আলফা- একটি অন্তর্লীন মহাযাত্রা

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

মঙ্গলবার , ২৫ জুন, ২০১৯ at ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
17


শুনেছিলাম ইতালির রেনেসাঁ যুগের ভাস্কর্য শিল্পী মিকেলেঞ্জেলো’কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, ‘আপনি পাথর দিয়ে এতো সুন্দর ভাস্কর্য কিভাবে করেন ?’ শিল্পী উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ওটা আসলে পাথরের মধ্যেই থাকে, আমি শুধু তার মধ্য থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো কেটে ফেলে দেই।’ নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু পরিচালিত ‘আলফা’ সামপ্রতিক বাংলাদেশের বাস্তব সময়ের দীর্ঘ গল্প। নির্মাতা শুধু অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বাদ দিয়ে আপনাদের সঙ্গীত, শিল্প আর কাব্যময়তার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের অন্তিম দর্শনকে উপস্থাপন করেছেন।
একটি চলচ্চিত্র দর্শক হিসেবে মূলত তিনভাবে অনুধাবন করে থাকি প্রথমত ইন্টেলিজেন্স অর্থাৎ বুদ্ধিমত্তা, এরপর ইন্টেলেক্ট মানে চিন্তা এবং তারপর ইমোশন বা আবেগ। যেকোনো চলচ্চিত্র বিচার করতে গেলেও আমাদের কোন না কোন ভাবে এই তিন প্রক্রিয়াকে চলচ্চিত্রের বিষয়, আঙ্গিক, দর্শন – ইত্যাদির সাথে সংযোগ সৃষ্টির জন্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। একথাও ঠিক যে পৃথিবীর ৭০ শতাংশ চলচ্চিত্র আমরা ভাবাবেগ দিয়ে দেখি – যে কারণে ‘চলচ্চিত্র’ বাণিজ্যিক বা অবাণিজ্যিক – যে উদ্দেশ্যে নির্মিত হোকনা কেন, আমরা বিনোদন নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছু কিছু চলচ্চিত্র আমাদের নতুন কিছু বস্তুগত উপাদানের সাথে সম্পৃক্ত করে – যা অনুধাবনের জন্য দর্শককে বুদ্ধি, চিন্তা, আবেগের বাইরে গিয়ে ‘বোধ’ এর সাহায্য নিতে হয়। ্তুবোধ্থ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, একেবারে ব্যক্তিগত আবহে একজন মানুষের গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। ‘বোধ’ কখনো কাউকে পড়িয়ে, বলে, দেখিয়ে শেখানো বা বোঝানো যায় না। ‘বোধ’ ধর্মবানীর মতো উচ্চারিত হয় না। ‘বোধ’ অস্পষ্ট, ব্যাখ্যাহীন, অকথিত একধরনের উপলব্ধি যা কেবল আমাদের চিন্তায় কাজ করে, অনুভূত নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে চেষ্টা করে।
‘আলফা্থ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি অভিনব এবং শক্তিশালী সংযোজন। একে অন্য কোন শিল্পগুণে গুণান্বিত বিকল্পধারা, স্বাধীন ধারা বা জীবনমুখী চলচ্চিত্র ভেবে নেবার সুযোগ নেই। এটি নির্মাতার নিজস্ব সৃষ্টি, একেবারে একান্ত অনুভূতি এবং বোধের প্রকাশ। সেখানে গল্প আছে , কিন্তু গল্প বলার তাড়াহুড়ো নেই ; শিল্প আছে , যে শিল্প মানবিক বোধের সাথে মিশে একাকার ; জীবন আছে , যা নতুন করে বেঁচে উঠার স্বপ্ন দেখায় ; আর আছে অজানা মৃত্যুর কথা – যে মৃত্যু রাতের অন্ধকারে এসে জানলার কাছে, বাতাসে ফিসফিস করে জানাতে চায় তার পরিচয়। রাশিয়ার পরিচালক আন্দ্রেই তারকোভস্কি’র একটি কথা আছে –
