আমাদের কবিতা : প্রাত্যহিক স্বপ্নময়তার দর্পণ

রিজোয়ান মাহমুদ

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ
16

আমাদের প্রজন্ম কিংবা আমাদের উত্তর প্রজন্মের কবিতার বয়স মাত্র ৪৭ বছর। স্বাধীনতার বয়সের সমান। ’৭১-এ আমরা ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে কবিতায়ও আলাদা হবার সুযোগ পেয়েছি। ঔপনিবেশিক শাসনের ত্রয়ী অব্যবস্থাপনায় শিল্প সাহিত্যের’ স্বাধীন জায়গাগুলোতে আমরা স্বচ্ছন্দ বিচরণ করতে পারিনি। আমাদের চিন্তার নিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবোধ ও অন্যান্য অনুসঙ্গগুলোসহ কবিতা নিয়ে ভাববার অখণ্ড অবসর শৃঙ্খলিত হয়েছে। সে কারণে মোগল আমল থেকে ব্রিটিশ শাসনামল এবং তৎপরবর্তী পাকিস্তান আমলে কবিতায় ঠাঁই পেয়েছিল শূন্যতাবোধ, চিন্তার দারিদ্র্যতা ও সর্বশেষ অস্বস্তিকর অস্থিরতা। এসব কেবল আজকের কথা নয়। চার্চ কেন্দ্রিকতাকে ভেঙে ঊনিশ শতকের ইউরোপীয় কবিতার যে যজ্ঞানুষ্ঠান হয়েছিল, তাতে জোসেফ এপস্টেইনের প্রবন্ধে এই শূন্যতাবোধ সম্পর্কে একটি ধারণা জন্মে। তার কিছু বৈশিষ্ট্য এরকম- ক) অনেক সমকালীন কবিতা সম্মান পাবার যোগ্য। তবে সীমিত ও নির্দিষ্ট গণ্ডীর বাইরে সে কবিতা খুবই কম পঠিত হয়। খ) সাম্প্রতিককালে কবিতা মোটেও বুদ্ধিজীবীদের নৈমিত্তিক খোরাকের মেন্যু নয়। এক সময় লন্ডনের রাস্তায় টেনিসন হেঁটে গেলে ভিড়ের পেছনের মানুষ পায়ের পাতায় ভর দিয়ে গলা বাড়িয়ে তাকে দেখতো। গ) কবিতা তার মধ্যমঞ্চের ভূমিকা থেকে এখন নিজে নিজেই অন্তর্হিত হয়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে। ঘ) প্রকৃতপক্ষে কবিতা এখন অস্বাভাবিক, অদ্ভুত এক পার্শ্ব চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ। ঙ) কবিতায় অন্ধ অনুগমণকারী এবং অনুসারীদের সংখ্যা এখন নগণ্য। কবিতা সম্পর্কে এই ঘোরতর অভিযোগ শুধু জোসেফ এপস্টেইনের নয়। ১৯৪১ সালে র‌্যান্ডেল জ্যারেল তার এক অভিভাষণে কবিদের কবিতার ভাষা ও চেতনাকে অগম্য করে তোলার জন্য জাতীয় সংস্কৃতির চর্চার অভাবকেই দুষেছেন। কবি ও প্রাবন্ধিক ওয়েল্ডেল বেরির ভাষায়, ‘এ সময়ের অর্থাৎ আধুনিক কবিতার ক্ষয়প্রবণতাটি সাধারণত ভাষার এক অপরিহার্য বিভাজন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। আমার ধারণা বিগত ১৫০ বছর ধরে ভাষার অর্থবোধহীনতা অথবা অর্থ বিকৃতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। ভাষার এই ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতার সমান্তরালে একইকালে ক্রমবর্ধমান বিভাজন প্রক্রিয়াটির সহাবস্থান।’ এ সমস্ত অভিযোগ ইউরোপীয় কবিতার জন্য ইউরোপীয় কবি ও সমালোচকদের। ধরা যাক বাঙলা কবিতা। কতটা সহজ ভাষায় এবং কতটা গম্য ভেতরে যাবার। এই উপমহাদেশের কবিতার যে অন্তর্নিহিত শক্তি ছিল তা আমরা সঠিক সময়ে ধরতে পারিনি। যেমন একজন নেপালি কবির কবিতায় কী বলা হচ্ছে? আমরা জানতে পারছি না অনুরূপ মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া কবিতায় কি কাজ হচ্ছে? কবিতার জন্য এই উপমহাদেশ আমাদের অকর্ষিত থেকে গেল। কবি লিথোনাদ পোদল নেপালি ঐতিহ্য ধারার একজন কবি। তার প্রতিবাদের ভাষা ভিন্নতর, কোনো কোনো কবিতা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তার পিঞ্জরার মধ্যে তোতাপাখি প্রকাশিত হওয়ার পর প্রবল প্রতিবাদে ফেটে পরে নেপাল ভাষী। আমরা আজ অবধি জানতে পারিনি কৃষ্ণভূষণ বল, বিষ্ণুবিভু ঘিমেরী ও মাধব ঘিমেরীকে। এশিয়ার ভেতরে আর এক দেশ, মালয়েশিয়া। এখনকার সময়ে এশিয়ার সর্বোচ্চ মডেল হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়া। বিশেষ করে তার অর্থনীতি, সমাজনীতি ও রাজনীতির উত্তরাধিকার ধারায়। ডা. মাহাথির মোহাম্মদ, ২৪ বছরের শাসনাধীন উত্তর প্রবল উচ্চারণে সাহসের সঙ্গে পশ্চিমা ইতিহাস সংস্কৃতি ও আগ্রাসনের বিপক্ষে সতর্ক করেছিলেন গোটা বিশ্বকে তথা তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশসমূহকে- এখন তিনি আবার ক্ষমতায় মালেশিয়ার পরিবর্তনের লক্ষে। সেই মালয়েশিয়ার সাহিত্যের ঐতিহ্যের ধারায় কিছু কবি সাহিত্যিককে দেখতে পাওয়া যায়। পেনটুন কাব্যের সৌন্দর্যবোধের ধারায় স্নাত ছিলেন বহু কবি। মূলত পেনটুন ছিল প্রাচীণ কাব্য অর্থাৎ মালে কাব্য। পেনটুনে ছিল মালে জাতির প্রতিচ্ছবি। যে সমাজ শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষ ও জনপদকে বাঁচতে সাহায্য করে। এ ধারার কবিতায় পাওয়া যায় কবি