আমার বাবার ছবি

মিলন বনিক

বুধবার , ৮ আগস্ট, ২০১৮ at ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
68

রোদেলা কিছুতেই ছবির সাথে বাবাকে মিলাতে পারে না। যতবারই চেষ্টা করে ততবারই মুখ ভেংচি কেটে বলে, ধুত্তোরি! কিছুই তো মিলছে না।

শফিক সাহেবও বিরক্ত বোধ করেন। কতক্ষণ আর ছোট্ট মেয়ের সামনে এভাবে ছবির মতো পোজ দিয়ে বসে থাকা যায়? নিজের মেয়ে। আবদারও ফেলতে পারেন না। যদি বলেন, আমার আর ভালো লাগছে না। আমি খুব ক্লান্ত। রোদেলা তা বুঝবে না। অমনি সাথে সাথে আড়ি দিয়ে বলবে,

যাও, তোমার সাথে আর কথা বলবো না।

সেই আড়ির ভয়ে শফিক সাহেব প্রতিদিন মেয়ের আবদার সহ্য করে যাচ্ছেন।

শফিক সাহেবের দীর্ঘ হৃষ্টপুষ্ট শরীর, চওড়া বুক, মাথা ভর্তি চুল, মোটা গোঁফ। ঈদ কিংবা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে পায়জামা পাঞ্জাবি পরলে বেশ মানায়। সেদিন চশমাটা বদলাতে গেলো দোকানে। গোঁধরে বসলো রোদেলা। বললো,

মোটা কালো ফ্রেমের চশমা নাও।

সে কী মা! মোটা ফ্রেমের চশমা আমাকে মানায় না। আমার আগের ফ্রেমটাই ভালো। তোর মা’রও পছন্দ।

আমিও তো তোমার মা। ভালো ছেলেরা মায়ের কথা শোনে। জানো তো?

শফিক সাহেব না হেসে পারেন না। পাকা মেয়ে। বাবাকে শাসন করতে শিখেছে। অগত্যা মোটা ফ্রেমের চশমাটাই নিতে হলো। রোদেলা দোকানিকে জিজ্ঞাসা করে,

আমার বাবাকে দেখতে কেমন লাগছে বলুন তো? সত্যি করে বলবেন।

দোকানদার একগাল হেসে খুশি হয়ে বলে,

এক্কেবারে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মতো।

রোদেলা খুশি হয়। সে আসলে বঙ্গবন্ধুর এই চশমাটাই বাবার জন্য কিনতে চেয়েছিলো। বিব্রত বোধ করছেন শফিক সাহেব। ভাবলো ইয়ার্কি হচ্ছে। মেয়ের সামনে কিছু বলতেও পারছে না। রোদেলা দাদুর কাছে গল্প শুনেছে। মাবাবার কাছে শুনেছে। বইতে পড়েছে। জাতির পিতা মানে বঙ্গবন্ধু। অথচ জাতির পিতার সাথে নিজের বাবার মিল খুঁজে পাচ্ছে না। বঙ্গবন্ধুর ছবিটা হাতে নিয়ে একবার বাবার ছবি দেখে, একবার বঙ্গবন্ধুর ছবি। কিন্তু কোনো মিল নেই। এটাই রোদেলার দুঃখ।

এবার ভাবছে, চশমাটা তো কেনা হলো। বাবাকে এই চশমাটা পরলে কিছুটা বঙ্গবন্ধুর মতো লাগে। পায়জামা পাঞ্জাবি তো আছেই। মুজিব কোট পরা বঙ্গবন্ধুর ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভাবে, একটা মুজিব কোট হলে আমার বাবাকেও ঠিক বঙ্গবন্ধুর মতো লাগবে। তাহলে জাতির পিতা আমার পিতা হয়ে যাবে। আর একটা ব্যাপারে কোনো মিল খুঁজে পায় না রোদেলা। তা হলো, যতগুলো ছবি দেখেছে, তাতে জাতির পিতার চুলগুলো উল্টো করে আঁচড়ানো। শফিক সাহেব চুল আঁচড়ান ডান দিকে সিঁথি কেটে। চুলগুলোও ছোট করে ছাঁটা।

এবার ধরলো ছোটচাচাকে। ছোটচাচা সারাক্ষণ মিছিল মিটিং নিয়ে থাকে। যখন কোনো সভা সমিতিতে বক্তৃৃতা দিতে যায় তখন মুজিব কোট পরে যায়। শফিক সাহেব কখনও মুজিব কোট পরেন না। ছোট চাচার আলমিরায় মুজিব কোট ভাঁজ করা আছে। আলমিরা থেকে মুজিব কোট নামাতে দেখে ছোটচাচা জিজ্ঞাসা করে

কি করছিস?

কিছু না। কোট নিচ্ছি।

কার জন্য?

বাবার জন্য।

কেন।

জাতির পিতা সাজাবো।

কিন্তু আমার কোট তো ভাইয়ার গায়ে হবে না।

হবে, হবে। আচ্ছা তুমি মুজিব কোট পরো কেন?

আমার ভালো লাগে, তাই।

কিন্তু তোমার তো গোঁফ নেই। তোমাকে দিয়ে হবে না।

এই বলে দ্রুত বাবার কাছে গেলো। বাবাকে বললো,

বাবা, এটা পরো।

এসব তুই কী শুরু করেছিস মা।

কিচ্ছু হবে না। তুমি আগে পরো তো। আমি দেখি।

শফিক সাহেব মেয়ের কথামতো আগে পায়জামাপাঞ্জাবি পরলেন। তারপর কোট গায়ে জড়াতে জড়াতে বললেন,

তিনি কত্তো বড় মহান মানুষ! আমি কি কখনও তাঁর মতো হতে পারি? শেখ মুজিব তো শেখ মুজিবই। তাঁর মতো দ্বিতীয় আর কেউ নেই। শুধু পোশাক পরলেই কি শেখ মুজিব হওয়া যায় রে মা?

প্রতিবাদ করলো রোদেলা।

তা হবে কেন? তুমি তো জানোই, ১৫ আগস্ট জাতির পিতার মৃত্যুদিন। তাই তো আমি আমার পিতার মধ্যে জাতির পিতার ছবি দেখতে চাচ্ছি।

সেদিন সন্ধ্যায় চাচার সাথে বঙ্গবন্ধুর অনেক গল্প শোনে রোদেলা। তাঁর ছোটবেলার গল্প। যতবারই বঙ্গবন্ধুর কথা উঠেছে ততবারই বইতে খুঁজে পাওয়া বঙ্গবন্ধুর ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠে। সেই সাথে রোদেলার বাবার ছবিটাও। গল্প শুনতে শুনতে চাচার গলাটা ভারী হয়ে আসে। পরের গল্পটা নির্মম, নিষ্ঠুর। পনেরোই আগস্টের কালো রাত্রির গল্প। রোদেলার আর শুনতে ভালো লাগেনি।

শফিক সাহেব বিছানায় হেলান দিয়ে বই পড়ছেন। চোখে মোটা ফ্রেমের পুরু চশমাটা তখনও আছে। রোদেলা দৌড়ে এসে চশমাটা খুলে নিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। কিছুতেই ছাড়ে না। শফিক সাহেব যতই জিজ্ঞাসা করেন, কী হয়েছে মা? আমাকে খুলে বল। চাচু বকেছে?

রোদেলা কিছুই বলে না। শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে——–

x