আমি গৃহকর্মীদের কথা বলছি…

নিপা দেব

শনিবার , ৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
38

প্রায়ই একটা কথা শুনি আমার পরিচিত, অপচিরিচ, অল্প পরিচিতজনদের কাছ থেকে। কথাটি হচ্ছে- ‘আর বইলেন না, বাসার কাজের মেয়ের কথা। ও তো একদিন আসলে দশদিন আসে না!’ মানে- যে গৃহকর্মী ছাড়া আজকাল শহরের বাসা-বাড়ি বলতে গেলে অচল, যার হাত ধরে হয়তো বেড়ে উঠছে আমাদের শিশুরা- সেই তাকে নিয়ে হরহামেশা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে বা তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতেই এই ধরনের বাক্য ব্যবহার করছি আমরা! প্রকৃত অর্থে- গৃহকর্মীরা একদিন ‘অফ’ দিলেই তাদের ‘দশদিন’ না আসার খোঁটা শুনতে হয়। তাই নয় কি?
বলতে গেলে- গৃহকর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়ার কথা প্রায়ই শোনা যায়। বিশেষ করে না জানিয়ে ছুটি নেওয়ার বিষয়টি ভীষণ বিরক্তিকর ঠেকে আমাদের এই ভদ্র (!) সমাজে। বলছিলাম- চাকরিজীবী বা পরিচিত, অল্প পরিচিত বা অতি পরিচিত কারও সাথে এ বিষয়ে কথা বললে সবার আগে গৃহকর্মীর ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টিই আলোচনায় প্রাধান্য পায় বহু সময়।
এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে গৃহকর্মীরা যে কাজগুলো করে সেগুলো অতি প্রয়োজনীয় আটপৌরে কাজ যেমন ঘর-মোছা, কাপড় ধোয়া, বাসন মাজা, রুটি বানানো ইত্যাদি। কারো-কারো বাসায় রান্না করা বা বাচ্চার দেখাশোনাও গৃহকর্মীরা করে থাকে। কাজেই একদিন ফাঁকি দিলেই গৃহকর্তার ‘খবর’ হয়ে যায়।
তাই বলে, আপনার বাসায় যে গৃহকর্মী রয়েছে তার কোনোদিন মাথাব্যথা ও জ্বর হবে না বা ডায়রিয়া হবে না, সে কখনও দাঁতের ব্যথায় কাত হয়ে পড়বে না, তার কখনও জরুরি কাজ পড়বে না, তার জীবনে কখনো কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না, তার বাচ্চার কখনও অসুখ হবে না, বা একটানা ৫/৬ দিন কাজ করার পরে সপ্তাহে একদিন তার পরিবারের সাথে সময় কাটাতে মন চাইবে না- এমনটি আশা করা কি ঠিক?
আমি বলবো- ঠিক তো নয়-ই, রীতিমত অমানবিক।
গহকর্মী- সেও তো মানুষ; যন্ত্র নয়। তারও নানাবিধ যন্ত্রণা থাকাটাই স্বাভাবিক। এমনকি যন্ত্রও একটানা চলতে থাকলে হ্যাং হয়ে যায়, তার বিশ্রামের প্রয়োজন হয় মানে যন্ত্রকে রিস্টার্ট দিতে হয় বা ‘নতুন লুক’ নিতে আপডেট রাখতে হয় সবসময়। তাহলে একটানা কাজ করার পরে সপ্তাহে একদিন করে ছুটি তো গৃহকর্মীরও প্রয়োজন হয়।
কিন্তু আমরা ক’জন এ বিষয়টা উপলব্ধি করেছি? ভীষণ অধিকার সচেতন ব্যক্তিটিও দেখা যাবে- ঘরে গিয়ে আশা করেন তার বাসার গৃহকর্মী প্রতিদিন আসুক। অথবা দেখা যায়- কিছুদিন ‘অফ’ দেওয়ার কারণে গৃহকর্মী তারা ছোট্ট চাকরিটাও হারালো!
যদি একটু গভীরে ফোকাস করি- তবে দেখবো- অনেক গৃহকর্মী আছে যারা একসাথে অনেকগুলো বাসায় কাজ করে। অন্য কথায় বললে- বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করতে বাধ্য হয়। দেখা গেল- এক বাসায় সকাল আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত কাজ করে, দশটা থেকে বারোটা আরেক বাসায় এবং বারোটা থেকে দুইটা অন্য আরেক বাসায় কাজ করে তারা। এর মাঝখানে একদিনের জন্য ছুটিও মিলে না তাদের। বিনোদন বলতে কি কোনো জিনিস তাদের জীবনে আসলেই আসে?
যাই হোক, এ তো গেলো সাপ্তাহিক ছুটির কথা। কোনো কোনো বাসায় গৃহকর্মীরা ঈদের ছুটিও পায় না। একাধিক বাসায় কাজ করে শেষে দেখা গেলো- বিকেলে নিজের বাসায় ফিরে নিজের ঘরের মানুষদের জন্য রান্না করতে-করতেই পুরো ঈদের-দিন শেষ হয়ে গেছে। ঈদ আনন্দ কী জিনিস- তার বোঝাই হয়ে উঠলো না। এভাবেও কোনো কোনো গৃহকর্মীর ঈদ উদযাপন হয় আমাদের এই শহরে! যেখানে তারা ঈদ উৎসবেই ছুটি পায় না, সরকারি ছুটির দিনগুলোতে তারা ছুটি পাবে এমনটি আশা করা তো বাতুলতাই বলতে হবে। উপরন্তু, আপনি তাকে দিয়ে অনেক সময়-ই অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নিচ্ছেন, কিন্তু অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিচ্ছেন কি? কয়জন অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে থাকি আমরা?
আরেকটি বিষয়- কথায় কথায় আমরা পোশাক-কারখানার মালিকদেরও সমালোচনা করি যে, তারা ঠিক মতো বেতন-বোনাস দেয় না।
আমার বা আপনার বাসায় যখন দু’জন গৃহকর্মী কাজ করছে, তখন আমরাও তো চাকরিদাতা। কিন্তু, আমরা নিজেরা তাদের অধিকারের ব্যাপারে কতটা সচেতন? আত্মসমালোচনা করা কি জরুরি নয়?

তাই বলে, আপনার বাসায় যে গৃহকর্মী রয়েছে তার কোনোদিন মাথাব্যথা ও জ্বর হবে না বা ডায়রিয়া হবে না, সে কখনও দাঁতের ব্যথায় কাত হয়ে পড়বে না, তার কখনও জরুরি কাজ পড়বে না, তার জীবনে কখনো কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না, তার বাচ্চার কখনও অসুখ হবে না, বা একটানা ৫/৬ দিন কাজ করার পরে সপ্তাহে একদিন তার পরিবারের সাথে সময় কাটাতে মন চাইবে না- এমনটি আশা করা কি ঠিক?.

x