আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ

ডেইজী মউদুদ

শুক্রবার , ১২ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ
99

বাংলা নববর্ষ ও বাঙালি সংস্কৃতি বৈশাখের সঙ্গে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ বাঙালির বিজয় পতাকা আকাশে তুলে ধরে। বাঙালির এই বিজয় হচ্ছে সংস্কৃতির বিজয়। এই সাংস্কৃতিক বিজয়ের ফল ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালির এই সর্বজনীন উৎসব।
আমরা নিজস্ব সত্তা ও স্বাতন্ত্র্য যে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছি এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য গ্রামীণ মেলা এখন আর আগের মতো বসে না। পুতুল নাচ, যাত্রাপালা, জারি, সারি, ভাটিয়ালি গানের দিন শেষ। গ্রামীণ খেলা, দাঁড়িয়াবাঁধা, গোল্লাছুট, কানামাছি, হাডুডু, লাঠিখেলা গ্রামীণ জনপদে তেমন একটা দেখা যায় না। কৃষিজমি দখল করে সেখানে তৈরি করা হয়েছে ইটভাটা না হয় করা হচ্ছে হাউজিং বা শপিংমল। নগরায়নের ছাপ পড়ছে সর্বত্র। এটাকে ছাপ না বলে গ্রাস বলাই সঙ্গত। নদীতে পাল তোলা নৌকা এখন আর চোখে পড়ে না। ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না ’ এ কথা এখন আর কেউ বলে না। নদী এখন ইঞ্জিনচালিত নৌকা দখল করে নিয়েছে। আর নদীর স্বচ্ছ পানি দখল করে নিয়েছে নাগরিক বর্জ্য। রাখাল গরুর পাল নিয়ে আর মাঠে যায় না। গ্রামীণ সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে দখল করে নিয়েছে নগর। যে নগর পশ্চিমা সংস্কৃতির আবহে উচ্ছ্বসিত ও ভারাক্রান্ত।
সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের দর্পণ। এটা নিরন্তর চর্চার বিষয়। মুখে এক আর কাজে অন্য এভাবে আর যাই হোক বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকে বেশিদূর এগিয়ে নেয়া যাবে না। মনুষ্যত্ব তথা মানবধর্মের সাধনাই হচ্ছে সংস্কৃতি। আমরা যা ভাবি পছন্দ করি এবং যা প্রতিদিনের জীবনাচরণে প্রতিফলিত হয় সেটাই আমাদের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানে নিজস্বতা নিয়ে সুন্দরভাবে বিচিত্রভাবে বেঁচে থাকা।
অসামপ্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে বাংলা নববর্ষ বরণ বাঙালি জাতিসত্তাকে নতুনভাবে জাগ্রত করে। সবকিছুর বিনিময়ে হলেও এ জাতি তার স্বাধীনতা রক্ষা করবে, রক্ষা করবে প্রাণের চেয়ে প্রিয় এ ভাষা, হাজার বছরের সংস্কৃতি। তারই জ্বলন্ত প্রমাণ বাংলা নববর্ষ উদযাপন।
বাঙালি জাতি গানে-কবিতায়, নানা লোকাচারে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দূর অতীত থেকেই বয়ে চলেছে নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সম্রাট আকবরের শাসনামলে কৃষিনির্ভর বাংলায় বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন চালু হয়েছিল, নানা বিবর্তনে তা আজো বহমান। এ দেশের বৃহত্তম অসামপ্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। চৈত্রসংক্রান্তির নানা লোকাচার আর নববর্ষ বরণে কৃষিজীবী সমাজের বিচিত্র আয়োজন লোকায়ত উৎসব হিসেবেও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও বৈশাখের গুরুত্ব যথেষ্ট।
