আমি তোমারই মাটির কন্যা, জননী বসুন্ধরা

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ
136

এই যে আয়োজন, এত যে আয়োজন তার খবরটুকু পর্যন্ত আমাদের আন্দোলিত করে। আমাদের বন্ধ ঘরে নানাদিক থেকে আলো পড়ছে। নাজলীর ছবির মতো গবাক্ষপথে উড়েও যাচ্ছেন আমাদের মেয়েরা দলে দলে। কিন্তু কবে, আমাদের সব মেয়ে, সকল শিশু, কিশোরী-তরুণী, ছাত্রী-পোশাককর্মী নির্ভয়ে, মনের আনন্দে বা নিজ নিজ প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বেরুতে পারবে এবং কাজ শেষে ক্লান্ত কিন্তু হাসিমুখে ঘরে ফিরতে পারবে!

শীত এবার যথাসময়ে এসেছে এবং বেশ হাঁকিয়ে, দাপিয়ে, কাঁপিয়ে রাজত্ব করেছে। তবে মাঘের শুরু থেকেই থেকে থেকে শচীন কর্তার গানের মতো হাওয়া বেচাল চলেছে এবং আহা কোকিল! মাঝরাতে কি ভোররাতে কী আহাজারি ডাকই না ডেকেছে। শীত জেঁকে এলে আবার চুপ। এই করতে করতেই যাই যাই করছে ১৪২৫এর শীত। এরই মধ্যে একদিন, শুক্লা ইফতেখার- যাঁরা চেনেন-জানেন, জানেন কেমন হাড়-বাঁদরী একটা দস্যি মেয়ে এখনও- ফোন করে গম্ভীর গলায় বললে, শোনো, জেরিন আপা (স্থপতি) সদ্যেজাত নাতি দেখতে আমেরিকায় যাচ্ছেন সামনের সোম-মঙ্গলের দিকে। আপা চাইছেন আপার বাসায় একটু আড্ডায় বসি আমরা, ওই আমাদের মাধবিকা অনুষ্ঠানে। তুমি কি আসবে? সাধারণত আমার কোথাও যাওয়া হয় না তেমন একটা। অর্ধশতাব্দীর মরচে-পড়া নোঙর আমার সংসারের; এ বয়সে সেটা টেনে তোলার শক্তি-সাহস তো বটেই ইচ্ছেটাও আর নেই। কিন্তু শুক্লা কবি তো! কোমল গলায় বললো, শোনো, হিমালয় তো দূরের কথা, আমাদের বোঁচা বাটালিতে ওঠারও সাধ্য তোমার নেই জানি। তবে যদি যাও নিখরচায় পাহাড় চূড়ায় উঠে চট্টগ্রাম শহরটা একবার ইচ্ছে করলে দেখে যেতে পারো।
নির্ধারিত দিনটিতে সেই পাথুরে পাহাড়ি পথ বাইছি তো বাইছি। উড়ে উড়ে, ঘুরে-ঘুরে পাতা ঝরার গান গাইছে পথের দুধারে ঢালু বেয়ে সরল কাণ্ডে আকাশ-ছোঁয়া বৃক্ষরাজি। নিচে যতদূর চোখ যায় ঝরাপাতার শূন্য বিছানার হাহাকার। কিন্তু শূন্যলোকে গাছেদের ডালে ডালে সবুজ পাতার স্তূপ। হিসেব মেলে না। অথবা হিসেব মেলানোর আগেই পৌঁছে যাই একটু সমতলের ছোট্ট এক চিলতে উঠোনে। দুচারটে যানবাহনের দম ফেলার জায়গা রেখে সারাটা জায়গা জুড়ে টব-গাছালি। ছোট-বড় পাতায়-ফুলে সেজেগুজে চুপচাপ বসে থাকা ঝোঁপ-ঝাড়। তারই মাঝখানে এক কোনে ছোট্ট গোলাকৃতি পাথুরে টেবিল ঘিরে কয়েকটি চেয়ার, এক পাশে ছোট্ট একটি বেঞ্চি পাতা, অন্যপ্রান্তে-সরু দোচালার নিচে ভারি দোলনায় হালকা দুলছে শায়লা-শারমীন (শিল্পী) আর তার পাশের আসনে একইভাবে দুলছে পরিপাটি বাবরি চুলো এ বাড়ির সোনার কুকুর। কুকুরও এমন সোনারঙের হয়! জেরিন সোনার মানুষ বলেই কি?
