আমাদের বৈশাখ

ফজলুল হক

শনিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৯:০১ পূর্বাহ্ণ
130

আপনাকে ধন্যবাদ রাশেদ, আমাকে ফোন করার জন্য। পহেলা বৈশাখ দৈনিক আজাদীর বিশেষ পাতায় আমাকে লেখা দিতে বলেছেন, শুনে ভাল লাগল। আজাদীর সাথে আমার “আবেগ” পূর্ণ সম্পর্ক আছে। সব কিছু বদলায়। পুরোনোর জায়গায় নতুনরা আসে। কচিপাতাঝরাপাতা হয়ে যায়। এক উর্দু কবি বলেছেন, গোলাপ মানে, যে কথা তোমাকে বলা হয়েছে। কলি, মানে, যে কথা বলা হয়নি। গোলাপ নই। ঝরাপাতা গো, আমি তোমাদেরই দলে। চৈত্র মাস। বাঁশ ঝাড়ের সামনে দাঁড়াই। মাতাল হাওয়ায় সে পাতা ঝরাচ্ছে। থির্‌ থির্‌ ঘুরছে, কাঁপছেঝরাপাতা। কেউ শোনেনা ঝরাপাতার কান্না। আজাদী পুরোনো পত্রিকা। আমরা পুরোনো মানুষ। তারকা কবি গোলাপের মতো সুবাস ছড়াবেন। আপনাদের দেখে আমরা আনন্দ পাই। আমাদের নিয়ে ভাবার অবকাশ নাই। “কে বলে গো সে প্রভাতে নেই আমি, সকল খেলায় করব খেলা, এই আমি”। আমি রোমাঞ্চিত হই। আবার আসিব ফিরে, ঠিক তো? ঠিক না। আমরা চলে যাবো, আর আসব না। দৈনিক আজাদীতে আপনারা নতুন ধারায়, নব প্রেরণায় কাজ করুন। আমাদের ভুলে যান।

এখন বৈশাখ আসে, আসে বৈশাখী ঝড়। সকলে নতুনত্ব চায়। পুরোনোকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চায়। বর্ষায় কদম ফোটে। কেয়া ফুল ফোটে। এদুটি আমার প্রিয় ফুল। বর্ষা প্রিয় ঋতু। বৈশাখে আম গাছে কচি আম দোলে। আমি গাছ থেকে কচি আম পাড়লে আমার ফুফু বলতেন, “ন খাইছ, বোঁরা ন বাঁধাইলে ছেরাবি।” (খেয়োনা, আঁটি না বাঁধানো আম খেলে পাতলা পায়খানা হবে।) পহেলা বৈশাখ নববর্ষ, এই দিনে ব্যবসায়ীরা হাল খাতা নিয়ে ব্যস্ত হন। ছোটকালে মান্দার, স্বর্ণালু, কৃষ্ণচূড়ার মনকাড়া রূপ দেখে পাগল হবার দশা হতো। পহেলা বৈশাখে এখন স্বর্ণালু, মান্দার, কৃষ্ণচুড়ার গাছ দেখিনা। লাল, হলুদ, সোনালী ফুল ও দেখিনা। আমাকে লিখতে বললে, আমি সেকালের পহেলা বৈশাখের আনন্দ উল্লাস নিয়ে লিখতে পারব। কোথায় গরুর লড়াই হবে, কোথায় বলি খেলা হবে, সাপের নাচ হবে, কোথায় মোরগ মুরগীর যুদ্ধ হবে (মোরগ লড়াই), কোথায় জ্বালাপিডা, মধুভাত খাওয়া যাবে, কোথায় মোয়া মুড়কি, চনা মনার ঠেং বেচেসে সব বিবরণ লিখতে পারব। কিন্তু পাঠক তো পুরোনো কাসুন্দি পাঠ করবে না। পাঠক এখন বৈশাখী ঝড় চায়। নতুনত্ব চায়। যুগ পাল্টে গেছে। পান্তাইলিশ ছাড়াও এখন বৈশাখের অন্য অনুষঙ্গ আছে। বলি খেলাচিনবেও না। তখন বলি খেলার দিনে মেয়েরা বাপের বাড়ী নাইয়র আসত।