পৃথিবীতে খুব কম জাতিরই নিজস্ব নববর্ষ আছে। বাঙালি সেই ঐতিহ্যবাহী গর্বিত জাতি যাদের নিজস্ব নববর্ষ, নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব শক্তিশালী বর্ণমালা, নিজস্ব ষড়ঋতু, নিজস্ব উঁচুমানের সংস্কৃতি রয়েছে- এবং সারা বিশ্বে একমাত্র বাঙালিরাই তাদের নিজস্ব ষড়ঋতুকে আলাদা আলাদা করে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেয়। বাংলাদেশ তথা বাংলা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও ছয় ঋতু নেই- এটাই বাঙালির গর্ব করার মত বিচিত্র বৈশিষ্ট্য। অসামপ্রদায়িক সাংস্কৃতিক উৎসবে এবং অপার আনন্দের সাথে বাঙালি এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছে তার প্রকৃত পরিচয়। বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে।
বাংলার নববর্ষ বৈশাখ, গ্রীষ্মকাল প্রভৃতি তখন নিদারুণ দাবদাহে দগ্ধ হতে থাকে। কাজেই কৃষিজীবী মানুষের মনে ভয়ভীতি, উত্তপ্ত এ পৃথিবী নবজলধারায় স্নিগ্ধ হবে কি না, ফসল ফলবে কি না এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে তখন কৃষককূল।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গাওয়া হতো সূর্যবঞ্চনার গান:
‘ওপর দুইটি বাওনের কন্যা মেল্যা দিছে শাড়ি
তারে দেখ্যা সূর্য ঠাকুর ফেরেন বাড়ি বাড়ি ।
ওগো সূর্যাইর মা, তোমার সূর্যাই ডাঙর হইছে বিয়া করাও না…….’ এছাড়া বৃষ্টির জল মেগে গান ধরতো ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই ….
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’
আর
কবি কাজী নজরুল ইসলাম কালবৈশাখী ঝড় দেখে গেয়েছিলেন :
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর,
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’
অজিত কুমার গুহ ‘নববর্ষের স্মৃতি’ প্রবন্ধে লিখেছেন:
‘চৈত্রের সংক্রান্তি আসার কয়েক দিন আগে থেকেই আমাদের ঢেঁকিঘরটা মুখর হয়ে উঠতো। নববর্ষের প্রথম দিন ছেলেমেয়েদের হাতে নাড়ু, মোয়া, ছানার মুড়কি ও সরভাজা দিতে হবে, তারই আয়োজন চলতে থাকতো। বাড়ি থেকে অনেক দূরে শহরের এক প্রান্তে আমাদের ছিল মস্ত একটা খামারবাড়ি। সেখান থেকে বাড়ির বাইরে গোলাবাড়িতে চৈতালী ফসল উঠতো। আর আঙিনার প্রান্তে তৈরি হতো বড় বড় খড়ের গাদা। উঠানের একধারে বড় দুটো কনকচাঁপার গাছ। এই শেষ বসন্তেই তাতে ফুল ধরতো। আর এলোমেলো বাতাসে তারই গন্ধ বাড়িময় ঘুরে বেড়াতো। কোনো কোনো দিন কালবোশেখি আসত প্রলয় রূপ নিয়ে। সারাদিন দাবদাহে উত্তপ্ত মাটিকে ভিজিয়ে দিত। কচি কচি আমগুলো গাছ থেকে উঠানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো আর ভেজা মাটি থেকে একটা সোঁদা গন্ধ নাকে এসে লাগতো। তারপর পুরনো বছরের জীর্ণ-ক্লান্তি রাত্রি কেটে গিয়ে নতুন বছরের সূর্যের অভ্যুদয় ঘটতো।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পহেলা বৈশাখে শান্তিনিকেতনে নববর্ষের অনুষ্ঠানে বলেছিলেন: ‘নতুন যুগের বাণী এই যে,তোমার অবলোকের আবরণ খোলো,
