আমাদের ঐতিহ্যের ভাষ্যকার আবদুল হক চৌধুরী

জামাল উদ্দিন

শুক্রবার , ২৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
93

চট্টগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে এক দারুণ সত্য পাঠ সম্পন্ন করেছেন। চট্টগ্রামের পরিবেশ, জীবন ও সামাজিক চিত্র তাঁর অন্বেষণে প্রমূর্ত হয়েছে অনন্য ভাস্বর আন্তরিকতায়। তিনি তাঁর অন্বেষণে চট্টগ্রামের এমন কোন বিষয় বাদ রাখেননি যা প্রণিধানযোগ্য। বিয়ের ‘চৌফুল’ হতে শুরু করে রন্ধন শৈলী, সামাজিক অনুষ্ঠান ‘পান-ছল্লাহ’ হতে শুরু করে ‘বংশ তালিকা’ পর্যন্ত তাবৎ সবকিছু তিনি অন্বেষণে তুলে এনেছেন একজন যথার্থ উত্তোলকের মতো।

চশমার কালো ফ্রেমে সাদা গ্লাসের ভেতর থেকে যেন দুটো চোখ জ্বল জ্বল করে তাকিয়ে আছে। মুখে তাঁর মিষ্টি হাসি। বললেন, কেমন আছ ভাগিনা? উত্তরে বললাম মামা ভালো, আপনাকে নিতে এসেছি, আজ আমাকে আসতে বলেছিলেন, বলেছিলেন ইতিহাস অন্বেষণে আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড় দেখতে যাবেন। তিনি এবারও বললেন- শরীর ভালো যাচ্ছে না, দেখি সুস্থ থাকলে এ মাসের শেষের দিকে যাবো। এভাবে অনেকবার..। যাবার কথা ছিল দেয়াঙ পাহাড়ে। যেখানে ছিল হাজার বছরের প্রাচীন বন্দর, বন্দর সংলগ্ন দেয়াঙ কারাগার, চাটিগাঁ দুর্গ, পর্তুগীজ কিল্লা, মঘ-পর্তুগীজ অভয়রণ্য দস্যুবন্দর, মনুমিয়া-মলকাবানুর স্মৃতিবিজরিত শোলকাটা গ্রাম, আলাওল কন্যা চুরুতবিবির মসজিদ, কালাবিবি চৌধুরানীর জরিদার বাড়ি, ঝিওরী হাজিগাঁও গ্রামে সেই ঐতিহাসিক পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় স্থান সমূহ পরিদর্শন করবেন, লিখবেন এবং আমাকে সাথে নিয়ে যাবেন। শেষ বার দেখা হয়েছে সম্ভবত ১৫ অক্টোবর ‘৯৪ সালে। সেবারও বলেছিলেন ঐতিহাসিক ঐ স্থান গুলোতে যা যাব বলে যাওয়া হয়নি। আমি যাবো, আমাকে যেতেই হবে। হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস তুলে আনতেই হবে। তাঁর ইতিহাস অন্বেষণ দেখে বার বার বিরক্ত করতাম, মামা চলুন না আনোয়ারায়; আমিই আপনাকে নিয়ে যাবো। কিন্তু আর যাওয়া হলো না ২৬ অক্টোবর ‘৯৪ সালে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
কোনো দিন মামার কথা শুনতে পাবো না, আর কোনো দিন মামা বলে ডাকতে পারবো না, প্রাণ খোলা হাসি দিয়ে বুকে আর জড়িয়ে ধরবেন না। একে বুঝি বলে মৃত্যু। জানি তো একদিন আমাকেও যেতে হবে, সকলকেই যেতে হবে। কিন্তু বিশ্বাস হয় না, একথা এখন মনে হয় তাঁর সাথে আবারো দেখা হবে, হেসে কথা হবে, লেখালেখির আলোচনা হবে, ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের কথাগুলো অতি দরদের সাথে তিনি বার বার আমাকে বলবেন, ভাাগিনা কি করবেন মেনে তো নিতেই হবে। হাঁ, এসব কথা আর দেখাদেখি আর কোনদিন হবে না। মৃত্যু, কী ভয়ানক, কী নিষ্ঠুর।
তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। চোখ বুঁজলে আজও দেখতে পাই লম্বা, স্বাস্থ্যবান আবদুল হক চৌধুরী হেঁটে যান বাকলিয়া, দেওয়ানবাজার, আন্দরকিল্লা, জামাল খান রোড, এনায়েত বাজার এরকম হাঁটছেন তিনি। হাঁটতে ভালবাসতেন-যতবার দেখেছি হাঁটাপথে, মৃদু হেসে অপত্যস্নেহে জিজ্ঞেস করছেন কেমন আছো ভাগীনা? সাদা পাঞ্জাবী, সাদা লুঙ্গি পরা এই একশতভাগ বাঙালি অনায়াসে সকল ক্ষুদ্রতাকে ছাড়িয়ে হয়ে ওঠেন বিশিষ্ট।
আবদুল হক চৌধুরীকে আমি প্রথম দেখেছি ১৯৭৩ সালে দেব পাহাড়স্থ দৈনিক ইস্টার্ন এক্সজামিনার পত্রিকার সম্পাদক খলিলুর রহমানের অফিসে। তখন আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। খলিলুর রহমান আমার মামা। আবদুল হক চৌধুরী প্রায় ইস্টার্ন এক্সজামিনার পত্রিকায় আসতেন এবং মামার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। মামার বন্ধু তাই আমিও পিতার চাইতেও বয়সী আবদুল হক চৌধুরীকে সম্বোধন করতাম ‘মামা’ বলে। ঐ সময় মামার সাথে বাকলিয়াস্থ আবদুল হক চৌধুরীর বাসায়ও গিয়েছিলাম অনেকবার। আমার মনে পড়ে আবদুল হক চৌধুরী প্রচণ্ড শীতকালের এক সকালে শীত পিঠার দাওয়াত দিয়েছিলেন মামাকে। মামা আমাকেও সাথে নিয়ে গেলেন। পিঠা খাওয়া শেষে তাঁরা আড্ডায় মেতে উঠলেন। তাঁদের দীর্ঘ সময়ের আড্ডার ফাঁকে ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ নামে একটি বই আমি চাদরের ভেতর লুকিয়ে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। বইটির লেখক ছিলেন চৌধুরী পূর্ণচন্দ্র দেবব্রহ্মণ। বইটি দেখে মামা বলেছিল এটা কোথায় ফেলি? আমি সরাসরি সত্য কথাই বলে ফেললাম। মামা বললো এটা তো গুরুতর অপরাধ! তবে তিনি তোকে ক্ষমা করবে এক শর্তে; আমি তোকে সাথে নিয়ে কয়েকদিন পর চৌধুরী সাহেবের বাসায় যাব, তিনি এই বই সম্পর্কে যা প্রশ্ন করবে তোকে তার উত্তর দিতে হবে, পারবি? আমি রাজী হয়ে গেলাম। এসব কথা মামা ফোনে চৌধুরী সাহেবকে জানিয়েও দিলেন। আমি মনোযোগ দিয়ে বইটি পাঠ করতে লাগলাম; এক-দু বার নয়, বহু-বহুবার। যেন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি। প্রায় দশ/বারো দিন পর মামা আমাকে নিয়ে গেলেন চৌধুরী সাহেবের বাসায়। তিনি আমাকে দেখে সহাস্যে বললেন- ভাগিনা কি পরীক্ষায় পাস করবে? আমি মাথা নাড়লাম। তারপর একের পর এক প্রশ্ন? আমিও উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। এক পর্যায়ে স্বহাস্যে বলে উঠলেন পাস-পাস, ভাগিনা তো পুরো ইতিহাস মুখস্ত করে ফেলেছে! মামা বইটি আবদুল হক চৌধুরীর হাতে তুলে দিলেন। গ্রন্থটি পড়ে[ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমিও ইতিহাস অন্বেষক হবো। এরপর গড়িয়ে গেল অনেক বছর। পা বাড়ালাম সাংবাদিকতায়। ১৯৯৪ সাল, আমি তখন দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকার ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি, এই সময় অনেকবার আবদুল হক চৌধুরীর স্মরণাপন্ন হয়েছি তাঁর বাকলিয়াস্থ বাসভবনে। যতবার তাঁর বাসভবনে গিয়েছি কথা বলার জন্য, তাঁর সান্নিধ্যে ধন্য হওয়ার জন্যে, স্মিত হেসে কাছে বসিয়েছেন। বয়সের বিরাট ব্যবধান ভুলে কথা বলেছেন বন্ধুর মতন। ইতিহাস, সমাজ, পুরাণ, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ করেছেন অবলীলায়। অবাক হয়ে যাই, সমস্ত সূত্র সমস্ত ধারাবাহিকতা, সমস্ত সংশ্লিষ্টতা তাঁর নখদর্পণে বলে যান তিনি। যে বিরল মানুষদের সামীপ্য ক্লান্তিকর, একঘেঁয়ামিতে বিরক্ত বিরক্তিকর হবার নয়, তিনি তাঁরেই একজন। তেমনি আকর্ষণীয় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সমূহ।
