আলবের কামু’র নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে

ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

মঙ্গলবার , ৭ মে, ২০১৯ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
83


আলবের কামু’র জন্ম ১৯১৩ সালে, ফরাসি অধিকৃত আলজেরিয়ায়। তার জন্মভূমি আলজেরিয়াকে বলা হতো ‘ফরাসি আলজেরিয়া।’ তিনি পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। জীবন আসলে কী, এ ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন। নিরর্থকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘দি আউটসাইডার’(১৯৪২), ‘দ্য প্লেগ’(১৯৪৭), ‘দ্য ফল’(১৯৫৬) ইত্যাদি উপন্যাস; ভাবনাবিস্তারি প্রবন্ধ ‘দ্য রেবেল’ (১৯৫১), ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’(১৯৪২); নাটক- ‘ক্যালিগুলা্থ (১৯৩৮), ‘দ্য পজেজসড’(১৯৫৯); গল্পগ্রন্থ- ‘এক্সাইল এন্ড দ্য কিংডম্থ(১৯৫৭)। কামু’র সাহিত্যকৃতির অনন্য দলিল ‘নোটবুকস’। তিনি তাঁর নোটবুকের ১ম খণ্ডে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২, ২য় খণ্ডে ১৯৪২ থেকে ১৯৫১ এবং ৩য় খণ্ডে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন চিন্তা ও উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেছেন।
আলবের কামু স্কুলজীবনে পড়েছেন বাইবেল, কলেজজীবনে অগাস্টিন, কিয়ের্কেগার্ড। তার ওপর কিয়ের্কেগার্ড গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন; শোপেনহাওয়ার ও নিটশেও তার মানস গঠনে ভূমিকা রাখেন, এদের পাঠের ফলেই তার ভেতর গভীর নৈরাশ্যের জন্ম হয়। দেকার্ত, স্পিনোজা, বার্গসনের সঙ্গে স্তাদাল, মেলভিল এবং ফিওদর দস্তয়েভস্কিও কামুকে প্রভাবিত করেন। কামু’র নিরন্তর প্রেরণা হয়ে ওঠেন তারা। ১৯৩৫ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সময়কালের ভেতরেই তিনি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলি লিখে ফেলেন। নোবেল পুরস্কার পান ১৯৫৭্থয়। ১৯৬০-এর ৪ জানুয়ারি, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি।
আলবের কামু তার সময়কে সাহিত্যে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। বিশ শতকের নিরর্থকতা যেন তার আউটসাইডারের মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল। ১৯৪২ সালে ফ্রান্স যখন জার্মানির দখলে, তখন তিনি প্রকাশ করেন তার দার্শনিক প্রবন্ধ ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’ এবং উপন্যাস ‘দি আউটসাইডার’ যার মাধ্যমে তিনি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী সার্কেলের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। সবকিছু যুক্তিপূর্ণ নয়, সর্বত্রই অন্তঃসারশূন্যতা, অনর্থকতা, সমগ্র জীবনই যেন অর্থহীন। জন্ম কিংবা মৃত্যুর মধ্যেও কোনও অর্থ নেই আবার এদের অস্বীকারও করা যায় না। এই হলো কামু’র অ্যাবসার্ডিটি। তার দর্শন। তার লেখায় জীবনের যে অর্থহীনতা ফুটে ওঠে তা আমাদের আমূল কাঁপিয়ে দেয়। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ তার মেয়ে ক্যাথরিন কামু লেখেন- তিনি যা লিখে গেছেন তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন লেখক জে. সি. ব্রিসভেল, তার মৃত্যুর আগের বছর, ১৯৫৯য়। পরবর্তীতে, এটা সহ মোট ৩টি সাক্ষাৎকার গ্রন্থভূক্ত হয় কামু’র- ‘লিরিক্যাল এন্ড ক্রিটিক্যাল এসেজ’ বইটিতে; বইয়ের লেখাগুলি অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন ফিলিপ থডি এবং এলেন ক্যানোরি কেনেডি নিউ ইয়র্কের ভিনটেজ বুকস থেকে বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭০-এ।

একজন লেখক কিছুতেই নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে তার ভেতরের সংশয় প্রকাশ করবেন না। না হলে খুব সহজেই লেখককে বলা : ‘কে আপনাকে সৃষ্টি করতে বাধ্য করেছে?’ আর যদি সংশয়ের ভার নিদারুণ হয়, অবিরাম চলতে থাকে, তাহলে বলা হবে ‘লেখক কেন সে ভার বহন করে চলবেন?’
