আমি একুশের সৈনিক -মুর্তজা বশীর

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ১২ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
85

‘মুর্তজা বশীর একজন নিঃসঙ্গ মানুষ, নিঃসঙ্গ চিত্রকর, নিঃসঙ্গ লেখক; তাঁর জীবনের এই নিঃসঙ্গতার মধ্যেও তিনি চান হীরের মতো দ্যুতি। তিনি মানুষকে ঘৃণা করেন, ঘৃণা করেন বলেই হয়তো তাদেরকে গভীরভাবে ভালোবাসতেও জানেন।’ শিল্পী মুর্তজা বশীরের একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘কাঁচের পাখি’র ভূমিকায় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান এমন শব্দবন্ধেই তাঁকে বেঁধেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে জেদী, অনমনীয়, দৃঢ়চেতা ছোটখাটো এই মানুষটি আপাদমস্তক একজন শিল্পী। শিল্পের প্রায় সবক’টি শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন ধ্যানীর মতো। তাঁর নিত্যকার পারিপার্শ্বিকতাকে যাপন করতে গিয়েই নিয়ত খুঁজে ফিরেছেন তাঁর শিল্পের রসদ। নানাভাবে ভেঙেছেন নিজের শিল্প ভাবনাকে, আবার নতুন করে গড়েছেন নিজের কাজকে তিনি দেখেছেন নানান দৃষ্টিকোণ থেকে, এ-দেখা শিল্পীর, দর্শকের, সমালোচকের যে কারণে তাঁর কাজের ভেতর কেবল একজন সৃজনশীল শিল্পীসত্তাকে আমরা পাই না, পাই একজন গবেষককেও। জন্মেছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। বড় বোন তাঁকে আদর করে ডাকতেন বকুল বলে। বহুভাষাবিদ সমাজ সংস্কারক ড. মোহাম্মদ শহিদুল্লার কনিষ্ঠ পুত্র আবুল খয়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ; কেবল এই পরিচয়ের ছায়া নিয়েই হয়তো কাটিয়ে দিতে পারতেন একটা জীবন। কিন্তু না, তিনি খুঁজতে শুরু করলেন তার নিজস্ব সত্তাকে। নিজের নাম থেকে ছেঁটে বাদ দিলেন বাবার নামের অংশটুকু। অল্প বয়স থেকেই নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা তাঁকে তাড়িত করেছে, সে-তাড়না তাঁর সবসময় সঙ্গী হয়ে থেকে গেছে। তাঁর জীবনযাপনকে যদি আমরা ঘুরে দেখি তাহলে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল নানামাত্রিক একজন মানুষকে আমরা খুঁজে পাব। প্রধানত তিনি একজন চিত্রশিল্পী ছেলেবেলা থেকেই। ছবি আঁকায় তার আগ্রহ ছিল, রাস্তার ধারে বসে পোস্টার-ব্যানার আঁকা শিল্পীরা যেভাবে গ্রাফ করে করে ছবি আঁকতেন সেসব দেখে-দেখে বাসায় ফিরে হাত মকশ করা দিয়ে চিত্রচর্চার শুরু। কিন্তু চিত্রশিল্পী হবেন সে-ইচ্ছে তাঁর ছিল না। তাঁকে চিত্রশিল্পী হতে হবে এটি রাজনৈতিকভাবে তাঁর উপর চাপিয়ে দেয়া দায়িত্ব। সে-সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের একনিষ্ঠ কর্মী মুর্তজা বশীর ১৯৪৯ সালে ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যচের ছাত্র হয়ে এলেন। শুরুতেই তার এই শিল্প চর্চার জায়গায় মন লাগেনি, সময় লেগেছিল তাঁর এই জগতের সাথে একাত্ম হতে। ছেড়ে দেবেন এই ভাবনা থেকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কাছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে ছাড়তে না দিয়ে তাঁর আগের ব্যাচের ছাত্র আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী আমিনুল ইসলামের সাথে জুড়ে দিলেন। নতুন উদ্যমে সেই যে শুরু করলেন তারপর ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়ে এলেন প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়ে। এরপর কেবল ছুটে চলেছেন নিজের স্বতন্ত্র শিল্পধারা নির্মাণের চেষ্টায়। নানান শিল্পধারার ভেতর হেঁটে হেঁটে নিজের জন্যে খুঁজে নিলেন এবাস্ট্রাক্ট রিয়েলিজম বা বিমূর্ত বাস্তবতা। আমাদের দেশে এই ধারার প্রবর্তক শিল্পী মুর্তজা বশীর। দু’বছর ইতালিতে পাশ্চাত্য ধারায় শিল্প শিক্ষা শেষে দেশে ফিরে এসে ছবি আঁকার জগতে নিমগ্ন হয়ে গিয়েও যে-শূন্যতা তাঁকে তাড়া করে ফিরত তার আভাস পেলেন ১৯৮০ সালে এসে। ফেলোশিপ নিয়ে গেলেন জাপানে সেখানে গিয়েই যে জাপানি নারীর সাথে তাঁর আলাপ হয় তাঁর দিকে তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়ে সৌহার্দ্য বিনিময় করতে গেলে নারীটি তাঁর হাত বাড়িয়ে না দিয়ে তাদের দেশীয় কায়দায় মাথা নুয়ে তাঁকে সম্ভাষণ জানালেন। জাপানিজদের ট্রেডিশনাল সে-সম্ভাষণের কায়দায় তাঁর ভেতর একটা ভাঙচুর হয়। তাঁর মনে হতে শুরু করে শেকড়ের সাথে সম্পর্কশূন্য শিল্প ঠিক শিল্পের মর্যাদায় পৌঁছুতে পারে না। এই ভাবনা তাকে তাঁর নতুন পথ বেছে নিতে সাহায্য করে। ফেলোশিপ শেষে দেশে ফিরে তিনি আরো বেশি করে নিমগ্ন হলেন শেকড়ের সাথে পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে নতুন পথ খুঁজে নিতে। এপিটাফ, দেয়াল, উইংস সিরিজের ছবিগুলোতে তাঁর নিজস্ব ভাবনার জগৎকে আমরা মূর্ত হতে দেখি। কেবল একজন শিল্পীর চোখ দিয়ে নয় একজন নৃতাত্ত্বিকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি দেশীয় শিল্পের শেকড় অনুসন্ধানে নামেন। দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে তিনি নানান নিদর্শন সংগ্রহ করে দেশীয় শিল্পের স্বরূপ খুঁজতে লাগলেন। এই খোঁজার ভেতর দিয়েই নিজের অন্য আরেকটি সত্তাকে তিনি আবিষ্কার করলেন। তাঁর কৌতূহলী মন, উৎসুক চিত্ত তাঁকে বিশ্রাম দেয়নি কখনো। নিয়ত তিনি খুঁজে ফিরেছেন নতুন নতুন অনুষঙ্গ, যে অনুষঙ্গের ভেতর তিনি কেবল খুঁজে গেছেন তা নয় বরং ধ্যানী বুদ্ধের মত নিমগ্ন হয়েছেন। ইতিহাসবিদ ছিলেন না কিন্তু আগ্রহী পাঠক ছিলেন ইতিহাসের। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি ঘাঁটতে শুরু করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার। নানান দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ভাড়ার ঘর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গ্রন্থাগার। এখানে এমন সব বই তিনি অধ্যয়ন করেছে যেগুলোতে তার আগে কেউ হাত দিয়েছে বলেও কেউ জানেন না। সেই ইতিহাসের পাঠ তাঁর উৎসুক মনকে মুদ্রা বিষয়ে গবেষণায় উৎসাহী করে তোলে। তিনি গবেষণা করেন সুলতানি আমলের মুদ্রা বিষয়ে। এই বিষয়ে তার ছয়টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। ল্যুমেসমেটিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়া নামে বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত জার্নালে। তাঁর কয়েন সংগ্রাহক সত্তাটি হয়তো এই গবেষণায় উৎসাহ জুগিয়েছে। বাংলার হাবসি সুলতানদের নিয়েও তাঁর একটি গবেষণাধর্মী বই ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৪ সালের বইমেলায়। দৃশ্যশল্পী, গবেষক, ইতিহাসবিদ, চলচ্চিত্র