হে মানব,আপন উদার রূপ প্রকাশ কর।’
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে তিনি বলেছিলেন :
প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী, কিন্তু উৎসবের দিন মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হয়ে বৃহৎ, সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ। এই উৎসবে পল্লী আপনার সমস্ত সংকীর্ণতা বিস্তৃত হয়ে তাহার হৃদয় খুলিয়া দান করিবার ও গ্রহণ করিবার এই প্রধান উপলক্ষ যেমন আকাশের জলে জলাশয় পূর্ণ করিবার সময় বর্ষাগম, তেমনি বিশ্বের ভারে পল্লীর হৃদয়কে ভরিয়ে দিবার উপযুক্ত অবসর মেলা ।
বৈশাখে গ্রামীণ মেলার চিত্র বর্ণনায় দীনেন্দ্রকুমার রায় ‘পল্লীচিত্র’ গ্রন্থে লিখেন :
গ্রামীণ মেলায় সমপ্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা। মৈত্রী-সমপ্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র এই মেলা। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায় । এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান। গাঁয়ের বধূর ঝোঁক আলতা-সিঁদুর- স্নো-পাউডার-জলেভাসা সাবান, ঘর- গেরস্থালির টুকিটাকি জিনিসের প্রতি। আকর্ষণ তার যাত্রা বা সার্কাসের প্রতিও। আর শিশু-কিশোরের টান তো মূলত: খেলনার দিকেই। মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, টিনের জাহাজ, মুড়ি-মুড়কি, খই-বাতাসা, কদমা-খাগরাই, জিলিপি-রসগোল্লা। সবই চাই। সবার ওপরে ‘তালপাতার এক বাঁশি’।
‘সবার চেয়ে আনন্দময়
ওই মেয়েটির হাসি,
এক পয়সায় কিনেছে ও
তালপাতার এক বাঁশি ’
বৈশাখ তার রুদ্ররূপ নিয়ে আবির্ভূত হলেও তার মধ্যে একটা প্রশান্তির মায়া আত্মগোপন করে থাকে, যা মানুষ দু’হাত প্রসারিত করে বিপুল বৈভবের আনন্দে জীবনের আনন্দের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়, একটি বছরের নতুন প্রত্যাশার আনন্দে।
বাংলা কাব্য-সাহিত্যে মানুষের গ্রামীণ জীবনের যে রূপ-রস মাধুর্যতার ছবি ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই অতুলনীয়। এ দেশের কৃষকের আঙিনা যখন বৈশাখে নতুন শস্যের সুগন্ধে ভরে যায়, তখন তার দোলাও লাগে মনের মধ্যে। কৃষকবধূ আঁটি বেঁধে দাহন সাজিয়ে রাখে আর সারা মুখে আনন্দ ছড়িয়ে ঢেঁকিতে ধান ভানে দিন-রাত। নতুন চাল দিয়ে বাড়িতে তৈরি হয় পিঠে আর ক্ষীর। নতুন অন্নকে বছরের প্রথমে বরণ করার জন্যই জীবনের এই ছোট উৎসব। কৃষক আর কৃষকবধূ অপেক্ষা করে এ দিনের জন্য। সুগন্ধি তেল দিয়ে কৃষকবধূ তার খোঁপা বাঁধে। খোঁপায় রঙিন ফিতে জড়িয়ে হাতে পরে কাঁচের চুড়ি। চায়ের দোকানে আড্ডা বসে ,নাগরদোলায় চড়ে শিশুরা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। পুতুলনাচ দেখে সবাই চমৎকৃত হয়ে হাততালি দেয়।
