আমাদের বুদ্ধ, বুদ্ধদেব বসু

আফরোজা নীরু

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
58


একের পর এক ‘ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট’ সিগারেট টেনে যাচ্ছেন আর স্মৃতির স্টিরিয়োস্কোপ দিয়ে আমাদের দেখিয়ে চলছেন তার ছেলেবেলা, যৌবন এবং কবিতাভবন।
পঞ্চাশ বছর আগে দেখা কোনো এক স্বপ্নের মতো, ধূসর অতীত ট্রেনের কামরায় হঠাৎ-চোখে-পড়া কোনো মুখের মতো কয়েকটি ছবি আটকে আছে যেন। ছবিগুলি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকপাল বুদ্ধদেব বসুর কাছের মানুষদের, প্রিয় শহরের এবং মহৎ কবিতার জন্মের সময়কার।
‘আমার ছেলেবেলা’ তে আমরা দেখি জন্মের সময় মাকে হারানোর পর মাতামহী স্বর্ণলতা আর মাতামহ চিন্তাহরণ সিংহের পরিবারে তার বেড়ে উঠার ছবি। চিন্তাহরণ সিংহের সাথে বিক্রমপুরের রাস্তার শীতের ভোরে কবি হাঁটছেন আর চলতে-চলতে মাতামহ জিগ্যেস করছেন; ‘Do you see what I see?’ তার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে কবি বলে চলছেন A Tree!’ , A dog!’ যেমন আমরা কবির সাথে সাথে দেখছি কুমিল্লা, নোয়াখালী, বিক্রমপুর, সবুজ ঢাকা, ওয়ারীর র‌্যাংকিন স্ট্রিট, ২০২ রাসবিহারী এ্যাভিন্যুত কলকাতা এবং কবিতাভবন।
আত্মজীবনীর এই প্রথম অংশে বুদ্ধদেব বসুর মধ্যে বেশ একটা ছন্নছাড়া ভাব আছে । পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ জীবন খুব পছন্দ হয়নি তাঁর তা অকপটে স্বীকার করেছেন, তাঁর এই সৎ উচ্চারণ ভাল লেগেছে । তার চোখে ঢাকার বিংশ শতাব্দীর প্রথম এক চতুর্থাংশের সময়কাল দেখেছি খুবই আগ্রহ নিয়ে।
‘আমার ছেলেবেলা’ যেখানে শেষ , ঠিক সেইসময় থেকেই শুরু ‘আমার যৌবন’ এর, আছে আজ থেকে আশি বছর আগেকার ঢাকা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৯২৭ সালে ঢাবিতে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। অকল্পনীয় সেই ঢাকার যে বর্ণনা বুদ্ধদেব দিয়েছেন তা ঈর্ষণীয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া দারুণ ছিমছাম এক ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমলাদের বাড়িঘর, আর রমনা গ্রিন! আজকের ইটপাথরের ভিড়ের নীলক্ষেত তখন কিন্তু আদতেই ক্ষেতই ছিল! তারই মাঝে মেঠোপথ। এই রাস্তা গিয়ে মিশেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে।
লিখেছেন নজরুলকে নিয়ে ‘সেই প্রথম দেখলাম নজরুলকে, অন্য অনেক অসংখ্যের মতো দেখামাত্রই প্রেমে পড়ে গেলাম।… কণ্ঠে তার হাসি, কণ্ঠে তার গান, প্রাণে তার অফুরান আনন্দ – লেখায় মুগ্ধতা ছিল কাজী নজরুলের জন্য ।
জানতে পারি তার টাকার জন্য লেখার চাপ, পুলিশের মামলা ,অশ্লীলতার দায়ে করা অভিযোগ লালবাজারে গিয়ে মীমাংসা করতে হয়েছে পুলিশের সাথে ৷
এরইমধ্যে প্রেম, মেয়ে ঢাকার প্রতিভা সোম, কণ্ঠশিল্পী প্রতিভার প্রতিভা ছিল বেশ, এমনিই তো কাজী নজরুল পছন্দ করতেন না! বিয়ে হয়ে গেল। কলেজে অধ্যাপনাও জুটল।
কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-অনুবাদ-নাটক-উপন্যাস বাদ যায়নি কিছুই। সংসার বেড়েছে, বেড়েছে দায়। বাধ্য হয়ে কলম ধরতে হয়েছে। আড্ডার জগৎ ছোট হয়েছে ক্রমেই। সেইসাথে সমাপ্ত হয়েছে আত্মজীবনীর দ্বিতীয় পর্ব ‘আমার যৌবন’ ।
বুদ্ধদেব ১৯৭২-এ লিখেছিলেন ‘আমার ছেলেবেলা’, ১৯৭৩-এ ‘আমার যৌবন’ । ১৯৭৪ বসুর কর্মবহুল জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ২০২ রাসবিহারী এ্যাভিন্যুতে ‘কবিতাভবন’ গড়ে ওঠার ইতিহাস। লিখতে যখন শুরু করেছিলেন তখন কেউ জানত না তাঁর জীবনস্মৃতির বিস্তৃততর অধ্যায়টি সম্পূর্ণ না করেই তাকে চলে যেতে হবে।
অসম্পূর্ণ এই বইয়ে সূত্র সংযোজনা করেছেন বুদ্ধদেব বসুর কনিষ্ঠা কন্যা এবং ছাত্রী দময়ন্তী বসু সিং আর বইয়ের নাম দিয়েছেন কবিপত্নী।
বইয়ের শুরুটা এত অসাধারণ সেটা শেষদিকে এসে ততখানি জমাট বলে মনে হয়নি মোটেও।
দময়ন্তী বসু সিং বলেছেন, তার বাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না আত্মজীবনী লেখার, মার চিকিৎসার টাকা জোগাড়ের জন্য বোধ করি তিনি নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে অনেকখানি লিখতে শুরু করেছিলেন। ‘আমাদের কবিতাভবন’-এ এসে সেই লেখায় খাপছাড়া হয়ে গেছে, কেবল একের পর এক কিছু চরিত্রের নাম করে তাদের সম্পর্কে খানিকটা কথা বলা হয়েছে কেবল। দময়ন্তী বসু সিং-এর সংযোজন করা অংশটুকুর প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তাঁর লেখনীতে সেই আশ্চর্য মেঘদলের অভাব ছিল অনেকটাই।
কে জানে, হয়তো বেঁচে থাকলে বুদ্ধদেব সম্পাদনা করে আমাদের দেখাতেন কবিতা জন্মানোর উজ্জ্বলতম মুহূর্তগুলি।
বইটি শুধুই আত্মজীবনী নয়, একজন মানুষের চোখে নতুন দর্শনের জন্ম নিতে দেখার ভ্রমণ।