সালাম ম্যা, কবি মালি খান, কবি সাইমি হাজি মুহাম্মদ, ইউনুছ সাইমি- এদের কবিতায় সমাজগীতি, নৃত্যগীত ও ফসল উৎসবের গান লক্ষ করা যায়। এবার আসা যাক এশিয়ার উন্নয়নশীল আর একটি দেশ শ্রীলংকার কবিতায় কী ঘটেছে অথচ আমাদের খুব কাছের এই দেশ। আলাদা সংস্কৃতি ও হাজার বছরের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিল বলে সুবিশাল ভারত থেকে ক্রমে ক্রমে পৃথক হয়ে পড়ে। শ্রীলংকার ঐতিহ্যধারার কবি ছিলেন মীমানা প্রেম তিলাকা, শোন্নিবাই রত্নী এঁদের কবিতায় ছিল প্রাচীন সিংহল ভাষীর নিকটতম ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং পালিত আচার অনুষ্ঠান। ইন্দোনেশিয়া, বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ দ্বীপের সমবায়ে গঠিত এশিয়ার একটি দেশ। এঁদের সংস্কৃতি স্বজাত্যবোধ ইতিহাসের ভিন্ন মাত্রায় প্রবাহিত হলেও অভিন্ন একটি সুরের মূর্ছনায় নিমজ্জমান ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবোধ। এদের টাকায় আছে গণেশের ছবি। বিমানের নামকরণ করা হয়েছে গারুড়া। এই দেশ মুসলিম হিন্দু, হিন্দু বৌদ্ধ জাতির সমন্বয়ে একটি অভূতপূর্ব দেশ। এই জায়গায় জন্মেছে গদ্য সাহিত্যের তিলকরত্ন লেখক অনন্ত প্রমোদ্য। যিনি পশ্চিমা সাহিত্যের যাবতীয় অনুষঙ্গকে অস্বীকার করে এসেছে প্রথম থেকে। বিরোধিতা করে চলেছে সাম্রাজ্যবাদকে। অথচ আমরা অবগত নই কিংবা মনোযোগ নেই প্রতিবেশী নিকটবর্তী শিল্প-সাহিত্য নিয়ে। এমন কি আমাদের মনোযোগ নেই, ভারতীয় স্থানীয় সাহিত্যে কি উলট-পালট হচ্ছে। মহারাষ্ট্র, কেরালা, তামিলনাড়ু গৌহাটির কবিতা ও সাহিত্যের কি পরিচয়? একজন ত্রিবান্দমের তরুণ কবি বালচন্দ্রনকে আমরা কখনো জানতে চেষ্টা করিনি। অথচ তাঁর কবিতা শ্লোগান নয়, মন্ত্র নয়। কিন্তু কবিতার টানাপোড়েন আছে এবং তাতে খুলে যায় তৃতীয় মাত্রার চোখ। ত্রিবান্দমের খুব জনপ্রিয় কবি বালচন্দ্রন। প্রচুর লোক তার অনুষ্ঠানে কবিতা শুনতে চায়। একটি কবিতা পাঠের আসরে দশ থেকে পনেরো হাজার লোকের সমাবেশ দেখার স্বপ্ন দেখেন যে কবি- তাঁর একটি কবিতা এরকম- সবচেয়ে তপ্তহৃদয়? আমার মা। সবচেয়ে কঠিন ব্যাকরণ? আমার বাবা। সবচেয়ে লবণাক্ত সমুদ্র? আমার স্ত্রী। সবচেয়ে নিঃশব্দে কান্না? আমার বোন। সবচেয়ে অনাথ জড়? আমার ভাই। সবচেয়ে বিকৃতমুখ? তা আমারই। উল্লেখিত এই কবিতায় আধুনিক মেজাজ আছে বটে, কিন্তু দুর্বোধ্য নয়, স্পষ্ট কিন্তু রহস্যহীন নয়, সুগম এবং সৌন্দর্যময়। যেমন কর্ণাটকের কবিতারও উদাহরণ দেয়া যায়, একটি কবিতায় কর্ণাটকের কবি লেখেন- আমি এইমাত্র পাঠ করে এলাম কবিতা-নগ্ন নারীদের নিয়ে উপহাস করেছে বৃষ্টি-কবিতা আমাকে ঠেলে দিচ্ছে নারীর দিকে নারীরা আমাকে নিয়ে সুখী নয়। খুব সুগম্য কবিতা। প্রকৃতপক্ষে কন্নড় কবিতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। কর্ণাটকের কবিতা ঐতিহ্য ভারাতুর। বলা হয়ে থাকে কন্নড় কবিতার সঙ্গে বাংলা কবিতার অনেক সাদৃশ্য আছে। দ্বাদশ শতকে বীরশৈবসন্ত কবিরা কর্ণাটকের ‘বচন’ নামে যে কবিতাবলি রচনা করেছিলেন তার সমান্তরাল কবিতা চর্যাপদে বা পরবর্তী কবিতায়ও লক্ষ করা যায়। গোপালকৃষ্ণ আদিগা সে সময়ের অন্যতম কবি। আমরা কখনো আমাদের উপমহাদেশের কবিতা কিংবা ভারত মহাদেশের স্থানীয় কবিতার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারিনি। কারণ প্রথম উপনিবেশ মোগল আমলের রাজ কবি এবং সভাকবিদের রাজ-রাজাদের স্তুতি, কবিতায় বিষয় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্ভার নিয়ে আসতে পারেনি। দ্বিতীয় উপনিবেশ ব্রিটিশ শাসনামলেও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হয়। কবিতায় ও গদ্যে ইউরোপীয় সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতি ঢুকে নকল আভিজাত্য প্রকাশ পেতে থাকে। পাকিস্তান আমলে তমদ্দুন মজলিশের জয়গান করে ইসলামী অনুষঙ্গে কবিতা রচিত হয়েছে প্রচুর। ফলে কবিতা হয়েছে ধর্মীয় জিগির, ধর্মীয় অনুশাসনের দলিল।