হ্যাঁ, সংশয়গুলো আমাদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, যা আমরা লেখক বলেই আমাদের মাঝে জন্ম নেয়। কখনোই এ সংশয় নিয়ে কথা বলা যাবে না; তা যা-ই হোক না কেন।
‘উইদারিং হাইটস’ হল অন্যতম মহৎ প্রেমের উপন্যাস, কারণ- এ উপন্যাসের সমাপ্তি হয়েছে ব্যর্থতা আর বিদ্রোহে; আমি আসলে আশাহীন মৃত্যুকেই বোঝাচ্ছি। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র এক অশুভ আত্মা। এমনও প্রেম আছে যা প্রবহমান থাকে কেবলই ব্যর্থতায়, আর এ ব্যর্থতা হল মৃত্যু। একমাত্র নরকেই তা নিরবচ্ছিন্ন থাকে।

অবিরাম বৃষ্টিতে উঁচু বৃক্ষদের অরণ্য লাল হয়ে গেছে। চারণভূমি ঢাকা পড়েছে হলদে পাতার চাদরে। শুকনো মাশরুমের গন্ধ, কাঠের আগুন (জ্বলতে থাকা দেবদারু গাছের কয়লা এমন নিভু নিভু, যেন তারা নরকের হীরা) আর মত্ত বাতাস ঘরের চারপাশে যেন বেদনা ও অনুতাপে চাপা আর্তনাদ করছে। এখন, এখানে কেউ কি চিরচেনা সেই শরৎকাল খুঁজে পাবে? চাষিরা এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পায়ে, ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির বাধা অতিক্রম করে চিরকাল যেভাবে তারা হেঁটেছে।
‘দ্য প্লেগ’-এর আছে বিশেষ এক সামাজিক এবং অধিবিদ্যামূলক অর্থ, সত্তার প্রকৃতি ও জ্ঞান সংক্রান্ত দর্শনের এক বিশেষ উদ্দেশ্য। একেবারে যথার্থরূপে এভাবেই বলা যায়। আউটসাইডারে, এই অর্থ বা অভিপ্রায়ের অস্পষ্টতা কিংবা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান।
পাইন গাছগুলি- হলদে পরাগরেণু আর তাদের সবুজ পাতার উল্লাস!
তিনি একজন বুদ্ধিজীবী? হ্যাঁ।
এবং তাকে কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। বুদ্ধিজীবী এমন এক ব্যক্তি যার মন নিজেই নিজেকে দেখতে থাকে। আমি এই ব্যাপারটা পছন্দ করি, কারণ আমি নিজেই দুটি সত্তাকে ধারণ করছি- আমিই দর্শক আবার সেই আমিই নিজেকে দেখাচ্ছি। ‘তারা কি দুইয়ে মিলে এক হতে পারে না?’ এটা একটা প্রায়োগিক প্রশ্ন। আমাদেরকে অবশ্যই এর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিকে আমি এই দৃষ্টিতেই বুঝে থাকি : কোনোভাবেই আমি আমার সংশয়গুলোকে বহন করতে পারছি না। আমি আমার চোখগুলোকে সবসময় খোলা রাখতে পছন্দ করি।’
সারাটা জীবন ধরে আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বকে একটা নির্দিষ্ট আকার দিতে অবিরাম চেষ্টা করি। যদি আমরা নিজেদেরকে পরিপূর্ণভাবে জেনে যাই, তাহলে মারা যাব।
উন্মাদনা (ম্যাডনেস)। নতুন একটি দিনের শুরুর পক্ষে এক মহৎ বিন্যাস। সূর্য। আকাশ আর অস্থি। ম্যাজিক। জানলায় একটি আঙুল। উদ্দশ্যহীন।
বিপ্লব, গৌরব, মৃত্যু, এবং প্রেম। আমার ভেতরকার সেইসব আলোঅন্ধকার, যাতে ছাপ পড়ে আছে গভীর এক বোধ, এক তীব্র সত্য; সেদিক থেকে আমার কাছে তাদের কী বিশেষ তাৎপর্য আছে? আর সেই ব্যাপারটা, কান্নার সেই প্রবল ধারাস্রোত?