বারবার স্বেচ্ছাচারী জ্যোৎস্না কেটে গিয়েছেন হেঁটে
সম্পূর্ণ একাকী, সঙ্গী মুক্তবোধ। চোখে নাগরিক
দৃশ্যাবলী গেঁথে নস্টালজিয়ায় মেদুর গলায়
কবিতার ডাকনাম ধরে ডেকেছেন কী ব্যাকুল।
শব্দেই আমরা বাঁচি এবং শব্দের মৃগয়ায়
আপনি শিখিয়েছেন পরিশ্রমী হতে অবিরাম।
অফলা সময় আসে সকলেরই মাঝে মাঝে, তাই
থাকি অপেক্ষায় সর্বক্ষণ। যতই যায় না কেন দূরে
অচেনা স্রোতের টানে ভাসিয়ে আমার জলযান,
হাতে রাখি আপনার কম্পাসের কাঁটা; ঝড়ে চার্ট
কখন গিয়েছে উড়ে, চুলে চোখে-মুখে রুক্ষ নুন,
অস্পষ্ট দিগন্তে দেখি বৌদ্ধ মুখ। আপনার ঋণ
যেন জন্মদাগ, কিছুতেই মুছবে না কোনো দিন।

(বুদ্ধদেব বসুর প্রতি, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫, শামসুর রাহমান, কবিতা-সমগ্র ১, অনন্যা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৫)

এই তিনটি বইকে এক মোড়কের মধ্যে এনে ‘আত্মজৈবনিক’ নামে প্রকাশ করার জন্য বাতিঘর প্রকাশক দীপঙ্কর দাশকে ধন্যবাদ।

x