আমার দেখা তওফিক ভাই

জিনাত আজম

মঙ্গলবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ
20

তাঁর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত ১৯৯৫ ইংরেজিতে। কোন এক শুভক্ষণে। শুভক্ষণ এই কারণেই বলি যে, সেই থেকে ২০১৮ ইংরেজির ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত কখনোই দুই কথা হয়নি। দুই যুগ। একইরকম বেশবাস, আচার-আচরণে ও চলায় বলায়। ছিলো না কোনো ব্যতিক্রম। উনার মেজ মেয়ে ফারহানা তেহসীন মুনমুন আমার পুত্রবধূ। আতিকের বউ। আমার বড় ছেলে আতিক উল আজম খানের সাথে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কথা বলার জন্যই আমরা দু’জনা গিয়েছিলাম উনার বাসায়। কুশল বিনিময় হলো। বিয়ের প্রস্তাব নিয়ম অনুুযায়ী মামা, চাচা ও খালুদের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিলো আগেই।
আমরা অর্থাৎ আমি ও আজম সাহেব। সামনে বসা তিনি আর আমিনা ইসলাম। কথা মনে হয় আমরাই বলে যাচ্ছিলাম। তাঁরা দু’জনা ছিলেন উত্তম শ্রোতা। মনে মনে ভাবছি হবু বেয়ান যাও দু একটা বলেন, ভদ্রলোকের তো মুখে ভাষাই নেই। ঠোঁটে কেবল স্মিত হাসি। যাও দু’একটা বলেন তাও এত নিম্নস্বরে যে কান পেতে শুনতে হয়। সামলে নিচ্ছেন তাঁর বেগম অর্থাৎ আমার হবু বেয়ান। যা হোক, কথা হলো। দু’ কথা নয় এক কথাই। যা যা বললাম আমাদের মতামত ওই পক্ষে কেবলি ঘাড়কাত। আমরা দুই পক্ষই খাস চাটগাঁইয়া। আত্মিয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবই বেশী। কাকে রাখি কাকে বাদ দেই। শেষতক মনে মনে আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম ওই পক্ষকে বেশী চাপ দেব না। ওয়ালিমায় বেশীর ভাগকে ডাকবো। আর চট্টগ্রামের সংস্কৃতির বিপক্ষে- নববধূর রুম ফার্নিচার ইত্যাদি সহকারে আগেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অতএব সব লৌকিকতা বাদ। বৌ ছাড়া আর কিছুরই দরকার নেই। তাই বলতে দ্বিধা হয়নি এতটুকুও।
হবু বেয়ান রাঁধেন ভালো। টেবিল ভরা নাশতা। খেলাম। কথা বললাম এবং হাসিমুখে ফিরে এলাম ওই বাড়ি থেকে দুজনে। আমিনা ইসলামের বাড়ি সিলেট। তারও আগে জামসেদপুর। সুতরাং তাঁকে জানাতে হলো রমজানে ইফতারী, ঈদের সাওগত, কোরবানীর গরু, খাসী এইসব লৌকিকতা সব বাতিল। তবে টিফিন ক্যারিয়ারে আদান প্রদান চলবে। সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবেই বিয়েটা হলো। অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে। ওই বিয়ের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তৌফিক ভাই কটা কথা বলেছেন, মনে হয় গুনতে চাইলে গুনতে পারতাম। আমিনা ইসলাম তার জামসেদ পুরের স্টাইলে আমাকে সম্বোধন করেন। জিনাত বাজী (আপা) বলে। আমিও সেই মতই ডাকি আমিনা বাজী বলে।