ধীরলয়ে রাজ হাঁসের মতো উঠে আসা তো নয় যেন উড়ে আসছে গাড়ি। উৎসুক প্রতীক্ষায় অনুমানের খেলা চলে আমাদের মধ্যে যারা বসে আছি, কে এলো? জেরিনের ছুটে যাওয়া তাঁর কিশোরী বেলার কথা মনে করিয়ে দেয়। এলেন নাসিমা, তাঁর পর পরই নন্দিতা (ডা. নন্দিতা বড়ুয়া; আমার বকুল-সই)। নন্দিতার মুখটি আড়াল করে রেখেছে ওর হাতের পুষ্পস্তবক। ছোট্ট কলসীর মতো কলিঘেরা দু’চারটে বড় আকাশের দলমেলা ফুল; শ্বেতপদ্ম কি? এ সময়ে? অবশ্য অসময় বলে এখন আছে কিছু? বেগুনি রঙের নির্ভেজাল জামের শরবত পরিবেশন করে জেরিন বললেন, ওই যে দুটো বড় গাছ দেখছেন, ওই গাছের জাম। জাম গাছ দেখতে গিয়ে চোখে পড়ল ঘরে ঢোকার সিঁড়ির বাঁ দিকে দেয়াল ঘেঁষে উঠে যাওয়া অনন্তলতা। জানালার কার্নিশে ফুলের শয্যাপাতা গুচ্ছের অনন্তলতা। এই অনন্তলতার ঝিমধরা গোলাপী আচ্ছন্নতা দেখবো বলে পঁচিশ বছর আগে সিআরবি রেলওয়ে হাসপাতালের ২ নং কেবিনে একটা দিন অকারণে বাড়তি থেকেছিলাম। কিন্তু এটি টুকটুকে লাল। সম্ভবত পাথুরে জমি বলে ফুল রোগাভোগা। স্মৃতিরা কখনও বিবর্ণ হয় না, রোগাও নয়। স্মৃতি সতত সুখের শুধু নয়, সতত সতেজও বটে।
নাজলীকে (নাজলী লায়লা মনসুর) দেখা মানে ওর ভুবনভোলানো হাসিটি দেখা। কিন্তু আমি দেখি ওর ছবি। নাজলীর ছবিতে নারীর চেহারার ধরণ, শরীরের গড়ন এবং ওর ছবিতে রঙের ব্যবহার পৌরাণিক যুগে নিয়ে যায় আমাকে। আমি জানি আমার ছবি দেখার চোখের সঙ্গে শিল্পিত, শিক্ষিত চর্চিত দৃষ্টিধারীদের ঢের তফাৎ রয়েছে। তবু আমার চোখটা তো আমারই। নাজলীর রিকশায় বসা মেয়েটি রিকশার পেছনের পর্দা একপাশে সরিয়ে যাকে দেখছে ছবিতে সে নেই। কিন্তু আমরা তাকে দেখি। দেখি ওই মেয়েটির দৃষ্টির ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়ে। আসলে নাজলীর যে-দুটি ছবি আমাদের মন জুড়ে আছে সে ছবির কথা বলি। একটি ছবিতে শূন্যে ভাসমান এক নারী। সে উড়ন্ত বা ধাবন্ত। তার আঁচল লুটিয়ে পড়ে আছে মাটিতে। শুধু লুটিয়ে পড়া নয়। একটা খুঁটিতে জড়ানো সে-আঁচল, পাশে গো-কন্যার ছবি। আর একটি ছবিতে জানালাপথে বেরিয়ে যাচ্ছে নারী। এও উড়ন্ত। পিঠের ওপর দুটো হাত ডানার কাজটি করছে যেন। এই ছবিদুটো নারী আন্দোলনের একটা বিশেষ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন বেইজিং প্লাস ফাইভ নিয়ে বেশ তোলপাড় হচ্ছে। ‘নারীর জন্য নীলাকাশ’, ‘নারীর চোখে বিশ্ব দেখুন’ জাতীয় স্লোগানে বিশ্ব আকাশ মুখরিত। সেই সময়কার ছবি। কিন্তু এ ছবির ধারাবাহিকতা কেন পেলাম না? এই প্রশ্নটা বার বার করতে চেয়েছি নাজলীকে। কিন্তু শুক্লা তার ‘মাধবীকা’র সদস্যদের স্মরণ শক্তির পরীক্ষা নেবেই নেবে। ব্যাগ ভর্তি করে জেরিনের ড্রেসিং টেবিল-ডাইনিং টেবিল তুলে এনেছে।
