আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও নারী

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ২২ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
39

বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এসব দিনগুলো যখন উৎসবের মতো আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় তখন আমরা আবেগ আপ্লুত হয়ে অনেক কথা বলি। ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে অনেক তথ্য হাজির করি। সভা সেমিনারে আমাদের বিজ্ঞজনেরা মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ইতিহাস তুলে ধরেন। গণভবন, বঙ্গভবনে ডেকে নেওয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। ঝলমলে উৎসবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারাও থাকেন হুইল চেয়ারে বসা। তারা দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। কারো হাত, কারো পা, কেউ বা হয়েছেন চলৎশক্তিহীন। তাদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা রেখেই বলছি তাদের ত্যাগের বিনিময়ে এই দেশটি আমরা পেয়েছি। কিন্তু কষ্টটা অন্য জায়গায়। তিন লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া কথাটি বারবার কানে আঘাত পাওয়ার মতো বাজতে থাকে। তিন লক্ষ মা বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। একজন নারীর কাছে তার জীবনের মতোই তাঁর সম্ভ্রম। সভ্য দেশে সভ্য আইনে একজন স্বামী ও তার স্ত্রীর ইচ্ছের বাইরে কিছু করা অপরাধ বলে গণ্য হয়। যে সব নারী নির্যাতনের, ধর্ষণের কথা বলতে বলতে আমরা ক্লান্ত তাদের জন্য রাষ্ট্র কি করেছে? সুশীল সমাজ কি করেছে? এসব নারীদের কি কখনো বঙ্গভবন কিংবা গণভবনের ঝলমলে উৎসবে ডাকা হয়েছে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে? ওদের কি কোনো তালিকা হয়েছে? ওদের পুনর্বাসনের কতটুকু কাজ হয়েছে? মাথায় শুধু প্রশ্নের পর প্রশ্ন। ওরা কতজন বেঁচে আছেন, কীভাবে আছেন? নিজেদের আড়াল করতে করতে জীবন প্রদীপ নিভে গেল কত জনের? ওরা কি পেয়েছিল? রাষ্ট্র পাশে দাঁড়ায়নি যেমনভাবে দাঁড়ানোর কথা ছিল। সমাজ গ্রহণ করেনি, পরিবারও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল অনেকের।
আমাদের চট্টগ্রামের রমা মার কথাই বলি-উনি কি সংসার ফিরে পেয়েছিলেন? স্বামী কি তাকে গ্রহণ করেছিলেন? একাকীত্বের যন্ত্রণা আর সামাজিক বঞ্চনা নিয়ে কি তিনি জীবন কাটাননি? কতটুকু সম্মান আমরা দিতে পেরেছি? জীবন ধারণের জন্য কতটুকু সহায়তা তিনি পেয়েছিলেন? তারামন বিবি, কাঁকন বিবিকে আমরা কিন্তু সহজে খুঁজে পাইনি। কারণ উনারা নারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনারা সরাসরি যুদ্ধ করেছিলেন। শিশির কণা সংসার করার জন্য নিজের পরিচয় গোপন করে ভারতে গিয়ে আজন্ম লালিত স্বপ্ন সুখের বাসর সাজিয়েছিলেন। টেকেনি। কারণ স্বামী জেনে গিয়েছিলেন তিনি যুদ্ধে নির্যাতিত হয়েছিলেন এই অজুহাতে তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে আবার বিয়ে করেছিলেন সতী সাধ্বী। বড় জোর এক দুইজন প্রিয় ভাষিনীকে সাহসের সাথে বের হয়ে আসতে দেখেছি। রাষ্ট্র কোনো দায়িত্ব পালন করেনি। প্রতিবার বিজয় দিবস আসলে, স্বাধীনতা আসলে তিনলক্ষ মা বোনের ইজ্জত হারানোর স্লোগান দেওয়া হয়। সেই ইজ্জত হারানো মা বোনদের অন্ধকারে রেখে আমরা আলো ঝলমলে উৎসব করি। নারীদের আসলে কখনো মূল্যায়ন করা হয়নি। গৌরবের ইতিহাস শুধু পুরুষের ইতিহাস। কারণ ইতিহাস রচনা করেন পুরুষরা। একজন শহীদ রুমীর মা, একজন আজাদের মা কি মুক্তিযোদ্ধা নয়? লাখ লাখ মা বোন মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাইয়েছেন। আশ্রয় দিয়েছেন, সেবা করেছেন, নিজের মুখের খাবারটা তুলে দিয়েছেন তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়? স্বামী হত্যা, সন্তান হত্যার পর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ নয়? মুক্তিযুদ্ধে পুরুষদের চেয়ে নারীর অবদান কিন্তু মোটেও কম নয়। যেহেতু নারীদের মনে করা হয় অন্তরালের মানুষ তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও নারীর অসামান্য অবদানকে অন্তরালেই রাখা হয়েছে। অনেক নির্যাতিত নারী আত্মহত্যা করেছে। অনেক পবিবার তাদের গ্রহণ করেনি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গোবরা ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন অনেক নারী। অনুরূপ আরও তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে। মেয়েদের দেওয়া হতো তিন রকমের ট্রেনিং (১) সিভিল ডিফেন্স (২) নার্সিং (৩) অস্ত্রচালনা ও গেরিলা ট্রেনিং। ভারতে শরণার্থী শিবিরে ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে শরণার্থীদেরও মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শিল্পী হিসেবে অংশ নিয়েছেন অনেক নারীশিল্পী। নারী কবি শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন। অপেক্ষায় থাকলাম ইতিহাস একদিন তুলে আনবে নারীর অবদান কেমন ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে।

x