আরও একবার

দেবাশীষ মজুমদার

মঙ্গলবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ
157

সকাল-বিকাল তৃপ্তির আহার, শান্তিময় সলিড ঘুম আর শারীরিক সম্পর্ক এই তিনই হল মধ্যবিত্ত জীবনের মূল ফান্ডা, এর যে কোনো একটায় ঘাটতি হলেই গেল গেল রব ওঠে, সে-ঘরের চৌহদ্দিতেই হোক কিংবা সমাজ বলতে আদতে আমরা যা বুঝি তাতে।
ইলা নামের এক মধ্যবয়সী বিবাহিত মহিলা, তার একঘেয়ে জীবন, আরেক বিপত্নীক ভদ্রলোক, নাম সাজন ফার্নান্ডেজ, ক’দিন বাদেই যিনি রিটায়ার করবেন। এই দুই চরিত্রকে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে গল্প, সিনেমার নাম ‘দ্যা লাঞ্চ বক্স’। ফার্নান্ডেজের জীবন আমরা ঢেঁড়স বলতে যা বুঝি সেরকমই ছিল, নিত্য অফিসে আসা এবং লোকাল ট্রেনে চেপে ফিরে যাওয়া আর এর মাঝে রোজকার লাঞ্চ বক্স (যা কিনা ডাব্বা নামে পরিচিত), তাতেও সেই থোড় বড়ি খাঁরা, খাঁরা বড়ি থোড় রান্না, প্রায় দিনই মেনু থাকে আলু-গোবি। ইলার বরের জন্য পাঠানো লাঞ্চবক্স কোনো একদিন ভুলবশত চলে আসে ফার্নান্ডেজ (ইরফান খান) এর কাছে, কেবল এটুকু হলেই হয়তো চলতো, তা হয়নি, ইলা (নিম্রাত কাউর) আবার বক্সে তাঁর বরকে একটা চিঠিও লিখেছিল। আর এখানেই এই একঘেয়ে জীবন মোচড় নেয়। একে ভিন্ন স্বাদের দারুণ খাবার আর তার উপর ওই চিঠি, সিনেমা জমতে আর কোন রসদের কি দরকার হয়!
না, তারপরেও ছিল, আরও কিছু ছিল, সেটা হল তৃতীয় চরিত্রটি, নাম শেখ আর এই চরিত্রে ছিলেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী, ছোট্ট একটা পার্শ্বচরিত্র, কিন্তু জাত অভিনেতা বলে কথা, ওতেই মাত করে দিয়েছেন সিদ্দিকী। খুব কষ্টে পাওয়া চাকরি টিকিয়ে রাখতে বসের সামনে হাত কচলানো এক চরিত্র, যে কিনা বিয়েতে যৌতুক হিসেবে একটা স্কুটার পেয়েছে। আর বলতে গেলে সিদ্দিকী এই সিনেমাটায় একটা শান্তির বাতাস হয়েই এসেছেন, মানে তার চরিত্রটাই হল এই সিনেমার কিছুটা কমিক রিলিফ।
আরেকটা চরিত্র এখানে অবশ্যই মুখ্য সেটা হল ‘ডাব্বা’ ইলা-ফার্নান্ডেজতো বটেই, শেষমেশ শেখও এই ডাব্বায় মোহিত হয়ে গিয়েছিল। এই একটা ডাব্বা তার স্বাদ, গন্ধ, ইচ্ছে-অনিচ্ছা,আশা, ভালবাসা, মনভাঙ্গা সমস্ত কিছু ভেতরে পুরে ট্রেন, লরি, সাইকেলে চেপে অবশেষে ভুল হাতে গিয়ে পড়েছে বলেই এমন অনবদ্য একটা আরবান স্টোরি আমরা পেয়েছি, আর তার জন্য পরিচালক রীতেশ বাত্রা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।
কিন্তু কথা হল, এই আজকের আলোচনা কিন্তু মোটেই ‘দ্যা লাঞ্চবক্স’ সিনেমা নিয়ে নয়। এ- এক অন্য গল্প। এটাও দু’জন মধ্যবয়সী মানুষের ভালবাসার গল্প। প্রশ্ন হল এই সিনেমার কথা বলতে গিয়ে দ্যা লাঞ্চ বক্সকে কেন টেনে আনা হল। আনা হয়েছে সংগত কারণেই, দুটো সিনেমাতে মধ্যবর্তী জীবন বা মিড-লাইফের যে ঘাত প্রতিঘাত বুঝানো হয়েছে তা এক্কেবারে আমাদের বর্তমান শহুরে জীবনের চালচিত্র। কিংবা অতিভাবনায় যদি এমনও ভেবে ফেলি ফার্নান্ডেজ আর ইলা দীর্ঘদিন চিঠিতে ভাব আদান-প্রদান করে ক্লান্ত হয়ে এখন টেলিফোনে নতুন নামে আবির্ভুত হয়েছে তাহলেও কি খুব বেশী দোষের কিছু হয়!