জীবনের এই টুকরো আনন্দের মধ্যে ধরা পড়ে রূপ-বৈভবের চেতনামিশ্রিত নতুন অনুভবের উল্লাস। এ রূপ চিরন্তন, এ রূপ জন্ম দেয় এ দেশের সংস্কৃতির, যা মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বর্ষশেষে চৈত্র বিদায় নেয়। আকাশে কালো পুঞ্জমেঘ বিস্তার করে। সে মেঘে কখনো আকাশ আবৃত হয়ে যায়, মেঘমালায় । কিন্তু মানুষের জীবনে প্রত্যাশার আকাঙ্খা শেষ হয় না।
‘বর্ষশেষ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন
‘ধাও গান, প্রাণ-ভরা ঝড়ের মতন ঊর্ধ্ববেগে
অনন্ত আকাশে।
উড়ে যাক, দূরে যাক বিবর্ণ বিশীর্ণ জীর্ণ পাতা
বিপুল নিশ্বাসে।
হে নূতন, এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি
পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে
ছন্দে ছন্দে পদে পদে অঞ্চলের আবর্ত-আঘাতে
উড়ে হোক ক্ষয়
ধূলিসম তৃণসম পুরাতন বৎসরের যত
নিষ্ফল সঞ্চয়।’
একটি বছরের নিরাশা আর বেদনাকে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়তে দিতে চায় ,বৈশাখের ঝড়ে দূরে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায়। নববর্ষ মানুষকে দেয় আশা আর পরিতৃপ্তির কামনা, মন বারবার তাই বলে ওঠে :
‘ছাড়ো ডাক, হে রুদ্র বৈশাখ
ভাঙিয়ে মধ্যাহ্ন তন্দ্রা জাগি উঠে বাহির ধারে।’
বাংলা কাব্য-সাহিত্যে যোগ হলো বৈশাখী পালনের নানান গান, কবিতা ও গল্পের আখ্যান।
আধুনিক সাহিত্যে আহমদ ছফা তাঁর ‘বাঙালির পহেলা বৈশাখ’ প্রবন্ধে লিখেছেন ,আমরা ছোটবেলায় দেখেছি বেলা আট-নয়টা বাজার সাথে সাথে বাড়িতে আচার্য বামুন আসতেন। তিনি পাঁজি খুলে অনেকটা আবৃত্তির ঢঙে বলে যেতেন, এই বছরের রাজা কোন গ্রহ, মন্ত্রী কোন গ্রহ, এ বছরে কত বৃষ্টি হবে, কত ভাগ সাগরে আর কত ভাগ স্থলে পড়বে, পোকামাকড়, মশা-মাছির বাড়বে কত। তারপর আমাদের কুষ্ঠি দেখে দেখে গণকঠাকুর বলে যেতেন। এ বছরটি কার কেমন যাবে । হিন্দু পরিবারগুলোতে নাড়ু মুড়কি মোয়া এসব ভালোভাবে তৈরি করতো। মুসলমান পরিবারে এসবের বিশেষ চল ছিল না। মুসলমান বাড়ির পিঠাপুলি ও হিন্দু বাড়িতে তৈরি হতো না। আমাদের পরিবারের সঙ্গে যেসব হিন্দু পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল সেসব বাড়ি থেকে হাঁড়িভর্তি মুড়ি মুড়কি, মোয়া নাড়ু আসতো। হাঁড়িগুলো ছিল চিত্রিত। আমাদের গ্রামে এগুলোকে বলা হতো ‘সিগ্যাইছা পাতিল’। আমার মা এ হাঁড়িগুলো যত্ন করে ছাদের ওপর রেখে দিতেন। আমরা সুযোগ পেলেই চুরি করে খেতাম।
পহেলা বৈশাখের দিন ঘরবাড়ি যথাসাধ্য পরিষ্কার করা হতো। গোয়ালঘরে বিষকাটালির ধোঁয়া দেওয়া হতো।
ইংরেজ কবি টেনিসন যখন বলেন: ‘রিং আউট দি ওল্ড, রিং ইন দি নিউ
রিং, হ্যাপি বেলস, এ্যাক্রস দি স্নো
দি ইয়ার ইজ গোয়িং, লেট হিম গো,
রিং আউট দি ফলস, রিং ইন দি টু।’
তখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেখি আরেক নান্দনিক উচ্চারণ :
‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপস নি:শ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা।’