স্বামী-স্ত্রী দু’জনাই যেন একে অন্যের পরিপূরক। কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেছেন এমন শুনিনি। ঝগড়া রাগ করেছেন কিনা জানি না। অন্তত এই দীর্ঘদিনে আমার কানে আসেনি। চোখেও পড়েনি। তবে মেয়েদেরকে খুউব ভালো শিক্ষা দিয়েছেন। ৪ মেয়ে ১ ছেলে সবাই উচ্চ শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। মেয়েদেরকে বিয়ের পর বিদায়ের সময় বলে দিতেন “আমাদের বাড়ির নিয়ম ভুলে যাও। শ্বশুর বাড়ির নিয়মেই এখন থেকে চলবে।” ঐটা ছিলো তাঁর কঠোর নির্দেশ।
তওফিক ভাই এর কথার আগে তাঁর জীবন সঙ্গিনীর কথা বলছি। মাঝে মাঝে গোলাপী সুন্দরী নামে ডাকতাম। এই ভদ্র মহিলার মত এত ভালো ও বুঝদার মানুষ আমি খুউব কমই দেখেছি। আমার ছোট ছেলের বৌ আর তার মা-খালারাও সবাই খুউব চমৎকার মনের মানুষ। এদিক দিয়ে আমি খুউব ভাগ্যবতী বলতে হয়।
এবারে তওফিক ভাই এর কথায় আসি। বাড়ি ফটিকছড়ির দৌলতপুরের প্রফেসর বাড়ি। বাবা চট্টগ্রাম কলেজের এ্যারাবিকের প্রফেসর ছিলেন। ছেলের নাম মনে হয় তিনিই রেখেছিলেন। মোরতজা তওফিকুল ইসলাম। ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ পেরিয়ে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেন। কিন্তু ডাক্তারী পড়তে গিয়ে তৃতীয় বর্ষের পরই স্টেথেস্কোপ ফেলে গলায় ক্যামেরা ঝুলালেন। এখানেই পূর্ণাঙ্গ সাফল্য তাঁর হাতে ধরা দিলো। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী। বিয়ের পর থেকেই তাঁকে যত দেখেছি কেবল অবাকই হয়েছি। ঘর বোঝাই দেশ বিদেশের অজস্র পুরস্কার ও সার্টিফিকেট। বাংলা ইংরেজির কথা বাদই দিলাম। উর্দু, ফারসী ও আরবিতে তিনি ছিলেন দক্ষ। তাঁর কলেজের বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক সচিব মরহুম জনাব আবদুশ শাকুর, ইয়াসীন চৌধুরী (চান্দগাঁও চৌধুরী বাড়ির ছেলে) আর নোবেল লরিয়েট ড. মোহাম্মদ ইউনুস। ড. ইউনুস যেদিন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন সেদিনের দৈনিক প্রথম আলোর ১ম পৃষ্ঠায় আবদুশ শাকুর আর তওফিকুল ইসলামের দুটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিলো।
তিনি যখন আলোকচিত্রে নাম লিখালেন, সেই সময়ে এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর মানুষ কমই ছিলো। এভাবেই চট্টগ্রামের বিপনী বিতানে একদা প্রতিষ্ঠিত হলো ফটোরামা।
আমার বেশ মনে পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালিন ফটোরমাতে গিয়ে দুটো ছবি তুলেছিলাম। সেদিন যে তরুণটি আমার ছবি তুলেছিলেন, বেয়াই হবার পর তাঁর ঘরে সেই যৌবনকালের ছবি দেখে মনে পড়লো-এই তো সেই। কে জানতো, পরিণত জীবনে আমরা আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ হবো। এটা নিয়ে হাসি মস্করাও অনেক করেছি। তিনি কেবলই মৃদু হাসতেন।
একদিন তাঁর বাসায় গিয়ে দেখি বেশ বড় একটা কার্টন। এতে কি? প্রশ্ন করতেই মৃদু জবাব ১ম পুরস্কার। ফিলিপ্‌্‌স কোম্পানি দিয়েছে। ক্যানো?