এখনকার কবিদের ধারাবাহিকতায় আধুনিক জটিল সময়গ্রন্থিকে উন্মোচন করে সম্প্রসারিত করেছে ভাষা ও বিষয়। অপর অংশ লোকায়ত জীবনের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে যাচ্ছে নিজস্ব মহিমায়। এতে কবিতার ভাষায় দ্বিগুণ শক্তি এসেছে। বিষয়ে বৈভব ছড়িয়েছে। নতুন উদ্দীপনায় নিজস্ব সংস্কৃতি ইতিহাসের ভেতর থেকে এক জাতীয় অসাম্প্রদায়িক চেতনার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এটি তৈরি করে দিয়েছে প্রথম অংশ, যারা বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আধুনিকতাকে বরমাল্য পরিয়েছেন। ৪৭ বছর আমাদের কবিতায় অর্থাৎ বাংলাদেশের কবিতার সফলতা ও অসফলতা বিচার একটি দুরূহ কাজ। আমি শুধু আমাদের অর্জনের কথা বলতে চেয়েছি। স্বাধীনতা উত্তর সমগ্র জেলায় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঁচ হাজার কবির নিশ্চয় পঞ্চাশ লক্ষ কবিতা লেখা হয়েছে। আমার উল্লেখিত এই সংখ্যা কোনো নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসেনি। প্রতি সপ্তাহে অসংখ্য দৈনিকের পাতায় কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রকাশিত অসংখ্য লিটলম্যাগে চারিত কবিতার রোদেল দুপুরে আমাদের ক্রম অগ্রসরমান স্বপ্ন প্রলম্বিত হয়েছে। শিক্ষিত ও চিন্তাশ্রিত করেছে সময়কে। আমি মনে করি কবিতার চোখ কোনো স্বপ্ন দেখা ও দেখানো ছাড়া কোনো শক্তি নেই। বিশ্বযুদ্ধ উত্তর কবিরাও স্বপ্ন দেখিয়েছে বিধ্বস্ত বিশ্বকে পুনর্গঠিত করার, সাহস যুগিয়েছে নতুন দর্শনের আলোকে একটি যুগোপযোগী বিশ্ব তৈরি করার। প্রতিবাদের আগুনে ঝলসে উঠেছে কবিদের শব্দের ব্রহ্মাস্ত্র। আবার কখনো অনুভূতির প্রবল স্নিগ্ধ শব্দগুচ্ছ নিয়ে নান্দনিকতার সৌকর্যে পরখ করেছেন অনাবিল সৌরভকে। এভাবে কবিতা যুগে যুগে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। কবিতা সাহিত্যের সবচে’ অনুভূতিপ্রবণ প্রপঞ্চের মধ্যে সর্বোত্তম। এটি সাহিত্যের অন্যান্য শাখার লেখককুল যেমন স্বীকার করেছেন। স্বীকার করেছেন সাহিত্যের বাইরে সংবেদনশীল পাঠক। পাঠকের রায়ে কবিতা কখনো দুর্বোধ্য, আবার কখনো সচল বহতা নদীর মতো স্নিগ্ধ। ইদানিং কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। এটি সত্য যে সাধারণ পাঠক আর কবিতার মধ্যে নেই। একটি জনপদের প্রতি বর্গমাইলে যদি তিন সহস্র মানুষ বাস করেন, তিন সহস্র মানুষের মধ্যে ১০ জন কবিতার পাঠক পাওয়া যাবে এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে পারে।
স্বাধীনতা উত্তর আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন চাহিদা ও যোগান আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। চাহিদা ও যোগান এক সাথে স্থিত না হওয়ায় যুবকদের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। প্রকৃতপক্ষে কবিতা বোঝা ও গ্রহণের স্বাদ রবীন্দ্রনাথ যেভাবে তৈরি করেছিলেন, সেই মনোবৃত্তি পরিবর্তন হলেও সমৃদ্ধ মনন তৈরি হতে সাহায্য করেনি। মানুষের কিছু প্রয়োজন মেটানোর জন্য উপর চালাকি বৃদ্ধি হয়েছে। কবিতার জন্য কোনো মনোনিবেশ গড়ে ওঠেনি। আবার একথা না বললেও অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় যে, রবীন্দ্র পরবর্তী কবিতায় শরীরে ঢুকেছে হিংস্রতা, শব্দসন্ত্রাস। ফলে কবিতা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকেনি। ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ থেকে যে সমগ্র রবীন্দ্রকাব্যের গুণমুগ্ধ সরলতা সেটি ঊনিশ শতক পরবর্তী কাব্যধারায় ছিল দুষ্প্রাপ্য। কথা হলো, ঊনিশ শতকের রবীন্দ্র সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের চালচিত্র আজকের প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রবর্তী সমাজ ও জনপদে কী রূপ নিয়ে আসতে পারে? কতটা সারল্যের গুণ থাকলে এই জনপদের মানুষ আবার কবিতামুখী হবে? প্রশ্ন জাগে কবিতা কি সবার জন্য? না কি কবিতা যে লেখে আর কবিতা যে পড়ে সে রকম কয়েক জনের জন্য? সম্ভবত সব সমাজে কবিতার পাঠক ও শ্রোতা কম ছিল বলে কবি হোমার এক সময় ইউরোপ থেকে ঘোষণা দিয়েছিল যে- কবিতা পড়া ফুটবল খেলার মতোন সহজ হোক। অবাক না হয়ে পারি না যে, কবিতার ইসথেটিকস্‌ নিয়ে চূড়ান্ত সব বই লেখা হয়েছে ইউরোপে। আমার ধারণা কবিতাকে জনমুখী করার জন্য কবিতা আর সহজ হবে না। সম্ভবত এ দায়িত্ব কবিরা নেবে না। সাধারণ মানুষের চিন্তা ও স্বপ্ন থেকে কবিরা আলাদা মাত্রার স্বপ্ন দেখেন বলেই তো তারা কবি। কবিরা পিছিয়ে পড়া জনপদকে টেনে তুলবেন, জনপদের সমান চিন্তার ধারক হবেন না। দায়িত্ব সেসব মানুষের, যুবকদের যারা সমাজ বিনির্মাণ ও নান্দনিক প্রত্যয়কে প্রকাশ করার দুর্বার আকাঙ্ক্ষায় কবিতার সহযাত্রী হবেন। আজকে আমাদের কবিতা সেসব জায়গাগুলোতে রোপণ করতে যাচ্ছে স্বপ্নবীজ। বস্তুত পৃথিবী এক রকমের সংকটের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। একদিকে নব নব প্রযুক্তি এবং শক্তি পরীক্ষায় অস্ত্র কেন-বেচার হাটে পৃথিবী ও তার মানুষ ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। এই দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশে পৃথিবী ও তার মানুষ অনুসন্ধান করতে চাইছে জাতিগত পরিচয়, নিজের ভূমিতে দাঁড়িয়ে কথা বলার দুর্বার সাহস। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের শেকড় সমৃদ্ধ জনজীবনের বিশ্বাস ও ভূমিচেতনা, ক্রমশ ইউরোকেন্দ্রিকতাকে পরিত্যাগ করে স্ফীত হচ্ছে। আফ্রিকাও পিছিয়ে নেই, তাদের সমৃদ্ধি সাংস্কৃতিক অহংকার থেকে। মুক্তি ও সনদ নিয়ে দাঁড়িয়েছে এডওয়ার্ড সাঈদ, মিশেল ফুকো ও দেরিদা। তাদের হাতেই আছে প্রাচ্যের স্নিগ্ধ অহংকার। সে কারণে আজকের তরুণের কবিতায় পাওয়া যায় লোকজ বাংলার বৈভব। মিথকথনের মিতালী, কিশোর-কিশোরীর স্বপ্ন, রূপকথা; এমনকি চাঁদের বুড়ির গল্প বলাও আছে। সীতা যেখানে গমন করুক রামের সুমতি ও প্রেম সঙ্গে আছে। দ্রৌপদীর শাড়ি কখনোই খুলবে না, যতই চেষ্টা করুক দুঃশাসনেরা। অতএব কবিতা নিয়ে দুর্ভাবনা নয়। কবিতার কখনোই মৃত্যু হবে না। জনপদের রক্ত মাংসের মানুষ যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন অনুভূতির রক্তে স্বাদ নেবে কবিতার ভাষা। কবি গালিবের ভাষায়:
ভাঙা কবরের পাশে এলোচুলের কোন সুন্দরীকে যখন কাঁদতে দেখি তখন এমন মনে হয় যে মৃত্যু কত সুন্দর কিম্বা বোন আর আমি একটি জামা উল্টেপাল্টে পড়তাম তাতে কি আমরা দু’জনে থাকতাম? নিবিড় কোন মৃত্যময়তায় ঘূর্ণায়মান পিঙ্গলতায় বোনের মধ্যে বোন হয়ে তবে আমি কি লুকিয়েছিলাম? এগুলো বিশুদ্ধ অনুভূতির স্নিগ্ধ বাক্যমালা। এতে পাওয়া যাচ্ছে, নির্মল প্রতিবেশ নির্মাণ। সুবোধ্য ভাষার আশ্চর্য যোগাযোগ পাঠক ও কবির। বিষয় ও আঙ্গিকের সরলতায় অভিনব শব্দের গাঁথুনি। এটিই হোক বাংলা কবিতার ব্রত।

তিরিশ-এর অবক্ষয় ও সাম্প্রতিক কবিতার স্বর

বাংলা কবিতা যখন সুস্থধারার সমন্বিত একটি জায়গায় বাঁক নিচ্ছে, বদলে দিচ্ছে এবং বদলেও দিয়েছে অনেকটা পথ, শাশ্বত সেই বদলে যাওয়ার চিরন্তন অভিপ্রায়কে ঘোলাটে করার জন্যে, কোন কোন কবি-চিন্তকের মস্তিষ্কে আবারও সেই ঔপনিবেশিকতার ভূত চেপে বসেছে। ফলে কোন কারণ ছাড়াই পাশ্চাত্য চিন্তা ও চিন্তকের সঙ্গে বাংলা কবিতার চরিত্র লক্ষণের একটি সম্পর্ক তারা অনায়াসে তৈরি করে ফেলেন। সোচ্চার কণ্ঠে ব্যক্ত করেন; এই সময়ের বাংলা কবিতায় ঐতিহ্য, ইতিহাস, লোকায়াত আচরণ সর্বোপরি মিথের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। এটি শুরু হয়েছে সেই ঊনিশ শতকের প্রথম দশক থেকে এবং এখনো বর্তমান। সেই কারণে বারংবার বাংলা কবিতায় তিরিশের দশকটি এসে পড়ে। ষাট ও সত্তর দশক পর্যন্ত কবিতার কী চরিত্র লক্ষণ ছিল তাও সঙ্গত কারণে ব্যাখ্যার প্রয়োজন দাবী করে। এসব বিষয় নিয়ে দেন-দরবার হয়েছে এবং এন্তার লেখা হয়েছে বিগত দু’তিন দশক ধরে। আধুনিকদের মধ্যে অনেকে স্বীকার করে নিয়েছেন, দু’শ বছরের আধুনিকতার মধ্যে ছিল যুদ্ধ-বিগ্রহ, দুঃশাসন যৌনতা রিরংসা এবং স্বৈরাচারী মনোভাব, যা বিকলাঙ্গ, বিপর্যস্ত করেছে এদেশের অথবা এ অঞ্চলের স্বাধীন চিন্তার ধারক বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও একাগ্রতাকে। মূলত কারেন্সি সভ্যতা বিকাশের পর্ব থেকে আরো বেশি রকমের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে পাশ্চাত্য সমাজ-সভ্যতা। বিশ্বে সমাজতন্ত্রের পতনের পর সমগ্র বিশ্ব একটি গ্রাম বিশ্বে পরিণত হয়। সেই সুযোগে আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্ব নতুন কৌশলে দেশ ও সংস্কৃতি দখলের মাত্রা অন্যতর ব্যাঞ্জনায় উপস্থাপিত করে- যা দরিদ্র তথা তৃতীয় বিশ্বের কবি, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্য-পিপাসু মনকে পাশ্চাত্যের ঘটকে পরিণত করে। আমাদের কবি, বুদ্ধিজীবীরা এখনো এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, জাতিগত ধারণায় স্পষ্ট হতে পারেনি স্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি। তৈরি হয়নি অনুকূল পরিবেশ। এই ধারণা স্পষ্ট থাকা দরকার যে একটি জাতি পূর্ণাঙ্গ জাতি গোষ্ঠীতে পরিণত হয় তখন-যখন উপলব্ধির ক্ষেত্রগুলো পুনর্বিবেচিত হয়। যেমন একটি জাতির ভাষণ কী? সংস্কৃতি ও ইতিহাস সেই জাতি গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাপনায় কী ভূমিকায় থাকে? সেই জাতি দেশ ও সমাজ বিনির্মাণে কোন সৌন্দর্যের অন্তর্গত হয়ে শিল্প সাহিত্যের জায়গাগুলো স্পষ্ট করে?
