আমাদের সেবা খাতনির্ভর অর্থনীতি আশাব্যঞ্জক

বৃহস্পতিবার , ৩০ মে, ২০১৯ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
49

অর্থনীতিবিদদের মতে, মোট জাতীয় উৎপাদনকে অনেক সময় মোট জাতীয় আয় বলা হয়। যে কোনো সরল অর্থনীতিতে মোট জাতীয় উৎপাদন ও মোট জাতীয় আয় একই হতে পারে। আমরা জানি, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশে উৎপাদিত মোট দ্রব্যসামগ্রী ও সেবার আর্থিক মূল্যের সমষ্টিকে মোট জাতীয় উৎপাদন বলে। কিন্তু এর সঙ্গে সমাজের মোট আয় বা মোট ব্যয়ের সমতা নাও হতে পারে। কারণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখার জন্য ব্যবহৃত মূলধন সামগ্রী যেমন, কলকারখানা, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য মোট জাতীয় উৎপাদনের আর্থিক মূল্য থেকে কিছু অংশ পৃথক করে রাখা হয়। উৎপাদনের উপাদানসমূহের আয়ের মধ্যে এই অংশটি অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। তাই মোট জাতীয় উৎপাদনের আর্থিক মূল্য এবং উৎপাদনের উপাদানসমূহের আয় (খাজনা, মজুরি, সুদ, ও মুনাফা) বা জাতীয় আয় এক নয়। তবে আলোচনার সুবিধার জন্য অনেক সময়ই মোট জাতীয় উৎপাদন ও মোট জাতীয় আয়কে সমার্থকভাবে ব্যবহার করা হয়।

আনন্দের বিষয়, নয় মাসে সেবা রপ্তানি বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। দৈনিক আজাদীতে গত ২৯ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পণ্য রপ্তানির মতো বাংলাদেশে সেবা রপ্তানির পালেও হাওয়া লেগেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সেবা রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ ৪৩১ কোটি ৭৩ লাখ ডলার আয় করেছে। এই অংক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৪ শতাংশ বেশি। আর নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি। অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত বলেন, সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যেই ইতিবাচক হাওয়া বইছে। অর্থবছরের দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশের মতো। আর গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে আয় বেশি এসেছে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। পণ্য রপ্তানি বাড়লে সেবা খাতের রপ্তানি বাড়বে-এটাই স্বাভাবিক। কেননা, এক খাত অন্য খাতের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্কিত এবং নির্ভরশীল।
সেবাবাণিজ্যই হচ্ছে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পরবর্তী ধাপ। তিনটি মৌলিক কারণে প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে পণ্য রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, সেবা খাতে রপ্তানির সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ সেবাবাণিজ্যে দেশীয় সেবা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার মাধ্যমে বাজার সংরক্ষণ।
বলা হয়, আমাদের অর্থনীতি সেবা খাতনির্ভর। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নের প্রথম পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক দেশগুলোকে প্রথমে শিল্পভিত্তিক করে তুলতে হবে। শিল্প উন্নয়নের একটা স্তরে এসে গেলে তখন সেবা খাতের প্রাধান্য বেড়ে যাবে। উন্নয়নের অভিজ্ঞতা দেখেন, যারা আজ উন্নত দেশ এবং যারা সম্প্রতি উন্নত হয়েছে, তাদের অগ্রগতি কিন্তু এভাবেই হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে শিল্প খাত শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগেই সেবা খাতের পরিধি বেড়ে যাচ্ছে। এটা বিভিন্ন কারণে হয়। শিল্পায়ন দ্রুতগতিতে হচ্ছে না এবং তা থেকে যে পরিমাণ কর্মসংস্থান হওয়া উচিত ছিল বা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে না। সুতরাং কর্মহীন লোকগুলোকে তো কিছু করতে হবে এবং তারা সেটাই করছে নিজ উদ্যোগে। আর তাদের সিংহভাগ সেবা খাতে সংশ্লিষ্ট। উন্নয়নের এ পর্যায়ে সেবা খাত দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব, সেটা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব দেশ উন্নত হয়েছে যেমন- তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মালয়েশিয়ার সাফল্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, শিল্পায়ন প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা যদি বলি, তবে সেটা অনেক বড় একটা বিষয়। সেখানে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসহ আরো অনেক বিষয় উঠে আসবে। যেহেতু সব বিষয়ে আমার দক্ষতা নেই, সেহেতু আমি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু কথা বলতে পারি। একটি দেশের অর্থনীতির জন্য এ দুই বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বীকার করতে হবে, এখানে আমাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন আছে। কোনো দেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য প্রধানত সে দেশের অর্থনীতির প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। অর্থনীতির প্রকৃতি আবার দেশের ভূ-প্রকৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, জনগণের শিক্ষা ও দক্ষতার স্তর এবং তাদের উদ্যম ও উদ্যোগ গ্রহণের মানসিকতা এ সবকিছুর উপর নির্ভরশীল। কাজেই এ খাতকে আরো গতিশীল করার উদ্যোগ নিতে হবে।

x