ঐ সময়ে আমি ‘দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস’ বইটি রচনা করতে গিয়ে আবদুল হক চৌধুরীর সংগ্রহ আমাকে দেখতে হলো খুঁটিয়ে, তখনই আমি তাঁর প্রতি আরো বেশি সশ্রদ্ধ হই, মধুকরের মতো এত কষ্ট করে চট্টগ্রামের নিজস্ব লৌকিক উপাদান সংগ্রহ এত আন্তরিকতার সাথে আর কারো পক্ষে সম্ভব হতো না।
এটা ঠিক যে, তাঁর লেখায় পাণ্ডিত্য কিংবা সাহিত্য কর্ম বেশি কিছু নেই, শুধু পরিশ্রম ও নিষ্ঠার ছাপ জুড়ে আছে। কিন্তু তাঁর চিন্তা ও চেতনায় একজন ঐতিহাসিকের বলিষ্ঠ ধারণা বর্তে ছিলো।
বাংলার ইতিহাস পড়তে রাজা গনেশের সাক্ষাৎ পাই, তিনি মুসলমান পরাক্রান্ত সুলতানদের ভেতর পাঁচ বছর রাজত্ব করে গেছেন, কি কৌশলে সেই সামপ্রদায়িক যুগে তা সম্ভব হয়েছিল তা আজও সঠিকভাবে জানা যায় না, ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার সেই রাজা গনেশকে শ্রেষ্ঠ অধিশ্বর এবং মহৎ ব্যক্তিত্ব বলে বিশ্লেষণ করেছেন, আর একজন ঐতিহাসিক আবদুল করিম অবশ্য গণেশকে দুর্বৃত্ত ছাড়া আর কিছু বলতে রাজী নন। ইতিহাস লিখতে গিয়েও আমাদের হিন্দু ও মুসলমান মনন উচ্চারণ ছাড়া আর কিছু থাকে না। সে কারণে আমি আবদুল হক চৌধুরীর ঐতিহাসিক তথ্যগুলোতে কিছু মাত্র সামপ্রদায়িক সুড়সুড়ি দেখিনা। তাঁর শহর চট্টগ্রামের বইটিতে চেরাগী পাহাড়কে নিয়ে সরকারিভাবে চট্টগ্রামের নাম মাহাত্ম্য দেখবার জন্যে অর্থাৎ চাটিগাঁ থেকে নামকরণ হয়েছে এ সামপ্রদায়িক ধারণার প্রতিবাদ করেছেন আবদুল হক চৌধুরী। একটি পরিকল্পিত ভূয়া ধারণা প্রজন্মকে বিপথগামী করার জন্যে কর্তৃপক্ষ বর্তমান চেরাগী পাহাড়ের উপর বিশাল মিনার তুলে যে মহৎ(?) করেছেন বলিষ্ঠভাবে তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন। চাটিগাঁ শব্দটি হযরত বদর শাহের চট্টগ্রাম আগমনের আরো ৪শ বছর পূর্বের। চট্টগ্রাম নাম যে থেকে হোক হযরত বদর শাহের চাটি থেকে ‘চেরাগী পাহাড়’ হয়েছে সেটা মেটেই ঠিক নয়। ইতিহাসের গভীরে না গিয়ে যারা ইতিহাস নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছেন তাদের প্রতি নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই।
আবদুল হক চৌধুরী, আমাদের মূলধারার একজন কৃতি অন্বেষক। শ্রম ও নিষ্ঠায় তাঁর এই অন্বেষা ছিলো বর্ণাঢ্য ও তথ্যবহুল। তাঁর প্রতিটি অন্বেষণে কৌতুহল যেমন ছিলো, তেমনি ছিলো এক অনুশীলনরত আবিষ্কারের হিরন্ময় আকুলতা। এ আকুলতায় পাঠকও বিভোর হয়ে যেতেন শিকড়ানুসন্ধানের এক অসাধারণ তাড়নায়। খুব সরল এক বর্ণনায় তিনি পাঠকদেরকে টেনে নিয়ে যেতে পারতেন মূলের সন্নিকটে। অন্বেষণে তিনি কোন রকমের ফাঁক বা ফাঁকির আশ্রয় দেননি। সে জন্য তাঁর পাঠকরা তৃপ্ত হতেন। কারণ তাঁর অন্বেষণে জিজ্ঞাসা ও কৌতুহলের নিবৃত্তি ছিলো একশ ভাগ পূর্ণতায় উজ্জ্বল।
