আর আমরা ব্যস্ত আছি  বিশ্বকাপ বিতর্কে!

নিপা দেব

শনিবার , ১৪ জুলাই, ২০১৮ at ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ
23

বস্তুত, উপরোক্ত ঘটনাপ্রবাহের পেছনের পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। বাংলাদেশ কিংবা দেশের বাইরেসর্বত্রই নারীর জন্য জায়গা কম। জায়গা তাঁকে করে নিতে হয়। কিন্তু সেই জায়গা করে নিতে গেলে এর চড়াদাম দিতে হয় নারীকেইদিতেও হচ্ছে। তেমনি ধীরে ধীরে আমাদের একেবারে চোখের সামনেই তৈরি হচ্ছে এক নতুন অসহিষ্ণু বাংলাদেশ। ঘৃণা নির্মমতা, বিভাজন আর নির্মূলের এক নতুন দেশ।

তথ্য.

সম্প্রতি ‘গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট’ তথা ‘বৈশ্বিক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ প্রকল্প’ নামের একটি অনলাইনভিত্তিক গবেষণা সংস্থার দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ১১৪টি দেশ থেকে সংগৃহীত তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে করা একটি গবেষণায় ওঠে এসেছে যেগণমাধ্যমে যাদের দেখা, শোনা ও পড়া হয় তাদের মাত্র ২৪ শতাংশ নারী। নারীকে অপরাধ বা সহিংসতার শিকার হিসেবে দেখানোর হার পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ। এই হার অপরিবর্তিত রয়েছে প্রায় এক দশক ধরে। সংবাদে বেশ কয়েকটি ভূমিকায় মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়ে থাকে। এদের মধ্যে রয়েছেন বিশেষজ্ঞ, মুখপাত্র, প্রত্যক্ষদর্শী, জনমত ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। গণমাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নেয়া সাক্ষাৎকার পুরুষের তুলনায় শতকরা ৩৮ ভাগ মাত্র। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারিত প্রতিবেদনের মাত্র ৩৭ ভাগ প্রতিবেদক নারীযে হার ১০ বছরে এতটুকুও বৃদ্ধি পায়নি।

তথ্য.

অপর একটি গবেষণা প্রতিবেদন পড়ে তা পাঠকদের সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না। কতোটা বাস্তবিক সেই তথ্যতা বলে বোঝাতে পারবো না। গবেষণাটি ২০০২ সালের। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের করা ‘গ্লোবাল সেল্ফ এস্টিম এক্রোস দ্য লাইফ স্প্যান’ নামক একটি গবেষণায় ওই তথ্যটি ওঠে আসে। সেখানে দেখা যায়বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের সেল্ফ এস্টিম বা নিজের যোগ্যতার ওপর বিশ্বাস ছেলেদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে হ্রাস পায়। উপরন্তু এই হারানো সেল্ফ এস্টিম নারী তার জীবনে আর কখনও ফিরে পায় না। ‘অলওয়েজ’ নামক স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রস্তুতকারক একটি প্রতিষ্ঠান বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের এই হঠাৎ হ্রাস পাওয়া আত্মবিশ্বাসের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে উপলব্ধি করে যে, জেন্ডার স্টেরিওটাইপ বা লিঙ্গবিষয়ক একই ছাঁচে ঢালা প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলো বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের ওপর একটি বড় প্রভাব ফেলে। কারণ এই স য়ে তারা শিখে যে সমাজের চোখে নারী বলতে কী বোঝায়, সমাজে নারীত্বকে সৌন্দর্য ও সাবমেসিবনেস অর্থাৎ অবনতশীলতার মতো কিছু নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ দিয়ে কেবল সংজ্ঞায়িত করা হয়। সমাজে ক্রমাগত চলমান এই লৈঙ্গিকবিভেদ আমাদের এই বার্তা দেয় যে,

নেতৃত্ব, শক্তিমত্তা ও ক্ষমতা কেবল পুরুষের জন্য, নারীর জন্য নয়। এ সমাজে একটি ছেলেকে মানুষ হিসেবে নয় বরং অনারী হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যা পক্ষান্তরে নারীপুরুষ উভয়কে শেখায় যেন নারী হওয়াটা যথেষ্ট ভালো কিছু নয়। ইটস সিম্পলি নট গুড এনাফ। এই গৎবাঁধা সামাজিক ধারণা অনিবার্যভাবে বয়ঃসন্ধিকালে নারীর আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরায় এবং পরবর্তী জীবনে তাদের আচরণের ওপর খুব বিরূপ প্রভাব ফেলে।

তথ্য.

