আমি স্যান্ডেল পরতে অপছন্দ করি : শাহরুখ খান

ভূমিকা ও ভাষান্তর: নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ২১ মে, ২০১৯ at ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ
133

ভূমিকা ও ভাষান্তর : নাজমুস সাকিব রহমান
শাহরুখ খান একজন মুসলমান সুপারস্টার। সিনেমায় অভিনয় করেন। তিনি জন্মেছেন ভারতের দিল্লীতে। ১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর। তার পরিবার এসেছে পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে। তিনি শরীরের দিক থেকে পাঠান এবং রাশির দিক থেকে একজন স্করপিও।
তার এই ইন্টারভিউটা ২০০৩ সালের। ওই বছর ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিন অনেকগুলো প্রশ্ন নিয়ে তার কাছে হাজির হয়েছিল। ইন্টারভিউটার ভূমিকায় তারা বলেছে, স্টারডম পাওয়ার পর থেকে শাহরুখ খান একজন বিনয়ী মানুষ ছাড়া কিছু নন। আমি এই ইন্টারভিউটা ভাষান্তর করার কারণ, শাহরুখ খান স্যান্ডেল পরতে অপছন্দ করেন। আরেকটা কথা, এই ইন্টারভিউটা পড়ার সময় মনে রাখতে হবে, শাহরুখ খান পেপসির অ্যাম্বাসেডর এবং তিনি একজন ভালো হিউম্যারিস্ট। না হলে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন। আসুন, ইন্টারভিউটা পড়া যাক-

ফিল্মফেয়ার : স্কুলে আপনার নাম কি ছিল ?
শাহরুখ : মেইল গাড্ডা। কারণ আমি খুব জোরে দৌড়াতাম। যেন একটা এক্সপ্রেস ট্রেন ছুটছে।
ফিল্মফেয়ার : আপনার ব্যাপারে তিনটা ইনফরমেশন?
শাহরুখ : এক, আমার অনেক তিল আছে। কিন্তু সেগুলো শরীরের ডান দিকে। দুই, আমি পানি খাই না, শুধু পেপসি খাই। তিন, আমি স্যান্ডেল পরতে অপছন্দ করি। কখনোই পরি না।
ফিল্মফেয়ার : হিউম্যান বডির ফেভারিট পার্ট?
শাহরুখ : কলার বোন এরিয়া।
ফিল্মফেয়ার : ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে আকর্ষণীয় শব্দ কোনটা?
শাহরুখ : সুইটহার্ট। যদিও শব্দটার অপব্যবহার হয়, কিন্তু এটাকে আমি আকর্ষণীয় মনে করি। আমি অন্যভাবে বলছি না। শশী কাপুর এটা ভালোভাবে বলতে পারতেন। আমার মনে হয় আমিও এটা মিষ্টি করে বলতে পারি। আমি প্রচুর মানুষের ভেতরে ‘সুইটহার্ট’ দেখেছি।
ফিল্মফেয়ার : কোন ব্যাপারটা আপনাকে না বলা উচিত?
শাহরুখ : অশোক বাংকার একবার লিখেছিল, আমাকে মুম্বাই থেকে বের করে দেওয়া উচিত। কারণ অভিনেতারা এখানে যারা থাকেন, তাদের জন্য বিপদজনক। আমরা যা করি তার সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পর্ক আছে। তারা আমাদের মেরে ফেলার চেষ্টা করে।
এরপরেও আমি এই কথার মধ্যে নেগেটিভিটি খুঁজে পেয়েছি। এটা স্টুপিডও। কেউ আমাকে মুম্বাই ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে বলতে পারে না। বিশেষ করে আমার বাংলো মান্নাতের পেছনে এতোগুলো টাকা খরচ করার পর।
ফিল্মফেয়ার : অফ স্ক্রিনে আপনি ভালো অভিনেতা?
শাহরুখ : অবশ্যই। কারণ ক্যামেরা কিছু কাজ করায়। অবশ্য ক্যামেরার সামনে কাজ করার কিছু স্টাইল আছে। কিন্তু ন্যাচারিলিজম তখনই আসে, যখন আপনি ক্যামেরার সামনে নেই।
ফিল্মফেয়ার : আপনার স্ত্রীর তিনটি পরিচিত দিক?
