আলোচনায় লবিস্ট নিয়োগ ও ফখরুলের সফর

তদবিরের টাকা বিএনপি কোথায় পায়, প্রশ্ন কাদেরের ।। দেশের অবস্থা জানাতে গেছেন মহাসচিব : মওদুদ

ঢাকা ব্যুরো

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:০৫ পূর্বাহ্ণ
68

কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জাতিসংঘ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের সাথে বৈঠক করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। জাতিংঘে তিনি কী মেসেজ দেবেন? আর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সাথেই বা কী ধরনের আলাপআলোচনা করবেন, তা নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে নালিশ করার জন্য জাতিসংঘে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করে সরকারকে চাপ সৃষ্টির জন্য বিএনপি চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মহাসচিবের আমন্ত্রণে সেখানে গেছে বিএনপির প্রতিনিধি দল। নালিশ করতে নয়, বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে বিএনপির প্রতিনিধি দল সেখানে গেছে।

গত মঙ্গলবার রাত পৌনে দুইটায় নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সঙ্গে নিউইয়র্ক গেছেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল। নিউইয়র্কে তাদের সাথে যোগ দিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা বিএনপির সহআন্তর্জাতিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির লন্ডন থেকে নিউইয়র্কে যান। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রোজমেরি এ ডিকার্লোসহ সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। বৈঠকে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অপেক্ষমাণ কয়েকজন বাংলাদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছি। মানবাধিবার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছি। সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে তার রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও অন্যরা আমাদের বক্তব্য শুনেছেন।

মির্জা ফখরুলের জাতিসংঘ সফর প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি আর আন্দোলন করতে পারে না। তাদের এখন নালিশই পুঁঁজি। তাই নালিশ করতেই মির্জা ফখরুল জাতিসংঘে গেছেন।

ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের সমালেচনা করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেন, আমাদের মহাসচিব নালিশ করতে জাতিসংঘে যাননি, তিনি বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে সেখানে গেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে, কোনো কারণ ছাড়াই বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের যে হামলা, মামলা ও গুম করা হচ্ছে, এসব সত্যিকার অবস্থাই তিনি সেখানে তুলে ধরছেন।

গতকাল শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে সরকারকে চাপ দেয়ার জন্য বিএনপি যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কেন লবিস্ট নিয়োগ করা হলো? আমাদের চাপ দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছে। আমাদের শেকড় দুর্বল নয়। আমাদের শেকড় বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের বহু গভীরে। অন্য কারোর চাপে আমরা নতি স্বীকার করব না। আমরা নতি স্বীকার করব বাংলাদেশের মানুষের কাছে।

কাদের বলেন, লবিস্ট নিয়োগের কি আছে? বাংলাদেশ কি পাকিস্তান, সুদান, সোমালিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ সিরিয়া হয়ে গেছে যে লবিস্ট নিয়োগ করতে হবে!

জাতিসংঘে বিএনপি নালিশ করতে গেছে মন্তব্য করে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি আর আন্দোলন করতে পারে না। তাদের এখন নালিশই পুঁজি। তবে যার সঙ্গে বৈঠক করতে গেছে তিনি (জাতিসংঘের মহাসচিব) এখন ঘানায়।

কাদের বলেন, বিএনপি ওয়াশিংটনভিত্তিক লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তবে বাংলাদেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা সুদান, ইরাক, সিরিয়া না। এখানকার সমস্যা আমরা এখানে সমাধান করব। বিএনপির ‘লবিস্ট নিয়োগ করতে’ যে টাকা খরচ হয়েছে তার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বলেন, এত টাকা তারা পায় কোথায়?

এদিকে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, জাতিসংঘের মহাসচিবের আমন্ত্রণে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যাওয়ায় সরকার আতঙ্কিত, ঈর্ষান্বিত ও বিব্রত। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল জাতিসংঘে গেছেন দেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরতে। আর এতেই ক্ষমতাসীন সরকার আতঙ্কিত, ঈর্ষান্বিত ও বিব্রত। আমাদের মহাসচিব ইচ্ছে করে সেখানে যাননি, তাঁকে জাতিসংঘের মহাসচিব আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, এই সরকারের উদ্দেশ্য অত্যন্ত খারাপ। তারা কোনো অবস্থাতেই সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না। আওয়ামী লীগ এখনো মনে করছে, আবারও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একদলীয়ভাবে ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু এটা তাদের দুঃস্বপ্ন, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি এ দেশে আর হবে না।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লবিস্ট ফার্ম (তদবিরকারী প্রতিষ্ঠান) ‘ব্লু স্টার স্ট্র্যাটেজিস’কে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি। এই প্রতিষ্ঠানের হয়ে সাবকনট্রাক্টর হিসেবে কাজ করবে ‘র‌্যাস্কি পার্টনার’ নামের আরেক তদবিরকারী প্রতিষ্ঠান। তদবিরকারীদের আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দুই লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হবে বিএনপিকে।

সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য রয়েছে। তবে কী ধরনের দাবি আদায়ে বা লক্ষ্য অর্জনে বিএনপি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় সে ব্যাপারে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্নাল পলিটিকোতে গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তদবির করার জন্য বিএনপির হয়ে আবদুস সাত্তার ব্লু স্টারের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। চুক্তি অনুযায়ী, ব্লু স্টার গত আগস্ট মাসে ২০ হাজার মার্কিন ডলার পেয়েছে। এ বছরের বাকি চার মাস অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ব্লু স্টার বিএনপির কাছ থেকে মাসে ৩৫ হাজার ডলার করে এক লাখ ৪০ হাজার ডলার পাবে। অর্থাৎ বিএনপির পক্ষে তদবিরের জন্য ব্লু স্টার পাঁচ মাসে পাবে মোট এক লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।

অন্যদিকে ব্লু স্টারের সাবকনট্রাক্টর হিসেবে র‌্যাস্কি পার্টনার আগস্ট মাসে ১০ হাজার মার্কিন ডলার পেয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার করে মোট ৬০ হাজার ডলার পাবে র‌্যাস্কি পার্টনার।

ব্লু স্টার স্ট্র্যাটেজিসের প্রতিষ্ঠাতা দুজনই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সহকারী। তাদের একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ কারেন ট্রামোনটানো এবং অন্যজন প্রধান কার্যক্রম পরিচালনা কর্মকর্তা (সিওও) ক্লিনটনের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী রন ব্রাউনের সহকারী স্যালি পেইন্টার। তারা যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির মনোভাব ও বক্তব্য তুলে ধরবেন।

x