই রং-এর কাপড় পরিধান করেন। পরিধেয় বস্ত্র একই হলেও ভিক্ষুদের মধ্যে রয়েছে নানা স্তর। প্রাথমিক অবস্থায় যারা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে তাদের ‘শ্রমণ’ নামে অভিহিত করা হয়। একজন বালক কাক তাড়ানোর মতো জ্ঞানের অধিকারী যখন হয় তখন সেই বালক প্রব্রজ্যা গ্রহণের উপযুক্ততা লাভ করে। প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে শ্রমণ হলেই কিন্তু ভিক্ষু জীবন ধারণের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। নিজের উপরই সবকিছু নির্ভর করে তখন থেকে। মন চায়তো একের পর এক ধাপে যাওয়া যাবে নতুবা শ্রমণ জীবন অতিবাহিত করতে তেমন কোনো আপত্তি নেই।
সাধারণ গৃহীরা, বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই নিয়মটা পালন করা বুদ্ধ বিধিবিধানে অবশ্যই করণীয়। কম করে এক সপ্তাহের জন্যে হলেও প্রব্রজ্যা গ্রহণ করা পুরুষদের জন্যে বাধ্যতামূলক। এই হলো সংক্ষেপে ‘শ্রমণের’ পরিচিতি ধর্মীয় আলোকে। এখানে উল্লেখ্য যে, গৃহীদের বয়স গণনা এবং ভিক্ষুদের বয়স গণনায় রয়েছে বিস্তর ফারাক। জন্ম তারিখ ঠিক রেখে বয়স নির্ধারণের রীতি থাকলেও ভিক্ষু জীবনে বয়স গণনায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
একজন ভিক্ষু বয়স ধর্মীয় বিধান হিসেবে তখনই গণনা শুরু হয় যেদিন শ্রমণ থেকে উপসম্পদা গ্রহণ করে ভিক্ষু জীবনে পদার্পণ করে। এই হিসেবে হিসেবে শ্রামণকে প্রাইমারী স্টেজ বলা যেতে পারে। যেদিন থেকে একজন শ্রমণ ভিক্ষু হলেন সেদিন থেকে দীর্ঘ নয় বছরকাল পর্যন্ত এই সময়টুকুকে ‘ভিক্ষু’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ভিক্ষু জীবনের বয়স গণনা করা হয় ‘বর্ষাবাস’ থেকে। ৯০ বছর বয়সের একজন পুরুষ যদি ভিক্ষু জীবন ধারণ করে তাহলে ২০-৩০ বছর বয়সের ছেলে (ভিক্ষু) ৯০ বছর বয়সের ভিক্ষু চেয়ে ধর্মীয় বিধানে বড়। বয়সের দিক দিয়ে তরুণ হলেও ঐ বুড়ো তাকে সম্মান দেখিয়ে চলতে হবে, আগে তাকে আসন দিতে হবে ইত্যাদি। এক থেকে নয় বছর পর্যন্ত কষায় বস্ত্রধারীকে ‘ভিক্ষু’ নামে অভিহিত করা হয়।
১০ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত গৌরিক বসনধারীকে স্থবির বলা হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এ বয়সের ভিক্ষুদের থেরও বলে। থের বা স্থবির বলতে একই পদবি বুঝানো হয়ে থাকে। ধর্মীয় খবর পরিবেশনে ভিক্ষুদের নাম থের, স্থবির, মহাথের, মহাস্থবির, ভিক্ষু, শ্রমণ ইত্যাদি লেখা হয়ে থাকে। আমরা অনেকে এই পদবিগুলোর স্তর বুঝতে পারি না বলে আমার এই প্রয়াস।
২০ বছর থেকে যতোদিন একজন স্থবির ইহজগতে ধর্মীয় সুধা বিলিরত থাকবেন ততোদিন তিনি মহাথের বা মহাস্থবির হিসেবে অভিহিত হন। আমি শুরুতে উল্লেখ করেছি ভিক্ষুদের বয়স গণনা করা হয় ‘বর্ষাবাস’ হিসেবে। ধর্মীয় বিধিবদ্ধ হিসেবে যেই নিয়ম রয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্যে তাহলো কাক তাড়ানো মতো জ্ঞান-বুদ্ধি হলে একজন বালক শ্রমণ হতে পারলেও ভিক্ষু হওয়ার নির্দিষ্ট বয়স হলো বিশ বছর। বিশ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ভিক্ষু তথা উপসম্পদা গ্রহণ করা যাবে না।