শাহরুখ : সে খুব ভালো ছবি আঁকতো। কিন্তু এখন আর আঁকে না। সে ভালো নাচতে পারে। এবং সে মিডল ক্লাস পাঞ্জাবী মেয়ে।
ফিল্মফেয়ার : আপনার মনে রাখা ফোনকল?
শাহরুখ : যে ফোনকলটা আমার মনে আছে, এটা এসেছিল হাসপাতাল থেকে। তারা জিজ্ঞেস করেছিল, আমার বাবার ডেডবডি নিতে যেতে পারবো কিনা? রাত তখন আড়াইটা বাজে। আমরা হাসপাতালে পৌঁছাই ভোর চারটায়। আমার মা প্রথমে আমাকে খবরটা দেননি। তিনি বলেছিলেন, চলো। বাবা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
ফিল্মফেয়ার : কোন বইটি আপনি প্রায়ই পড়েন?
শাহরুখ : অনেকগুলোই। আদ্রিয়ান মোল এবং উডি এলেনের বই। আমার কাছে উডি এলেনের পুরো কালেকশন আছে। বিল কোসবির ফাদারহুড এবং প্যারেন্টহুড। এছাড়া ডগলাস এডামের দ্য হিচহাইকার্রস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি।
ফিল্মফেয়ার : শেষ কোন সময় মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন?
শাহরুখ : ছয়মাস আগে আমি মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আসলে আমার রাগ খুব খারাপ। কিন্তু আমি এটা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে গেছি। কারণ নিয়ন্ত্রণ হারালে আমি যা করতে পারি তার জন্য ভীত। আমি একবার পাগল হয়ে গেলে কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। এমনকি আমি যে কাউকে খুনও করে ফেলতে পারি। তাই পরিস্থিতি যখন অস্থির হয়ে যায়, আমি শান্ত হতে চেষ্টা করি।
ফিল্মফেয়ার : একটি আদর্শ দিন নিয়ে আপনার ধারণা কি?
শাহরুখ : এটা শুরু হবে দুইটায়, বিকেলের দিকে। শেষ হবে ভোর পাঁচটায়। আগে আমি এটা নিয়ে ভাবতাম কিন্তু এখন না। তবে যদি বৃষ্টি হয়, আমি কাউকে নিয়ে ঘরে থাকতে চাই। সিনেমা দেখতে চাই। সালসা সস দিয়ে নাচোজ খেতে চাই। এবং পেপসি পান করতে চাই।
ফিল্মফেয়ার : একজন অভিনেতা হওয়ার খারাপ দিক কোনটি?
শাহরুখ : তেমন কিছু না। তবে মাঝে মাঝে শট দেওয়ার সময় ক্যামেরার রিল চলে যায়। এবং আমি জানি ওই মোমেন্টটা কখনোই ফিরিয়ে আনা যাবে না। অবশ্য আমি জোরে কান্নাকাটি বা মারামারির কোনো দৃশ্যের কথা বলছি না। শুধু সুন্দর মুহূর্তের সাথে সহজ একটি দৃশ্যের কথা বলছি।
ফিল্মফেয়ার : আপনি কী নিয়ে রসিকতা করবেন না?
শাহরুখ : অক্ষমতা নিয়ে। মানসিক বা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে রসিকতা করা ভুল। আমি বাদশাহ (১৯৯৯) সিনেমাটা করার সময় এটা খুব খারাপভাবে অনুভব করেছি। তবে এই একবারই আমি সেটা করেছি। কারণ এটা মজার একটি দৃশ্য ছিল।
ফিল্মফেয়ার : পোশাকের কোন জিনিসটি আপনার ব্যাক্তিত্বকে আকৃতি দিয়েছে?
শাহরুখ : আমার শার্ট। অর্ধেক বাইরে, অর্ধেক প্যান্টের ভেতরে। আমি অফস্ক্রিনে সবসময় এভাবেই শার্ট পরেছি। দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গেতে (১৯৯৫) এটা আমি প্রথমবারের মতো অন স্ক্রিনে নিয়ে আসলাম। এবং এটা ট্রেন্ড হয়ে গেলো।
ফিল্মফেয়ার : শেষ কোন প্রশংসাটা পেয়েছেন?