একথা আজ অনস্বীকার্য শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিবেচনা থেকে আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। এদেশের জনগোষ্ঠীর ভাষা, সাংস্কৃতিক আচরণ, লোকায়ত জীবন প্রবাহ ভিন্ন ব্যঞ্জনায় একমাত্র বাঙালির অহংকার ছিল বলে নয় মাসব্যাপী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে মুক্ত হয়েছিল বাধা বিপত্তি ও নৈরাজ্য থেকে আজকের এই বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সংস্কৃতির ফসল। ভাষা আমাদের কণ্ঠের উচ্চকিত অহংকার। ইতিহাসের আমাদের বাতিঘর। আমরা সেই বাতিঘর থেকে আলো বিলিয়ে একটি উত্তর আধুনিক জীবন প্রবাহে শামিল হতে চাই। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে আমাদের সংস্কৃতি মনোউপনিবেশিকতা সৃষ্টি করে মোটা দাগে এগিয়েছিল। আরো একবার পরখ করলে এর মর্ম উদ্ধার করা কঠিন হবে না। যেমন কবি বিষ্ণু দে-তাঁর কবিতায় কী আছে? বেদনাহত একাকী মানুষ মূলত যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তার কাব্য জীবনটাতে। সমাজতন্ত্র সচেতন কবিরূপে তাঁর যত প্রচার- তার অনুরূপ কবিতা তাঁর রচনাবলীতে ততটা লভ্য হয় না। এমনও লক্ষ করা গেছে তার প্রেম স্পর্শ চিহ্নিত ব্যক্তিগত কবিতাকেও অনেকে সামজতান্ত্রিক পরিচয় চিহ্নিত কবিতা বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি জনসাধারণকে এড়িয়ে নিজের ব্যক্তি চেতনার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তিরিশের কবিবৃন্দ ও কবিতাকে অন্তর্গত ধ্যানে পাঠ করলে বোঝা যায়। পাশ্চাত্য ইতিহাস-পুরাণ-ভূগোল-সঙ্গীত-সাহিত্য ছন্দ তত্ত্বের জগৎ থেকে তাঁরা অকৃপণ হস্তে ধার করেছিলেন বাংলা কবিতাকাশকে সমৃদ্ধ করার জন্যে। যেমন পাশ্চাত্য মিথের কথা বলা যায়। ‘আটেমিস’, ‘বুদোয়ার’, ওফেলিয়া’, ‘হেডিস’, ‘প্যান্ডার’, ‘ক্রেসিডা’, ‘হেলেন’, ‘ট্রয়লাস’, ‘সিরোক্কা’, ‘গ্যালাহাড’, ‘ভিয়েলা’, মিথের এসব চরিত্র কোন পূর্ণাঙ্গ মানসিকতা নিয়েও আবর্তিত হয়নি। হঠাৎ ঢুকে পড়েছে কবিতার কোন এক জায়গায় এবং কোন অনিবার্য প্রয়োজন থেকেও আসেনি। এইসব কবিতা আধুনিক যুগ-চেতনার মধ্যে মানুষের কাছে পৌঁছানোর যে ব্যাপারটি সর্ব প্রধান শর্ত, তার পরিচয়ও এখানে তেমন নেই। বুদ্ধদেব বসু, আধুনিক কবিতার সব থেকে বড় জামিনদার বলা হয়। প্রায়শঃ তাঁর কবিতায় প্রতীকের ব্যবহার দুর্লক্ষ্য নয়। কিন্তু তাঁর ব্যবহৃত প্রতীককে অনেকেই আধুনিক বলতে নারাজ ছিলেন। অনেকেই মনে-করেছেন যুগচেতনা নিরপেক্ষ ব্যক্তিগত ব্যাপার। যেমন ‘সিন্ধু’ যৌবনের প্রতীক। শাপভ্রষ্ট, বন্দীর বন্দনায় কবির ব্যক্তিগত প্রবৃত্তির প্রতীক। ‘অবিচ্ছেদ্য কারাগার’, ‘কঙ্কাবতী’, কবিতার নির্বিশেষ প্রেমপাত্রীর প্রতীক। নারীর স্তনের প্রতীক হেলেনের বুকের ছাঁচে গড়া ‘সোনার বাটি’ কবিতায়। শূন্য দিনের প্রতীক ‘পচা ডোবা’ বৃষ্টি আর ঝড় কবিতায়। এ সমস্ত প্রতীক ও অনুভূতি কবির নিজস্ব ব্যক্তিত্বের জায়গা ছাড়িয়ে সবসাধারণীয় ব্যাপার হয়ে ওঠতে পারেনি। তাছাড়া আধুনিক হয়েও আধুনিক জীবনের ইংগিত এখানে সুলভ্য নয়। এরপর অমিয় চক্রবর্তীকে ধরা যায়। তাহলেও একই প্রবচন উঠে আসে। তিনিও সবার অলক্ষে শূন্যতাকে মেপেছেন দৈর্ঘ্য-প্রস্থের আলোকে। এইভাবে তিরিশি আধুনিক কবিতা বেড়েছে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন, প্রেমেন্দ্র মিত্র এঁদের মনোবিকলনের উন্মত আবহে। সমর সেন একটি কবিতায় বলেন, মধ্যবিত্ত আত্মার বিকৃত বিলাস/স্যাকারিনের মত মিষ্টি/ একটি মেয়ের প্রেম। স্থূল চতুর প্রবঞ্চনা বিলাসী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতি বিদ্রুপ ও ঘৃণা। মধ্যবিত্তের মন্থর রক্ত, এখানে কোন আবর্তন কোন স্রোতোশ্চলতা নেই। অনেকটা এলিয়টের নায়কের মতো, …..এক নিষ্ঠুর পৃথিবী সমর সেনের কবিতার গভীর সংক্রামিত। এ সমস্ত কথার পরে প্রশ্ন আসে, একজন কৃষি প্রধান অর্থনৈতিক, দেশের মানুষ, সমতল ও পাহাড়ী প্রান্তিক মানুষের পেশাজীবিতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গীভূত মানুষের সুস্থ স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এসমস্ত চিন্তার ঐক্য কোথায়? যে আধুনিকতা ব্যক্তিগত সমুদ্রে আকুণ্ঠ ডুবে অপর কে বাঁচিয়ে তোলার নিতান্ত মূর্খ স্বপ্নে নিমজ্জিত থাকেন- সেই আধুনিকতাকে দরকার আছে কি না ভেবে দেখা দরকার।