আমরা যারা নিজেদের আমজনতা দাবি করি, তো সেই আমজনতার কেচ্ছাটা কি? এইতো এই ক’দিন আগেও ছিল (এখন যে খুব পাল্টেছে তাও নয়), কোনো মেয়ে জিন্স প্যান্ট পরে ঘোরাঘুরি করলেও পেছনে নানা কথা ছুটে আসে, স্কার্ট পরলে তো পোয়া বারো, যেহেতু সে এইসব পোশাক পড়ছে, তাহলে অনায়াসে তার দিকে দু-একটা খিস্তি ছুঁড়ে দেয়া যেতেই পারে, এটাতে দোষের কিছু নাই। আর যদি সে মেয়ে ধূমপান করে? সর্বনাশ, তবে তো চরিত্র বলে তার যে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নাই, সেটা এ-তাকে-সে-তাদেরকে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বার্তা পৌঁছে দেবে। আমজনতা হচ্ছে সেইজন্য যেভাবে বড়লোক গাড়ি কেনে গরিবের পয়সা মেরে, রাজনীতিবিদ মানেই দুর্নীতিবাজ, সরকারি চাকরি নেবার মূল উদ্দেশ্য হল ঘুষ খাওয়া। রাস্তায় একটা গাড়ির সাথে একটা রিক্সার লেগে গেল, আমজনতা নির্ঘাত রিকশাওয়ালার পক্ষ নেবে। ছোটবেলাতেই এই আমজনতার ঘরে শিখতে হয়েছে বড়লোকদের থেকে দূরে থাক, অথচ তারাই চায় ছেলে পড়ালেখা শিখে টাকা কামাক কাঁড়ি কাঁড়ি, মেয়ে পাক বড়লোক জামাই। তো এই আমজনতার যে-সমাজ সে-সমাজে মধ্যবয়স্ক প্রেমকে কোনদিনই স্বীকৃতি দেয়া হবে না। বউ অন্য ছেলের সাথে প্রেম করছে, যাও লটকে সাধের জীবন লীলা সাঙ্গ কর। বর অন্য মেয়ের সাথে ফষ্টি-নষ্টি করছে, রাতে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে পরে টুকরো টুকরো করে কেটে ডাস্টবিনে ফেলে আস। এসব কিছুই যদি করতে না পার তবে সারা জীবন চিৎকার করে পাড়া মাতিয়ে রাখ। বাপ-ভাই-মা-বোন এমনকি বহুকাল আগে স্বর্গে বা নরকে চলে গিয়ে যাবর কাটতে থাকা দাদু-পরদাদুকেও ছাড়ে না। এই হলো আমাদের আমজনতা।
তো এই আমজনতার আবার লাঞ্চ-বক্স সিনেমা ভাল লাগে, তেমন আরেকটা সিনেমার কথাই আজ বলছি, নাম ‘ওয়ান্স এগেইন’। আগে লাঞ্চ বক্সের কথা এ-কারণেই বলেছি যে দু’জন মধ্য বয়স্ক নর-নারীর প্রেম নিয়ে সিনেমা করবার মতোন অবস্থা আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো তৈরি হয়নি, কিন্তু লাঞ্চ বক্সের সাফল্য থেকে কিনা জানি না আরেকটা সিনেমা আমরা ঠিকই পেলাম। শেফালি শাহ ও নীরজ কবির এর দুর্দান্ত অভিনয় সমৃদ্ধ এই সিনেমা বানিয়েছেন কনওয়াল শেঠি, তিনিই ‘ওয়ান্স এগেইন’ ছবির পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার।
এই গল্পটাও একদমই শহুরে গল্প। টাচফোন, ট্যাবের মাঝে হারিয়ে যাওয়া আত্মিক যোগাযোগের যে ধুলো জমা স্মৃতি, সেটাই নিজের হাতে ঝেড়েঝুড়ে যত্নে সাজিয়েছেন পরিচালক। এই প্রতিযোগিতামূলক জীবনের ইঁদুর দৌড়ে যারা দৌড়চ্ছেন এবং পণ করে রেখেছেন যে আমাকে জিততেই হবে, কেন যেন মনে হল এ সিনেমা তাদের জন্য নয়। বরং এই সিনেমা যারা জীবনকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারে তাদের জন্য। স্লো সিনেমা যাকে বলে এটা