আমাদের সমাজে, বিশেষ করে বৌদ্ধ সমাজে কোনো কোনো গৃহী শ্রমণ হয়ে বুদ্ধ অনুশাসনে থেকে ধাপে ধাপে ভিক্ষু, থের বা স্থবির, মহাথের বা মহাস্থবির হয়ে প্রভূত ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করে। ধর্মীয় জ্ঞান লাভের পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান তথা লেখাপড়া করে উচ্চতর ডিগ্রী নেন। সাধারণ গৃহীদের থেকে এ ধরনের ভিক্ষুদের জ্ঞানের পরিধি ব্যাপক। কোনো ভিক্ষু কাপড় ত্যাগ করে সংসারী হলে নানা সমালোচনায় পঞ্চমুখ হই আমরা। এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো- কেন আমরা ঐ ভিক্ষুর সমালোচন করবো ? ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে ভিক্ষু জীবন ত্যাগ করে সংসারী তিনি পরিবারে যেই ধর্মীয় শিক্ষা দিতে পারবেন আমরা সাধারণ গৃহীরা হয়তো ততোটুকু দিতে পারবো না।
সামান্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে- আমরা গৃহীরা শ্রমণ হয়ে খুব কম সময়ের জন্যে বিহারে অবস্থান করি। এখানে উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরুষদের অবশ্যই বিয়ের আগে শ্রমণ হতে হবে। এটা ধর্মীয় বিধান। তাই পরিবারে বাবা-মায়ের প্রধান কর্তব্য ছেলেকে শ্রমণ করানো। বংশপরম্পরায় এ নীতি মহাধুমধামে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়ে আসছে। যেই কথা বলতে চাইলাম, সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে শ্রমণ হয়ে (এক সপ্তাহ) আত্মীয়স্বজনদের বাসায় বা বাড়িতে নিমন্ত্রণে (ফাং) যেতে যেতে সময় শেষ হয়ে যায়, ধর্ম অনুশীলনের সুযোগ তেমন একটা হয়ে ওঠে না। কাপড় ছেড়ে আবার গৃহী হয়ে গেলাম। বৌদ্ধ বিহার তথা মন্দিরে শ্রমণ হয়ে অবস্থান গ্রহণ করে যেই ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করা যাবে তা বিহারের বাইরে গৃহীদের বেলায় হয়ে ওঠে না।
বৌদ্ধ সমাজ অনেক অগ্রগতি লাভ করেছে। এর পেছনে যেই কারণটি সক্রিয় তা হলো- ‘বুদ্ধনীতি’ অনুসরণ। অহিংসা পরম ধর্ম, একথার প্রতিফলন ঘটাতে পারলে হিংসা-বিদ্বেষ সমাজে থাকার কথা নয়। ভিক্ষু সমাজ এব্যাপারে জোরালো ও প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে গৃহীদেরও ‘পার পাওয়ার’ কোনো সুযোগ নেই। ভিক্ষু-গৃহীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে সাম্য-মৈত্রীর সেতুবন্ধন। কারণ আমরা এক-অপরের পরিপূরক।
ধর্মীয় জ্ঞানে প্রকৃত জ্ঞানী হতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যে যার ভালোমন্দের অধিকারী। কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করা চরম অন্যায়ের সামিল। সকলের মঙ্গলময় ও সুন্দর জীবন কামনা করছি। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

x