আমেরিকার পাবলিক লাইব্রেরি ও মানবহিতৈষী কার্নেগী

মোহাম্মদ ফজলুল রেজা

শনিবার , ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
43

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থাৎ আমেরিকাতে দর্শনীয় অনেক কিছুই রয়েছে। রয়েছে অনেক নান্দনিক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ও স্থান। এগুলোর কিছু স্রষ্টা প্রদত্ত আবার কিছু মানুষের গড়া। তবে আমার যে স্থানে সবচেয়ে ভালো লেগেছে, ভালো লাগে, স্বস্তি ও নির্মল আনন্দ পাই সে স্থানটি হলো আমেরিকার পাবলিক লাইব্রেরি।
বেশ ক’বছর আগে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকাতে প্রথম এসে পৌঁছেছিলাম নিউইয়র্কে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর চলে আসি মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে। মেরিল্যান্ড-এর লিনথিকাম এলাকায় বসবাস শুরুর কিছুদিন পর একদিন অ্যান অরুনডেল কাউন্টি পাবলিক লাইব্রেরিতে গেলাম। এডাম নামের এক ভদ্রলোকের কাছে জানতে চাইলাম কীভাবে সদস্য হওয়া যায়। তিনি আমার স্টেট আইডি দেখে আমাকে সদস্য কার্ড করে দিলেন। তারপর থেকেই লাইব্রেরিতে যাওয়া-আসা। লাইব্রেরিটিতে আমার অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে। তাই আমি লাইব্রেরিটির কাছে বিশেষভাবে ঋণী হয়ে থাকব।
তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশেষভাবে উন্নত এই দেশে মানুষ ইচ্ছে করলে ঘরে বা যেকোনো স্থানে বসে কম্পিউটার, আইপ্যাড, ট্যাব ও সেলফোনে সকল ধরনের পড়াশোনার কাজ সারতে পারে। কিন্তু তারপরও মানুষ কেন যে এত লাইব্রেরিতে আসে তা দেখে সত্যিই অবাক হই। লক্ষ্য করেছি ফাস্টফুডের দোকানগুলোর চেয়েও লাইব্রেরি অনেক বেশি ব্যস্ত থাকে।
এরই মধ্যে অনেক বৃদ্ধ ও যুবকের সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। তাদের মধ্যে একজন হলেন মিস্টার কারসন যার বয়স প্রায় ৬৫ বছর। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম লাইব্রেরিতে এসে তিনি কী উৎসাহ পান। তিনি বলেছিলেন, জ্ঞানের পিপাসা মেটানোর জন্য বই আর লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। তার স্ত্রী মিসেস লিন বললেন, আধুনিকতা ও প্রযুক্তি যতই উন্নতির শিখরে পৌঁছুক না কেন বইয়ের চাহিদা কখনো ম্লান হবে না। তেমনি অন্য তরুণ-তরুণীদের সাথে কথা বলেও জানলাম, বই পড়ার স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন, একেবারেই তুলনাহীন। এদেশের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও উৎসাহ নিয়ে লাইব্রেরিতে আসে, বই সংগ্রহ করে ও পড়ে।
আমেরিকার পাবলিক লাইব্রেরিগুলো জনসাধারণের জন্য বিশেষভাবে উন্মুক্ত। এগুলো চলে জনগণের ট্যাক্স বা করের টাকায়। লাইব্রেরিগুলো পরিচালিত হয় সুশিক্ষিত লাইব্রেরিয়ান দিয়ে। আর তাদের গণ্য করা হয় জনগণের সেবক হিসেবে। আমেরিকার প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি হিসেবে বিবেচনা করা হয় ফ্রাঙ্কলিন পাবলিক লাইব্রেরিকে। জানা যায় এই লাইব্রেরিটির শুরুতে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জনকদের মধ্যে একজন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন লাইব্রেরিটিতে ১১৬টি বই উপহার দিয়েছিলেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার উন্নয়নের সাথে সাথে আমেরিকানরা উপলব্ধি করলো যে তাদের জনসাধারণের মন-মানসিকতা, জ্ঞানবোধ, শিক্ষা, প্রযুক্তি, তথ্য, জ্ঞানের লেনদেন আরো বেশি উন্নত ও উন্মুক্ত হওয়া দরকার। তাই তারা বেশি বেশি পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করে।
আমেরিকাতে পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার পিছনে যে লোকটির বিশেষ অবদান রয়েছে তিনি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধনী ব্যক্তি এন্ড্রু কার্নেগি। ১৮৩৫ সালের ২৫ নভেম্বর স্কটল্যান্ডের এক অজপাড়াগাঁয়ের এক নগন্য পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর জীবনের প্রথম ১৩টি বছর স্কটল্যান্ডে কাটে পরিবারের সাথে। পরবর্তীতে জীবিকার তাগিদে তাঁর বাবা সপরিবারে আমেরিকা পাড়ি জমালে আমেরিকাতে তাদের ঠিকানা হয় একটি বস্তি।
তাঁর পরিশ্রম ও চিন্তাধারা তাঁকে অনেক বড় শিল্পপতি ও মানবপ্রেমিক হতে সাহায্য করেছে। কার্নেগি তাঁর অর্জিত সম্পদ থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মানবতার সেবায় দান করে গেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কার্নেগির দানের নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মানবহিতৈষীমূলক তাঁর অনেকগুলো কাজের মধ্যে একটি হলো পাবলিক লাইব্রেরি। শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করার জন্য ২০ কোটি টাকা দান করেন কার্নেগী। তিনি ২ হাজার ৫০৯টি কার্নেগি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিলেন যেগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৬৮৯টি আমেরিকায়, ৬৬০টি যুক্তরাজ্যে, ১২৫টি কানাডায়। তাছাড়া তিনি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডেও লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন।
কার্নেগির স্বপ্ন ছিল, ‘লাইব্রেরি সকল মানুষের জন্য বই এবং তথ্য নিয়ে আসবে।’ তাই আমরা যেখানেই থাকি না কেন আমাদের উচিত লাইব্রেরি গড়ে তুলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে এর সাথে পরিচিত করে তোলা। অবশেষে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’ থেকে ওমর খৈয়ামের উদ্ধৃতিটি তুলে ধরতেই হয়। ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা-যদি তেমন বই হয়। তাই বোধ করি খৈয়াম তাঁর বেহেশতের সরঞ্জামের ফিরিস্তি বানাতে গিয়ে কেতাবের কথা ভোলেননি।’

লেখক : মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

x