আবদুল হক চৌধুরী আমাদের কালের প্রজন্ম নন। তবে তিনি আমাদের কাল বা প্রজন্মকে আমাদের ঐতিহ্যকে উন্মোচিত করে দেখিয়ে দিয়েছেন আমরা মূল্যহীন নই। আমাদের ঐতিহ্য আছে জানার মতো, অহংকার করার মতো-এ সত্যটি প্রমাণের জন্য সেকালের আবদুল হক চৌধুরী আমাদের কালে অর্থাৎ একালে আমৃত্যু নিয়োজিত ছিলেন-নিবেদিত ছিলেন এক অনন্য সাধনায় গবেষণায়। তাঁর জীবনের বিস্তার ছিলো বিপুল। বিপুল বিস্তারকে তিনি জীবনের অকৃত্রিম অন্বেষণের পাঠ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন বিশালতায়। ফলে নিজে যেমন বিশাল হয়েছেন কর্মের কৃতিত্বে, তেমনি আমাদেরকেও দিয়েছেন বিশাল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চারুসৌন্দর্য।
তাঁর দৃষ্টি ছিলো সুদূর প্রসারি। এ দৃষ্টির মাঝে তিনি অক্লান্ত ব্যগ্রতায় নিয়ে এসেছিলেন আমাদের অতীতকে। তিনি খুব প্রদৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায় বিশিষ্ট করেছেন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে। আমরা চাল চুলোহীন কিংবা বানে ভেসে আসা ফেলনা কেউ যে নই-তা আবদুল হক চৌধুরী খুব সযতনে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়ে গেছেন।
আবদুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে এক দারুণ সত্য পাঠ সম্পন্ন করেছেন। চট্টগ্রামের পরিবেশ, জীবন ও সামাজিক চিত্র তাঁর অন্বেষণে প্রমূর্ত হয়েছে অনন্য ভাস্বর আন্তরিকতায়। তিনি তাঁর অন্বেষণে চট্টগ্রামের এমন কোন বিষয় বাদ রাখেননি যা প্রণিধানযোগ্য। বিয়ের ‘চৌফুল’ হতে শুরু করে রন্ধন শৈলী, সামাজিক অনুষ্ঠান ‘পান-ছল্লাহ’ হতে শুরু করে ‘বংশ তালিকা’ পর্যন্ত তাবৎ সবকিছু তিনি অন্বেষণে তুলে এনেছেন একজন যথার্থ উত্তোলকের মতো।
কোন জায়গায় তিনি অযথা বর্ণনায় বাহুলতা দিয়ে তথ্যের সমাহারকে খাটো করে দেননি। যা ছিলো তাই তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন একজন সনিষ্ঠ ঐতিহাসিকের একাগ্রতায় ও নিরপেক্ষতায়। তাঁর শ্রম ও সাধনা তাঁর কর্মকে ঐতিহাসিকের একাগ্রতায় ও নিরপেক্ষতায়। ঐতিহাসিক রেফারেন্স এর আওতাধীন করেছে। একজন সাধারণ গবেষকের জন্য এটা এক অনন্য সাধারণ পুরস্কার। এছাড়াও তাঁর কর্ম ও সাধনায় এবং তাঁর কর্ম ও সাধনার ফলশ্রুতিতে এটাই প্রমাণ করে যে, বড়ো যে কোন আবিষ্কার, অন্বেষণ ও গবেষণার জন্য ‘বিদ্যাধর’ বা ‘কেউকেটা’ হতে হয় না। কৌতুহল ও আকাঙ্ক্ষা, একাগ্রতা ও নিষ্ঠাই যে কাউকে মহৎ গবেষণায় সাফল্য এনে দিতে পারে।