উপুড় করে সব জিনিসপত্র ঢেলে সাজিয়ে ঢেকেও দিয়েছে। মাথা গুণে জেরিনকে দিয়ে কাগজ-কলম আনিয়ে নিচ্ছে ঘর থেকে। থেকে থেকে নিজের নুপুর পরা সুন্দর দুটি পায়ের ছবি তুলিয়ে নিচ্ছে একে-তাকে দিয়ে। এমন পরিবেশে অমন ছবি সম্পর্কে কথা বলা যায়? আমি একাই ডুবে থাকি নাজলীর ছবিতে। ১৮কি ২০ বছর আগের কথা। শাহীন (শাহীন আক্তার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক; সম্পর্কে আমার আত্মীয়) বেশ কয়েকদিনের চেষ্টায় আমার কিছু গল্পের সন্ধান পেয়েছে ডাঁই করে ফেলে রাখা কাগজপত্র ঘেঁটে। বলল, বই করে ফেলি। আপনার কিছু করতে হবে না শুধু…। বললাম, ‘শুধু’ তো হবেই সেইসঙ্গে একটা শর্ত। কি শর্ত? বালিশে মাথা রেখে ডান হাতের তালু বালিশের উপর ছড়িয়ে ডানকাতে শুয়ে আছে এক বিষন্ন মেয়ে; অকাতর ঘুমে ডুবে থাকা মেয়ে। ওই ছবিটি প্রচ্ছদে চাই। সম্ভবত সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীতে মুদ্রিত সে স্কেচটি ওকে দেখাই। ও বললে, নাজলী আপার ছবি? সে হবে। কোনও অসুবিধে নেই। সত্যিই হলো। ‘হননসুখ’ গল্পগ্রন্থ শাহীনের করা, প্রচ্ছদে নাজলীর ওই ছবি-নিখরচায়। নাজলী অনেকদিন ছবি আঁকে না। পুত্র, পুত্রবধূ-নাতি নিয়ে, স্বামীকে নিয়ে ব্যস্ততা, ছোটাছুটি ঢাকা-চট্টগ্রামে। ছবির বিষয় আসে মনে। মাথায় নেয় বটে সব। লে-আউট হয়। ক্যানভাসে বসাও হয়। তারপর ছোটাছুটিতে সব মাথায় ওঠে। এই তো জীবন, সৃজনশীল নারী-আঁকিয়ের।
কিন্তু না, সময় বদলেছে। বদলে যাচ্ছে। ‘কন্যা আর আমরা’ শিরোনামে দৈনিক সমকালের ‘মঞ্চের বাইরে’ পাতার একটি মন-কাড়া প্রতিবেদনের (৩.২.১৯) কথা বলি।
গত ২৫ থেকে ২৭ জানুয়ারি ৭ শিল্পীর আঁকা এক যৌথ শিল্প প্রদর্শনী হয়ে গেল ঢাকা শিল্পকলা একাডেমিতে। ‘কন্যা ও আমরা’ শিরোনামের এ প্রদর্শনী একটি বিশেষ কারণে বিশিষ্ট। বাংলাদেশের সমাজ-ব্যবস্থায় নারী-শিল্পীদের কতটা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয় এ ছবিগুলোতে তার প্রমাণ তো রয়েছেই উপরন্তু যাঁরা এঁকেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীপ্রাপ্ত