সে বলল, ‘মৃত্যুতেই আমি যার সমস্ত স্বাদকে খুঁজে পেয়েছিলাম।’
প্যারিস; তার সমস্ত আবেগ আর কোমলতা। সেই বিড়াল, শিশু আর লোকজনের সরল ও সাবলীল মনোভাব; আর- রঙের সেই অদ্ভুত ধূসরতা; সেই আকাশ, জল-পাথরের সেই প্রশান্ত প্রদর্শনী।
।।২।।
নভেম্বর ১১, যেন একটি ইঁদুর আটকা পড়েছে ফাঁদে।
নভেম্বরের সকালগুলোয় দেখা যায়, চারপাশের সবকিছু ঢেকে গেছে সাদা তুষারে; যেখানে এক অনিন্দ্য-ঐতিহ্যময় গ্রাম্য মেলার চত্বরকে ফুলপাতা আর লম্বা করে কাটা কাগজের সরু টুকরো দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, তার ঠিক পিছনে, আকাশ ততোধিক উজ্জ্বল হয়ে আছে, সেখানে দীপ্তিময় আলোর স্ফুরণ। দশটার সময়, সূর্য যখন তাপ ছড়াতে শুরু করে, তখন, ঠিক তখনই প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্যাবলী যেন একটু একটু করে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে শুরু করে আচ্ছন্ন করে দেয়া স্ফটিক-স্বচ্ছ কোমল সঙ্গীতের মূর্ছনায়, কেননা তখন বইতে শুরু করে হাওয়া, তাতেই যেন গলতে শুরু করে তুষার। এত সন্তর্পণে তুষারের স্তূপ ভাঙতে শুরু করে যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে গাছগুলি, জমাট হিম এমনভাবে ওপর থেকে গড়াতে গড়াতে নিচে নামতে শুরু করে যে তাদের নেমে আসার তালের সঙ্গে মিশে যায় তুষারে শুভ্র পতঙ্গগুলির টপাটপ পড়তে থাকার প্রায় শুনতে না পাওয়া শব্দ। এখনও ঝরে পড়েনি এমন পাতারা অন্তহীন ঝরছে জমতে থাকা বরফের ভর সামলাতে না পেরে; এবং, মরা মাকড়শার পলকা শরীরের মত মাটিতে তারা এমনভাবে পড়ছে যেন কোনওমতে কেবল স্পর্শটুকুই করতেই তারা নেমেছে! চারপাশের পাহাড় আর উপত্যকাগুলি ধোঁয়াশায় ঢেকে গিয়ে দৃষ্টিসীমা থেকে আবছা আবছা হতে হতে হারিয়ে গেছে। আপনি যদি এই আবছা হয়ে যাওয়া দৃশ্যের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থাকেন, তাহলে বুঝতে পারবেন অবিরাম তুষারপাতে তাদের নিজস্ব রঙ হারিয়ে গেছে। পুরো ভূভাগ যেন হঠাৎ করে বয়োবৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ ভূমি পৃথিবীর বুকের বহুপুরনো একটি দেশ যা মাঝে মাঝে একটিমাত্র ভোরের প্রথম আলোর ভেতর দিয়ে আমাদের কাছে ফিরে ফিরে এসেছে হাজার বছর ধরে… পাহাড়ময় এই ভূমিখণ্ডের সর্বত্র বৃক্ষরাজি আর ফার্ন, তারমাঝে দুইটি নদীর সংযোগের মধ্যভাগ এমন যেন তারা জাহাজের সূচাল অগ্রভাগ। যখনই, সূর্যেও প্রথম রশ্মিগুলি এই অঞ্চলটাকে তুষারহিমের কবল থেকে মুক্ত করে দিতে থাকে, তখন মনে হয় এই পাহাড়জঙ্গল যেন পৃথিবীর মাঝখানের একমাত্র জীবিত কিছু যে বিস্তার করছে শুধু শুভ্রতা আর তা করতেই থাকবে অনাদিকাল ধরে। এখানে, দুটি জলপ্রবাহের সম্মিলিত তরঙ্গস্বর অন্তহীন নীরবতার সঙ্গে যেন যুদ্ধ করছে। নীরবতা তাদের ঘিরে রেখেছে চারপাশ থেকে। কিন্তু একটু একটু করে জলের এই তীব্র স্রোত, এই তরঙ্গরোল নিজেকে এই পুরো অঞ্চলের সঙ্গেই মিশিয়ে দিয়েছে। অসীম নীরবতার মাঝখানে নিজেকে ধীরে ধীরে বিস্তার করা ছাড়া যেন তার আর কোনও উপায় ছিল না। এখন তার প্রয়োজন তিনটি ছাইরঙা কাক, জীবনের চিহ্ন হয়ে আচমকা যারা আকাশের বুকে উড়াল দেবে।