তিরিশের আধুনিক কবিদের কবিতার কয়েকটি উদাহরণ। মিলের ধোঁয়ায় ঢাকা শরতের নীল নভস্থল, নগরের আবর্জনা জাহ্নবীর পুণ্য স্রোতে ঘুরে। ছুটি-পাওয়া মসিজীবী দল বেঁধে করে কোলাহলে, পরিক্ষিপ্ত পরচর্চা বিষায়িছে বিমুক্ত বায়ুরে। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, “এটি কোলকাতা নগরের আংশিক চিত্রপট, নৈরাজ্যের ছায়া নাগরিক চেতনার উৎকটগন্ধী বায়ু প্রবাহ। সত্যিকারের কোলকাতায় সে সময় এরকম আবহ বিরাজমান ছিল কি না বলা মুশকিল। বস্তুতঃ এই দৃষ্টিভঙ্গী নগরীকে খোঁজেনি, পাশ্চাত্যের তত্ত্ব আহরিত রঙিন চশমায় কৃত্রিমভাবে কোলকাতাকে দেখা আরাধ্য ছিল। আমরা ভেঙেছি ধান,আমরা ভেঙেছি গম জোয়ার বাজরা আর শস্য অড়হর আমরা তুলেছি পাট। আমরা বুনেছি শাড়ি গড়েছি পাথর, আমরাই ধরি হাল আমরাই করি গান “বিষ্ণু দে” ধরা যাক তিনি এখানে মানুষের প্রতিনিধি। সব মানুষের হয়ে কথা বলেছেন। যে মানুষ সকল কালের। কিন্তু সে মানুষের সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি আধুনিক যুগ মানসিকতার ফল। প্রকৃতপক্ষে আধুনিকতা ও সমাজতন্ত্র এক সঙ্গে হাটতে পারে না। যেহেতু আধুনিকতা তাই পুঁজির মধ্যে আকন্ঠ ডুবে নির্মাণ করেন অলীক স্বপ্ন। আর সমাজতন্ত্র সেখানে সাধারণজীবী মানুষের উৎপাদনে চলমানি মানুষের নির্বিঘ্ন স্বপ্ন-পুরাণ। তা হলে বিষ্ণু দে সেই আধুনিকতাকে স্বীকার করে সমাজতন্ত্রী হন কিভাবে? প্রশ্ন থেকে যায় আজকের পাঠকের কাছে। তারপরেও তার কবিতার এই ভাবসম্পদ ভারত বর্ষের নয়, পাশ্চাত্যের। তবু হঠাৎ আসে যখন পাতা ঝরার দিন, দমকা হাওয়া থেকে থেকে ছাদ- ছাড়ানো গাছের মাথায় লাগে। আমার শহর খানিক বুঝি ঝিমিয়ে পড়া তন্দ্রা থেকে জাগে। চিমনি তোলা ঊর্ধ্বমুখে আকাশ পানে চেয়ে কিভাবে সেই জানে। ভেবে ভেবে পায় কি নিজের মানে? গোল বেঁধেছে কল ফেঁদেছে বসিয়ে বাজার হাট, রাস্তা পেতে মেলেছে ঢের রং-বেরং-এর হাট প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই কবিতার প্রথম পাঁচটি পঙ্‌ক্তি অসাধারণ ভঙ্গিমায় উপস্থাপিত হয়। মানুষের অনুভূতির রেজারেকশনও হয়। অশান্তির পরে যেন সব শান্তি গলায় গলায় ভাব জমায়। এই মেজাজি আনা বা সম্পূর্ণ প্রেমেন্দ্র মিত্রের একার। নৈরাশ্য হতাশা নাভিশ্বাস এ সমস্ত রূপকল্প থাকলেও কোথাও যেন বা ইতিবাচকতা শেষ পর্যন্ত উঁকি মারে। ঊনিশ শতকের কোলকাতার জীবনের বিভীষিকা কম চোখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত কোন দফা-রফা হয় না। পাশ্চাত্য আসে ভর করে তার কাব্যের দরোজায়। অনেকটা এরকমভাবে ক্লান্ত বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে কাল্পনিক সমাজ বিনির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন তিরিশি কবিবৃন্দ। তিরিশি এবং তিরিশ পরবর্তী কবিদের এই আত্মরতি রিরংসা সর্বোপরি হতাশার গহীনে নিমজ্জিত এই ঊনিশ শতকের শুরুর পর্যায়ে অর্থাৎ ১৯০৬ এ শুরু হয় ফবিজম, ১৯০৭ সালে কিউবিজম, ১৯১০ সালে ফিউচারিজম এবং পরবর্তী পর্যায়ে আসে দাদাইজম। যেটি কবিতার উপরে নিরন্তর প্রভাব ফেলে চলেছে। দাদাইজমের পরিচয় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে; এই আন্দোলনের ভবধারনায় প্রভাবিত সুররিয়ালিজম। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রুমানীয় কবি ত্রিস্তান জারা, হুগু বেল, রিচার্ড হলম্যান কবি ও স্থপতি হেন্স আর্প। ‘দাদা’ ফরাসি শব্দ, অর্থ কাঠের ঘোড়া। একদিন ত্রিস্তান জারা একটি কাফেতে বসে এক ফরাসি অভিধানের প্রথম পাতায় বসিয়ে দেন এক তীক্ষ্মাগ্র ছুরি। ছুরির ডগা যে পাতায় গিয়ে শেষ হলো, সেখানে ‘দাদা’ শব্দটি রয়েছে। কিন্তু ছুরির শীর্ষ তাকে স্পর্শ করে-নি। এই গল্পটি এ জন্যই উপস্থাপিত হলো যে, ইউরোপের এ সমস্ত আন্দোলনের পশ্চাতে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না। ত্রিস্তান জারাতো কবিতাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। সংবাদপত্রের একটা অংশ থেকে প্রত্যেক শব্দ আলাদা করে কেটে নিয়ে একটি পাত্রে মিশিয়ে দিয়ে, তার থেকে এক মুঠো শব্দ তুলে সাজিয়ে দিলেই কবিতা হবে। দাদাবাদের শূন্যগর্ভতা আবিষ্কারের পরে শুরু হয় সুররিয়ালিজম আন্দোলন। এসব থেকে বোঝা যায় ইউরোপের শিল্প এবং সাহিত্য বিষয়ক কোন আন্দোলন বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর দিয়ে সমাজ বিনির্মাণের সহায়ক হয়ে আসেনি। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষেও ইউরোপীয় আন্দোলনের মতো অনেক আন্দোলন দানা বাঁধে, যার কোন দর্শন, সামাজিক ও ঐতিহাসিক মূল্য নেই। কবিতা আন্দোলন, শ্রুতি আন্দোলন, হাংরি জেনারেশন, স্যাড জেনারেশন, এংরি জেনারেশন ঐতিহাসিক ও সামাজিক অভীপ্সা থেকে লক্ষ্য করলে এ সমস্ত আন্দোলনের কোন উৎসভূমি পাওয়া যায় না। এর কোন ইস্তেহার নেই; যে সমাজে বড় ধরনের কোন অসংগতির কারণে আন্দোলনগুলো কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে নতুন স্বপ্ন ও জাগরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব কারণ পর্যালোচনা করলে বাংলা কবিতার ঊনিশ শতকীয় দর্শনে কেবল উঠে আসে ক্লেদ বিবমিষা হতাশা ও ক্লান্তি। বিগত পঞ্চাশ বছর আমাদের অনুভূতি ও মেধাকে শোষণ করেছে। পরান্নভোজী ও অধীনস্থ করে রাখা হয়েছে। যাতে বাঙালি না জাগে স্বপ্নে ও সীমানায়, রাষ্ট্রে ও দর্শনে। কিন্তু একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতরে, বাঙালির স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্থিত্বের ভেতরে পুনর্জাগরিত। সেই সঙ্গে খুলে যায় কবিতার নান্দনিক ও ইতিহাস ঐতিহ্যের জায়গা। এরই ভেতরে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে উত্তর আধুনিক কবিতাভূমির জন্ম হয়। কবিতার নতুন ভাষাভঙ্গি ও কাঠামোর মধ্যে সরল চারুতায় যুক্ত হয় ইতিহাস ঐতিহ্য ও লোকায়াত আচার। কিছু কবিতার উদাহরণ দিলে পূর্বোক্ত কবিদের কবিতার চেয়ে আজকের কবিতার কোথায় আলাদা তা শনাক্ত করা সহজ হবে।

১. যে নিষ্ঠুর কথা আমার মনে,
ওই রূপোলি চুল আমায় বলতে দেয় না
আরো যে নিষ্ঠুর কথা এরপর,
ওই রূপোলি চুল আমায় লিখতেও দেয় না।
অনির্বাণ লাহিড়ী
২.কোথাও কিছু নেই, অনুতাপ ছাড়া, বোবা ও বধির
ছাড়া- শুধু শব বাহকের উল্লাস ধ্বনি বয়ে যায়
(নাসের হোসেন)
৩. সব নদী গঙ্গা নয় শিবের সান্নিধ্য
পাবে
আমারও সান্নিধ্যে এসে ধন্য ছিল
হালদা কর্ণফুলী
সব নদী সংকীর্ণ হলে চর জাগে
দেবতারা দূরে সরে যায়।
(জিললুর রহমান)
৪. মায়ের ছায়ায় সু-কন্যা ইশকুলে যায়
দাদিমার শাদা চুলের আলোতে
রাত আরো গভীর হয়ে আকাশের তারাকে ডাকে
তারার অপেক্ষায় থেকে
সু-কন্যা এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে
(সাজিদুল হক)
৫. কে সে এক মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে
পুজো দিচ্ছে ঘাটে
আমি যে পূজারী তার
দাঁড়ালাম এসে
অর্ঘ্যহীন শূন্য হাতে,
সে আজ ফেরাবে
কোন অজুহাতে?
(ইউসুফ মুহম্মদ)
৬. আমার কানের কাছে বাজবে না খঞ্জনার শীষ
চারুর সৌকর্যে আমি, অন্ত্যজ সুষমা এক
মাটির মহিষ
(ওমর কায়সার)
৭. খুইমা আরো খাং, লুমা আম্যে খাং
সেই ভাল কুকুরের অনেক লালসা আমি
তুসি অস্থি সেই সুজনার…
(হাফিজ রশিদ খান)

৮. আষাঢ়স্য এ ঘন দিবসে
আমার ময়ূর
মনের হরষে
মেলেছে পেখম
নানান রঙিন,
যায় দিন।
দিনগুলি এ দীনের হাত ধরে
যেখানে বাসনা করে
(আহমেদ রায়হান)
৯. বাবা কী দারুণ ছিলো এই ঘাস
মেঘ ছেঁড়া ঝাঁকে ঝাঁকে বুলবুলি চোর
মোর ধান খেয়ে যেতো বুলবুলি চোর
কুমারী মায়ের মতো ছিল এই ঘাস
(সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)
১০. মেঘনার ঘাটে-ঘাটে
ইলিশের কাঁচা ঘ্রাণ। কখনো ওঠে না
কুবের মাঝির পাতে।
ও পাড়ে জামাই ষষ্ঠী- এ খবর শোনে
হোসেন বেপারী
দলে দলে মীন কনে পাল তোলা নায়ে
(শাহিদ হাসান)
১১. চিলতি এখন মেঠো পথ। ঘাসফুল।
কাছাকাছি বয়স প্রায়-জন্মদিনের গোধূলি…
ছোট্ট প্রজাপতি। রঙধনু কেশবতী
বাল্যপাঠে ডানা ঝাপটায়।
সবুজ পোয়াল
লাল কাঁকরোল
গিমি পাতা- সেই
(হেনরী স্বপন)
১২. কবিতা-কবিতা কইরা যে- মেয়েকে খুঁজছে সবাই
ছোট্ট বেলার নামতা- খাতায় লেখা দূরের স্টেশনে
নাইমা গেছে সে- নদীটার কাছে
ধুলার অসরে সুইদা গেছে সেইসব রাতের ট্রেন।
(শামীম রেজা)
১৩. এই মাঠের কী নাম? নিয়তি?