বাংলা কাব্যে বৈশাখ নিয়ে আরও পরিচ্ছন্ন একটি কবিতা পাঠককে মুগ্ধতার দিকে টেনে নিয়ে যায় । মযহারুল ইসলামের
‘ আজ আমরা এক অগ্নিবলয়ের প্রান্তে
এসে দাঁড়িয়েছি।
বাড়িয়েছি দু’হাত উত্তাপের প্রত্যাশায়
আমরা হিমশক্তি
ক্লান্ত কুয়াশার শোষণে
আমরা রসরিক্ত
আমাদের মেরুদণ্ডে বরফের তীব্র প্রদাহ
আমরা উত্তাপ চাই
আমরা উত্তাপ চাই।
এ উচ্চারণ প্রত্যাশিত প্রত্যাশার বৈপরীত্যে বহমান বাংলা কাব্যের ধারা। বাংলা কাব্যে বৈশাখ ও নববর্ষের দীপক রাগ উঁচু সুরে বাজে না, বাজে বিলম্ব লয়। বাঙালির মনন ও মেজাজের সঙ্গে তাই বৈশাখের আত্মযোগ যেন এক ক্ষীণস্রোতা নদীর মতো।
প্রাচীন বাংলার পুঁথি ও পালায়, মধ্যযুগের গানে ও গাঁথায়, কবি কঙ্কন কাজী দৌলতের বারমাস্যায় বৈশাখীর যে চিত্ত উৎসার অনুরাগবাহিত, আধুনিক বাংলা কাব্যে তার উৎসরণ তত বলিষ্ঠ নয় ।
বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ ও নববর্ষকে নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি থাকলেও আমরা দেখি বাংলা ভাষার কবিরা এই বিষয় নিয়ে কম কাব্য রচনা করেননি। তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের সঙ্গে, জীবনের সঙ্গে যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বৈশাখ। অবশ্য কবির জন্মদিনটিও বৈশাখেই। ‘ঈশানের পুঞ্জমেঘে’ ধ্বংসের ইঙ্গিত লক্ষ্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ধুলায় ধূসর বৈশাখের পিঙ্গল জটাজাল, তার ভয়াবহ রুদ্রমূর্তি প্রত্যক্ষ করি আমরা রবীন্দ্রনাথের কাব্যে। কিন্তু কালবৈশাখী ও ধ্বংসের উৎস এই বৈশাখের ধ্বংসলীলার কাছেই কবির প্রার্থনা থাকে আরেকরকম:
‘উড়ে হোক ক্ষয়
ধূলিসম তৃণসম পুরাতন বৎসরের যত
নিষ্ফল সঞ্চয়।’
রবীন্দ্রনাথের কাব্যে, গানে এই কল্যাণ প্রার্থনাই বারবার ঝংকৃত।
নীলিমা ইব্রাহীম তাঁর ‘আমার শৈশবের নববর্ষ পয়লা বৈশাখ’ আত্মজৈবনিক লেখায় সমকালীন চিত্র বিধৃত করেছেন অত্যন্ত পরিশীলিত ভাষায়
‘আজকের মতো আমার শৈশবে পয়লা বৈশাখ নীরবে আসতো না। চৈত্র মাসের শেষের দিকে সারা দিন ঢাকের বাদ্যি শুনতাম। মা বলতেন চরকের বাজনা। কলকাতায় এই বাজনা বাজলে দিদিমা বলতেন, শিবের গাজন হচ্ছে। ঠাকুমার সঙ্গে দেশের বাড়িতে গেলে তিনি বলতেন, দোল পূজার বাজনা। এই দোল ঠাকুর ঢেঁকির মতো লম্বা একখানা তক্তা মাথায় দিয়ে আসতো। নন্দীভৃঙ্গী সঙ্গে জটলাধারী দেবাদিদেব মহাদেব। ওই তক্তার গায়ে সিঁদুর লেপা ও চুল ছড়ানো। বাড়ি বাড়ি নেচে গেয়ে চাল পয়সা সংগ্রহ করে চলে যেত এরা। শুনতাম এরা শ্মশানে পূজো দেবে অর্থাৎ মহাদেবের সঙ্গে একটা ভূত- প্রেতের সম্পর্ক ছিল।
রোদ পড়তে না পড়তে নানা রকম বাঁশির আওয়াজ পেতাম। আম আঁটির ভেঁপু ক’দিন আগ থেকেই পাড়ার ছেলেরা বাজাতো। এবারের মেলা থেকে কিনে এনেছে টিনের বাঁশি, তার সুরে শ্রীরাধার পাগল হবার কথা। তবে এরা বেশিক্ষণ যন্ত্রণা দিত না। সস্তার খেলনা এত ঠুনকো থাকতো যে সহজেই ভেঙে যেত। মেয়েরা কিনতো মাটির হাঁড়ি পাতিল, রান্নাবাটি খেলার জিনিসপত্র। আর মেলাফেরত বড়দের হাতে থাকতো রকমারি ঝালর দেয়া তালপাতার পাখা। রথের মেলা থেকে যারা ফিরতেন তাদের হাতে থাকতো ইলিশ মাছ আর আনারস। কারণ সেটা হতো আষাঢ়ে আর বৈশাখে।
সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ির দোতলার হল কামরায় গানের জলসা বসতো। বাবা ভালো গাইয়ে ছিলেন। তার ক্লাবের সংগীতপ্রিয় সঙ্গীরা আসতেন। হারু কাকা আমাদের গান শেখাতেন। খুলনায় আরেকটি বাড়িতে নিয়মিত জলসা হতো। সেটা আইনজীবী সুবোধ মজুমদারের বাড়ি। এই গানের আসরে সুন্দর রঙিন তরমুজের শরবত সবাইকে দেয়াা হতো। সঙ্গে সন্দেশ রসগোল্লা থাকতো। কিন্তু ট্রের ওপর সাজানো তরমুজের শরবতের গ্লাসগুলোর কথা ভাবলে আজও আমার জিহ্বা লালাসিক্ত হয়ে ওঠে।’
পহেলা বৈশাখ নিয়ে বরেণ্য সাহিত্যিকদের লেখায় বাংলার চিরায়ত রূপ ফুটে উঠেছে। যেখানে কোনো ভনিতা নেই। এ লেখাগুলোকে সে সময়কার দিনলিপি বলা যায়।
মধ্যযুগের কবিদের রচনায় বৈশাখ এসেছে প্রধানত প্রকৃতির অনুষঙ্গে। উত্তরকালে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের কবিতা ও গানে নববর্ষ এসেছে জীর্ণ-পুরাতনকে সরিয়ে নতুনের আহ্বান উৎস হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ জীর্ণ-পুরাতন-গতানুগতিক জীবনকে বর্জন করে বৈশাখের আগমনে নতুন সত্তা নিয়ে সকলকে জাগ্রত হবার আহ্বান জানান।
সনাতন-গতানুগতিক প্রচল সমাজের পরিবর্তে নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার ডাক থাকলেও রবীন্দ্রনাথের গান এখানে বিগত বছরকে ভুলে গিয়ে নতুন বছরকে আহ্বানেই মুখর। কাজী নজরুল ইসলামের গানেও আমরা ওই একই ধারার অনুবর্তন লক্ষ্য করি।
নজরুল লিখেছেন:
‘এলো এলোরে বৈশাখী ঝড়
ঐ বৈশাখী ঝড়, এলো এলো মহীয়ান সুন্দর।
পাংশু মলিন ভীত কাঁপে অম্বর,
চরাচর থরথর
ঘন বনকুন্তলা বসুমতী
সভয়ে করে প্রণতি,
পায়ে গিরি-নির্ঝর
ঝর ঝর।
ধূলি-গৈরিক নিশান দোলে
ঈশান-গগন-চুম্বী
ডম্বরু ঝলরী ঝনঝন বাজে
এলো ছন্দ বন্ধ-হারা
এলো মররু সঞ্চয়
বিজয়ী বীরবর ’
নজরুলের গানেও রবীন্দ্রনাথের মতো প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে পুরনোকে দূর করে নতুনের আবাহনী সুর উচ্চারিত। দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির সৃষ্টিশীলতায় বৈশাখ এভাবেই উপস্থিত হয়েছে। কবিরা-গীতিকাররা বৈশাখকে দেখেছেন নতুনের অনন্ত উৎস হিসেবে।
উত্তরকালে নববর্ষ বা বৈশাখবিষয়ক কবিতায় কখনো ভিন্ন মাত্রার প্রকাশ ঘটেছে। সে সময় কবিদের রচনায় বৈশাখ উপনিবেশ শাসিত বাংলাদেশে উপস্থিত হয়েছে মুক্তির উৎস হয়ে। সমাজ বদলের আহ্বানই উপনিবেশ পর্বের নববর্ষ-উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দেয়। মিলিত বাঙালির সংঘচেতনায় ঔপনিবেশিক পর্বের নববর্ষ অভিষিক্ত হয় বিপ্লবের বীজমন্ত্র হয়ে, কবির কণ্ঠে তাই ঘোষিত হলো এই বাণী।
অনিল মুখার্জি তাঁর ‘পহেলা বৈশাখ’ কবিতায় লিখেন :
‘পহেলা বৈশাখ আজ
কেন এই উৎসব, কিসের উল্লাস?