কাফকার সমস্ত সৃষ্টি ঘুমিয়ে থাকে তাকে পুনর্বার পড়বার জন্য আমাদের নিজেদেরকে প্রস্তুত করে নেওয়ার ভেতর। তার বইগুলি যেভাবে শেষ হয়্তকিংবা, যেভাবে শেষ হতে চায় না-বইগুলি অবশ্যই দাবি করে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যার, যা আসলে কখোনই যথাযথভাবে ব্যক্ত করা যাবে না; এবং আমাদেরকে ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে লেখাটিকে পুনরায় পাঠ করতে বাধ্য করে, যাতে গল্পের ভিত্তিটিকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হই। মাঝে মাঝে তার এক একটি বইকে দুই বা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যাখ্যাও করা যেতে পারে এবং ব্যাখ্যা করার জন্য বইগুলোকে দুই থেকে তিনবার পড়তেও হতে পারে। কিন্তু মারাত্মকরকমের ভুল হয়ে যেতে পারে কাফকা্থর লেখাগুলোকে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করতে লেগে গেলে। লেখায় প্রায় সময়ই প্রতীকের ব্যবহার করা হয়, এবং সেই প্রতীকটি প্রায় সময়ই সাধারণ স্তরে বা পর্যায়ে থাকে; একজন শিল্পী প্রতীকটিকে অদ্ভুতভাবে রূপান্তরিত করে ফেলতে পারেন।
অনুবাদের জন্য শব্দ কখনোই অস্তিমান থাকে না, কেবলমাত্র শব্দের সাধারণ চলন থেকেই তার অর্থকে খুঁজে বের করা যায়। শব্দ সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা নিয়ে এক শব্দ থেকে আরেক শব্দের যতটা কাছাকাছি যাওয়া যাবে ততোই আমরা শব্দের ভেতর থেকে শব্দকে বের করে নেবার সুযোগটি পেতে থাকব। এই ব্যাপারটি সমস্ত সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য এক মহৎ সম্মান।
এই উদ্ভট নিরর্থক কিম্ভূতকিমাকার বিশ্বকে কেবল নান্দনিকভাবেই সমর্থন করা যায়।
প্লেগ। দ্বিতীয়বার লেখার পর।
মূলত, বইটির প্রথম ৩টি পর্ব লিখিত হয়েছিল ডায়েরিতে, নোট আকারে। লেখার ভাবনা এসেছিল বিভিন্ন ধর্মোপদেশ আর আলোচনা গ্রন্থ থেকে, আর বইটি কীভাবে লিখিত হবে তা যেন ভেতর থেকে কেউ ঠিক করে দিচ্ছিল। দাবি করছিল গভীর মনোযোগ। বইটিকে বোঝার জন্য কেউ যেন উন্মুখ অপেক্ষা করছিল। শেষপর্বটি বিভিন্ন ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লিখিত হয়েছিল, তাতে একটি সাধারণ উদ্দেশ্য প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। আহ, কী অপার নিঃসঙ্গতার সঙ্গেই না তারা প্রকাশিত হচ্ছিল! প্রত্যেকটি পর্ব চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিবিড় হবার যোগসূত্র তৈরি করছিল আর পাঠককে তৈরি করছিল এমনভাবে, যেখানে ঘটনাবলী ক্রমশই সংগঠিত হচ্ছে এমন এক একীভবনের মাধ্যমে যাতে অনেকগুলো ডায়রিকে একটি ডায়রি করে যৌক্তিক শৃঙ্খল তৈরি করা যায়; এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় ৪র্থ পর্বের দৃশ্যগুলির মাধ্যমে।
প্লেগের মাধ্যমে আমি সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিটাকে বলতে চেয়েছি, যার শিকার আমরা সবাই। যেখানে আমরা সবাই শাস্তি ভোগ করছি, চারপাশে বিরাজমান অরাজকতা; ভয়ভীতি, হুমকি, গুম, হত্যা…এসব থেকে তৈরি হচ্ছে এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির। যেখানে আমরা বাস করতে চাইছি, আমাদেরকে চলে যেতে হচ্ছে সে জায়গা ছেড়ে; আমাদের জন্য যেন অনিবার্য হয়ে পড়েছে-নির্বাসন।
একই সঙ্গে আমি আমাদের অস্তিত্বের সাধারণ ধারণাটিকে বোঝাবার জন্য ব্যাখ্যা দেওয়ারও চেষ্টা করছি।
…কারণ, আকাশ নীল, নদীকূলের বৃক্ষগুলি তুষার-চাদরে ঢাকা; বৃক্ষেরা তাদের শুভ্র ডালপাতা নিয়ে ঝুঁকে পড়েছে হিমে জমে যাওয়া জলের ওপর, যেন জলকে স্পর্শ করতে পারলেই সে তার জীবন ফিরে পাবে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া কাঠবাদামের গাছ।
এ দেশ আমাকে এমন এক দেখার চোখ উপহার দিয়েছে, যাতে বসন্ত ও শীতের ব্যবধান বোঝার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক অপরিবর্তনীয় বিভ্রান্তি!