শিল্পী, লেখক, সংগ্রাহক এইরকম আরো অজস্র সত্তায় বিভক্ত মানুষ মুর্তজা বশীর। জীবনকে দেখতে চেয়েছেন নানান দিক থেকে ঘুরিয়ে অণুবীক্ষণিক দৃষ্টিতে। এই অণুবীক্ষণিক দেখার ছাপ তাঁর ছবিতে যেমন দৃশ্যমান তেমনি তাঁর জীবনেও। তিনি বলেন আনন্দে তিনি ছবি আঁকেন, আর বেদনা তাঁকে লেখায়। এই অনুধাবনের ভেতর দিয়েই তিনি জীবনকে তাঁর শিল্পের মতোই যাপন করতেন এই বয়েসে এসেও। সরলীকৃত রেখা আর নগণ্য রঙের প্রাধান্যে যেভাবে ছবি আঁকেন অনেকটা সেই ভাবনাকে মাথায় রেখেই আর সব শিল্পের শাখায় তাঁর বিচরণ। একটি উপন্যাস আত্মজৈবনিক। একটি গল্পগ্রন্থ যেগুলোতে তাঁর পারিপার্শ্বিক জীবনের ও সমাজ ব্যবস্থার ছাপ আমরা পাই আর তাঁর কবিতা তা-যে আত্মনিমগ্ন। অনেকটাই নিজের ভেতর নিজেকে উদযাপনের প্রয়াস। বহুমাত্রিক এই শিল্পীর জীবন কেবল শিল্পচর্চার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর জীবন নানান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। প্রথম জীবনে সাম্যবাদী রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ততা তাঁর পুরো জীবনে একটি বড় প্রভাব রেখেছে। যে-কারণে একটি সোচ্চার চরিত্র তার সবসময় ছিল। ১৯৫০ সালের হাজং বিদ্রোহের সময় রাস্তায়-রাস্তায় পোস্টার লাগাতে গিয়ে প্রথম কারাবরণ। তারপর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারির আমতলার সেই মিটিং থেকে মিছিলে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার কন্ঠস্বরের একজন তিনিও। সেদিন ভাষা শহীদ বরকতের রক্তাক্ত শরীর কাঁধে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া মুখ মুর্তজা বশীর নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতা হিসেবেও তিনি প্রতিবাদে সামিল হন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল জীবনের সবচাইতে বড় সুখ কোনটি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন আমি একুশের সৈনিক। ভাষা আন্দোলনে যোগ দেয়া আমার জীবনের সেরা অর্জন। গভীর অন্তঃদৃষ্টির, জীবনের প্রতি মমত্ববোধ, কৌতূহলী সত্তা, আর নবীন আত্মার প্রাণবন্ত মানুষ মুর্তজা বশীর। কখনো কখনো জেদ তাঁকে উৎকর্ষের দিকে উৎরে দেয় কখনো অভিমানী মন তাঁকে কবি করে তোলে। কখনোবা ছেলেমানুষী মন তাঁর পিকাসোর সাথে পাল্লা দিয়ে ৯২ বছর বাঁচবার আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ করে রাখে এইসব কিছু মিলিয়ে শিল্পী মুর্তজা বশীর আমাদের কাছে উপস্থাপিত হন বহুমাত্রিক প্রতিভার সাক্ষর হয়ে। তাঁর প্রতিভার নানান স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন কিন্তু সেই স্বীকৃতি তাঁর খুব আকাঙ্ক্ষার কিছু নয়। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন পুরস্কার সম্মাননা পদক এসব আসলেই প্রতিভার প্রকৃত মূল্যায়ন নয়, এগুলো কেবল উৎসাহের ব্যঞ্জনামাত্র। তবুও আমরা যারা তাঁর অনুরাগী, শিষ্য ,দর্শক এবং শুভাকাঙ্ক্ষী তাদের কাছে তার যে-কোনো সম্মাননাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রিয়। তাই এ-বছর তার স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তি আমাদের জন্যেও অত্যন্ত আনন্দের এবং গৌরবের। জয়তু শিল্পী মুর্তজা বশীর।

- Advertistment -