নামে কি আসে যায়, পায়ের তলায় যত রাঙা ধুলো
পায়ে বাঁধা গতি।
চলেছি খালের ধার ধরে। দূরে দেখা যাচ্ছে
একটা দুটো গৃহস্থের বাড়ি।
জলে নেমেছে শ্রীরাধার বান্ধবীরা সব।
(বিশ্বজিৎ চৌধুরী)
১৪. কোনদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম।
রাত গভীর হলে আমাদের এই প্রচলিত ভূপৃষ্ঠ থেকে
ঘুমন্ত কুড়িগ্রাম ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়।
অগ্রাহ্য করে সকল মাধ্যাকর্ষণ।
তারপর তার ছোট রাজ্যপাট নিয়ে উড়ে উড়ে
চলে যায় দূর শূন্যলোকে।
(মাসুদ খান)
১৫. পুকুরের লোনা জলে ভাসছে দুপুর
বেহুলার চোখ
ভাসছে দুপুর
আমাদের সমস্ত দুপুর
(হোসাইন কবির)
১৬. তোমাকে লাখেরাজ দিয়েছে ঐ আকাশ, ওরা বললো।
স্তবকের পর স্তবক ভাঁজ করা নীল আসমান
আর তার চন্দ্র সূর্য গ্রহতারা। চতুরঙ্গ আলোর সিপাহী,
বৃষ্টি ও মেঘের তীরন্দাজ সেনাদল, অফুরন্ত ক্ষমতা প্রসার
তুমাকে সেলাম বাবু। কিন্তুক এ জমিন হামার
(খোন্দকার আশরাফ হোসেন)
১৭. বলো কী জমাট তবু? আলিঙ্গন লীন?
মরছে তবু বহু আগে- বাজলে কফিন
যে প্রাণের কড়া নেড়ে দূরে চলে যায়
কী মেঘ ছড়িয়ে রাখো তার আঙিনায়
(সেলিনা শেলী)
১৮. তরুণী তোমার দুঃখ আমাকে দাও
জ্বল জ্বলে এক আংটির মতো পরি
(শাহিদ আনোয়ার)
১৯. ছেঁড়া কাঁথার মতো গ্রামটির কথা
আজ মনে পড়ছে সারাদিন
আজ নয় কাল এসো
(প্রকাশ দাস)
২০. আমার একটি কবিতা শোনানোর দরকার ছিল
ইয়াসিন আলিকে
যে কখনো রবীন্দ্রনাথের নাটক শোনেনি
(নাসিমা সুলতানা)
২১. পুরনো বেদনা ভুলে যাওয়াও আরেক বেদনা।
শুকিয়ে-যাওয়া ক্ষতের মতো, চাপ দিলে আর ব্যথা লাগে না।
বুকটা হঠাৎ করে ওঠে। কই, চিতায় শোয়ানো সেই আলতা
পরা পা দুটির কথা মনে পড়লে আর চোখের জল আসছে
নাতো?
তাহলে কি, এতদিন পর, সত্যিই ভুলে গেলাম তাকে।
বুকটা ছ্যাৎ
করেও ওঠে
(রণজিৎ দাশ)
২২. তোমার নাম নিলে ধুলো উড়ে সাঁই
কাঠফাটা সাগরের জলে ভাসিছে
কাঠের জাহাজ
মন আঁখি হতে পয়দা হলো আসমান ও জমিন
অজলে ভাসে না কাঠের জাহাজ
ভাসিছে নরম জল।
(এজাজ ইউসুফী)
২৩.
আমি বৃক্ষ দেখি না, বৃক্ষের ছায়া দেখি
মৃত্তিকা দেখি না, তার মায়া দেখি
(শুক্লা ইফতেখার)
উল্লিখিত এ সমস্ত কবিতা ৫০ পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে রচিত হয়েছে। দু’বাংলার কবিতা এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। কবিতা সম্পর্কে দু’বাংলার সাম্প্রতিক ভাবনা কি? কবিরা কী ভাবছেন? উল্লিখিত ক্ষুদ্র অথচ মনোসঞ্চারী কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যাবে। কবিতার মেজাজ ও বিষয় একবারে আলাদা। সম্মুখের ভাবনাগুলোকে দ্বিগুণ উৎসাহে সম্প্রসারিত করে। কিছু কবিরা উত্তর আধুনিকতায় বিশ্বাস করেন না। তাদের বিষয়ে ও ভাষায় এর কিছু প্রস্তাব রয়েছে বিধায় উল্লিখিত হলো। যাদের এখনো সন্দেহ কিংবা বোঝার ফাঁক রয়েছে, কি কি কারণে একটি কবিতাকে উত্তর আধুনিক কবিতা বলা যেতে পারে, তাদের বোঝানোর ব্যাপারে হয়তো সাহায্য করবে। প্রধানত ভাষার বুনন, বিষয় নির্বাচন, ছন্দের গাঁথুনি, সহজিয়া সুর এবং পুরনো অতীতকে নতুন আঙ্গিকে ব্যবহারের চতুরতা, সুগম্য আঙ্গিকে উপস্থাপনের দৃষ্টিভঙ্গি আমার কাছে দেশ ও জনপদের অনেক কাছের বলে অনুমিত হয়েছে। উত্তর আধুনিকতা বিবৃত হয় স্থানিক সংস্কৃতির আবহে-বর্তমানে বিম্বিত হয়ে ভবিষ্যতের নির্দেশনা কে মেনে নেয়। এটি একক কিংবা একপেশে ধারণা নয়, ব্যক্তিগত অনুভূতির ঝরামালা নয়, একগুচ্ছ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কাছে দায়বদ্ধ, এটি মাটিগন্ধি সংস্কৃতির মিলিত মোহনা, ক্রমশই সাহিত্য আন্দোলন থেকে বৃহত্তর সমাজ ও সচেতনতা বোঝে আবিষ্ট হয়ে একটি সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনা অঙ্গীভূত হতে চলেছে। সাহিত্যের জন্যেও এই অঞ্চলের বাঙালির জন্য আর কোন নতুন সাহিত্য আন্দোলনের দরকার হবে না। আমার ধারণা এই দার্শনিক প্রত্যয় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনায় এই গোটা অঞ্চলের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের জাগরণের দুয়ার খুলে দিচ্ছে নতুন ব্যঞ্জনায়।”

x