আমাদের সন্তানেরাই আমাদের সুপারহিরো

মোহছেনা ঝর্ণা

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
25

আমাদের সন্তানদের স্লোগান আর প্ল্যাকার্ডের ভাষায় মুগ্ধতায় আলোড়িত হয়ে যাই। তাদের প্রতিবাদের ভাষা দেখি

৯ টাকায় ১ জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই’,

জনপ্রতিনিধিদের সপ্তাহে অন্তত তিনদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হবে’, ‘সার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে, গাড়ি চাপায় মানুষ মরে মন্ত্রী সাহেব হাসে’।

যদি তুমি ভয় পাও

তবে তুমি শেষ

যদি তুমি রুখে দাঁড়াও

তবে তুমি বাংলাদেশ

আমাদের সন্তানদের স্লোগান আর প্ল্যাকার্ডের ভাষায় মুগ্ধতায় আলোড়িত হয়ে যাই। তাদের প্রতিবাদের ভাষা দেখি– “৯ টাকায় ১ জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই“, “জনপ্রতিনিধিদের সপ্তাহে অন্তত তিনদিন গণ পরিবহনে যাতায়াত করতে হবে“, “সার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে, গাড়ি চাপায় মানুষ মরে মন্ত্রী সাহেব হাসে“…

ইমার্জেন্সি লেনবলে সড়কে আলাদা একটা অংশ থাকতে পারে জানা ছিল না। আমাদের ছেলেমেয়েরা দেখিয়েছে আমাদের এরকম ইমার্জেন্সি লেন কি? এর কাজ কি? দেখলাম, বাচ্চারা দেখালো আমাদের।

ঘর থেকে সুস্থশরীরে বের হওয়া শিশু, বুড়ো, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী, কর্মজীবী যে কোনো আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে আসবে কিনা এই আতংকে শহুরে জনপদের প্রায় মানুষই কুঁকড়ে থাকি ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ নামক জমের ভয়ে।

গত ২৯ জুলাই ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ( দুর্ঘটনা না বলে হত্যাও বলা যায়) রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং আরো পাঁচজন শিক্ষার্থীর মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার প্রতিবাদে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকা ব্যক্তির বেফাঁস মন্তব্য, বত্রিশ দন্ত বিকশিত নির্লজ্জ হাসির পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে আমাদের সন্তানদের এই সফল (সফল বলছি এ কারণে তাদের নয়টি দাবিই সরকার পক্ষ থেকে মেনে নেয়ার কথা বলা হয়েছে এবং তাদের সবগুলো দাবিই যৌক্তিক সেকথা প্রশাসনের সকল মহল থেকে স্বীকার করা হচ্ছে) আন্দোলনকে স্যালুট জানাই।

আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সহপাঠী হত্যার বিচার চেয়ে এবং সব মানুষের নিরাপদে চলাচলের জন্য নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে নেমে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে আমাদের সবাইকে।

সুশৃঙ্খলভাবে যেকোনো আন্দোলন করা যায়, ভাঙচুর না করে, কাউকে ক্ষতবিক্ষত না করে, রক্তাক্ত না করে (যদিও আন্দোলনের প্রথম দিন নিজেরা অনেক পুলিশের হাতে রক্তাক্ত হয়েছে), ভয়ভীতির সৃষ্টি না করে আন্দোলন করে দাবি আদায় করা যায় তা তো আমাদের সন্তানেরা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন কে প্রভাবশালী, কে অসহায়, কে বড়, কে ছোট তা কি আর বাছবিচার করে হয়? হয় না। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যেসব কারণ উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে বেপরোয়া গতি অন্যতম। চালকদের খামখেয়ালি পূর্ণ মানসিকতা, ঠিকভাবে গাড়ি চালানো না শিখেই গাড়ির স্টিয়ারিংএ বসা, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, মোবাইলে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালানো, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ট্রিপ সিস্টেমে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন না মানাসহ আরও অনেক কারণ আছে। তবে চালকদের স্বেচ্ছাচারী, খামখেয়ালি এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের কারণেও অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।