।।৩।।
মে, ১৯৩৫।
নস্টালজিয়া।
কপর্দকহীন হয়ে জীবনের নির্দিষ্ট কিছু বছর বেঁচে থাকাটাকে, আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় এই কারণে যে, একটি পূর্ণাঙ্গ চেতনাবিশ্ব বা প্রকৃত সংবেদনশীলতা অর্জনের জন্য এই সময়টুকু আসলেই জরুরি।
বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে আমাদের মধ্যে এই অদ্ভুত অনুভূতিটির জন্ম হয়্তজন্মদাত্রীর সমস্ত সংবেদনকে ধারণ করছে তার পুত্র। সন্তানের ভিতরে তার সমস্ত সংবেদন, ছেলেবেলা থেকে বহন করা সেইসব সুপ্ত বস্তুগত স্মৃতিগুলি (আত্মার সঙ্গে তা যেন আঠা দিয়ে লাগানো)।
ধনী লোকেরা সবসময় ভেবে থাকে, আকাশ আসলে তেমন বিশেষ কিছু নয়, না থাকলেও চলে; এ আসলে প্রকৃতির দান। অন্যদিকে, হতচ্ছাড়ারা আকাশ দেখে, যেভাবে তারা সত্যিকার অর্থেই কোনোকিছু দেখে থাকে; তারা মনে কর্তেআকাশ ঈশ্বরের এক অসীম অনুগ্রহ।
যতক্ষণ না মায়ের চোখগুলি আমার ওপর স্থির হয়, আমার চোখের কান্নার জলফোঁটাগুলি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমার পক্ষে কোনোভাবেই তার দিকে তাকানো সম্ভব হয় না।
একটি দোষী বা অপরাধী নীতির দরকার হয় স্বীকারোক্তির। এক একটি শিল্পকর্মও স্বীকারোক্তি।
জীবনের অর্থকে অনুভব করতে হবে। শিল্প হয়ত সব সময় আমাদেরকে তা দেখিয়ে দিবে না। আবার, শিল্প আমার কাছে সব কিছু নয়; তবে, শিল্পকে জীবনসন্ধানী হওয়ার একটি উপায় হতে দেওয়া উচিত।
আজ যা কিছু লেখা হলো তা নিয়ে ভাবলাম। বলতে পেরেছি কি না, ভেবে দেখলাম।
যখনই কেউ কোনও বিশেষ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে যায়, তখন সবকিছু হয়ে পড়ে আরও বেশি জটিল, আরও বেশি দুর্বোধ্য।
অধ্যায়টি শেষ হচ্ছে এই বর্ণনার মধ্যে দিয়ে-
কীভাবে মায়ের প্রতীকী মূল্য অস্তিত্ববান হয়ে উঠেছে তার পুত্রের নস্টালজিয়ার ভেতরে।
আত্মগর্ব বা অন্তঃসারশূন্যতাকে আমরা যে শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারি, তা হল- অভিজ্ঞতা। কোনও ঘটনা কিংবা পরীক্ষার ভিতর দিয়ে না গিয়ে আপনি কখনওই অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন না। আপনার পক্ষে অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করাও অসম্ভব। আমাদেরকে অবশ্যই তার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। ধৈর্য, যথার্থ রূপে বললে, ধৈর্যই অভিজ্ঞতা। ধৈর্য না বলে সহনশীলতাও বলা যায়। আমরা ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করব।
আমাদের অভিজ্ঞতাগুলি!
যখনই আমরা কোনো ঘটনা কিংবা চিন্তার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা লাভ করি, তখন আমরা আসলে বিচক্ষণ বা প্রজ্ঞাবান হই না, হয়ে উঠি দক্ষ। কিন্তু, কেন?
।।৪।।
নভেম্বর, ৪২।
এবারের হেমন্তে, বর্ণিল পাতায় পাতায় চারপাশ ছেয়ে গেছে। চেরি গাছগুলি লাল হয়েছে, ম্যাপল হয়েছে হলদে আর বিচ গাছগুলি যেন ব্রোঞ্জের পোশাকে সজ্জিত। মালভূমি, দ্বিতীয় বসন্তের সহস্র সৌন্দর্যশিখায় ছেয়ে গেছে পুরোপুরি।
যৌবন চলে যাচ্ছে। এ তবে আমি নই যে কি না মানুষ আর অন্য সমস্ত কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে (আমি কখনই তা করতে পারব না)। আসলে সবকিছুই আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। যৌবন আমার কাছ থেকে উড়ে চলে যাচ্ছে আর এটাই হল নিজেকে অসুস্থ ভাববার মোক্ষম উপায়।