আমাদের দেয়ালের পাশের বাদাম গাছটি
কঠিন শীতের লাঞ্ছনায়
দু’দিন আগেও যাকে মনে হয়েছে নিস্তেজ, প্রাণহীন
সে আজ ঝড়ের প্রতীক্ষায়’
কবি সমুদ্র গুপ্ত তাঁর ‘বৈশাখ : একাত্তরে’ কবিতায় লিখেছেন
‘ মেঘ ছিল কি না যুদ্ধে পড়া বাঙালি সঠিক জানে না
কেননা, সেই একাত্তরে বৈশাখ ছিল কেমন অচেনা
কোথাও কোনো গ্রাম জনপদে আগুনের ধোয়া দেখে
মেঘ বলে ভ্রম হতো
মেঘ দেখলে বাড়ি পোড়ার গন্ধ লাগতো নাকে।
যুদ্ধের প্রথম মাসে এসেছিল পহেলা বৈশাখ
মেঘের ডম্বরু ফেলে হাতে হাতে উঠেছিল
স্বাধীনতা যুদ্ধের বজ্রনিনাদ
যুদ্ধমুখী পা আর স্বাধীনতা দেখে ফেলা চোখ
আমাদের জেগে ওঠার
প্রথম সাক্ষী দিল বৈশাখী মেঘ।’
সিকান্দার আবু জাফর তাঁর ‘হালখাতা’ গল্পে লিখেছেন:
‘স্কুল যেখানে বসতো, তার পাশেই ছিল বাজার। পহেলা বৈশাখে বাজারের দোকানে হতো ‘হালখাতা’।
জিনিসটা বুঝতাম না। বুঝবার তেমন আগ্রহও ছিল না। তবে হালখাতা উপলক্ষে দোকানদাররা যে মিষ্টি খাওয়াত গ্রাহক-অনুগ্রাহকদের, সেটাই ছিল পয়লা বৈশাখ সম্পর্কে আমাদের মোহ এবং হালখাতা সম্পর্কে আমার জ্ঞানের শেষ সীমানা’।
‘নববর্ষ : আমাদের জন্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন : আমাদের গ্রামের বাড়িতে পহেলা বৈশাখ যখন আসতো, তখন আমরা এটা বুঝতে পারতাম আমাদের জমিদার নানীর গোমস্তা নিশিকান্ত চক্রবর্তীর সামাজিক ব্যবস্থাপনা এবং আচরণের মধ্যে। তিনি আমাদের কাচারিঘর নিজ হাতে পরিস্কার করতেন। প্রবেশপথের চৌকাঠে পানি ছিটাতেন এবং ধূপের পাত্র হাতে নিয়ে ঘরে ধূপের ধোঁয়া দিতেন। খেরোখাতা বদলাতেন এবং সকল শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করতেন।
আমার নানাজান জমিদার ছিলেন না, জমিদার ছিলেন আমার নানী। প্রজারা নববর্ষের দিনে বাড়ির ভেতরে যাবার অনুমতি পেত এবং উঠানে যে শীতলপাটি বিছানো থাকতো সেখানে জমিদারকে দেয়া বিভিন্ন জিনিস রাখতেন এবং তাদের কুশল জিজ্ঞাসা করতেন। অস্পষ্টভাবে এ ঘটনার স্মৃতি আমার মনে ভেসে আছে। তারা পাটির উপর রুপোর টাকা রাখতো। এগুলো রোদের আলোয় ঝলমল করতো। আমরা নিজেরা নববর্ষ পালন না করলেও উৎসবটাকে গ্রহণ করতাম।’
বাংলাকাব্যের মধ্যযুগে নববর্ষ পালন বলে তেমন কিছু নেই। মধ্যযুগের কাব্যে ঋতুর বর্ণনা আছে, বারমাসি আছে। ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকায় গ্রামীণ ব্যঞ্জনায় মলুয়ার বারমাসি পাওয়া যায়। সেখানকার বর্ণনায় বৈশাখকে নির্দয় গ্রীষ্মকাল বলা হয়েছে। সেই ভয়ংকর গ্রীষ্মকালে পথ চলতে ভরসা হয় না। তবুও কন্যা ধীরে ধীরে পথ চলে। পালঙ্কের উপর শীতলপাটি বিছানো আছে, গ্রীষ্মের দাবদাহে সারা গায়ে চন্দন মেখে সেখানে কন্যা শয়ন করে। স্বপ্নের মতো দিন কেটে যায় এবং এক, দুই, তিন করে বৈশাখ শেষ হয়।