মাস দুয়েক আগে দুই বাসের অসম প্রতিযোগিতায় প্রথমে হাত হারানো রাজীব পরবর্তীতে মৃত্যুর কাছে হার মানে। সপ্তাহ খানেক আগে হানিফ পরিবহনের একটি গাড়ি থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পায়েলকে গাড়ির চালক এবং সহকারীরা নদীতে ফেলে খুন করে, প্রায় বছরখানেক আগে টাংগাইলএ চলন্ত তরুণীকে ধর্ষণ করে মুখ থেতলে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে হত্যা করে গাড়ির চালক এবং সহকারীরা। এরকম ভুরেভুরে ঘটনা ঘটেই চলছে আমাদের পরিবহন সেক্টরে। চালক এবং তার সহকারীদের এরকম ভয়ংকর কর্মকান্ড ঘটানোর ক্ষেত্রে ভয় কাজ করছে না কেন? কারণ তাদের অপরাধের যথোপযুক্ত বিচার হচ্ছে না, শাস্তি হচ্ছে না।

সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা বিচারের দাবিতে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে বিপ্লব ঘটিয়েছে তার জন্য তাদের সাধুবাদ। তবে কেউ যেন নিজেদের স্বার্থ আদায়ের অপকৌশল হিসেবে ব্যবহার করে এই সুন্দর এবং সুশৃঙ্খল আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে এবং তাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে তাই তারা যেন নিরাপদে ঘরে ফিরে আসে। তারা এ কদিনে যা ম্যাজিক দেখানোর দারুণভাবেই দেখিয়েছে। চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের সিস্টেমের গলদ কোথায় এবং সেই গলদগুলো কীভাবে সারানো যায়।

আইন প্রণয়নকারীরা এবং আইন প্রয়োগকারীরাই যখন আইন অমান্য করে তখন আর কিই বা আশা থাকে! বিচারপতির গাড়ির চালকের লাইসেন্স নাই, দুদকের গাড়ির, সরকারি আমলাদের গাড়ির, পুলিশের গাড়ির, সাংবাদিকদের গাড়ির কাগজপত্র ঠিক নাই এগুলো তো ধরে ধরে দেখালো তারা। উল্টো পথে আসা মন্ত্রীর গাড়ি ফিরিয়ে দিল কি অসীম সাহসীকতায়। লাইসেন্স নাই লিখে দিল লাইসেন্স না থাকা বড় বড় ক্ষমতাধর মানুষদের গাড়িতে। এসবই সম্ভব হয়েছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সততার জন্য। কত কিছু শেখালো বাচ্চারা আমাদের। এবার যদি সেশিক্ষা কাজে লাগানো হয় আর কি! বড় বড় বুলি আওড়ানো, বড় বড় পদে থাকা বড় বড় মানুষেরাই যখন আইন অমান্য করে দম্ভ ভরে চলে তখন দেশের পরিস্থিতি এরকম নৈরাজ্যপূর্ণ হওয়াই স্বাভাবিক। পুত্রকন্যারা তোমাদের এই কার্যক্রম আমাদের ঘুণে ধরা সিস্টেমকে যেভাবে কাঁপিয়ে দিল তাতে যদি নীতিনির্ধারকদের হুশ না হয় তাহলে আর কোনোদিনই হয়তো হবে না। কারণ এ আন্দোলন এক দিনেই হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বহুদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই এ আন্দোলনের জন্ম। এ আন্দোলন দেশের প্রতিটা মানুষের নিরপদ জীবনের স্বার্থে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন। এখন যদি পরিবহন মালিক, শ্রমিক, চালক, পথচারী থেকে শুরু করে, প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর সবাই সচেতন হয়, আন্তরিক হয়, লোভী মনোভাব ত্যাগ করে সৎভাবে নিজের কাজটি করে তবে সড়ক নিরাপদ হবেই।

সরকারের আশ্বাস মতে অতি দ্রুত সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন করা হবে। আইন করলেই হবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগও করতে হবে। আর সেকারণেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে, সেব্যাপারেও সরকারকে সজাগ থাকতে হবে।

আইনের চোখে সবাই সমান’ এই বাক্য শুধু কিতাবে না থেকে এর বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটালে অনেক অন্যায় অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে। প্রতিটা মানুষের জীবন মূল্যবান। প্রতিটা প্রাণ মূল্যবান। যেচালক কিংবা যেপরিবহন শ্রমিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় কিংবা আহত হয় তার প্রাণটাও কিন্তু মূল্যবান। তাদেরকে সঠিকভাবে কাউন্সেলিং করলে এবং গাড়ি চালানোর সঠিক প্রশিক্ষণ দিলে তারাও নিশ্চয়ই বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে সবার জীবন হুমকির মুখে ফেলবে না। প্রতিটা প্রাণ বাঁচুক। প্রতিটা প্রাণ নিরাপদ থাকুক। সড়ক নিরাপদ হোক। প্রিয় স্বদেশ নিরাপদ থাকুক।

x