একজন লেখকের জন্য একেবারে প্রাথমিক শর্ত হল স্বর পরিবর্তন কিংবা বিভিন্নমাত্রিক ভাবনার স্থানবিন্যাস করার শিল্পকৌশলকে আয়ত্ত করে ফেলা। অন্যারা ঠিক কী অনুভব করতে চাইছে সে সম্পর্কে তার নিজের অনুভূতিটাকে বুঝতে শেখা। এভাবে লেখক সফল হবে। পরবর্তীতে আসবে প্রজ্ঞার প্রশ্নটি এবং ভাবনার সমস্ত স্থান দখল করে নেবে; এভাবে আমাদের প্রজ্ঞা ও প্রতিভা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হয়ে বিরাজ করতে থাকবে।
সেন্ট স্তেফান চার্চ।
আমি জানি খেটে খাওয়া একজন দরিদ্র মানুষের কাছে রবিবার ব্যাপারটা কী; আবার, রবিবার সন্ধ্যার মানে কী তার অর্থও আমি জানি। এখন আমি যদি যা কিছু জানি তার অর্থ বলতে শুরু করি আর তাদের অর্থের এক একটি মূর্তি গড়ে তুলি, তাহলে আমি এক দরিদ্র ব্যক্তির ছুটির দিনটিকে (রবিবার) মানবজাতির কাজের দিন হিসাবেই গড়ে তুলব।
হয়ত লিখিতই আছে, তবু আমার জন্য ব্যাপারটা ভয়ানকরকম বিস্ময়কর : দুনিয়াটা যদি একেবারে সহজ, সরল হত, তাহলে আমাদের কাছে শিল্প বলে কিছুই আর থাকত না, তবে, আমি যদি খুঁজে বের করি যে এই বিশ্বের কোনও একটি তাৎপর্যময় অর্থ আছে, তাহলে আমার পক্ষে আর কিছুই লেখা সম্ভব নয়।
এখানে এমন কিছু বিশেষ পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে বিনয় কিংবা নিরভিমান দাবি করে যে সে থাকবে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে। এই ধারণাটিকে একটি বিশেষ সূত্রের সঙ্গে যুক্ত করলে, খুব সতর্কতার সঙ্গে আমার মনে কিছু ভাবনার জন্ম হবে আর শেষ পর্যন্ত এটা দাঁড়াবে যে আমি কোনোভাবেই জটিলতাটাকে লিখে উঠতে পারব না।
লাগামহীম যৌনতা পৃথিবীর এক অনর্থক দর্শনকে প্রধানরূপে তুলে ধরে। বিপরীতে, কৌমার্য পৃথিবীকে অর্থময়তার দিকে নিয়ে যায়।
কখন, ঠিক কখন আমাদের এই জীবন নিয়তি দ্বারা পরিবর্তিত হয়? যখন আমরা মারা যাই? কিন্তু এটা হল অন্য মানুষের নিয়তি- ইতিহাসের কিংবা একটি পরিবারের। কিন্তু আমাদের সচেতনতা কোথায়? এ হল আমাদের মনের একটি অবস্থা যা নিয়তি হিসেবে আমাদের জীবনের এক ছবি তৈরি করে ফেলে আর এই ছবি তৈরি করে এক ধরণের সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থা, যেখানে আর কারও অস্তিত্ব থাকে না। দুইক্ষেত্রেই আমরা কুহক কিংবা অলীকতা নিয়েই জীবনের মুখোমুখিতে দাঁড়াই। উপসংহার? এখানে কি নিয়তি বলে কিছু আছে?
এই দেশে, শীত অন্যান্য সব রঙ এমনভাবে মুছে দিয়েছে যে মনেই হবে না সাদা ছাড়া আর কিছু আছে, ক্ষীণ শব্দগুলি যেন শুরু থেকেই প্রবল তুষারপাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়েছিল, সব সুগন্ধ যেন আদিকাল থেকেই প্রচণ্ড হিমে জমে গিয়েছিল। বসন্তের প্রথম উন্মাদ হাওয়ায় ঘাসফুলগুলিকে মনে হচ্ছে যেন আনন্দের হল্লা, যেন সংবেদনের ট্রাম্পেট উল্লাসে ফেটে পড়ছে।
আলজেরিয়ায় রাতের বেলা কুকুরের তীব্র ঘেউ ঘেউ ইউরোপের যে কোনও দেশের তুলনায় দশগুণ বেশি শোনা যায়। এই ডাক আমাদের স্মৃতিকাতর করে তুলে। আমাদের আবদ্ধ, স্থবির দেশে আমরা একটি ঘরের জন্য হাহাকার করতে থাকি। আজ এই শূন্যতা আমার ভেতর ভাষার আকার নিচ্ছে। আমি যেন স্মৃতির ভেতর একা একা এই শব্দগুলিকে শুনছি।
একটা প্রশ্ন করি : আপনি কি তীব্র অনুভূতি দিয়ে এই ধারণাগুলিকে ভালবাসেন? এই ধারণা ও চিন্তাগুলি কি আপনাকে জাগাতেও পারে? আপনি কি কখনও অনুভব করতে পেরেছেন যে এই চিন্তা দিয়ে আপনি আপনার জীবনকে একটা মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পেরেছেন? পৃথিবীর বহু গভীর চিন্তাশীল মানুষও একসময় পিছিয়ে পড়েছেন!
সেই মুহূর্তে, যখন তুষারে ঢাকা পড়েছে সবকিছু, তখন দেখছিলাম কীভাবে দরজা-জানালাগুলি নীল হয়ে গেছে!
