আমাদের প্রাক্তন বাড়ি

শাফিনূর শাফিন

মঙ্গলবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
75

১.
একটা স্যাঁতস্যাঁতে বাড়ি। রেলিংবিহীন কালো ছাদে চিলেকোঠার পাশে শিউলি আর তুলসি গাছে ঘেরা। ছাদে বসলেই দেখা যায় ডকইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার কাজ করে চলেছে শ্রমিকেরা এবং কর্ণফুলী নদীজুড়ে সাম্পান আর জাহাজের মেলা। নদীর হাওয়া গায়ে মাখতে মাখতে বাড়ির রমনীরা খোলা চুলে হেঁটে বেড়ায়। সাদা থান পরা বৃদ্ধাও আছেন। কয়েকজন শিশু কিশোরীরা লুকোচুরি আর পুতুল খেলতে ব্যস্ত। দর্জির দোকান থেকে সংগ্রহ করে আনা কাপড়ের টুকরো দিয়ে সেসব পুতুল বানানো হয়েছে। পুতুলেরা শুয়ে আছে জুতোর বাক্সে।
২.
দুটো শিশু গল্প করছে।
-এই বাড়িটা ভূতের বাড়ি।
-যাহ!
-সত্যি! রাত হলে নূপুরের আওয়াজ পাওয়া যায়।
-আমি থাকি। কোনোদিন শুনিনি!
-আমি শুনেছি, দিদিও শুনেছে। আর পুরনো বাড়িতে ভূত প্রেত থাকেই। থাকতে হয়। পিকে সেন সাততলায়ও আছে। অনেকেই দেখেছে। মা কালী!
-মিথ্যা কথা।
বলেই দৌড়ে মায়ের কাছে এসে জানতে চায়, “আম্মু আম্মু, আমাদের এই বাড়িতে ভূত আছে?” মা বিরক্ত হয়ে, “আমিই ভূত হয়ে গেছি তোদের জ্বালায়।”
৩.
বাড়ির সামনের মাঠে বাবা সব্জির চাষ করছেন। বেগুন, টমেটো, বরবটি, পেঁপে- এমনকি পরীক্ষামূলক বাঁধাকপি ও ফুলকপির বীজও ফেলা হয়েছে। বিকেলবেলা মহাসমারোহে বাড়ির শিশুরা সবজি বাগানে পানি ছিটিয়ে দেয়ার কাজটা করে। আর মা বাবা নিচতলার বাসার সবুজ দরজার সামনে লম্বা টানা লাল বারান্দার রেলিঙে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন বাচ্চাদের খেপামো।
৪.
বড় ভাই ছোট বোনকে নিয়ে লাঠি ঠুকে চলেছে ঘরের মেঝেতে। কে যেন বলেছে, এমন শত বছরের পুরনো বাড়িতে লুকোনো গুপ্তধন থাকে। তাই আপাতত তারা দুজন ফাঁপা জায়গা খুঁজে মরছে। বলা তো যায় না, সত্যি সত্যি হয়তো গুপ্ত সেই ঘরে ঢোকার চাবি বা কিছু একটা পেয়ে যাবে।
৫.
পুরনো বাড়িটার কার্নিশ থেকে সিমেন্টের নকশার ঝালর পড়ে থাকে। চাঁদ উঠলে কাঁচের ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে সেসব নকশা অন্ধকারে রহস্যময় সাদা ফুল তৈরি করে ঘরজুড়ে। তাতে হাঁটতে গেলেই সেসব অধরা ফুলের ছায়া অভূতপূর্ব দৃশ্যের মতো হাতে এসে ধরা দেয়। শৈশব সেই আধো আধো পার্থিব চাঁদের ফুলের নকশাতে আরামে চোখ বুজে ফেলে।
এমন এক সন্ধ্যায় জানলার শিকের ভিতরে এক বন্দী চাঁদের ভেসে যাওয়া দেখতে-দেখতে সে জেনে যায়, মেঘেরা সব চাঁদের আলোয় ছুটে যাচ্ছে পৃথিবীর জন্য পানির সন্ধানে।
৫.
