আলোর রাজা রুবাব

মীর নাজমিন

বুধবার , ১০ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
22

শান্ত দ্বীপটা হঠাৎই অশান্ত হয়ে উঠলো। যে যেদিকে পারছে ্‌ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে। রাজপুত্র রুবাব কিছুতেই বুঝতে পারছে না ওকে দেখে দ্বীপবাসীরা দিগ্‌িবিদিক হারিয়ে এমন করে পালাচ্ছে কেন! কি জোয়ান কি বুড়ো, কি পুরুষ কি মহিলা যে যেদিকে পারছে ছুটছে তো ছুটছেই। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। দ্বীপবাসীদের এই অবস্থা দেখে রাজপুত্র রুবাব অবাক হয়ে ভাবছে, আমাকে দেখা মাত্রই এরা এভাবে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে কেন? এর পেছনে নিশ্চয় কোন কারণ আছে। আমাকেই জানতেই হবে কি সেই কারণ? তৎক্ষণাৎ রাজপুত্র তার সঙ্গে থাকা একজন কর্মচারীকে নির্দেশ দিলো, যেভাবেই পারো এদের একজনকে অন্তত আমার কাছে ধরে নিয়ে আসো। আমি জানতে চাই, আমাকে দেখে এদের পালানোর কারণটা কি? নির্দেশ পাওয়া মাত্রই রাজ কর্মচারী শশব্যস্ত হয়ে দ্বীপবাসীদের খোঁজে দ্বীপের ভেতরে চলে গেলো। এদিকে তাদের আগমণের অপেক্ষায় ঠিক ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে রাজপুত্র রুবাব।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঁচাপাকা দাঁড়ি গোঁফ ওয়ালা মাঝবয়সী একজনকে সাথে নিয়ে ফিরে এলো রাজ কর্মচারী। রাজপুত্রের সামনে এসেই হুজুর আমাদের মাফ করে দিন বলে নতজানু হয়ে মাটিতে বসে পড়ে লোকটা। আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আর মাত্র ক’টা দিন আমাদের সময় দিন। কথা দিচ্ছি এই দ্বীপ আপনাদের ছেড়ে দিয়ে আমরা দূরে কোথাও চলে যাবো। দোহাই লাগে আপনার, আমাদের কোন ক্ষতি করবেন না বলেই মাটিতে বসে পড়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে থাকে লোকটা। রাজপুত্র রুবাব যারপরনাই বিস্মিত হয়ে লোকটার মুখোমুখি হয়ে সেও মাটিতে বসে পড়লেন। তারপর লোকটাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, দ্বীপ ছেড়ে কোথায় যাবেন আপনারা? কি হয়েছে? এমন করে কাঁদছেন কেন আপনি? আমি অভয় দিয়ে বলছি দয়া করে আমাকে সব খুলে বলুন।
রাজপুত্র রুবাবের এমন আন্তরিকতা দেখে লোকটা বলতে থাকে। বেশ কিছুদিন আগের কথা। আপনার মতোই কয়েকজন লোক বেড়াতে আসে এখানে। দ্বীপের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখে তাদের খুব ভালো লাগে। কয়েকদিন ঘুরেফিরে বেড়িয়ে চলে যায় ওরা। কিন্তু তার কয়েকদিন যেতে না যেতেই সদলবলে ওরা আবার দ্বীপে এসে হাজির হয়। বলে, এই জায়গাটা আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে। এখানে আমরা কিছু বড় বড় বাংলো করতে চাই। যতো শীঘ্রই সম্ভব এই জায়গাটা ছেড়ে তোমরা অন্য কোথাও চলে যাও। তাদের এমন হৃদয়হীন কথা শুনে আমরা দ্বীপবাসীরা সবাই মিলে অনেক অনুনয় বিনয় করে ওদের বুঝানোর চেষ্টা করি, থাকার মতো অন্যকোন জায়গা আমাদের নেই। কোথায় যাবো আমরা? কিন্তু ওরা কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে বলে দ্বীপটা নাকি ওরা অনেক টাকায় কিনে নিয়েছে। তাই আমাদের ছেড়ে দিতেই হবে। তা কি লেখা ছিলো ঐ কাগজে? রাজপুত্র জানতে চাইলো। আমরা তো বাবা অন্ধ মানুষ, এতোসব কি আর পড়তে জানি? মূল ভূখণ্ড থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ এটা। শিক্ষার আলো এখানে পৌঁছায়নি। লেখাপড়া জানি না বলেই আমরা অন্ধ। আর অন্ধকে লাঠি দেখানো আর হারিকেন দেখানো তো একই কথা। লোকটার সহজ সরল উত্তর।
