আমীর খসরু একজনই বিএনপির প্রার্থী

মোরশেদ তালুকদার

বুধবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ
388

চট্টগ্রাম১১ (বন্দর, পতেঙ্গা, ডবলমুরিং, ইপিজেড ও সদরঘাট), একমাত্র সংসদীয় আসন যেখানে দলীয় প্রাথী নিয়ে বিরোধ নেই বিএনপিতে। একক প্রার্থী হিসেবেই আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিগত ১০ টি সংসদ নির্বাচনের চারটিতেই এ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি। দলের হাইকমান্ডেরও আস্থাশীল, তৃণমূলেও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে তার। তাই একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে এ আসন থেকে আমীর খসরুই হচ্ছেন দলের প্রাথী, সেটা অনেকটা নিশ্চিত।

সংসদীয় আসনটির তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমীর খসরু পরাজিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় নি বিএনপি। তাই গত ১০ বছর ধরেই চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটি হাতছাড়া হয়ে আছে বিএনপির। অথচ এর আগের নির্বাচনগুলোতে বিএনপিই এখানে বিজয়ী হয়েছিল। তাই আগামী নির্বাচনে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসনটি পুনরুদ্ধার করা। অবশ্য এ ব্যাপারে আশাবাদী দলটি। এ আসনে প্রার্থীতা ঘিরে বিভক্তি না থাকায় তৃণমূলেও বড় ধরনের সাংগঠনিক বিরোধ নেই। কিছু ক্ষেত্রে তৃণমূলের কর্মীরা পরষ্পরের সঙ্গে মতানৈক্যে জড়ালেও আমীর খসরুর বিজয় নিশ্চিতের জায়গায় ঐক্যের সুর তাদের মধ্যে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : ১৯৯১ সালে তৎকালীন নির্বাচনী এলাকা(ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, বন্দর) থেকে বেগম খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছিলেন। ওইসময় আমীর খসরু বেগম জিয়ার সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে একই বৎসরে নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রাম৮ এর উপনির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও খসরু সংসদ সদস্য হিসেবে একই এলাকা থেকে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চার দলীয় ঐক্যজোট সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে ১০ অক্টোবর ২০০১ সালে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন এবং ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উত্তর কাট্টলী ঐতিহ্য সমৃদ্ধ নাজির বাড়িতে ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ্ব মাহমুদুন নবী চৌধুরী। যিনি ১৯৫৪ সালে অত্র এলাকা হতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং যুক্ত ফ্রন্ট সরকারের গণযোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জেঠা আইনজীবী মরহুম নুরুল হক চৌধুরীও মন্ত্রী ছিলেন। আমীর খসরু চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৯ সালে। তারপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য যুক্তরাজ্যে গমন করেন। লন্ডন থেকে হিসাব বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে আসেন। শিক্ষা জীবন শেষে জনাব আমীর খসরু পিতার ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহন করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, ক্রীড়াসহ জনসেবামূলক কাজ করে চলেছেন।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অন্যতম ক্ষেত্র হলো বাণিজ্য এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি মেঙিকোর কানকুনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশ গুলোর পক্ষ হয়ে নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন এবং দোহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে যোগদান করেন। ২০০৩ সালে তিনি ঢাকায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সম্মন্বয়ে প্রাক কানকুন সম্মেলন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহন করেন এবং পরবর্তীতে “ঢাকা ঘোষণা” অবতারণা করেন। যা কানকুন ঘোষণার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া তাঁকে বাণিজ্য নীতির একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সাথে বিশ্ব বাণিজ্যে সম্মন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। এছাড়াও আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক নীতির ব্যাপারে তিনি মূখ্য আলোচক হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রাম১১ আসনকে ঘিরে একাদশ সংসদ নির্বাচন বিষয়ে জানতে চাইলে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘যদি বাংলাদেশে নির্বাচন হয় সেক্ষেত্রেই আমরা নির্বাচন করবো কি না সেই প্রসঙ্গ আসবে। এরা (আওয়ামী লীগ) তো নির্বাচনের নামে একদলীয় ক্ষমতা দখলের আয়োজন করছে। নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এমন হতে হবে, যেখানে দেশের মানুষ ভোট দিতে পারবেন। নিরপেক্ষ সরকার হতে হবে, সংসদ বাতিল হতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে, প্রতিরক্ষা বাহিনীর অন্তর্ভুক্তি হতে হবে নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে। এসব মৌলিক বিষয়ে তো সমাধান হতে হবে। এসব তো বিএনপির না, পুরো জাতির প্রত্যাশা। এসব সমাধান না হলে তো আসন আসবে না। আগে নির্বাচনের পরিবেশ, অবস্থান সঠিকভাবে মানুষের কাছে স্পষ্ট হতে হবে এবং দৃশ্যমান হতে হবে। তবেই না নির্বাচন।’

সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনের জন্য বিএনপি কতটা প্রস্তুত? এমন প্রশ্নে আমীর খসরু বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী বিএনপি। সবচেয়ে শক্তিশালী দল। সবসময় প্রস্তুত। কারণ, বিএনপির নির্ভরশীলতা তো জনগণের উপর। নির্বাচনে গেলে আমাদের কোন সমস্য নাই। কারণ, জনগণ আমাদের পাশে আছে সেটা আমরা জানি।’

তৃণমূলের বক্তব্য :

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সহসভাপতি ও বন্দর থানার সাবেক সভাপতি এম এ আজিজ দৈনিক আজাদীক বলেন, চট্টগ্রাম১১ আসন থেকে খসরু ভাই ছাড়া আর কেউ নাই। সাধারণত, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দুটি আসন থেকে নির্বাচন করেন, সেক্ষেত্রে খসরু ভাই এ আসনের পাশাপাশি অন্য আসন থেকেও নির্বাচন করতে পারেন।’

সাংগঠনিকভাবে তৃণমূলে দলের প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে আমাদের ভাল প্রস্তুতি আছে। আগের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থানে আছে। সরকারের নির্যাতন, গায়েবি মামলা দিয়ে হয়রানির কারণে নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছে। রেষারেষি ভুলে সবাই এখন এক।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে যাবে। তবে ভাল পরিবেশ চাচ্ছে। জাতিও সেটা চায়। ২০০৮ সালের পর থেকে তো কেউ ভোট দিতে পারে নি।’

সদরঘাট থানা বিএনপির সভাপতি হাজী সালাহ উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম১১ আসনের একক প্রার্থী আমাদের দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি একজন সৎ এবং ভাল মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। ক্লিন ইমেজের অধিকারী। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন তিনি।’

পতেঙ্গা থানা বিএনপির সভাপতি ডা. নুরুল আবছার দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘খসরু ভাই, বিএনপির একক প্রার্থী। আর কেউ নাই। তিনি এ আসন (চট্টগ্রাম১১) থেকে চারবার নির্বাচিত হয়েছেন, সুতরাং তার বিকল্প কেউ নাই।’ ‘নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূলের প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। প্রচারণাও চালাচ্ছি। কেন্দ্র থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা এলে আমাদের কোন সমস্যা হবে না। আমরা সবসময় প্রস্তুত।’

আসন সম্পর্কিত :

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২৭ থেকে ৩০ এবং ৩৬ থেকে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে এ আসনটি গঠিত। পতেঙ্গা, বন্দর, সদরঘাট ও ইপিজেড থানা এবং ডবলমুরিং থানার একাংশ পড়েছে চট্টগ্রাম১১ আসনে। এখানে উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চট্টগ্রাম৮ আসনটি দুই ভাগে ভাগ করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। নতুন আসনের পরিচিতি লাভ করে চট্টগ্রাম১১।

এ আসনে বিগত ১০টি সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পাঁচবার, আওয়ামী লীগ চারবার ও জাতীয়পার্টি একবার জয়লাভ করে। আমীর খসরু ছাড়া ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সুলতান আহমেদ চৌধুরী এখানে বিজয়ী হন। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে এখানে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সরকার গঠনের পর বেগম খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দেন। উপনির্বাচনে বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিজয়ী হন।

এছাড়া ১৯৭৩ সালে এ আসনে প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ইসহাক মিয়া, ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির লিয়াকত আলী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ লতিফ বিজয়ী হন।

x