সেই সবুজ রঙের জানলার শিক গলে কৈশোর চলে আসে। বাড়িতে নতুন চুনকাম উঠে দেয়ালে। হলদে রঙ পাল্টে সাদা চুন চেপে বসে দেয়ালে। বড় উজ্জ্বল সেই নীলচে সাদা। ছোট ছোট খোপ সব ঢেকে যায়। ফ্রক ছেড়ে স্কার্ট, কমিক্স আর রূপকথার বই ছেড়ে রকি মাউন্টেনের তিন গোয়েন্দা প্রিয় সঙ্গী হয়ে যায়। পুরনো স্ট্রিঙে ঝোলানো লাল হলুদ সবুজ ক্রিমের পর্দা বদলে জানলা ঢেকে যায় আধুনিক পর্দায়। খেলার মেয়েসাথীরা বড় হয়ে গেছে অজুহাতে বাসার সামনের মাঠে আর কেউ খেলতে আসে না। খেলার সাথী ছেলেটা বড় মাঠে বড় আর সমবয়সী ছেলেদের সাথে যোগ দেয় ততদিনে। পুরনো বাড়িটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরো বুড়ো হয়।
৬.
প্রতিবছর বর্ষা এলেই সাপ। সাপ মানেই সবাই বিছানার উপর দাঁড়িয়ে। কেবল মা লাঠি বা বেত হাতে নিয়ে ব্যস্ত সাপ তাড়াতে। সাপ মানেই বাড়ির পেছনের গোয়ালঘরে গরুর দুধ খেয়ে যাওয়া। তবে বাস্তুসাপ মারতে নেই। তাকে শুধু তাড়াতে হয় কাউকে কামড়ে দেবার আগেই। এদিকে বাড়ির উৎসুক শিশু কিশোরেরা ভাবছে, সাপের মাথার মণির কথা।
৭.
সকালবেলা বেজে উঠে মায়ের পছন্দের গান। মান্না দে, হেমন্ত বা কিশোরকুমার। এরমধ্যে কারা যেন ফিতের ক্যাসেটের দুর্লভ মান্না দে- কে চুরি করে নিয়ে গেছে দুবার। ক্যাসেটের খাপ লুকিয়ে রাখা হয়েছে যাতে আর কেউ বুঝতে না পারে এতে মান্না দে-র গান আছে। তারপরেই বড় ছেলেমেয়েরা শুনবে অঞ্জন, সুমন, জিম মরিসন, বিটলস, কান্ট্রি সঙ, বাংলা রক ব্যান্ডের গান। সারাদিন টুইন ওয়ান বেজেই চলেছে ক্লান্তিহীন। বাড়িটাও একেকটা গানের তালে যেন নেচে উঠে আনন্দে।
৮.
সবাই বড় হয়ে যায়। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে শিশু কিশোরের দল ব্যস্ত হয়ে যায়। সব্জি বাগান কবেই সাফ। আবার নতুন করে এনামেল পেইন্ট চাপে দেয়ালে। এবার দরজা জানলার সবুজ জামা বদলে যায় নেভি নীলের রঙে। দেয়ালের জমে উঠা গাঢ় সবুজ শ্যাওলা ঘষে ঘষে তুলে ফেলা হয়। বাড়ির একটু মন খারাপ হয়। কিন্তু এভাবে নিজেকে তরুণ হতে দেখতে খারাপও নিশ্চয় লাগে না। ২৬-২৭ বছর ধরে এরাই তো আপনজন। এরাই তাকে সাজায়, এরাই তাকে গোছায়। বাড়িটা তাঁর প্রশ্রয়ের আশ্রয় জারি রাখে।
৯.
৩৬২ জলিলগঞ্জ। জ্ঞান হবার পর থেকে জেনে এসেছি এই আমার ঘর। ঘর আর বাসা দুটো যে আলাদা শব্দার্থ বহন করে তা বুঝেছি আমাদের পুরনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাসায় আসার পর। কোথাও নেই সেই খোলামেলা হাওয়ার দৌড়। বিশাল সব রুমে থেকে থেকে অভ্যস্ততা ছেড়ে হুট করে খুপড়ি ঘরে এসে পড়ার সাথে যেন খাঁচায় বন্দীদশার তুলনাই দেয়া চলে। বিছানায় গা এলানো অলস দুপুরের গল্প উপন্যাসের চরিত্রের সাথে মিশে যাওয়া, প্রতিবেশীদের নুন, তেল, হলুদ, মরিচ মশলা ফুরিয়ে গেলে কৌটো ভরে দেয়া, রান্না কিছু নতুন বা ভালো হলেই বাটি ভরে খাবার দেয়া-নেয়া এসব ছেড়ে ফ্ল্যাটবাড়িতে উঠে আসাটা হয়ত সময়ের প্রয়োজন ছিল কিন্তু আত্মার প্রয়োজন নয়। তাই এখনো স্বপ্নে পাওয়া যায় তুলসি শিউলির ঘ্রাণ, চাঁদের নকশা হাতে পাওয়া রাত, নিত্যকার ঘর গেরস্থালীর মধ্যবিত্ত গল্পসব।

x