আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমার আঙিনা দিয়া!

পূর্বাঞ্চল রেলের জন্য আনা কোচ যাচ্ছে পশ্চিমে

শুকলাল দাশ

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ
315

কোচগুলো আনা হয়েছিল রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জন্য। এসেছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ট্রায়ালও হবে এখানে। কিন্তু একে একে চলে যাচ্ছে পশ্চিমাঞ্চলে। এ খবর জেনে সোনার বাংলা ও সুবর্ণ এক্সপ্রেসের কয়েকজন যাত্রী বললেন, ‘আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমার আঙিনা দিয়া’। কথাটা চণ্ডিদাসের। চণ্ডিদাস প্রেমকেই জগৎ বলে জেনেছেন। তিনি দুঃখের কবি। যাত্রীদের রসিকতায়ও যেন দুঃখের ছোঁয়া।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০০ যাত্রীবাহী মিটারগেজ কোচ আমদানির প্রথম ও দ্বিতীয় চালানে ৪৮টি অত্যাধুনিক কোচ চট্টগ্রাম এসেছে। প্রথম চালানে ২৬টি, গত সপ্তাহে দ্বিতীয় চালানে ২২টি কোচ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। বন্দর থেকে মিটারগেজের কোচগুলো পাহাড়তলী কারখানায় নেয়া হয়েছে। এখন ইন্দোনেশিয়ার প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে যৌথভাবে আনুষঙ্গিক সংযোজন ও রেললাইনে চলাচলের উপযোগী করে ট্রায়ালের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক।
এর আগে একই প্রকল্পের অধীনে পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ৫০টি ব্রেডগেজ কোচ এসেছিল এবং নতুন এই কোচ দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে নতুন ট্রেন চালুর পাশাপাশি পুরনো বগি পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু পূর্বাঞ্চল জুড়ে শুধু মিটারগেজই চলে। নতুন ২০০ কোচের মধ্যে ৪৮টি কোচ চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পাহাড়তলী কারখানায় আসার পর চট্টগ্রামবাসী মনে করেছিল অত্যাধুনিক কোচগুলো এখানে সংযোজন হবে। কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোর পুরনো বগির স্থলে নতুন বগি সংযোজিত হবে। কিন্ত পূর্বাঞ্চলের যাত্রীদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। প্রথম চালানের সব বগি পশ্চিমাঞ্চলে চলে গেছে। গত সপ্তাহে যে ২২টি বগি এসেছে সেগুলোও পশ্চিমাঞ্চলে চলে যাবে বলে জানান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের যাত্রীরা জানান, বর্তমান সরকারের আগের দুই মেয়াদের রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক পূর্বাঞ্চলের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান মন্ত্রী পশ্চিমাঞ্চলীয় নীতিতে (পশ্চিমাঞ্চলের প্রতি) বেশি ঝুঁকে পড়েছেন বলে তাদের অভিমত।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ গতকাল আজাদীকে জানান, এখন যে কোচগুলো এসেছে সব পশ্চিমাঞ্চলে চলে যাবে। রেলের পশ্চিমাঞ্চলের অবস্থা খুব খারাপ। ওখানে চাহিদা বেশি। যাত্রীদের তুলনায় ট্রেন কম। এর মধ্যে নতুন ২/৩টি ট্রেন চালু হয়েছে। আরো কিছু নতুন ট্রেন চালু করবে, ট্রেনের বগি পরিবর্তন করা হবে। পরবর্তীতে যেগুলো আসবে সেখান থেকে পূর্বাঞ্চল নতুন ট্রেন পাবে।
যাত্রীদের চাহিদা থাকার পরও কেন পূর্বাঞ্চলে নতুন ট্রেন নামানো হচ্ছে না? জবাবে তিনি বলেন, পূর্বাঞ্চলের অবস্থা ভালো। এখানে কোনো ট্রেনের বগি খারাপ নেই। তিনি জানান, সিলেট রুটের সব ট্রেনের বগি ভালো। পূর্বাঞ্চলে নতুন ট্রেনের বিষয়ে বলেন, এগুলো সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে। আর এখানে নতুন ট্রেন নামিয়ে কি করবে? এখানে তো চাহিদা নেই। চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে যাত্রী থাকলেও চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে এখন টিকিটের সংকট নেই। চট্টগ্রাম থেকে যাওয়ার সময় যাত্রী পাওয়া গেলেও ঢাকা থেকে আসার সময় অনেক ট্রেন খালি আসতে হয়। ২০০ মিটারগেজ কোচ আসবে। তখন পূর্বাঞ্চলে নতুন ট্রেন চালানো হবে এবং কিছু কিছু ট্রেনের পুরনো বগি মেরামত করা হবে।
এদিকে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তৃতীয় চালান আসবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক মো. মহিউদ্দিন। তিনি জানান, তৃতীয় চালানে আরো ২২টি মিটার গেজ বগি আসবে।
ইন্দোনেশিয়া থেকে পানামার পতাকাবাহী এমভি হোসি ক্রাউন জাহাজ এসব কোচ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধার এসব কোচের প্রতিটির দাম পড়েছে গড়ে তিন কোটি পাঁচ লাখ টাকা। এভাবে প্রতি মাসে একটি করে চালান চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছাবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক। নতুন আনা কোচগুলোর মধ্যে রয়েছে মিটারগেজের ৫৫ আসনের পাঁচটির এসি চেয়ার কোচ, ৬৬ আসনের ১৬ শোভন চেয়ার কোচ, ১৭ বার্থে ৩৪ আসনের ২টি এসি স্লিপার কোচ, একটি পাওয়ার কার ও ২টি ডাইনিং ব্রেক এবং ১৬টি শোভন চেয়ার কোচ।
পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান আজাদীকে জানান, নতুন এই কোচগুলো উন্নতমানের। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। কোচগুলোতে বায়ো-টয়লেট যুক্ত থাকছে। প্লেনের মতো বায়ো-টয়লেট পদ্ধতি থাকায় রেললাইনে কোনো মলমূত্র পড়বে না। ফলে পরিবেশ যেমন দূষণ হবে না, তেমনি ট্রেনগুলোও ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ও দূষণমুক্ত থাকবে। এসব কোচ সহজে নষ্ট হবে না। প্রতিবন্ধীদের জন্য স্পেশাল চেয়ারের ব্যবস্থা থাকবে। সামনে টেলিভিশনের মতো মনিটরিং পর্দা থাকবে, ট্রেন কোথায় থামছে সেটি স্ক্রিনে দেখা যাবে। একইসঙ্গে কত গতিতে ট্রেনটি চলাচল করছে তাও দেখা যাবে। এর আগে দেশে এমন অত্যাধুনিক বগি আনা হয়নি। নতুন ২০০টি মিটারগেজ ক্রয়ে ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রেলওয়ের তথ্যমতে, রেলওয়ের মিটারগেজ ও ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্পের অধীনে ইন্দোনেশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান পিটি ইনকা রেলওয়ে ইন্ডাস্ট্রি থেকে এসব মিটারগেজ কোচ আমদানি করা হয়েছে। এতে অর্থায়ন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

x