দারিদ্র্যে বিপন্ন এক ছেলেবেলা। রেইনকোট শরীরের মাপের চেয়েও বড়। সিয়েস্তা। ভিঙ্গা বিয়ারের বোতল। ফুফুর ঘরে, রবিবার। অজস্র বই। দ্য টাউন লাইব্রেরি।
ক্রিসমাসের রাতে নিজের ঘরে ফিরছিলাম। রেস্টুরেন্টের সামনে মৃতদেহ, পড়ে আছে। সেলারে, খেলা চলছে। জিনে, জোসেফ আর ম্যাক্স।
।।৫।।
জানালার বাইরে একটা বাগান, আমি শুধু দেয়ালগুলোকেই দেখছি; গাছের কয়েকটি ডাল যেন আলোক প্রবাহে উচ্ছল হয়ে পড়েছে; আর একটু ওপরে, দেখলাম আরও কিছু ডাল নিজেদের সীমানাকে বিস্তৃত করেছে, আর তাদের মাথার অনেক ওপরে জ্বলে আছে সূর্যটা। বাতাসের বিজয়ী উল্লাস চারপাশটাকে কেমন সজিব করে তুলেছে, মনে হচ্ছে পুরো বিশ্বে যেন এই আলোক-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি শাদা পর্দায় বিম্বিত ডালগুলোর আলোছায়ার খেলা…
দুটি চরিত্র, তাদের একজনের আত্মহত্যা।
যেন ফুলগুলি সূর্যকে তাদের আত্মা দিয়ে ধরে রেখেছে।
ফিয়েসোলে, ইতালি : আমরা অবিরাম লড়াই করছি আর যাতনা সহ্য করছি, আমাদের নিঃসঙ্গতাকে পুনর্বার জয় করবার জন্য। কিন্তু আমরা জানি এমন একদিন আসবে মা-ধরিত্রী তার সেই সরল আর সেই আদিম হাসিটি হেসে উঠবে।
ফিয়েসোলের প্রতিটি স্ট্রিট-কর্নারে তাকে পাবে, যাকে তুমি বুকে টেনে নেবে তাঁর নিঃশ্বাসে তাজা লরেলের ঘ্রাণ।
রোববার।
উত্থাল পার্বত্য হাওয়া আমাদেরকে পেছন থেকে যেন ঝাপটে ধরে, এমনি উন্মাতাল; আর- যেন ঠাট্টা করছিল আমাদের সঙ্গে, চিৎকার করছিল আমাদের কানের কাছে। পুরোটা জঙ্গল যেন উন্মাদ হাওয়ায় টুইস্ট করছে। উপত্যকার ওপরে লাল রঙের ফার্নগুলি পর্বত থেকে পর্বতে উড়ে চলেছে। আর, এ সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে কমলারঙের অপরূপ পাখিটি।
পুরুষ নার্সদের একজন সাংবাদিকদের বলল : ্তুআপনাদের কাগজে এ-সম্পর্কে কিছুই লিখবেন না। সে ইতোমধ্যেই যথেষ্ট যন্ত্রণা ভোগ করে ফেলেছে।্থ
মৃত্যু আর একজন লেখকের কাজ। মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগে তার শেষ লেখাটিও পঠিত হয়ে গেছে। তিনি এবারও বলতে পারেননি যা তার বলার ছিল। লেখাটিকে পুড়িয়ে ফেলতে বললেন তিনি, মারা গেলেন যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে, সহানুভূতিহীন; এবং হৃদয়ে এমন এক ভাঙচুর নিয়ে ঠিক যেন এক ঐকতান ভেঙে যাওয়া সুর।
নৈঃশব্দ্যের আরাধনার এক প্রগাঢ় মুহূর্ত উদযাপিত হচ্ছে। মানুষ নৈঃশব্দ্যে পতিত। কিন্তু মাটিপৃথিবীর বুক থেকে উঠে আসছে যে গান এবং এই আমি- যেন কারাবন্দি হয়ে আছি পর্বতগুহায়, শিকলপরা, কিন্তু আনন্দে পূর্ণ; কেননা, পূর্বে আমারও আকাঙ্ক্ষার সময়-অসময় ছিল। মনে হচ্ছে এখানেই সেই অনন্তকাল সেই চিরন্তনতা আর আমিও যেন তাকে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম। এখন আমি আমার কথাগুলি বলতে পারব। আমি এখনও কিন্তু জানি না কীভাবে আমি স্বয়ং-এর সঙ্গে স্বয়ং-এর ধারাবাহিক উপস্থিতিটুকুর জন্য সময়ের কাছে আমার ইচ্ছাকে প্রকাশ করব। যাকে আমি ঠিক এখনই চাইছি তা সুখ নয়, সচেতনা। একজন ভাবছে সে নিজেই নিজেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে কিন্তু তার জন্য এই দৃশ্যটি দেখাই তো মহাজীবনকে দেখা- জলপাই গাছটি সোনালি ধুলোয় দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে, সোজা; কিংবা সকালবেলার সূর্য ঝলতে শুরু করেছে বেলাভূমিতে আর আমি দেখছি তাদের এক সঙ্গে মিশে যাওয়াটা, যেন তা আমার ভেতরই ঘটছে।