“শিল্পের লক্ষ্য হল স্বয়ং শিল্পী এবং তার পারিপার্শ্বিকের কাছে ব্যাখা করা কেন মানুষ বেঁচে আছে; বেঁচে থাকার অর্থ কি; মানুষের কাছে ব্যাখা করা কেন এই গ্রহে আমাদের আগমন। ব্যাখা করা না হলেও অন্তত প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দেওয়া।’’
এই চলচ্চিত্র আমাদের তেমন কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, যার উত্তর জানা খুব বেশি প্রয়োজন পড়ে না । আমাদের চিন্তার জগতে খেলা করে ‘আলফা’ নামক যুবকটি কেন একজন অজানা, অচেনা, ঠিকানাবিহীন লাশের পরিচয়ের সন্ধান পেতে পাগলের মত ঘুরে বেড়াবে ? কেন সে ব্যস্ত ঢাকা শহরে গাধার পিঠে শিল্প নিয়ে ঘোরে ? কেন একজন অন্ধ মা প্রতিদিন সন্তানের জন্য রান্না করে অপেক্ষা করবে – আসছে না জেনেও ? কেন অন্যের সন্তান ধারণ করা স্ত্রীকে তাচ্ছিল্য করা মানুষটি আবার সবকিছু আপন করে নেয় ? কেন গ্রিক পুরাণে বর্ণিত চরিত্রের মত এক অন্ধ বাজারের মাঝে বসে সবার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে ?
আমরা এমন এক বিজ্ঞান মনস্কতার সময়ে উপস্থিত হয়েছি – যেখানে আমাদের আধুনিকতা, যান্ত্রিকতা, বিলাস, ভাষা, চিন্তা, প্রজ্ঞা সবকিছুর প্রতিনিয়ত মহাবিস্ফোরণ ঘটে চলেছে। আমরা মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে নভোযান নিয়ে পাড়ি দিচ্ছি, কিন্তু রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ ঘাতকের আঘাতে মুহূর্তে নাই হয়ে যায়। আলফা’র মত আমাদের রাতে নির্জনে বসে ভাবনায় আসে না – এই শহরে প্রতিদিন কত মানুষ মারা যায়? কেন যায়? তাদের কেউ নাম জানে না, তাদের নিয়ে কোন ভাবনা নেই। গার্মেন্টস এ আগুনে লেগে শতজন পুড়ে ছাই, রাস্তায় পিষ্ট হয়ে যায় কিশোর, খেলতে খেলতে খুঁড়ে রাখা গর্তে হারিয়ে যায় শিশু, একটা প্রকাণ্ড দালান আছড়ে পরে সহস্র মেহনতি মানুষের উপর – এরা কি কেবল সংখ্যা এবং সংবাদ ? ক্রিকেট ম্যাচে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ আমরা যে উত্তেজনা নিয়ে দেখি, সেই একই উত্তেজনা নিয়ে আমরা শ্রীলঙ্কার শতশত মানুষের বিস্ফোরণের মৃত্যু দেখি। আমাদের বোধে এখন কোনো কিছুই বেশিক্ষণ ছাপ ফেলে না। ইংরেজ কবি টিএস এলিয়ট তার The Hollow Men কবিতায় আধুনিক মানুষের বেঁচে থাকাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন –
Shape without form, shade without color,
Paralyzed force, gesture without motion;
‘আলফা’ সেইসব মানুষের বাইরের একজন বোধজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ – এই আধুনিক সময়েও।
বিঃ দ্রঃ: আগামী ২৮-২৯ শে জুন , চট্টগ্রামের থিয়েটার ইন্সিটিউট মিলনায়তনে নাসির উদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত ‘আলফা’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের চলচ্চিত্রের সকল দর্শককে স্বাগতম।

x