আমার তিন প্রশ্ন

মাধব দীপ

মঙ্গলবার , ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
19

গত ১৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠার ৫২ বছর পার করলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এই সুদীর্ঘ সময়েও কি বিশ্ববিদ্যালয় সুস্পষ্ট করে দিতে পেরেছে যে- চাকরির জন্য পড়াশোনা আর মানুষ হওয়ার জন্য পড়াশোনা- এক কথা নয়? প্রথম উদ্দেশ্যটা শিক্ষার্থীর জীবন ধারণের জন্য জরুরি হতে পারে কিন্তু অন্যটা মানবমুক্তির জন্য আবশ্যক। আমি মনেকরি, একজন শিক্ষকের নিজস্ব চারিত্রিক গুণ, শিক্ষাপদ্ধতি ও তাঁর যাপিত জীবনের আদর্শ-ই শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা যা বলেন তা নয় বরং যা করেন তা-ই শিক্ষার্থীদের মানসভূমকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। মাঝে-মাঝে- পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাই। এটা সত্য যে- জীবনটাই একটা সংগ্রামের নাম। এখানে চলার পথে আনন্দ-নিরানন্দের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ব্যর্থতা কিংবা বিফলতা, হতাশা কিংবা বিষাদের বড় বড় ‘দৈত্য’র মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সংগ্রামমুখর জীবন থেকেই তো সত্যিকার জীবনের ‘বেঁচে থাকার পাঠ’ পাওয়া যায়। এটা ধ্রুব সত্য যে- পৃথিবীতে এমন কোনো মহামানব বা মানব সন্তান কখনো জন্মেনি, কিংবা ভবিষ্যতেও জন্মাবে না- যাঁর জীবনে কোনো দুঃখ নেই বা ছিলো না কিংবা কোনো সংগ্রাম নেই বা কখনো ছিলো না অথবা থাকবে না। তাই- জীবনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে জীবনের মাঠ থেকে পালিয়ে যাওয়ার নাম কখনোই শিক্ষা হতে পারে না। এ ধরনের পলায়নপর মানুষের সাথে প্রাণির কোনো পার্থক্য নেই- পার্থক্য থাকে না। ইউটোপিয়া (টঃড়ঢ়রধ) আক্রান্ত জীবন- যে জীবনের কল্পনার সাথে বাস্তবতার মিল বড় সামান্য- সেই জীবনের তুলনায় লড়াইমুখর জীবনই যে মানুষকে পৃথিবীতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে অনেকবেশি সক্ষম করে তোলে- এই সহজ সত্য অনুধাবন করাতে হবে শিক্ষার্থীদের। এই দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষকদেরই। মহান পণ্ডিত চাণক্য একবার তাঁর শিষ্য চন্দ্রগুপ্তকে পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছিলেন- ‘গুরুকূলের সব কথাই হয় পূর্ব নির্ধারিত- সকল প্রশ্ন, সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর। পড়ানোর আগেই একজন গুরু জানেন যে- তিনি কী পড়াবেন আর একজন শিক্ষার্থীর অনুভূতিতেও সবসময় থাকে কোনো না কোনো গ্রন্থ। কিন্তু জীবনে কোনোকিছুই পূর্ব নির্ধারিত থাকে না। না প্রশ্ন, না উত্তর। সাহায্যের জন্যও থাকে না কোনো গুরু বা কোনো গ্রন্থ। নিজেকেই সেইসব প্রশ্নের যোগ্য উত্তর বের করে নিতে হয়। এমনকি জীবনের প্রত্যেক পরিস্থিতির পরিণতিতে একের অধিক উত্তরও থাকতে পারে, সেখান থেকে সঠিক উত্তর নির্ণয় করতে হয় কারও কোনো সহযোগিতা ছাড়াই।’ বলাই বাহুল্য যে- জীবনের নানাবিধ সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে কিংবা পরিপূর্ণ জীবনের আদর্শের খোঁজ শিক্ষার্থীরা কোথায় পাবে? -এ নির্দেশনা একজন শিক্ষার্থী তার মেন্টর তথা শিক্ষকের কাছেই পাওয়ার কথা। এই জায়গায় কি আমরা এখনো প্রকটভাবে ‘শূন্যতা’ অনুভব করছি না?
প্রশ্ন দুই. প্রিয় পাঠক, আরেকটি ব্যাপারে কথা বলতে চাই। আর সেটির সঙ্গে বোধ করি আপনারাও একমত হবেন যে- গবেষণা শব্দটি যে বৃহাদাকার প্রতিষ্ঠানের সাথে সবচেয়ে বেশি যায়- যে প্রতিষ্ঠানের সাথে গবেষণা ধারণাটি আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে আছে- সেই প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। পুরো পৃথিবীব্যাপীই বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয়ে থাকে গবেষণার সূতিকাগার। বলার দরকার পড়ে না যে- যেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যতো বেশি উন্নত, সেসব দেশ ততো উন্নত। আর অনিবার্যভাবেই- বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকজন ফ্যাকাল্টি বা শিক্ষক হয়ে থাকেন এককেজন সেরা গবেষক। সমাজ, জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক যে-কোনো দিক থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে বিশ্বনাগরিক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। যাঁদের প্রধান কাজ হচ্ছে গবেষণায় নিবেদিত প্রাণ হওয়ার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের অংশীদার হওয়া। কিন্তু যদি বলি- আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর যে শ’খানেক গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন অনুষদের জার্নালে ছাপানো হয়- এগুলোর আসলে পাঠক কে বা কারা? গবেষক, গবেষণার রিভিউয়ার ও সংশ্লিষ্ট প্রকাশনার সাথে জড়িত দুয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ গবেষণা প্রবন্ধ আর কেউ কি পড়েন সচরাচর? কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী এই সমস্ত গবেষণা জার্নাল পড়েছে বা পড়ছে এমনটা আমি কখনো শুনিনি। যে শিক্ষক যে বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে পড়ান, সেই বিষয়সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রবন্ধই সাধারণত সেই শিক্ষক লিখে থাকেন। এদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এটাই সাধারণ চর্চা। প্রায় শতভাগ গবেষণানির্ভর জার্নালেও আমি এমনটাই দেখেছি। তাহলে- যৌক্তিকভাবেই সেগুলো পাঠের প্রাসঙ্গিকতা শিক্ষার্থীদের রয়েছে। কিন্তু, শিক্ষার্থীরা সেসব গবেষণা প্রবন্ধ পড়ার কোনো সুযোগ আমাদের এখানে এই গত ৫২ বছরেও তৈরি হয়েছে কি? প্রায়ই পত্রিকার পাতায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখি- ‘অমুকে’ ‘অমুক’ বিষয়ের ওপর এমফিল, পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন- কই তাঁদের কেউ তো এটা বলেন বা লেখেনা যে- তাঁর ‘গবেষণাকর্ম’ ‘এই-এই জায়গায়’ গেলে, ‘এই-এই লিংকে’ গেলে পাওয়া যাবে?
যাক সে কথা। অন্যভাবে যদি বলি- শিক্ষার্থীরা যদি তাঁদের নিজের শিক্ষকদের গবেষণা প্রবন্ধও পড়ার সুযোগ না পান বা সেসব পড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ উস্‌কে না দেওয়া যায়- তবে সমাজের নতুন কোনো তথ্য, তত্ত্ব, বা উদ্ভাবন বা সমাধান সম্পর্কে তাঁরা কীভাবে জানবেন? সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নয়নে তাহলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কীভাবে সম্ভব? বিশেষ করে কলা, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান শাখার উপর লিখিত প্রবন্ধগুলো সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কতোটুকুই বা ভূমিকা রেখেছে? আচ্ছা, সাংবাদিকতা বিভাগের সিলেবাস তৈরির সময় আমরা কি এ সংক্রান্ত গবেষণাপ্রবন্ধ আমাদের সামনে রাখছি?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এতো বছর পরও কি আমরা এই দিকটায় মনোযোগ দিতে পেরেছি? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে- ওই গবেষণাগুলো কেবল গ্রন্থগত হয়েই থাকে। তবে কাজের কাজ যেটি হয় সেটি বলতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেই হয়। কারণ, এসব প্রবন্ধ লেখা বা ছাপানো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পদোন্নতির অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু এর বিনিময়ে ব্যক্তিশিক্ষকের পদোন্নতি ঘটলেও সমাজের কি উন্নতি হলো- সেটি ভেবে দেখা কি জরুরি নয়? আমি মনে করি- এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অন্তত: এসব প্রবন্ধ বা জার্নাল প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানো জরুরি। শিক্ষার্থীদের ভিতর গবেষণামুখী প্রবণতা সৃষ্টি করার এটি একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি এ বিষয়টি খেয়াল করছে? আমরা করছি কি?
প্রশ্ন তিন. আমার শেষ প্রশ্ন- বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ থিওরি (তত্ত্বীয়) ক্লাস এখনো ৪৫ মিনিটের। সেটা শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান আমলে মানে খুব সম্ভবত ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই। যেখানে আগে ক্লাসসাইজ ছিলো ১৫ জনের; এখন সেখানে ৮০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। আগে যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একপক্ষীয় (ওয়ানওয়ে) যোগাযোগের মাধ্যমে পাঠদান করা হতো এখন সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ামূলক পাঠদানের বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। তাহলে- এতোবছর পরও সেই একই সময় কীভাবে বরাদ্দ করা আছে একটি থিওরি ক্লাসের জন্য? অধিকন্তু বলতে চাই- আমরা আর কতোকাল ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করবো? কেন্দ্রিয়ভাবে অটোমেশান পদ্ধতির জন্য অপেক্ষা আর কতোকাল?
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ॥

x