যার জন্য আমি নীতিগতভাবে দায়ি তার সম্ভাবনার জন্য সদা সতর্ক হয়ে আছি। জীবনের প্রতিটি মিনিটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে তার অতিলৌকিক মূল্য, তার চিরতরুণ মুখ।
আমাদের সাহিত্য আর সঙ্গীত নগরবাসীর জন্য তৈরি করা হয়। এইভাবে আমরা দর্শনের ইতিহাসকেও তৈরি করি প্রতিটি চিন্তার সিরিয়াস থিম হিসেবে।
এপ্রিল।
দুটি গদ্য পাঠালাম। ক্যালিগুলা। তেমন তাৎপর্য কোনও লেখা নয়। যথেষ্ট প্রাজ্ঞতাও নেই। আলজিয়ার্সে ছাপা হবে। তারপর- ফিরে যাই দর্শন ও সংস্কৃতিতে, অন্য সবকিছুকে ত্যাগ করে : থিসিস।
নোটবুকে, প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখে চলেছি, দুই বছর ধরে। সময় চলে যাবে। আমাকে আরও কিছু কথা লিখে ফেলতে হবে।
।।৬।।
প্যারিস। বেপরোয়া বৃষ্টি ও বাতাস হেমন্তের পাতাগুলিকে ছড়িয়ে দিয়েছে এভিনিউ জুড়ে, মনে হবে তুমি স্যাঁতস্যাঁতে তামাটে লোমশ চামড়ার ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ।
*
ট্যাক্সি-চালক লোকটা, নিগ্রো, ্তু৫০-এর প্যারিসে এক স্বভাববিরুদ্ধ সৌজন্যতায়, আমাকে নিয়ে যেতে যেতে বলতে থাকে, থিয়েত্রে ফ্রান্সে-কে ঘিয়ে রয়েছে অসংখ্য গাড়ি। সন্ধ্যায়, প্রদর্শিত হচ্ছিল : লা মেইজন দে মলিয়ের; ছবিঘরেরর একটি আসনও খালি নেই।
*
ফকনার। তরুণ প্রজন্মের লেখকদের সম্পর্কে কী ভাবেন? প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন : তারা করে চলেছেন অন্তহীন অনর্থক কাজ। এ প্রসঙ্গে এরচে বেশি আর কী বা বলার আছে। কেউ যদি লিখতেই চায়, লিখতে হলে, আপনাকে অবশ্যই নিজের ভেতরে জেগে ওঠা সেই সত্যগুলোকেই আঁকড়ে ধরতে হবে যে সত্যগুলি আমাদের অন্তর্জগতে, আমাদের শিকড়ে, জন্ম নেয়। আপনার কাজকে সেসব সত্যের একটির দিকে চালিত করতে হবে, কিংবা একটি সত্যের দিকে নয়, আমাদের হৃদয়ের সমস্ত সত্যের দিকে এগিয়ে দিতে হবে, একই সময়ে। সেইসব লেখক, যারা জানেই না কীভাবে আত্মার ঐশ্বর্যের কথা বলতে হয়, যন্ত্রণার কথা বলতে হয়, আলোর কথা বলতে হয়, তারা অন্তঃসারশূন্য লেখক; তাদের লেখার মৃত্যু হয় তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, কখনও তাদের মৃত্যুর আগে লেখা মারা যায়। কিন্তু গ্যোতে আর শেক্সপিয়র তাদের সমস্ত কাজের ভেতর থেকেও দাঁড়িয়ে যান, দাঁড়িয়ে যেতে পারেন, মানুষের হৃদয়ের প্রতি তাদের তীব্র বিশ্বাসের কারণেই। বালজাক আর ফ্লবেয়ারও তেমন, চিরকালের লেখক তারা।
: এই নাস্তিবাদ বা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের কারণটি কী যা সাহিত্যকে আকীর্ণ করে রেখেছে?
: ভয়। মানুষ যখন আর ভয় পাবে না, তাদের ভয়ের দিন শেষ হয়ে যাবে, সেদিনই সে আবার মাস্টারপিস লিখতে পারবে। এমন কাজ করবে, যাকে বলা হবে চিরকালীন।
*
আমার সমস্ত কাজই বিদ্রূপাত্মক।
*
জিদের (আন্দ্রে জিদ) সঙ্গে ডিনার। তাঁর হাতে তরুণ লেখকদের চিঠি, তাতে তাদের জিজ্ঞাসা -তারা কি লেখালেখি চালিয়ে যাবে। জিদের উত্তর -বলো কী? যেখানে নিজেকে লেখালেখি থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে, আর সেখানে কি-না ইতস্তত করছ?
*
উপন্যাসের শেষ : ‘মানুষ হচ্ছে এক ধর্মানুগামী প্রাণি’, সে বলল। সঙ্গে সঙ্গে ক্রুর পৃথিবীতে বৃষ্টি নামল, অপ্রতিরোধ্য।

x