নতুনত্বসেটা কেমন? মেয়েদের জন্য পহেলা বৈশাখের নতুনত্বঃ সে রমনা বটমূলে উদীচীর অনুষ্ঠানে যাবে, কোথায় মঙ্গল শোভাযাত্রা হবেসেখানে যাবে। চারুকলার ছাত্র শিক্ষকরা মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জারুলতলায়, রব হলের মাঠেবৈশাখী সাজে আসবে তরুণ তরুণী। তাদের মাথায় ঘুরছে নতুনত্ব। অধরে লাল রং, কপালে লালটিপ। পোশাক উজ্জ্বল হলে, সাজ হবে সাদামাটা। পোশাকে রং কম থাকলে সাজ হতে পারে সামান্য জাঁকালো। এভাবে পহেলা বৈশাখ তরুণ তরুণী নিজের ভেতরে নতুনত্ব আনে। তারা ভাবে পহেলা বৈশাখে নিজের ঐতিহ্য ধরে রাখব। নতুন ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করব। নিজেকে গুছিয়ে নেব। এখন মানুষ যত সচেতন এবং গোছানো, আমাদের যৌবনে ব্যাপারটা কি সে রকম ছিল? পাকিস্তান আমলে পহেলা বৈশাখ পালন তো কঠিন ব্যাপার ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান দুটি জিনিসকে ভয় পেতেনএক: শহীদ মিনার, দুই: পহেলা বৈশাখ। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা সরকারের গদি কাঁপিয়ে দিতাম। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? পুলিশ দিনে আমাদের কলেজ শহীদ মিনার ভেঙে দিত। আর রাতে আমরা রাজ মিস্ত্রির মতো ইট সিমেন্ট নিয়ে কন্নি মাত্তুল হাতে মিনার বানাতাম। পুলিশ এদিকে মার দিলে আমরা ওদিকে গিয়ে গেয়ে উঠতাম, আমার ভাইয়ের রক্তেএবং এসো হে, এসো হে বৈশাখ। এখনো কিছু হুজুর আছে, বলে, তোমরা মালাউন, পহেলা বৈশাখ হিন্দুয়ানী রীতি। আমাদের পহেলা বৈশাখ আসতো বিষাদ নিয়ে। এখন পহেলা বৈশাখ রঙে ভরা।

একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখদ্রোহের আগুনের নাম। আমাদের গর্ব বাংলা ভাষা। আমাদের ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখে আমি নতুন করে নিজের দিকে তাকাই।

এযুগের পহেলা বৈশাখ আমাদের কল্পনার বাইরে। প্রচুর কেনাকাটা হবে, তাই কার্ডে কার্ডে ছাড়। বাংলা নববর্ষ কেনাকাটায় ক্রেডিট কার্ডে বিশেষ ছাড়। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সব কার্ড ও মোবাইল পেমেন্ট: বৈশাখের অনুষঙ্গ আগে কল্পনায় ছিল না। লাইফ স্টাইল, জুয়েলারি, ডাইনিং, সাজগোছে আপনি পহেলা বৈশাখে অনেক ছাড় পাবেন। পয়সাওয়ালাদের পহেলা বৈশাখ এরকমই। গরীব কি ধনীর আসরে উদযাপিত পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যেতে পারে? সে যায় বলি খেলায়। বলি খেলা কোথায়? মাঠ কোথায়? দিঘি কোথায়?

একটা প্রতিষ্ঠান বলেছে, বাংলা ১৪২৫ উপলক্ষে অন লাইনে শাড়ি, কুর্তা, সালোয়ার কামিজ, ছেলেদের পায়জামা পাঞ্জাবি সহ সকল পোশাক কেনাকাটায় সাড়ে চৌদ্দ পারসেন্ট ছাড়। বাহপহেলা বৈশাখ। বৈশাখী খাবারের আয়োজন আছে। বৈশাখী খাবার। চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু তে এক্সচেঞ্জ রেস্তোরাঁয় বৈশাখী খাবারের আয়োজন আছে। নানা রকম পিঠা, ভর্তা, ইলিশ খিচুড়ি সহ ৩০ পদের খাবার আছে, বৈশাখী খাবার,দাম ২ হাজার ৯৫০ টাকা (ভ্যাট ছাড়া) একজন। এটা জনগণের বৈশাখ নয়।

ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার হোটেলে খাওয়ার কথা ভাবি না। সে সামর্থ্য নাই। সেকালে বৈশাখে কি করতাম? “দুইধ্যা” খেলার নাম শুনেছেন? দিঘির পাড়ে গাছে উঠতাম। উদ্দাম বৈশাখ। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। এক গাছ থেকে আরেক গাছেডাল ধরে ঝুলে পড়তাম। দিঘির জলে ঝাঁপ দিতাম। সাঁতার কেটে কেটে কার মাথা ছোঁয়া যায়সে চেষ্টা করতাম। এত ছেলে যেপানিকে “দৈ” বানিয়ে ফেলতাম। সাঁতরে খাল পার হতাম। পাশে বঙ্গোপসাগর আছে। ভয় পেতাম না। রাতে আকর্ষণ ছিল আকাশ ভরা তারা। ঘুরছে মেঘের ভেলা। আমাদের একটাই আকাশ। হায় শহরএই শহরে তারা দেখা যায় না।

বৈশাখ আসে। বৈশাখ যায়। টিভিতে, সামাজিক মাধ্যমে, পত্রিকায়বৈশাখ দেখি। গন্ধ শুঁকি। আমাদের প্রাণে বৈশাখ নাই। আকাশ ঢেকে ফেলেছি। নদী ঘিরে ফেলেছিবৈশাখ আসবে কোথায়?

লেখকঃ সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

x