‘হামিদুর রহমানের “জীবনবৃত্তে” বন্দী হয়েছে ফেলে-আসা শতবর্ষের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের স্ফটিকস্বচ্ছ জলছবি। তাঁর বর্ণনায় ‘বৈশাখ মাস। আকাশজুড়ে মেঘের দাপাদাপি। দিগন্ত কালো হয়ে ঝড়ের পূর্বাভাস। ভয়ে নানুর গলা জড়িয়ে বসে আছি। তারপর অঝোর ধারায় শুরু হতো বৃষ্টি। উঠানে লেবুতলার নিচে জবুথবু হয়ে জড়ো হয়ে বসে থাকা আমার মায়ের পোষা হাঁসগুলো। আর সারা উঠানজুড়ে কেচোদের হামাগুড়ি, সুযোগ বুঝে হাঁসগুলোও লুফে নিত দলাদলা কেঁচো ,গপাগপ গিলে ফেলে আবার প্যাঁক প্যাঁক করে চলে যেতো পুকুরে। কাকেরা সব ভিজে বসে থাকতো তেজপাতা গাছের ডালে। গোয়াল ঘরে আমাদের পাশের বাড়ির লোকেরা ভিড় জমাতো হুকোয় ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে । আমি বুবুর সাথে বসে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনতে শুনতে অপেক্ষা করতাম মা কখন পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ, রসুন ও সরিষার তেল দিয়ে মেখে মজাদার চালভাজা খাওয়াবেন। চালভাজা খেতে খেতে কখনো কানে আঙুল দিয়ে বৃষ্টির রিমিঝিমি রিদম শুনতাম। আমার বাবার পাঠ করা ‘তালিবনামা’ পুঁথির সুর তখন এক অন্য রকম দ্যোতনার সৃষ্টি করতো। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইতিহাসে উৎসবরূপে পালিত হতে থাকে বাংলা নববর্ষ আর রচিত হতে থাকে অসংখ্য গল্প, কবিতা, গান এই বৈশাখ আর নববর্ষকে নিয়ে। নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্যবৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসবে প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা।
সে নববর্ষের অমোঘ-সহচর, নবসৃষ্টির অগ্রদূত, সুন্দরের অগ্রপথিক ও নতুনের বিজয় কেতন।
আমরা দেখি বৈশাখ বা নববর্ষ বাঙালি কবি-শিল্পীদের কাছে যুগে যুগে যুগান্তরে নতুন নতুন ভাবের উৎস হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। বাঙালির আত্মবিকাশের সঙ্গে, বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের উৎসধারায় বৈশাখ বা নববর্ষ সব সময় জড়িয়ে ছিল, জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গীভাবে।

x