আবদুল হক চৌধুরী পরিণত বয়সে লেখালেখি শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ’ (১৯৭৬) যখন প্রকাশিত হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল ৫৪ বছর। এর প্রায় বছর চারেক আগে থেকে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের প্রথম দিক থেকে তাঁর লেখার চর্চা শুরু হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার আগে এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত অনেকগুলো লেখা ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।তখন থেকেই তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আবুল ফজলসহ চট্টগ্রামের ও দেশের বরেণ্য পণ্ডিত এবং জ্ঞানপিপাসু সাধারণ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করেছিলেন। তাঁর তৃতীয় গ্রন্থ ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি’ প্রকাশের পর তাঁর খ্যাতি উভয় বঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ কলিকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে এই গ্রন্থের একটি বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশ করেন। চট্টগ্রামের লৌকিক বিষয়ের জন্য তিনি আবদুল হক চৌধুরীকে ‘মহাফেজ খান’ উপাধি দিয়েছেন। আজহার উদ্দিন খানও তাঁর সম্বন্ধে লিখেছেন। এসব লেখা প্রকাশের পর একজন অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন সমাজতাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর নাম অখণ্ড বঙ্গেও আনাচে কানাচে বিস্তার লাভ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে যে সমস্ত লেখক গবেষক পরিণত বয়সে লেখার জগতে আবির্ভূত হয়ে রাতারাতি বিখ্যাত হয়েছিলেন, এইভাবে তাঁদের তালিকায় আবদুল হক চৌধুরীর নামও সংযুক্ত হয়ে যায়।
আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন একজন বিদগ্ধ বাঙালির প্রতিকৃতি। বাঙালির ইতিহাস অনুসন্ধানে তাঁর বিদগদ্ধতা তাঁর পর্যায়ের জন্য একটি ঈর্ষণীয় ব্যাপার ছিলো। অনুসন্ধানের মাঝ দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চান যে, বাঙালির শিকড় কতো গভীরে। কারণ তাঁর কাছে একটা প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ ছিলো যে, বাঙালিরা বর্ণশংকর কিংবা মিশ্র একটা জাতি। তিনি সেটা মানতেন। তবে এ মিশ্রণের ফলে যে একটা জাতিগত ঐক্যের ধারা সৃষ্টি হয়েছিলো চিন্তা ও চেতনায় সেটাকেই তিনি সবিশেষ প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাঁকে দেখলে মনে হতো বাঙালির মাঝে আরবীয় বণিকের রক্তের ধারার প্রমাণ।
রাতারাতি খ্যাতি অর্জন করলেও এ শ্রেণীর সকল লেখক সাহিত্যিকের মতই আবদুল হক চৌধুরীরও একটি গোপন সাধনার ইতিহাস আছে। এই গোপন সাধনার ইতিহাসটি হলো কোন শুভ মুহূর্তে কিশোর আবদুল হকের মনে ইতিহাসের প্রতি কৌতুহলের বীজ উপ্ত হয়েছিল, ধীরে ধীরে সে বীজ একদিন মহিরুহে রূপ নিয়েছিল। সে ইতিহাস যদি তিনি নিজে আত্মজীবনী আকারে লিখে যেতেন, তাহলে পাঠকের কৌতুহল নিবৃত্ত হতে পারতো।
আবদুল হক চৌধুরী আজ নেই। কিন্তু রেখে গেছেন বর্তমান ও আগামীর জন্য একটি স্বর্ণ-কান্তি ইতিহাস ও গবেষণার অনন্ত অন্বেষণের সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনাই আমাদের গৌরব, চট্টগ্রামের ঐশ্বর্য আর বাঙালির অহংকার। তিনি একজন প্রবাদ পুরুষ হিসেবে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে যুগ যুগ ধরে স্মৃতিতে ঠিকে থাকবেন এ আমি বলে দিতে পারি।

x