এমনই, হুট-হাট ঘটনার পরিক্রমা নেই, ত্রাহি সাউন্ড বা জমকালো সেট নেই, যা আছে পুরো সিনেমা জুড়ে তা হল পরিমিতি বোধ। এই ছবির এডিটিং, সাউন্ড, সেট ডিজাইন, ক্যামেরা ওয়ার্ক সব কিছুতেই এই পরিমিতি বোধের পরিচয় দিয়েছেন সবাই, এমনকি একটা মাঝারী মাপের রেস্টুেরন্টের অফিসঘরটাও ছিল যুতসই। আর ছবির কস্টিউমের কথা উল্লেখ না করে একদমই পারা যাচ্ছে না, তারা শেঠঠি ( শেফালী শাহ) দু বাচ্চার মা এবং ডিভোর্সি, একটা মাঝারী মাপের রেস্টুরেন্টের মালিক, তার রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার যায় ফিল্মস্টার অমর কুমার (নীরজ কবির) এর বাসায়।
দীর্ঘদিন টেলিফোনে কথোপকথনের পরে একদিন অমর কুমার সিদ্ধান্ত নেয় যে তারাকে দেখতে তার রেস্টুরেন্টে যাবেন, চলে যানও, এবং সেখানে তাঁরা বুঝতে পারে আশপাশের মানুষেরা তাদের দেখছে। তারা ডিভোর্সি, অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তার রেস্টুরেন্ট চালাবার জন্য, দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার, ছেলের বিয়ের জন্য টাকার দরকার, লোনের এপ্লাই করেন, ইত্যাদি নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গল্প গড়াতে থাকে এবং এরই মধ্যে প্রতিদিন রাত দশটায় অপেক্ষা করে থাকেন অমর কুমারের ফোনের জন্য। অমর আর তারার কথোপকথনের এক জায়গায় তারাকে বলতে শোনা যায় সে সমুদ্রকে ভয় পায়, প্রতিকীভাবে হয়তো বোঝা যায় নিজের বা জীবনের গভীরে ডুব দিতেও তাঁর ভয় হয়। তেমনি অমর বলেন তিনি ভয় পান পাহাড়কে, অত উঁচুতে উঠে কোনকিছু অর্জনের ইচ্ছেও তাঁর নেই।
সিনেমায় তারা একজন পরিশ্রমী বিজন্যাস উওম্যান, দু-বাচ্চার খুব ভাল মা। ছেলের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ের একদম আগেই জেনে গেল সকলে তাঁর একটা প্রেম আছে, ঠিক তখন সমস্ত দৃশ্যপট বদলে গেল। নিজের পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের অন্যেরা সবাই তাকে ভর্ৎসনা করতে কোমর বেঁধে লেগে গেল। আর অমর বিখ্যাত অভিনেতা, এক বাচ্চার বাবাও। নিজের একাকীত্ব, নিজের গভীর কষ্টগুলো এতদিন ধরে চেপে রেখে শেষে তারার কাছে সব উগরে দিয়েছেন, সেই তিনিও তারার সাথে তার সম্পর্ক প্রকাশে দ্বিধান্বিত।
পুরো সিনেমাতে ঘটনা গড়িয়েছে খুব ধীর লয়ে, এমনকি ডায়লগেও তেমন গভীরতা নেই, পরিচালক যেন মনে হল দুই অভিজ্ঞ অভিনেতা-অভিনেত্রীর উপর দায়িত্বটা ছেড়ে দিয়ে মজা দেখতে চেয়েছেন, আর এ-ক্ষেত্রে তাকে সফলই বলা যায়। একটা দৃশ্য থেকে আরেকটা দৃশ্যে যেতে যে সাইলেন্ট পজগুলো ছিল তাতে দর্শক শ্বাস নিতে পেরেছে; এ সিনেমা দেখবার পর সিনেমাটোগ্রাফার ঈশিতা নারাইনের পরবর্তী কাজগুলোর প্রতি খুব আগ্রহ জন্মাবে। সরলরৈখিক বা লিনিয়ার কাহিনীতে প্রবহমান এই সিনেমায় ক্লাইম্যাক্সের জন্য দর্শককে অপেক্ষা করতে হয়েছে শেষ অব্দি। কিন্তু শেষটাও কি আদতে শেষ!

x