আচ্ছা সে না হয় বুঝলাম আপনারা লিখতে পড়তে জানেন না। তারপর বলুন ওরা আর কি কি বলেছে আপনাদের? রাজপুত্র আবার জিজ্ঞেস করে। বৃদ্ধ লোকটা বললেন, কি আর বলবো, বাবা? ওরা আমাদের ছয়মাস সময় দিয়ে গেছে। এরমধ্যে যদি দ্বীপ ছেড়ে চলে না যাই, আমাদের সবাইকে মেরে নাকি সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেবে। এ কথা বলে বৃদ্ধ এবার হাউমাউ করে কাঁন্না করতে লাগলো। বৃদ্ধের পিঠে মমতার পরশ বুলিয়ে দিয়ে রাজপুত্র রুবাব বললেন, আমি এসে গেছি ওরা কিছু করতে পারবে না তোমাদের। বৃদ্ধ এবার অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, কিন্তু তুমি কে বাবা? তোমাকে তো চিনলাম না। তখন রাজপুত্র বলতে থাকেন, আমি রূপনগরের রাজপুত্র রুবাব। ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রাজ্য থেকে বের হয়েছি। ভয় পাবেন না আপনারা। ছয়মাস তো অনেক সময়। এর মধ্যেই আমি নিরক্ষরতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন এই দ্বীপে স্বাক্ষরতার আলো জ্বালাবো। আপনারা পড়তে পারবেন, বুঝতে পারবেন, জানতে পারবেন কি লেখা আছে ঐ কাগজে? অবশ্যই আপনারা সকলে যদি তাতে সম্মত হন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের কোন একটা ব্যবস্থা না করে এই দ্বীপ ছেড়ে আমি যাবো না। রাজপুত্রের যেই কথা সেই কাজ। দ্বীপবাসীদের অনুমতি নিয়ে দ্বীপের অভ্যন্তরে চমৎকার একটা স্কুল গড়ে তুলেন। রাজ কর্মচারীদের সাথে নিয়ে দ্বীপের সব বয়সী মানুষকে স্বাক্ষরতার আলো বিলাতে শুরু করেন। দ্বীপবাসীদের একান্ত আগ্রহ আর রুবাবের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ছয়মাসের মধ্যেই অক্ষরজ্ঞান অর্জন করে ফেলে দ্বীপবাসী। এখন তারা আগের মতো আর অন্ধ নয়। তারা পড়তে জানে, লিখতে জানে এবং বুঝতেও জানে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল।
ভূমিদস্যুদের দেয়া ছয় মাস পূর্ণ হতেই তারা দ্বীপে এসে উপস্থিত হয়। এবার আর তাদের দেখে ভয়ে কেউ এদিকওদিক না করে সবাই তাদের সামনে এসে এক কাতারে দাঁড়ায়। দৃঢ়ভাবে তারা জানতে চায়, তোমরা কে? কি লেখা আছে সেই কাগজে? ভূমিদস্যুদের একজন কাগজগুলো তাদের দিকে ছুঁড়ে দিতেই গড়গড় করে পরতে থাকে তারা। বুঝতে পারে তাদের এসব কথার কোন ভিত্তি নেই। জোচ্চুরি করে তাদের থাকার জায়গাটা দখল করতে এসেছে তারা। রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠে দ্বীপবাসী সবাই মিলে যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই ভূমিদস্যুদের ওপর। এদিকে নিরক্ষর মূর্খ দ্বীপবাসীদের অক্ষরজ্ঞান দেখে হতবাক হয়ে পড়ে ভূমিদস্যুরা। কিন্তু নিরীহ দ্বীপবাসীরা ফুঁসে উঠেছে তাই উপায়ান্তর না পেয়ে চিরতরে লেজ গুটিয়ে পালায় ভূমিদস্যুদের দল। আর তাতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে দ্বীপবাসীরা। আড়াল থেকে সবকিছু দেখে মনে মনে ভীষণ শান্তি অনুভব করে রাজপুত্র রুবাব। রুবাবের কারণেই দ্বীপবাসীরা বুঝতে পেরেছে, শুধুমাত্র চোখের আলো দিয়ে নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করা যায় না। পৃথিবীকে দেখতে হলে, বাঁচার মতো বাঁচতে হলে চাই স্বাক্ষরতা, চাই অক্ষরজ্ঞান, চাই শিক্ষার আলো। অন্ধকারাচ্ছন্ন এই দ্বীপে সেই নির্মল আলো ছড়িয়ে তাদের অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেছে বলে খুশি হয়ে তারা রাজপুত্র রুবাবকে “আলোর রাজা” উপাধিতে ভূষিত করে। রাজপুত্র তার কথা রেখেছে। রুবাব এর মনটা আনন্দ-খুশিতে ভরে উঠেছে। এবার তার রাজ্যে ফেরার পালা। দ্বীপবাসীরা সবাই মিলে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানায় মাত্র কয়েকদিনে তাদের কাছে প্রাণের চেয়ে প্রিয় হয়ে উঠা “আলোর রাজা রুবাবকে।”

x