“জীবনের জন্য আলো; আলোর জন্য ফিলিপস্‌্‌।” এই বিজ্ঞাপনটি তৈরির জন্য। চমৎকৃত হয়েছিলাম। মাঝে মাঝে দু’একটা কবিতাও লিখতেন। কিন্তু সরবে না নীরবে। প্রচারবিমুখ এই মানুষটি মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে লিখেছিলেন সেটাও আমরা পেয়েছি তাঁর চির বিদায়ের পর।
“বয়স আমার আশি
তাইতো বলি, এখন তবে আসি……।
আশ্চর্য যেই কথা সেই কাজ। নিজের ইচ্ছেমতই যেন বিদায় নিলেন চিরদিনের জন্য। অথচ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা বলতে তেমন কিছুই ছিলোনা। ইদানিং কেবল ভুলে যাচ্ছিলেন। গত মাসে সপরিবারে কক্সবাজার গিয়ে হারিয়ে গেলেন বীচে। সাথে মোবাইল নেই। কোন নাম্বারও স্মরণে নেই। এমনকি হোটেলের নামও স্মরণ করতে পারছিলেন না। ওদিকে ছেলে-বৌ-স্ত্রী সবাই পাগলপারা। হঠাৎ করেই আতিকের সেল নম্বর স্মরণে আসায় একজনকে জানালেন। তিনি আতিককে জানাতেই এখান থেকে খালেদকে (ছেলে) জানানোর পর মধুরেন সমাপয়েত। মৃত্যুর আগের শুক্রবারে আমরা সবাই একত্রে কাপ্তাই গেলাম। ঢাকা ও সিঙ্গাপুর থেকে মেয়েরা জামাইরা এসেছে। দিব্যি ঘোরা হলো। অনেক সিঁড়ি ভেঙে বোটে চড়লেন। অসুস্থতার বা দুর্বলতার কোন লক্ষণই দেখিনি। অথচ পরের বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায়, ১৪ ডিসেম্বর প্রিয় জীবন সাথীর কোলে মাথা রেখেই বিদায় নিলেন। (ইন্নালিল্লাহি …. রাজেউন) এমন শান্তির ও স্বস্তির নিরব মৃত্যু খুব কমই দেখেছি।
তাঁর দাফনের পর এক শিক্ষার্থী (পুরানো দিনের) ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানালেন তার স্ত্রী একটি নাক ফুলের বায়না ধরেছিলো। কিন্তু জিনিসটা তার পছন্দ নয় বলে কিনে দেননি। বলেছিলেন-বেদেনীর মত লাগে। তৌফিক ভাই তার মুখে চুপচাপ কথাটা শুনলেন। পরদিন তার বাসায় একটা নাকফুল নিয়ে হাজির। এমন অনেক ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন জীবনে। অনেক অসহায় মেয়েকে সহায়তা দিয়েছেন। বাড়িতে রেখেছেন পর্যন্ত। অবশ্য তাঁর জীবন সাথীর পূর্ণাঙ্গ সহায়তা ছিলো।
তিনি ছিলেন একাধারে আলোকচিত্রী, আলোকচিত্রী বিচারক, স্টুডিও মালিক কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতি, চট্টগ্রাম রাইফেলস ক্লাবের প্রাক্তন যুগ্ম সম্পাদক, চট্টগ্রাম কলেজ প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, প্রাক্তন ইউটিসি ক্যাডেট। বাংলাদেশ ক্যাডেট এসোসিয়েশনের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, লায়নিজমের সাথে জড়িত ছিলেন আজীবন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিয়ে, বৌভাত অনুষ্ঠানের আলোচকচিত্রও তিনিই ধারণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বহু ছবি তিনিই ধারণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তাঁকে ২০১৩ সালে “আলোকচিত্র যশস্বী” খেতাবে ভূষিত করেন।
এই গুনী মানুষটি আজ আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু তার স্মৃতি চিরদিন আমাদের হৃদয়ে থাকবে অমলিন হয়ে। মহান করুণাময়ের কাছে তার মাগফিরাত কামনা করছি, আমিন। একজন সফল আলোকচিত্রী হিসাবে সবার অন্তরে তিনি চির জাগরুক হয়ে থাকবেন।

x