শাহরুখ : দেবদাস (২০০২) দেখার পর দীপা ও কেতন মেহতা আমাকে বলেছে, অনেক বছর হয়ে গেলো, তুমি এখনো চোখ ব্যবহার করতে পারো। তুমি কি নতুন এক জোড়া চোখ লাগিয়েছ? আমরা অনেক বছর ধরে তোমাকে দেখছি, কিন্তু তোমার চোখ এখনো আমাদের আবেগাক্রান্ত করতে পারে। তুমি কীভাবে এটা করো? প্রশংসাটা বেশ মিষ্টি ছিল।
ফিল্মফেয়ার : একজন সুপারস্টার হওয়ার ভাল দিক কোনটি?
শাহরুখ : মানুষ যখন আমাকে দেখে, তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠে। তারা আনন্দিত হয়। এটা আমি উপভোগ করি। আমি যখন স্টেজে উঠি, আমি তাদের মুখের হাসি অনুভব করতে পারি। আমি ভুলও হতে পারি, কিন্তু এটা বুঝতে পারি।
আমি এটা পছন্দ করি যখন আমার গাড়ি তাদের ক্রস করে, তারা আমাকে দেখে উত্তেজিত হয়। অথবা যখন আমি ঘর থেকে বের হই, তারা বাইরে আমাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করে। এটা খুবই চমৎকার। একজন সুপারস্টার হিসেবে আমি ভালো ব্যবহার পেয়ে থাকি।
তবে এখনো এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে আমি এ ধরনের অভ্যর্থনা পাই না। যেমন, মুম্বাই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টার। তারা আমাকে সবসময় থামায়, এবং লাইনে দাঁড় করায়। তবে হিথ্রো বিমানবন্দরের গল্পটি ভিন্ন। যে মুহূর্তে আমি বিমান থেকে নামবো, একজন ভদ্রমহিলা আমাকে ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার ব্যাগ কাছে নিয়ে আসবে। একবার একজন আমেরিকান আমাকে বলেছিল, আমরা জন ট্রাভোল্টার জন্য এটা করবো না।
ফিল্মফেয়ার : কোন গানের লিরিক আপনার কাছে অনেক কিছু?
শাহরুখ : ‘আভি না যাও ছোড় কার। কে দিল আভি ভারা নেহি। আভি আভি তো আয়ি হো, বাহার বানকে চাইয়ে হো, হাওয়া জারা মেহেক তো লে, নজর জারা বেহেক তো লে, ইয়ে শাম ঢাল তো লে জারা, ইয়ে সাম্ভাল তো লে জারা। … আভি তো কুচ কাহা নেহি, আভি তো কুচ সুনা নেহি।’ হাম দুনো সিনেমার গান। এটা খুবই রোমান্টিক। আমি কোনো একদিন এটা সিনেমায় গাইতে চাই।
ফিল্মফেয়ার : আপনাকে যদি একটি চিঠি লেখার সুযোগ দেওয়া হয়, এটা কার কাছে ও কি নিয়ে হবে?
শাহরুখ : এটা হবে আব্রাহাম লিংকনের চিঠিটার মতো, যেটি তিনি তার ছেলের শিক্ষককে লিখেছিলেন। অবশ্য আমি অন্যদিকে যাব না, তবে যারা আমার সন্তানদের দেখাশোনা করে, তাদের প্রত্যেকের পেছনে চিঠি ছেড়ে দেবো। বিশেষ করে তাদের শিক্ষকদের। আমি বলবো, তাদের প্রতি সদয় হোন। বিরক্ত হবেন না। কঠোর হন যদি প্রয়োজন হয়, কিন্তু মারবেন না। তারা হয়তো কিছু জিনিস বুঝতে সময় নেবে কিন্তু এটা এজন্য না যে তারা শিখতে চায় না। এর কারণ পড়াশুনার পাশাপাশি অন্য অনেক বিষয় তাদের মনে ঘোরাফেরা করে।

x