কিন্তু অনেকদিন পরে রং তুলি হাতে নিয়েছেন। মাহফুজা বিউটি ডিগ্রীপ্রাপ্তির ১৭ বছর পরে এঁকেছেন ডিটারেন্ট-৩ ও ডিটারেন্ট-৭। এখানে প্রতীকী নারী হিসেবে এসেছে ফুল এবং তাকে বিপর্যস্তকারী হিসেবে এসেছে বৃষ্টি। শকুন্তলা ৩ ক্যানভাসে সুরভী সোবহানা এঁকেছেন তপোবনে শকুন্তলার ছবি। শর্মিলা কাদের এঁকেছেন বন্দেগি-৩। সেলিনা মুন্নার ‘ডিসটেন্স’, শামীমা আক্তারের ‘বন্ডিং’ শাকিলা চয়নের ‘প্রকৃতি’ তানিয়ার ‘আমার স্বপ্ন, আমার ছন্দ এবং শিল্পী শাহনাজ শাহীনের ‘ফেস’ ছবিটি নিয়ে তেলরঙ, জলরঙ ও অ্যাক্রিলিকে আঁকা শিল্পীদের এইসব ছবি শিল্পবোদ্ধাদের মনোযোগ কেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীপ্রাপ্ত এ শিল্পীরা প্রমাণ করেছেন তাঁরা হারিয়ে যান নি। ফুরিয়েও যান নি। শিল্পীদের এই ফিরে আসাকে, জেগে ওঠাকে আমরা স্বাগত জানাই।
প্রসঙ্গত ২০১৯ এর জানুয়ারির প্রথম পক্ষে রেইনবো ফিল্প সোসাইটি আয়োজিত সপ্তদশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের কথা মনে এল। এ উৎসবের উল্লেখযোগ্য পর্ব ছিল আন্তর্জাতিক নারী চলচ্চিত্র সম্মেলন। বিশ্বজুড়ে নারী চলচ্চিত্রকারদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও সুযোগ নিয়ে প্রচুর কথা হয়েছে সেখানে। রাজধানীর অলিয়ঁস ফ্রঁসেজের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মিলনায়তনে ৫ম বারের মতো এ আয়োজনে নারী নির্মাতাদের মধ্যে তরুণ প্রজন্মের উত্থান, নগর পর্যায়ে নারীর সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা, ঊনিশ শতকের মূলধারার চলচ্চিত্রে সহিংসতা, পতিতাবৃত্তি প্রদর্শনসহ চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থান, বিশ্বে মুসলিম নারী চলচ্চিত্রকার ও এশিয়ার নারী চলচ্চিত্রকারদের সম্পর্কে পশ্চিমের দৃষ্টিসহ চলচ্চিত্রের আরও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই যে আয়োজন, এত যে আয়োজন তার খবরটুকু পর্যন্ত আমাদের আন্দোলিত করে। আমাদের বন্ধ ঘরে নানাদিক থেকে আলো পড়ছে। নাজলীর ছবির মতো গবাক্ষপথে উড়েও যাচ্ছেন আমাদের মেয়েরা দলে দলে। কিন্তু কবে, আমাদের সব মেয়ে, সকল শিশু, কিশোরী-তরুণী, ছাত্রী-পোশাককর্মী নির্ভয়ে, মনের আনন্দে বা নিজ নিজ প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বেরুতে পারবে এবং কাজ শেষে ক্লান্ত কিন্তু হাসিমুখে ঘরে ফিরতে পারবে!

x