আমাদের পূর্বসূরি আমাদের সাহিত্য

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
40

অল্প বয়সে আমিও বেগম এর ঈদ সংখ্যায় লিখেছি। লেখকদের কাছে ঈদের আগেই বিনা মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হতো এই ঈদ সংখ্যা। ঈদসংখ্যার গল্প উপন্যাসগুলোও হয়ে উঠতো ঈদ আনন্দ উৎসবের অংশ। সুফিয়া কামাল, রাবেয়া খাতুন, জাহানারা ইমাম, রিজিয়া রহমান, জাহান আরা আরজু, লায়লা সামাদ, সেলিনা হোসেনদের লেখায় সমৃদ্ধ থাকতো। আজকে যে আমরা মন খুলে লিখতে পারছি মূলত এই নারী লেখকরাই আমাদের লেখালেখির ক্ষেত্রটা প্রস্তুত করে দিয়েছেন, তাঁদের নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে আজকের মসৃণ পথ।

এক সময় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কোলকাতা। দেশ ভাগের পরে ৫০-এর দশক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আস্তে আস্তে খুব অল্প সংখ্যক লেখক সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটা ভিত্তি তৈরি করে তুলেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আমরা দেখতে পাই আলাউদ্দিন আল আজাদ, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, আহসান হাবীব প্রমুখ। সে সময়ে নারী লেখকদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত হওয়া এবং তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অনেক কঠিন ব্যাপার ছিল। সেই প্রতিবন্ধক পরিবেশ থেকে মেধা ও সংগ্রামকে পুঁজি করে কিছু নারী লেখক আত্মবিশ্বাসের ভিত গড়ে তুলেছিলেন।
আজকের নারীরা লিখতে পারছেন স্বাধীনভাবে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ভাল লেখা পেলেই সুযোগ করে দিচ্ছে। অন্তত লেখকদের বেলায় লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে না বলে আমার বিশ্বাস। রাতের জোনাকীর মত বের হয়ে আসছে নারী লেখকরা, লিখছে, প্রতিবাদ করছে, সমাজের ক্ষতগুলোকে সামনে আনছে সাহসের সাথে। মা খালাদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় ছিল ‘বেগম’ পত্রিকা। এটা ছিল সাপ্তাহিক মহিলা পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন নুরজাহান বেগম। এই পত্রিকায় গল্প, ধারাবাহিক উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী, সাজ পোশাক, সিনেমার খবর, রান্নাবান্না সবই থাকতো। তাই মহিলাদের কাছে এটি অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন পত্রিকা ছিল। লম্বাটে পাতলা ম্যাগাজিন হলেও ঈদ সংখ্যা বের হতো বেশ বড় আকারে। ছবিসহ লেখকদের লেখা প্রকাশিত হতো। অল্প বয়সে আমিও বেগম এর ঈদ সংখ্যায় লিখেছি। লেখকদের কাছে ঈদের আগেই বিনা মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হতো এই ঈদ সংখ্যা। ঈদসংখ্যার গল্প উপন্যাসগুলোও হয়ে উঠতো ঈদ আনন্দ উৎসবের অংশ। সুফিয়া কামাল, রাবেয়া খাতুন, জাহানারা ইমাম, রিজিয়া রহমান, জাহান আরা আরজু, লায়লা সামাদ, সেলিনা হোসেনদের লেখায় সমৃদ্ধ থাকতো। আজকে যে আমরা মন খুলে লিখতে পারছি মূলত এই নারী লেখকরাই আমাদের লেখালেখির ক্ষেত্রটা প্রস্তুত করে দিয়েছেন, তাঁদের নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে আজকের মসৃণ পথ। আমাদের পূর্বসূরি অনেক নারী লেখক তাদের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে পুরুষের মতই লিখেছেন। আজকে বিশেষ করে দুইজন লেখকের কথা মনে পড়ছে রিজিয়া রহমান ও রাবেয়া খাতুন। এক সময় উনাদের লেখা খুব পড়া হতো, সেলিনা হোসেন আরও পরের। তিনি এখনও তুমুলভাবে সক্রিয়। কিন্তু রাবেয়া খাতুন, রিজিয়া রহমানকে আমরা আর সেভাবে পাইনা। তাঁরা ছিলেন সময়ের সাহসী লেখিকা, রিজিয়া রহমান পুরুষ লেখক ও নারী লেখকের দূরত্ব ভাঙতে পেরেছিলেন। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ অগ্নিসাক্ষর ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। এই গল্প গ্রন্থের ‘লাল টিলার আকাশ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ম্যাগাজিনে অশ্লীলতার অভিযোগ এনে ছাপা হয়নি। ‘ললনা’ নামক একটি পত্রিকায়ও তিনি নিয়মিত লিখতেন। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁর ঘর ভাঙা ঘর বস্তির মানুষদের দুঃখ দুর্দশা ও ক্লেদ নিয়ে রচিত। এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উত্তর পুরুষ। এই উপন্যাসে তিনি চট্টগ্রামের হার্মদ জলদস্যুদের দখলদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেন। এতে তিনি আরাকান রাজসন্দ সুধর্মার অত্যাচার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্ব, পর্তুগীজ ব্যবসায়ীদের গোঁয়া, হুগলী চট্টগ্রাম দখলের ইতিহাস তুলে ধরেন।
এছাড়া নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়েদের মানবেতর দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাবলী নিয়ে লেখেন ‘রক্তের অক্ষর’। বং থেকে বাংলা প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। বাঙালির জাতীয়তাবোধ ও বাংলা ভাষার বিবর্তন এই উপন্যাসের মূল বিষয়।
রাবেয়া খাতুন আর এক প্রখ্যাত সাহিত্যিক। পঞ্চাশের দশকে এই অঞ্চলের মুসলিম নারীদের জীবন যখন অনেক বিধি নিষেধের বেড়াজালে বন্দি তেমনি সময়ে তাঁর আত্মপ্রকাশ। তিনিও বাংলা একাডেমি পদক, একুশে পদকসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। রিজিয়া রহমানের চেয়ে তিনি বেশি প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন।
তাঁকে দুটো সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে একসঙ্গে। একদিকে সাহিত্য সংগ্রাম, অন্যদিকে নারী হিসেবে ব্যক্তিসত্তা প্রতিষ্ঠার লড়াই। তাঁর কথা সাহিত্যে নারীর জীবন প্রকৃতি ও সংগ্রাম একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। তিনি নিজেও বলেছেন তখন লেখা প্রকাশ এত সহজ ছিল না। পত্রিকাও ছিল কম। তখন সামাজিক দিকগুলো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। সমাজের প্রভাব পরিবারের ওপর প্রবল ছিল কিছু লেখার আগে ভাবা হতো সমাজ কি বলবে, পরিবার কি বলবে। তাঁর প্রথম উপন্যাস মধুমতী- তাঁতী সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনের দুঃখ গাথা নিয়ে রচিত। পরবর্তীতে এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। তাঁর স্বামী সাহিত্য সংস্কৃতিক মানুষ বলে বরাবরই তাঁকে উৎসাহিত করেছেন এবং পাশে ছিলেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতা করেছেন। সাংবাদিকতা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য অনেক উপন্যাসের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে ‘সাহেব বাজার’, ‘অনন্ত অন্বেষা’ ‘মন এক শ্বেত কপোতী’, ‘ফেরারী সূর্য’ ‘রাজার বাগ শলিমার বাগ’, “মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র’।
এখন নারী লেখকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে সকল দরজা। বলতে গেলে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। তাই নারী লেখকদের বক্তব্যও স্পষ্ট হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরিদের নিকানো উঠানেই আমরা হাঁটছি। তাই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাঁদের। আমরা তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাঁদের সৃষ্টিগুলো হচ্ছে আমাদের বাতিঘর।

x