গত জুনে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রিকেট ম্যাচে আমাদের জাহানারা আলম প্রথম বাংলাদেশি নারী ক্রিকেটার হিসাবে পাঁচটি উইকেট নিয়ে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে। ম্যাচটির ভাগ্য গড়িয়েছিল শেষ বলে, বাংলাদেশের জয়ের জন্য দরকার ছিল এক বলে এক রান। এরকম শেষ বলে এসে হারের ইতিহাস বাংলাদেশ পুরুষ দলে বারবার আছে, তবে সালমা আর জাহানারারা নারী এশিয়া কাপের ফাইনালের মতো আবারও সেই ম্যাচে ইস্পাত কঠিন নার্ভের পরিচয় দিয়ে শেষ বলে জয় সুনিশ্চিত করেছে। কিন্তু, আমরা পরবর্তিতে পত্রপত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছিপুরুষ ক্রিকেটারদের তুলনায় কতোটা অবহেলিত জীবনযাপন করছে আমাদের নারী ক্রিকেটাররা।

তথ্য.

মেয়েটির নাম মরিয়ম। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন তিনি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসানকে যখন সাপের মতো পিটিয়ে মারছিল ছাত্রলীগ, একটি মানুষও যখন এগিয়ে যায়নি বাঁচাতে, তখনই ফারুককে রক্ষার জন্য এগিয়ে যান তিনি। না, ফারুক তার পূর্বপরিচিত কেউ ছিল না। না বন্ধু, না স্বজন, না পরিচিত। তবে যে কাউকে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে দেখলে সুস্থ ও স্বাভাবিক মানসিকতার একজন মানুষ যা করে, মেয়েটি কেবল সেটাই চেষ্টা করেছিল। শুধু ছোট্ট একটি ভুল ছিল তার। সে বুঝতে পারেনিদেশটি আর সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের দখলে নেই। শকুনের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো কোটা আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগঠনের ক্যাডাররা। মেয়েটির সেই সময়কার ছবি তুলেছিল কেউ একজন। আত্মাকাঁপানো ওই ভয়াল ছবি মুহূর্তে ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেই ছবির বর্ণনা দেয়ার কোনো ভাষা কি কারও জানা আছে?

বস্তুত, উপরোক্ত ঘটনাপ্রবাহের পেছনের পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। বাংলাদেশ কিংবা দেশের বাইরেসর্বত্রই নারীর জন্য জায়গা কম। জায়গা তাঁকে করে নিতে হয়। কিন্তু সেই জায়গা করে নিতে গেলে এর চড়াদাম দিতে হয় নারীকেইদিতেও হচ্ছে। তেমনি ধীরে ধীরে আমাদের একেবারে চোখের সামনেই তৈরি হচ্ছে এক নতুন অসহিষ্ণু বাংলাদেশ। ঘৃণা নির্মমতা, বিভাজন আর নির্মূলের এক নতুন দেশ। এদেশে এখন হয় তুমি আমার বন্ধু, আর নয়তো শত্রু। এখানে মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। এ এক তীব্র অসহিষ্ণু সময়। এই পরিবর্তন আমাদের সামনেই ঘটছে। আমরা চোখ বুঁজে আছি, উট পাখি যেমন বালুতে মুখ গুঁজে থাকেঠিক তেমনভাবেই। ভাবছিআমি তো নিরাপদ। বুঝতে পারছি নাঅনিরাপদ রাষ্ট্রে কেউই আসলে নিরাপদ নয়। আড়াই বছরের শিশু রাইফা খানের জীবন ‘ভুল চিকিৎসায়’ চলে গেলেও আমরা মনে করছি নাএটা আমারআমাদেরআমজনতার আন্দোলন। ভেবে বসে আছিসাংবাদিক কন্যার মৃত্যু এটাশুধু সাংবাদিকরাই আন্দোলন করুক। বাহ্‌কী ভয়ঙ্কর এমন ভাবনা আমাদের!!! বলাই বাহুল্যঅত্যাচার, নিপীড়নের খবর আর ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে সয়ে যাওয়া মন ও মস্তিষ্ককে আমরা গত দুএকমাস ধরে অদ্ভুতভাবে ব্যস্ত রেখেছি বিশ্বকাপেআর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল বিতর্কে। সত্যিই সেলুকাস! বিচিত্র আমাদের মগজজাত ভাবনা!! বিচিত্র আমাদের মনের মানচিত্র!!!

(তথ্য উৎস: ওয়েবসাইট)

x